বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি যখন লাবনীকে বিয়ে করি তখন সে সাত মাসের অন্ত:সত্ত্বা । মাগরিবের আজানের সময় আমাদের বিয়ে হয়েছিল। সবার মত আমিও চেয়েছিলাম আমার বউয়ের যেন গা ভর্তি গয়না থাকে,টুকটুকে লাল বেনারসি থাকে আর আমার বউটা ফুলে ঠেসে থাকা বিছনায় লজ্জায় মোড়ানো ঘোমটা দিয়ে আমার জন্যই অপেক্ষা করে। কিন্ত তার কিছুই হয়নি সেদিন আমার সাথে, আমার বউটার চোখের নিচে কালো দাগ পড়া ছিল, চোখ জুড়ে ফুরিয়ে যাবার আহবান ছিল, তার পরনে ছিল বড় একটা ম্যাক্সি, আর মাথার অর্ধেক পর্যন্ত একটা কালো রঙের ওড়না। ও সেদিন রোবটের মত বলেছিল.. কবুল কবুল কবুল, আমি ওর মুখের দিকে তাকাবার সাহস দেখাতে পারিনি তখন। লাবনী বিয়েতে রাজি হয়েছিল শুধুমাত্র তার সন্তানের কথা চিন্তা করে আর আমার মায়ের অনুরোধে। অথচ মাত্র পাঁচ মাস আগেই তার স্বামী মানে আমার বড়ভাই মারা গিয়েছিল। তাদের বিয়ের বয়সটাও ছিল মাত্র নয় মাস, আমার ভাইটার বাইক আর তাকে পিশে ফেলেছিল একটা সর্বানাশা কাভার্ড ভ্যান, আমার ভাইয়ের লাশটা বুকে নিয়ে আমার মায়ের আর্তনাদ আর লাবনীর গোঙানিতে সেদিন বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল হয়ত আমি সেদিন চোখে অন্ধকার দেখছিলাম তাই। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ভাবীকে তার বাবার বাড়ির লোকজন নিয়ে যেতে চাইলেও সে সেদিন যায়নি। বলেছিলেন শাকিল এর কবরের পাশে যেদিন শুতে পারব সেদিন ই আমি বের হব এ বাড়ি থেকে। সেদিন আমার বাবা মা আমি নতুন এক লাবনীকে দেখেছিলাম। ৪১ দিন পর আমি আমার কর্মস্থলে চলে গিয়েছিলাম, বাড়ি থাকার সাহস হচ্ছিল না। তার পর কোন এক দুপুর বেলায় বাবা ফোন দিয়ে বলেছিলেন - শিহাব তুমি বাড়ি আসো আজ, জরুরি প্রয়োজন। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়েছিল সেদিন,ফিরে দেখি আমার বিয়ে। লাবনীকে সাথে নিয়েই আমার মা ঘুমাচ্ছেন ভাইয়ের মৃত্যুর পর থেকে, সেদিনও মায়ের সাথেই ঘুমিয়েছিল ও। বাসর কি জিনিস তার স্বাদ পাওয়া হয়নি আমার তারপরেও আমি তৃপ্ত ছিলাম এই ভেবে - লাবনীর জন্য, ভাইয়ের জন্য কিছু তো করতে পারলাম। সকাল ঘুম থেকে উঠেই আমি মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি লাবনী আমার মায়ের কোলের ভিতর মাথাটা রেখে ঘুমিয়ে আছে। কি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে লাবনীকে! মা জেগেই ছিলেন, আমাকে দেখেই বললেন -সারা রাত জেগেই ছিল, শেষ রাতে কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। এই মুহুর্তে আমার কি করনীয় সেটা আমি বুঝে উঠতে পারছিনা। মা আমাকে ইশারায় বললেন লাবনীর পাশে যেয়ে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, কিন্তু লাবনীকে কখনো আমি ওমন দৃষ্টিতে দেখিনি। অন্য দেবরদের মত ফাজলামিও করতাম না, ওকে অনেক রেস্পেক্ট করে চলতাম কিন্তু ও আমায় নিয়ে সব সময় ই মজা করত। মা উঠে চলে গেলেন, আমি আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। লাবনী খানিকপর উঠে আমাকে দেখল, তারপর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নিজের মাথাটা সরিয়ে নিল। মাঝে মাঝে লাবনী টুকটাক কথা বলত আমার সাথে, তবে সেগুলো অতীব প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কিছুনা। এই যেমন ওয়াশরুমে পানি নেই,ওর ওষুধ শেষ এই ধরনের কথাই হত আমাদের। আস্তে আস্তে ওর ডেলিভারির দিন এগিয়ে আসল, বাড়ির সবাই খুব উত্তেজনায় ছিল.. ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, কবে হবে, নাম কি রাখা যায়। দশ তারিখ রাতে আমার প্রথম সন্তান মিডফোর্ডের হাসপাতালটাকে চিৎকার করে মাথায় তুলেছিল, হ্যা আমার ই সন্তান। এই কয়দিনে আমার অবচেতন মন ঘুরে ফিরে এই বাচ্চার বাবা হিসেবে নিজের সাথে নিজেকেই পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।দুদিন পর নবজাতক আর তার মাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম, প্রেগন্যান্সির সময়টাতে খাবার দাবারে অনীহা ওর শরীরটাকে ইদানীং কাহিল করে তুলেছে। এখন আমি আর ও এক সাথেই ঘুমাই। খাটের এক পাশে আমি আর অন্য পাশে লাবনী আর মাঝে আমাদের স্বর্গের টুকরো। কয়েকদিন পর যখন বাচ্চার নাম কি রাখা যায় বলে সবাই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ল তখন এক সন্ধ্যায় লাবনী বলেছিল - শিহাব.. তুমিই তোমার মেয়ের নাম রাখ! আমি সেদিন আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি, এই কয় মাস যে মেয়েটা আমার কাছ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিল, যেকিনা আমার দিকে ফিরে একটা কথাও বলেনি সে ই আজ আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করে নিজের স্বামীর পরিচয় দিচ্ছে, তার অন্তরে ধারন করা ছোট্ট স্বর্গের নামটা যখন আমাকে ঠিক করার অধিকার দিচ্ছে তখন তার চেয়ে বিশাল প্রাপ্তি আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। সেদিন ওর চোখের দিক তাকিয়ে দেখেছিলাম চোখ দুটিতে একটু আশার ছায়া, একটু বেচে থাকার আকুলতা সে উৎস ছিল আমাদের সংসারে আসা ছোট বাচ্চটা। ইদানীং রাতের বেলার বেশির ভাগ সময়টাতেই আমি জেগে থাকি, শুচি রাতে খুব কান্নাকাটি করে। লাবনীর শরীর খারাপ থাকায় তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুমিয়ে রাখানো হয়, তারপরেও সে প্রায় রাতে জেগে ওঠে। রাতের বেলায় তিন চারবার কাপড় বদলে দিতাম, একদম কোল ঘেসে জড়িয়ে রাখতাম, ফিডার খাইয়ে দিতাম। মাঝ রাতে বারান্দায় নিয়ে কোলের সাথে মিশিয়ে রেখে পায়চারি করতাম। দিনের বেলায় গোসল আমিই করিয়ে দিতাম, নখ কেটে দিতাম আমার মেয়েটার। কিছুদিন পর এমন হল মেয়ে আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেনা, লাবনী মিস্টি হিংসায় জ্বলে মরত তখন। একদিন তো লাবনী বলেই দিয়েছিল - ভাগ্যিস তোমাকে আল্লাহ সব কিছু দিয়ে বানায় নি তাহলে আমার মেয়ে আমাকেই চিনত না। মা এ কথা শুনে সেদিন ই প্রান খুলে অনেক্ষন হেসেছিলেন। বাড়ির সবার আনন্দের উৎস জুড়ে তখন ছিল আমার মেয়ে। সব বাচ্চারা মা ডাক আগে শিখলেও শুচি প্রথম বাবা বলে ডেকেছিল, সেদিন রাতে আকাশ জ্যোৎস্না বিছিয়ে দিয়েছিল, লাবনী প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছিল, শুচিকে কোলে নিয়ে আমি বারান্দায় পায়চারি করছিলাম তখনই শুচি বা...বা বলে ডেকেছিল। আমার মনটা সেদিন পাগলা ঘোড়া হয়ে গিয়েছিল আরেকবার ডাকটা শুনতে, সেদিন আনন্দে কেঁদে দিয়েছিলাম ইচ্ছে করছিল আমার মেয়েটাকে বুকটা ফেড়ে তার মাঝে লুকিয়ে ফেলি, একান্তে অনুভব করি আমার শুচি মায়ের অস্তিত্ব
। সে যে কি ভাল লাগা সেটা কোনদিনও কাউকে বোঝাতে পারব না আমি। সারাক্ষন শুচি আমার কাছেই থাকত, ওকে লাবনীর কাছে দিয়ে ওয়াশরুমে গেলেও মনে হত আমি যেন খুব অসহায়,আমার কেউ নেই। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই শুচিকে জোর করে লাবনীর কাছ থেকে কেড়ে নিতাম আর শুচি আমার মুখ দেখেই একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে জানাতো..বাবা... ও বাবা তুমি এসেছো! এতক্ষন কোথায় ছিলে? তোমার গন্ধ ছাড়া আমি যে থাকতে পারিনা গো বাবা। কিছুদিন পর দেখা গেল শুচি জোরে জোরে বাবা বলা ডাকা শুরু করল, এ দেখে বউ বেচারি আশাহত হয়ে বলল - শিহাব এই মেয়ে তোমার পেট থেকেই এসেছে এতে আমার সন্দেহ নেই এই বলেই সে গাল ফুলিয়ে থাকতো, আমার মা চেয়েছিল শুচি দাদী বলা শিখুক কিন্তু শুচি তা কানে না নিয়ে বাবা বাবা ডেকেই বাড়ি মাথায় তুলত। আস্তে আস্তে আমার,আমাদের শুচি বড় হতে লাগল। ময়না পাখিটার দাত উঠল, বাকা বাকা দাত!! এক পা দু পা করে হাটা শিখল আর এখন তো তার হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে বাড়ির সবাই ক্লান্ত! আমি যখন বাসায় ফিরি মেয়ে আমার শার্টে তার ঘেমে যাওয়া নাকটা মোছে, আমাকে জড়িয়ে ধরে লম্বা করে চুমু দিয়ে পকেটে হাত দিয়ে চকলেট খোজে, পেয়ে গেলেই আবার চুমু দিয়ে দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যায়, এই কয়েক বছরে আমার আর লাবনীর সম্পর্কটা অনেক বদলে গেছে, এখন লাবনী বৈশাখে আমার সাথে ঘুরতে বের হয়, সন্ধ্যায় শপিং করতে যায়, অফিসে থাকাকালীন অনেকবার ফোন দিয়ে খোজ নেয় আমার, তবুও বলা হয়ে ওঠেনি "ভালবাসি"। আজ আমাদের ৪র্থ বিবাহ বার্ষিকী, লাবনী নিজের হাতে টাটকা গোলাপে বিছানা ঠেসে রেখেছে, সে লাল বেনারসি পরেছে আর তার পাশেই শুচি শুয়ে আছে তার মায়ের পাশে। আমি আস্তে আস্তে লাবনীর পাশে গিয়ে শুলাম, লাবনী আমার খুব কাছে চলে আসল..যতটা কাছে আসলে নিশ্বাস ভারী হয়ে সব এলোমেলো হয়, লাবনী কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল :- এবার যে আসবে তাকে কিন্তু আগে মা ডাকটাই শেখাবে কথাটা বলেই লাবনী আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।সংগৃহীত।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now