বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জীবনের হিসাব

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Suborna Akhter Zhumur (০ পয়েন্ট)

X বহুদিন পর হিসাবউদ্দিনের বাড়িতে চাঁদেরহাট বসেছে। বহুদিন মানে যথার্থই অনেকদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। দুই ছেলে, তিন মেয়ে, নাতিপুতি, মেয়ে জামাই-বউমা সবাই হাজির। বড়মেয়ে এবং মেজমেয়ের বিয়ে হয়েছে একই বাড়িতে কিন্তু দুই বোনের গলায়গলায় ভাব শেষ হয়ে গেছে বিয়ের পরপরই।হিসাবউদ্দিন অবাক বিস্ময়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন মানবিক সম্পর্কচ্ছেদের ক্লেদাক্ত পরিণতি। নির্বাক দর্শক হয়ে বসে থাকেননি, একসময় স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে দুই মেয়ে এবং দুই জামাইকে ঈদ উপলক্ষে একত্রে দাওয়াত দিয়েছেন, সাধ্যমত খাবার-দাবারের আয়োজন করে অপেক্ষার প্রহর গুনেছেন, কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। ওদের মধ্যে একজন এলেও অন্যজন কিছুতেই আসেনি। দিনে দিনে বিচ্ছিন্নতা আরো বেড়েছে। দুই মেয়ের মধ্যে এমন দা-কুমড়োর সম্পর্ক দেখে হিসাবউদ্দিন যন্ত্রণাদগ্ধ হয়ে গুমরে মরেন। বড়মেয়ের দেবরের সাথে মেজোমেয়ের সম্পর্ক মেয়েদের মায়ের নজরেই আগে পড়েছিল। কিন্তু সব জেনেও প্রতিকার না করে একই বাড়িতে দ্বিতীয় মেয়েকেও বিয়ে দিলে দুই বোন একত্রে আনন্দে থাকবে ভেবেই টিনিও খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর অচিরেই বোনে-বোনে, ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদের বিশ্রী সংবাদে কানপাতা দায় হয়ে ওঠে। বড়ছেলে সপরিবারে এসেছে চিটাগাং থেকে। ইতিপূর্বে বড়ছেলে বহুবার উদ্যোগ নিয়েছিলো দুই বোন এবং দুই দুলাভাইকে একত্রিত করার, পারেনি। ওদের প্রবল কোন্দলের জেরে টিকতে না পেরে ফিরে এসেছে। এবার কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ ছাড়াই সবাইকে একত্রে দেখে ভীষন খুশি সে। কিন্তু মূলত আজ সবাই একত্রিত হয়েছে যারযার স্বার্থসিদ্ধির জন্য। হিসাবউদ্দিনের বাবা ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সামান্য নুন-পান্তাও সবদিন সময়মত জোটেনি।অল্প রোজগার দিয়ে ঘর-সংসার চালানো, ক্যান্সারাক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসা করানো, ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য তাকে যে কতোটা পরিশ্রম করতে হয়েছে সে কথা হিসাবউদ্দিন মোটেও বিস্মৃত হননি। বাবার সেই অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মনে পড়লে আজো তার চোখের কোনে অশ্রু জমে। নিজে লেখাপড়া না জানলেও বাবার খুব সাধ ছিল তাকে লেখাপড়া শেখানোর। লেখাপড়া শিখে হিসাবউদ্দিন জজ-ব্যারিস্টার হতে পারেননি, হয়েছেন ব্যাংকের ক্যাশিয়ার। আজ ছেলে-মেয়েদের কাছে স্মৃতির ডালা খুলে বসে নিজের অজান্তেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে তার। সামান্য ক্যাশিয়ার হওয়ায় হিসাবউদ্দিন বেতন পেতেন খুবই নগন্য। তবুও ছেলে-মেয়েদের তিনি লেখাপড়া শেখাতে তিনি পিছিয়ে যাননি। সংসারে টানাটানি লেগেই থাকতো। স্ত্রীর অসন্তোষের প্রত্যুত্তরে তিনি বলতেন, "যাত্রা-নাটকে যারা রাজা সাজে তাদের কথা ভেবে দেখেছো কখনও? নাটক ফুরালেই রাজত্ব শেষ। পথের মানুষ। আমাদের অবস্থাও সেই রকম। অফিস থেকে বেরোলেই আমার টাকার গরম শেষ। তুমি চিন্তা করোনা, তোমার ছেলে-মেয়েরা একদিন বড় চাকরী করবে।ওরা নিশ্চয়ই আমাদের ফেলে দেবেনা!! তখন তোমার আর কোনো কষ্ট থাকবেনা।" বাস্তবিকই অবসরের পর হিসাবউদ্দিনের টাকার গরম শেষ হওয়ার পর তিনি আজ জগৎ সংসারের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি। তার অবসর গ্রহণ উপলক্ষেই তার বাড়ি লোকারণ্য। পুত্র-পরিজন, মেয়ে-জামাই সবাইকে নিয়ে সেদিনের পারিবারিক বৈঠক চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। কত জনের কত কথাই যে জমেছিল! স্মৃতিকাতর পৌঢ় মানুষটি স্মৃতির পাতা উল্টাতে গেলেই ফাক বুঝে তার কথার মধ্যে ছেলে অথবা মেয়ে ঢুকে পড়ে তাদের মনের কথাটা বলে ফেলে। কথা তো নয় যেন মিছরির ছুরি, কখনোবা ঝলসে ওঠে ইস্পাতের মতো। কথাগুলো যেন হিসাবউদ্দিনকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে। প্রথমে মুখ খোলে ফাহমিদা, বড়বোনের মতো তারও গয়নাগাটি চাই। নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে বলে নিজের ভাগ ছাড়বে কেন! তারা দুই বোন একই বাড়ির বউ, মানে সমান না হলে চলে! বড়মেয়ের সমস্যা অন্যত্র। তার ছেলেকে ক্যাডেট কলেজে ভরতি করতে চায়। ফাঁকফোকর গলিয়ে সেই ব্যবস্থা করতে প্রয়োজন কাড়ি কাড়ি টাকা। দুশ্চিন্তায় তার নাকি ঘুম আসেনা। ছোটছেলের দাবি একটা মোটরসাইকেলের। কিন্তু সে কথা বলতেই তার বড়বোন তাকে সরাসরি বললো, "তুই মোটরসাইকেল দিয়ে কি করবি বল, শুধুশুধু টাকা খুরচ! ছোটবোনটার বিয়েতে যে প্রচুর টাকা লাগবে সে খেয়াল কি আছে?" বিয়ের প্রসংগ আসতেই হিসাবউদ্দিনের ছোটমেয়ে লজ্জায় এবং কিছুটা অভিমানে সেখান থেকে চলে গেল। তার অভিমান হয়েছে এটা দেখে যে, বাবার পেনশনের টাকায় ভাগ বসাতে এসে সবাই বাবা-মায়ের প্রতি, ছোটবোনটার প্রতি দায়িত্ব বেমালুম ভুলে আছে!! সবার শেষে বড়ছেলে জানায় যে তার শ্বশুরবাড়ির কাছেই একটা প্লট সুলভ মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে, সেই জমিটুকু সে কিনতে চায়। সেখানে বাড়ি থাকার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে সে দাবি করে যে, বাবার গ্রাচ্যুইটি এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার অর্ধেক তাকে দিতে হবে। এই অস্বস্তির মধ্যেই হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে হনহন করে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যান হিসাবউদ্দিন। আর তক্ষুনি তার স্ত্রী বিলাপ করে বলে ওঠেন,"হলো তো তোমাদের ভাগবাটোয়ারা! যেই বয়সে মানুষ ছেলে-মেয়েদের কাছে নির্ভরতা খোঁজে সেই সময়ে মানুষটাকে এতোবড় ধাক্কাটা পেতে হলো। তিনি ভেবেছিলেন শেষ বয়সে ছেলে-মেয়েরা মাথায় তুলে রাখবে। কিন্তু অমানুষদের কাছে কি স্নেহ, মায়ামমতা, ভালোবাসার কোনো মূল্য আছে? তারা শুধু তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে জানে।" কথাগুলো বলেই তিনি ছুটে গেলেন স্বামীর খোজে, ছেলে-মেয়েরাও তার পিছু নিলো। সবাই মিলে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির উঠোনের ডুমুর গাছটার নিচে হিসাবউদ্দিনকে খুজে পেল। ছেলে-মেয়েরা তাকে দেখতে পেয়ে একসাথে কোরাস গেয়ে ওঠে, বাবা!! কান্নায় হিসাবউদ্দিনের শরীর কেঁপে ওঠে। আতংকিত ভংীতে উঠে দাড়িয়ে তিনি বলেন,"আমার যা আছে সব তোরা নিয়ে যা। আমি শুধু অল্প কিছু টাকা রাখবো এই ডুমুর গাছের নিচে আমার কবর করার জন্য। আমার নিজের টাকায় আমার দাফন, কাফন, কবর সবই হবে, তোদের কারোর টাকায় নয়। বিশ্বাস কর আমি বেশি টাকা রাখবো না।" SUBORNA AKHTER ZHUMUR


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ জীবনের হিসাব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now