বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দাদুবাড়ি )
---
||দাদুবাড়ি ||
---
# শেষ_পর্ব
-
লোহার বেলচা হাতে শিশির আর ওর পিছে আমি
চললাম নিচে।
কয়েক বার মাটিতে কোপ দিলো শিশির আর আমি
হাত দিয়ে মাটি সরালাম, কাজটা খুব ধিরে সুস্থে
আস্তে আস্তে করলাম, এর অবশ্য দুইটা কারন
ছিলো। এক বাবা জানলে খবর আছে, আর দুই যা
আমরা উপর থেকে দেখতে পাচ্ছি তার যদি সত্যি
অস্তিত্ব থাকে তাহলে সেটা যেন অক্ষত থাকে।
আরো দুবার হাত চালালো শিশির আর আমিও মাটি
তুলতে লাগলাম। এক বিঘাতের মত মাটি তুলতেই হঠাৎ
হাতে কি যেনো বাধলো, তুলে নিলাম।
কাদা মাটিতে ভরপুর জিনিস টা আর কিছু না ছোট্ট একটি
আংটি । তবে সোনার না রুপার বোঝা যাচ্ছে না। শিশির
ওর রুমালটি এগিয়ে দিলো।
কিছুটা পরিস্কার হয়ে এলে বুঝতে পেলাম বেশ
নিখুঁত কারুকার্য করা সোনার একটি আংটি আর তার মাঝে
বসানো মুক্তা পাথর।
তাহলে কি এই মুক্তাই সূর্যের আলো পড়ায় দ্যুতি
ছড়াচ্ছিলো! কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব এটা তো
আমি প্রায় বিঘাত খানেক মাটির নিচ থেকে তুললাম।
অবাক বিস্ময় নিয়ে এসব ভাবছিলাম তখন মা'র ডাকে
ঘোর ভাঙলো।
উপরে এসে আংটি টা ভালো করে ধুয়ে
টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে ফেললাম, শিশির অবশ্য
বাধ সাধছিল আপি কি দরকার ওটা রাখার ফেলে দে কার
না কার আর অন্যের জিনিস এভাবে রাখতে নেই।
আমিও জানি এটা ঠিক না তবে যে লোভে পড়ে
নিচ্ছি তা না, কেন জানি ফেলতে পারলাম না।
-
রাতে ঘুমানোর আগে আবার বের করলাম আংটি টি,
হাতে পড়তেই কেমন উজ্জ্বল দ্যুতি বের হয়েই
মিলিয়ে গেলো ঠিক যেমন দ্যুতি দেখেছিলাম
উপর থেকে।
আংটি না খুলেই ঘুমিয়ে গেলাম।
সকালে হাটুর উপর দু'হাত ভাজ করে একমনে সিঁড়ির
মাঝবরাবর বসে আছি, গেট খুলার আওয়াজে চমকে
উঠলাম। দেখি আমার বয়সি একটি মেয়ে বেশ উঁচু
লম্বা প্রায় পাঁচ ফিট চারের কাছাকাছি হবে, বেশ
চিকনচাকন গড়ন মাথা ভর্তি কালো লম্বা চুল আগের
যুগের মেয়েদের মতো দু 'বেনি করা, গায়ে
খুব কমদামি ছাপা সালোয়ার কামিজ পড়া। ওড়না দিয়ে মুখটি
ঢাকার ব্যর্থ প্রয়াস করছে আর বার বার ভয় ভয়
চোখে উপরের কামরার দিকে তাকাচ্ছে। এমন
সময় তার পাশে এসে দাঁড়ালো এক যুবক, সেও
বেশ লম্বা, গায়ে দামী সার্ট প্যান্ট কিন্তু তার চেহারা
কেমন ঝপসা ঝাপসা লাগছে অথচ মেয়েটিকে
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মেয়েটি শ্যমলাবর্ণ কিন্তু
চোখ দুটি মায়া কাড়া।
দুজনে হাত ধরাধরি করে দ্রুত চোরের মতো
এদিক ওদিক চেয়ে হেটে নিচতলার ঘর খুলে
ভেতরে ঢুকে গেল। আমিও দ্রুত ওদের পিছু
নিলাম কিন্তু আমি পৌঁছানোর আগেই দরজা দিয়ে
দিলো। বেশ অবাক হলাম পুরানো অব্যবহৃত রুমের
চাবি এরা কি করে পেলো! বেশ কিছুক্ষণ দরজা
ধাক্কা দিলাম কিন্তু কাজ হলো না তাই চিৎকার করে বাবা
কে ডাকতে লাগলাম।
প্রচন্ড ঝাকানিতে ঘুম ভেঙে গেলো । চেয়ে
দেখি তিন জোড়া চোখ অবাক হয়ে আমার দিকে
তাকিয়ে আর বাবা আমাকে বললেন, চেচাচ্ছিলি
কেনো?
তাহলে স্বপ্ন ছিলো! কপালের জমে থাকা ঘাম
মুছতে মুছতে লজ্জিত স্বরে বললাম, স্বপ্ন
দেখছিলাম তোমারা যাও আমি ঠিক আছি।
মা, বাবা গেলেও শিশির অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি
তাকাতেই বলল, তোরা মেয়েরা এত লোভী
কেনো?? আংটি হাতে পড়েছিস কেন? বাবা
দেখলে কি জবাব দিতি?
আমি ওর কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আংটি
খুলে ড্রয়ারে চালান দিলাম।
--
পরদিন সকালেও একই কান্ড বাবা ঝাকাচ্ছেন আর আমি
চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাবা কে ডেকেই যাচ্ছি। হুশ
ফিরতেই বাবা জোড় করতে লাগলেন কি এমন
স্বপ্ন দেখি যে এত ভয় পাই। আমি কিছুই না বলে
কাটিয়ে দেই। কিন্তু আজ আমি আরেকটু বেশি
দেখেছিলাম, আজ ওদের পিছু গিয়েছিলাম ওরা দরজা
দিতেই দরজায় কান লাগিয়ে শুনেছিলাম প্রথমে
ওদের খিলখিলিয়ে হাসির শব্দ তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা
তারপর মৃদু আপত্তি এরপর কিছু কথা কাটাকাটি এর
কিছুক্ষণ পর মেয়েটির প্রবল চিৎকার। মেয়েটির
চিৎকার এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে তার সাথে সাথে
আমার গলা চিরেও চিৎকার বেরিয়েছিল আর তার ফল
সবাই চিন্তিত হয়ে আমার রুমে।
সারাদিন স্বপ্ন নিয়ে অনেক ভাবলাম, একসময় মনে
হলো আংটি টি পাওয়া তারপর প্রতি রাতে হাতে নিজের
অনিচ্ছায় আংটি পরা তারপর স্বপ্ন, কি হচ্ছে এসব!
তাহলে কি এই আংটিতেই কোন রহস্য লুকিয়ে
আছে? হয়ত স্বপ্নের মাধ্যমেই কোন এক শক্তি
আমাকে এই পরিত্যক্ত দাদুবাড়ির মধ্যে ঘটে যাওয়া
কোন এক চাপা পড়া ঘটনা জানাতে চাচ্ছে।
অপেক্ষায় থাকলাম রাতের, আজ নিজের ইচ্ছাতেই
পড়ে নিলাম আংটি তারপর অজানা আশংকা আর প্রচন্ড
কৌতুহল নিয়ে চোখ দুটি বন্ধ করলাম।
-
বসে আছি সিঁড়িতে, ওরা এলো, চোরের মতো
এদিক ওদিক তাকালো, নিচতলার রুমের দরজা খুললো
আমি পৌছবার আগেই দরজা দিয়ে দিল, হাসি, কথা কাটাকাটি,
চিৎকার , সেই আগের সব দৃশ্যপট একে একে
আবারো চোখের সামনে ঘটে চললো।
একসময় দরজা খুলে গেল, দেখতে পেলাম যুবক
টি হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল। এবার মুখটি স্পষ্ট
দেখা গেলো, কেমন চেনাচেনা লাগছে
যুবকটিকে। আমাকে পাশ কাটিয়ে উদ্ভ্রান্তের
মতো ছুটলো উপরের দিকে আর আমি ছুটলাম
রুমের ভেতরে। ভেতরে গিয়ে দেখি একটি
ডাবল সোফায় মেয়েটি শুয়ে আছে, কাছে
যেতেই নজরে এলো মেয়েটির গলায় ওর
নিজের ওড়না পেচানো আর জিহ্বা টা বেরিয়ে
ঝুলছে, চোখ দুটি বিস্ফারিত হয়ে আমাকে যেন
দেখছে। আমি আবারো ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠি।
চিৎকার দিতে দিতেই দেখতে পাই যুবকটির সাথে
বাবাও ছুটে ঘরে ঢুকছেন।
প্রচন্ড ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙে গেলো । দেখলাম
বাবা আমাকে জরিয়ে ধরে আছেন আর মা মাথায় হাত
বুলিয়ে দিচ্ছেন। শিশির এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো।
আমি পানি হাতে নিয়ে খাওয়া শুরু করতেই বাবার চোখ
আমার হাতে পড়ায় ছিটকে সরে গেলেন আমার কাছ
থেকে। তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞাসা
করলেন, কো... কো.... কোথায় পেলে এটা!!
আমি ধীরস্থির ভাবে বাবার দিকে চেয়ে বললাম,
এবার নিশ্চই সব সত্য বলবে বাবা। কেন তুমি বাড়ি
ছেড়েছিলে আর ছোট কাকুর মৃত্যু কিভাবে
হলো। কেন মেরেছিলো মেয়েটিকে কি
দোষ ছিলো ওর?
বাবা বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন
যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না, আমি কিভাবে
জানলাম।
আমি আংটি পাওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে স্বপ্ন সহ
সব একে একে বলে গেলাম।
বাবা কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থাকলেন তারপর বলতে
লাগলেন, মা মারা যাবার পর তোর ছোট চাচু কে আমি
আর তোর মা নিজের সন্তানের মতই দেখতাম।
কিন্তু দিন দিন জসিম কেমন বখে যেতে লাগলো।
নিচতলার ভাড়াটিয়া উঠিয়ে দিয়ে ও একাই থাকতে শুরু
করলো। আমাদের কথা একদম শুনতো না। সারাদিন
মদ জুয়া, বন্ধু নিয়েই মেতে থাকতো । মেয়ে
বন্ধুদেরও যে আনতো জানা ছিলো না। তুই যখন
আট মাস পেটে তোর মা তোর নানু বাড়ি চলে
গেল।
হঠাৎ একদিন সকালে জসিম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে
এলো, বললো দাদা, , দাদা ভুল হয়ে গেছে
আমাকে বাঁচাও আমি,,,,, আমি খুন করে ফেলেছি। কি
করবো বলো একটি অনাথ মেয়ে হয়ে আমাকে
ভয় দেখায় বিয়ে করার, না করলে নাকি কেস
করবে। তাই মাথা ঠিক ছিলো না। আমি সঙ্গে সঙ্গে
তোর ছোট চাচাকে নিয়ে ছুটে যাই নিচে, গিয়ে
দেখি সব শেষ। মেয়েটির জিহ্বা বেরিয়ে কি
বীভৎস্য যে দেখাচ্ছিল। কি করবো বুঝতে
পারছিলাম না, একবার মনে হলো পুলিশ ডেকে
ধরিয়ে দেই পাপী টাকে কিন্তু রক্তের টানকেও
যে প্রত্যাখ্যান করতে পারিনি।
দুজন ধরাধরি করে বাড়ির পেছনে মেয়েটিকে
দাফন করে দেই, ফিরার পথে মাটিতে মেয়েটির
আংটি পড়ে থাকতে দেখে আবার কিছু মাটি খুড়ে
আংটি টি চাপা দেই।
পরদিন সকালে নাস্তা খেতে ডাকতে গিয়ে দেখি
জসিম ফ্যানের সাথে ঝুলছে, ওর জিহ্বাও বীভৎস
ভাবে ঝুলছে আর গলায় পেচানো মেয়েটির
সেই ওড়না।
পুলিশ এলো, তদন্ত করলো তারপর আত্মহত্যা
প্রমাণিত হয়ে কেস ক্লোজড হয়ে গেলো
কিন্তু একমাত্র আমি জানতান এটা আত্মহত্যা ছিলো না
ছিলো প্রতিশোধ ।
আর একটি রাতো আমি থাকিনি সেইদিনই বেরিয়ে
গিয়েছিলাম আর কোনদিন ফিরিনি আর তোর মাকেও
এসব কিছুই বলিনি।
-
সেদিন সারাদিন ঘরের পরিবেশটা কেমন থমথমে
হয়ে ছিলো। কেউ কারো সাথে কথা বলছিলাম না,
বাবাও সারাদিন নিজের ঘরেই ছিলেন। আমি আর শিশির
কলেজে যাইনি। যেন একটা মানুষিক ঝড় বয়ে
গেছে সবার উপর দিয়ে কেমন বিধ্বস্ত
দেখাচ্ছিলো সবাইকে। রাতে খেয়ে যার যার
ঘরে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। শুয়ার আগে অবশ্য আংটি
টি ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম পিছনের ফাকা জায়গায়।
রাতে আর কোন স্বপ্ন দেখলাম না। কিন্তু সকালে
মা'র আর্তনাদ এ ঘুম ভাঙল। গিয়ে দেখি বাবা ফ্যানের
সাথে ঝুলছেন, জিহ্বা টাও বীভৎস ভাবে বেরিয়ে
আছে আর গলায় পেচানো আমার স্বপ্নে দেখা
সেই ওড়নাটি। আজ মেয়েটির প্রতিশোধ পূরণ
হলো, বাবা শাস্তি পেয়ে গেলো একটি অপরাধ
লুকানোর।
কাঁদতে কাঁদতে আমাদের অবস্থা যখন শোচনীয়
তখন বড় মামা এসে আমাদের নানুবাড়ি নিয়ে
গেলেন।
এরপর আমরা আর কোনদিনও দাদুবাড়ি যাইনি ।
পরিত্যক্ত দাদুবাড়ি আবারো পরিত্যক্ত হয়েই
রইল........
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now