বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বন্যা আড়াই বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে। হাসান সাহেবকে খুব ভালোবাসে। তিনিও মেয়েটাকে চোখে হারান, একদিন দেখতে না পেলে অস্থির হয়ে যান। অথচ, বন্যার সাথে তার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। হাসান সাহেবের পাশের বাসার ভাড়াটিয়া বন্যারা। এ-বাড়ি ও-বাড়ির প্রান্ত সীমানায় একটা ইটের প্রাচীর। বন্যা যখন দেড় বছরের শিশুকন্যা, তখন থেকে হাসান সাহেবের সাথে ওর ভাবটা জমে উঠতে শুরু করে। অবশ্য তাদের আলাপের শুরুটা হয়েছিল বন্যার কান্না দিয়ে। সেই ক্রন্দনরত মেয়েটা আজ তার একান্ত স্নেহভাজন।
বন্যার যখন দেড় বছর বয়স, তখনকার কথা। একদিন তিনি দেখেন মোমের পুতুলের মতো সুন্দর একটি মেয়ে ওবাড়ির বারান্দায় গ্রীল ধরে আপ-ডাউন করছে আর আধো আধো বুলিতে বলছে, দাদু-দাদু-দাদু। যেন একটি দম দেয়া কলের পুতুল। সীমান্ত প্রাচীরের দুইধারের দুই বাসিন্দা হাসান সাহেব আর বন্যা। প্রায়ই দেখা হয় কখনো ওর মায়ের কোলে, কখনো কাধে। কিন্তু এ যাবৎ কোনো কথা হয়নি তার বন্যার সাথে।
হাসান সাহেবের বাড়ি ছেলে-মেয়ে বর্জিত। ছেলেরা বিদেশে নিজেদের কর্মস্থলে। একমাত্র মেয়ে স্বামীর সাথে স্বামীর সংসারে। স্ত্রী বিগত হয়েছে আরো আগেই। তাই, পাড়াপড়শিও তেমন আসে না। ছোট ছেলে-মেয়ে কেউ না থাকায় বাচ্চারাও আসেনা। আর তিনিও বাচ্চাকাচ্চার কোলাহল পছন্দ করেন না। কিন্তু আজ বন্যার মধুর কন্ঠে আধো আধো বুলিতে দাদু ডাক শুনে চমকে উঠলেন। মনে হলো যেন সুদূর বিদেশে থাকা তার সব নাতিনাতনিরা একসংে ডাকছে তাকে দাদু বলে। সুতরাং, বন্যার দাদু ডাকে সাড়া না দিয়ে তিনি থাকতে পারলেন না।
তিনি বললেন,"এই যে আমি বন্যা। কাছে এসো। পুতুল দেবো তোমাকে।" বলে তিনি প্রাচীরের ওপর দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু বন্যা তাকে দেখে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে পালালো। হাসান সাহেবের মনে পড়ে গেল সেলফিস জায়ান্টের কথা যে তার বাগিচায় বাচ্চাদের আসা পছন্দ করতেন না। ফলে, বাচ্চাদের কলধ্বনি না শুনে ধীরেধীরে তার বাগিচার সমস্ত ফুল শুকিয়ে ঝরে যায়। হঠাৎ একদিন জায়ান্ট দেখে একটি ছোট্ট মেয়ে তার বাগিচায় এসে একটি গাছে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু, পা পিছলে পড়ে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে জায়ান্ট মেয়েটিকে ধরে গাছে তুলে দেয়। আর সাথে সাথেই বাগিচায় অজস্র ফুল ফুটে ওঠে। জায়ান্ট বুঝতে পারে, ভালোবাসা দিয়ে বিশ্বজয় করা যায়, এমন কি শুস্ক শাখায় ফুলও ফোটানো যায়।
বন্যার খেলায় বাধা সৃষ্টি করার জন্য হাসান সাহেবের ভীষন আফসোস হলো। ওকে আপন মনে খেলতে দিলে এখনও হয়তো খেলতো। পুতুলের মতো নাচতো, আধো আধো বুলিতে আরো অনেককিছু বলতো। কিন্তু ওর খেলার ভুবনে অনধিকার প্রবেশে সবকিছু নষ্ট হয়ে গেল।পাখিকে স্বাধীন ভাবে গাইতে দিলে পাখি গান শোনায়। কিন্ত, তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে পাখি উড়ে যায়। হাসান সাহেব ভাবলেন, যেমন করেই হোক বন্যার ভয়টা তার ভাংাতেই হবে।আর যেহেতু, শিশুর সাথে শিশুসুলভ আচরণ না করলে শিশুর মন জয় করা যায়না তাই তাকেও এই বয়সে শিশু সাজতে হবে।
বুয়াকে আদেশ করলেন প্রাচীরের লাগোয়া বন্ধ দরজাটা খুলে দিতে। এক ছেলের অপমৃত্যু আর স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর পর থেকেই তিনি দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন নিজেকে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে। আজ বাড়ির সেই রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত হলো গত একযুগ পর। পরের দিনই অফিসের একটা কাজে কিছুদিনের জন্য বাইরে যান। বাড়ি ফিরে দেখেন বাড়ির বাগানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে, খেলছে। ওদের মধ্যে বন্যা আর ওর বড়বোন মিমিও আছে। হাসান সাহেবকে দেখে সবাই ভয়ে থমকে দাড়িয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তিনি ওদের সাহস দিয়ে বললেন,"আজ থেকে তোমাদের সাথে আমি বন্ধুত্ত করলাম। আমিও তোমাদের খেলার সাথী।"
হাসান সাহেবের কথা শুনে সবার ভয় কমে যায়।তিনি সবাইকে চকোলেট কিনে দিলেন বন্ধুত্তের উপহার হিসেবে। আর এরপর থেকে বন্যা নির্ভয়ে তার কাছে আসে। তিনি বন্যার ভালোবাসা জয় করেছেন, বেঁধেছেন স্নেহের বাঁধনে। একদিন ওকে না দেখলেই তার মনে হয় দিনটাই বৃথা। বন্যা এখন আর তাকে ভয় পায়না। এখন ওর ভয় পরিনত হয়েছে দাবীতে। যখন তখন খেলা করে বাড়িতে এসে। বায়না করে নতুন নতুন পুতুলের। রাগ করার ভান করলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কোলে। আর হাসান সাহেব সর্বক্ষণ ওর সুখস্বাচ্ছন্দ্য আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেন। বন্যা এখন তার কাছে তার নিজের নাতিনাতনিদের চেয়েও আপন।
এক সপ্তাহের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন হাসান সাহেব। ফিরে এসে শুনলেন, বন্যারা বাড়ি পাল্টিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেলো। একটা নতুন পুতুল এনেছিলেন বন্যার জন্য। ছুড়ে ফেলে দিলেন বিছানার ওপর।বন্যা-হীন পুরো এলাকাটাই যেন গহীন মরুভূমি। পাড়ার অন্যান্য ছেলেমেয়েরা এখনো খেলতে আসে। কিন্তু, তারা কেউই বন্যার শূন্যস্থানটা পূরন করতে পারেনা। তিনি আবারো আগের মত একা, নিঃসংগ হয়ে গেলেন।
এর কয়েকদিন পরে হাসান সাহেবের কাছে একটা চিঠি আসে বন্যার বাবার লেখা। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, "বন্যা মারাত্মকভাবে অসুস্থ। বিকারের ঘোরে সে দাদু, দাদু বলে ডাকছে। নতুন বাসায় আসার পর থেকেই সে খেতে চাইতো না, খেলতো না। সবসময় সে তার দাদুকে খুজে বেড়াতো। মনে হয় বন্যা আপনাকে না দেখতে পেয়েই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপনি এলেই হয়তো মেয়েটা সুস্থ হয়ে যাবে। অনুগ্রহ করে একবার এসে ওকে দেখে যান।"
চিঠি পেয়ে একদন্ডও দেরী না করে হাসান সাহেব গেলেন বন্যাকে দেখতে। ওর পাশে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, "বন্যা, এই যে দেখো আমি এসেছি। তোমার জন্য পুতুল নিয়ে এসেছি।" আশ্চর্য বন্যার গায়ে তখন একশো তিন ডিগ্রীর উপরে জ্বর থাকলেও ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুললো। খুলেই মৃদু স্বরে বললো, "দাদু"। হাসান সাহেব নতুন কেনা পুতুলটা ওর কাছে দিলেন। মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো বন্যার ঠোঁটে। আর এক মুহূর্তেই যেন বন্যা সুস্থ হয়ে গেলো।
ভালোবাসা দিয়ে শুস্ক মরুভূমিতেও ফুল ফোটানো যায়। কিন্তু ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি শক্তি সামর্থ্যহীন শিশুকেও জয় করা যায়না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now