বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সাজ্জাদের একেবারে ভ্যানভ্যানা অবস্থা! বাসাভর্তি মাছি ভনভনও না; রীতিমতো ভ্যানভ্যান করছে। এই বিচ্ছিরি পতঙ্গ উড়ে এসে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জুড়ে বসলে যেমন মেজাজ ছ্যানছ্যান করে ওঠে; তেমনি খোলা খাবারের প্রতি এদের হাভাতেপনা দেখলে রাগে শরীর তিড়তিড় করে ওঠে। সুকুমার রায় হয়তো এমন বিপদের মধ্যে বসেই লিখেছিলেন, ‘মাছি ভনভন, ছোটে পনপন’!
কোরবানি ঈদের পরই এই আপদের শুরু। সাজ্জাদের বাসার সামনেই খোলা মাঠ; যেনতেন মাঠ নয়-ঐতিহাসিক মাঠ! কারণ ঈদের আগে এই মাঠেই ছিল গরু-ছাগলের ঐতিহাসিক বিরাট হাট। ঈদের তিনদিন মাঠের চারপাশে চলল গরু-ছাগল জবাইপর্ব। ঈদ শেষে হাট উঠে গেল ঠিকই; কিন্তু মাঠ তো আর ওঠা সম্ভব না! হাটের দগদগে স্মৃতিবস্তুগুলো নিয়ে মাঠ পড়ে রইল।
আবর্জনা এখনো ঠিকমতো পরিস্কার করা হয়নি; তাই অনিবার্যভাবে মাঠ ও তার চারপাশ হয়ে উঠেছে মাছি মহাশয়দের অভয়ারন্য! সেই মাছিকুল আশেপাশের বাসাগুলোতে উপনিবেশ গড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে! ঘরে-ঘরে চলছে তাদের মিটিং-মিছিল-সমাবেশ! পরের ঘরের খবর জানা নেই; তবে সাজ্জাদের ঘরে মাছির জন্য শান্তি এক আনাও নেই।
সারাদিন সাজ্জাদ বাসায় থাকে না। চাকরির খোঁজে আর টিউশনি করে দিন কেটে যায়। যখন রাতে ফেরে, তখন মাছির জন্য একটা উপযুক্ত ব্যবস্থা করার মতো যথেষ্ট সময় তার হাতে থাকে না। তাই থেমে আছে মাছি তাড়ানো উদ্যোগ; কিন্তু থেমে নেই ছুটা বুয়া ময়নার মা-র মুখ! সাজ্জাদ এলেই তার মুখ ছুটতে শুরু করে। মাছির জ্বালায় বুয়া অতিষ্ঠ।
মাঝেমাঝে মাছির চেয়ে ময়নার মায়ের ভ্যানভ্যান-ঘ্যানঘ্যানই সাজ্জাদের কাছে বেশি বিরক্তিকর লাগে! গতদিন তো সাজ্জাদ একবার চেঁচিয়ে বলেই ফেলল, ‘আমার কি গরুর মতো লেজ আছে যে লেজ দিয়ে মাছি তাড়াব?’ লেজ-টেজ বলাতে ময়নার মা কী ভাবল কে জানে, চোখ গোলগোল করে দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে চুপ করে রান্নাঘরে ঢুকে গেল!
মাছিদের শায়েস্তা করার জন্য আজকে সাজ্জাদ সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরেছে। কিন্তু এ তো আর মশা নয় যে কামান দাগালেই হবে! জড়জগতের পারদ আর জীবজগতের মাছি একই টাইপের! এদের স্পর্শ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
সাজ্জাদের অস্ত্র চড়-থাপ্পড়-কিল-ঘুষি; এসবের সাহায্যে সে পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মাছিও যেন এতে মজা পাচ্ছে! তারাও সদ্য কেনা যুদ্ধবিমানের কসরতের মতো চোখজুড়ানো শারীরিক কসরত দেখিয়েই যাচ্ছে। কে জানে, এই কসরতের ফাঁকে তারা কত কিছু যে ছেড়ে দিচ্ছে টেবিলে বেড়ে রাখা খাবারের ওপর! তাদের ইয়ে তো আর চোখে দেখার বস্তু নয়।
ফাঁকা গুলির মতো ফাঁকা চড়-থাপ্পড় মারতে মারতে সাজ্জাদ যখন ক্লান্ত, তখন হঠাৎ তার মাথায় একটি আইডিয়া খেলে গেল। তার কাছে বেশ আগে কেনা একটি ‘ইলেকট্রনিক মসকিউটো ব্যাট’ আছে! ব্যাটটি দিয়ে সে মশা মারত। সেসময় মশারা তার ‘অপারেশন ক্লিন মশা’ কর্মসূচি ধরতে পেরেছিল কিনা জানা নেই; তবে সাজ্জাদের বাসায় মশার সংখ্যা কমে গিয়েছিল আশঙ্কাজনক হারে! মাছির ক্ষেত্রেও সেই ব্যাটের ব্যবহার মন্দ বুদ্ধি নয়।
২
মোটাসোটা মাছিগুলো পটপট করে ফুটে ফোঁটা-ফোঁটা বস্তুতে পরিণত হচ্ছে! রবীন্দ্রনাথের সেই ‘সুখের মতো ব্যথা’ লাইনটির জন্য উপযুক্ত দৃশ্য বলা যেতে পারে! ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যাটের মতো দেখতে এই মরণাস্ত্র সাজ্জাদ নিউমার্কেট থেকে কিনেছিল। কিছুটা চার্জ দিতেই ঘুমন্ত ব্যাটটি যেন জেগে উঠেছে!
মাছিনিধনের চেষ্টা চলছে আকুতি-কাকুতি-মিনতিসহ; সাজ্জাদ নানাভাবে মাছিদের রিকোয়েস্ট করছে যেন তারা ব্যাটের ওপর এসে বসে! তার এই কা- দেখে ময়নার মা বেশ মজা পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। ছেলেবেলায় একটি বাক্য ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করতে হতো: ‘সে না হেসে পারল না’-‘হি কুড নট বাট লাফ’! এখনকার পরিস্থিতির জন্য বলা যায়, ময়নার মা না হেসে পারছে না-ময়নার মা ক্যান নট বাট লাফ!
সাজ্জাদ একমনে ব্যাট চালিয়ে যাচ্ছে। মশা যত সহজে ব্যাটের আওতায় আসে, মাছি তত সহজে আসে না! এই বস্তু কখন কোনদিকে ছুটবে, তা অনুমান করা ভীষণ কঠিন। হঠাৎ একটি মাছির দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ ভড়কে গেল!
সাজ্জাদ দৃষ্টি তীক্ষ্ম করে দেখল; চোখ কচলে দেখল! তার ভ্রূ কুঁচকে গেল, স্বপ্ন নয়, সত্যি! মাছির সাইজের প্রাণিটি; অথচ মুখটা মানুষের মতো! দেখমাত্রই সাজ্জাদের মনে অদ্ভুত প্রাণিটির জন্য একটি নামেরও উদয় হলো: মাছিম্যান! আরেকটু হলেই ব্যাটে-মাছিম্যানে সংঘর্ষ হতো! সাজ্জাদ খেয়াল করল, মাছিম্যান তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
সাজ্জাদ নিজের হাতে নিজেরই কান ধরে টান দিল; কষে নিজের গালে দুটো চড়ও দিল। না, কোনো ঘোরের মধ্যে তো সে নেই! কোনো হ্যালুসিনেশন হচ্ছে বলেও তো মনে হচ্ছে না। সাজ্জাদ যখন এসব নানা চিন্তা করছে, তখন কেউ একজন কথা বলে উঠল, ‘আমাকে মেরো না। আমি তোমাদের অতিথি!’
ঘটনা বেগতিক; এখন সাজ্জাদ মাছিম্যানের কথাও শুনতে পাচ্ছে! তবে প্রাণিটি মনে হয় মুখে কথা বলছে না। হয়তো টেলিপ্যাথিক উপায়ে মনের ভাব প্রকাশ করছে। সাজ্জাদ জানে যে হোমিওপ্যাথি ও অ্যালোপ্যাথি হলো চিকিৎসাবিদ্যার ধরন আর টেলিপ্যাথি হলো যোগাযোগের ধরন। এই উপায়ে কথা মুখে হয় না, হয় মনেমনে; সরাসরি মগজে-মগজে কানেকশন। কী ভয়াবহ ব্যাপার! এক আপদ তাড়াতে এসে এ কী বিপদে পড়েছে সে!
সাজ্জাদের এও মনে হলো, তার মাথা খারাপ হয়নি তো! ঠিক তখনই সে আবার কথা শুনতে পেল, ‘তোমার মাথা খারাপ হয়নি। আমি অন্য গ্রহ থেকে এসেছি। তোমাদের ভাষায় আমি এলিয়েন।’
টেলিপ্যাথিতে যেহেতু মুখে কথা হয় না, তাই সাজ্জাদ মনেমনেই বলল, ‘এলিয়েন! তোমার নাম কি?’
‘আমার নাম ফিটু।’
‘নাম তো এলিয়েনদেন মতোই! কিন্তু চেহারা এমন কেন?’
‘দুঃখিত, প্রশ্নটি বুঝতে পারিনি।’
‘কিছু না। তো এলিয়েন থাকবে অন্য গ্রহে, এখানে তুমি কি করছো?’
‘আমি এই গ্রহে এসেছি মাছি নিয়ে গবেষণা করতে। মশা ও মাছি নামের দুটি প্রাণি মহাবিশ্বে শুধুমাত্র তোমাদের গ্রহেই আছে। তাই এখানে আসা।’
‘আশ্চর্য, মাছি নিয়ে আবার গবেষণার কী আছে!’
‘আমার সাথে এভাবে কথা বলছো কেন? আমি তোমাদের অতিথি।’
‘আমি এমনই। যাহোক, প্রশ্নের উত্তর দাও। মাছি নিয়ে কী গবেষণা?’
‘তোমাদের এক বিজ্ঞানী যেমন বলেছিলেন, মানুষ এসেছে বানর থেকে; তেমনি আমাদের এক বিজ্ঞানী বলেছেন, আমরা নাকি মাছি থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছি! তাই গবেষণা করতে চলে এলাম পৃথিবীতে।’
‘কিছু পেলে?’
‘ওই ব্যাটা এক নম্বরের বাটপার। ভেবেছিল, যা বোঝাবে, আমরা তা-ই খাব! কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা ছাগল নই, আমরা মাছি!’
‘তোমার গবেষণার কাজ শেষ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
‘হুম, কাজ আরেকটু গুছিয়ে কালকে চলে যাব।’
‘গুড, ভেরি গুড।’
‘ধন্যবাদ। কিন্তু যাওয়ার আগে তোমার কোনো উপকার করে যেতে পারলে খুশি হব!’
‘হঠাৎ আমার উপকার করতে চাচ্ছ কেন?’
‘কারণ পৃথিবী গ্রহে তুমিই তো আমার হোস্ট! আমি তোমার গেস্ট হিসেবে এই কদিন আছি! তোমার বাসায় থেকেই গবেষণা করেছি! পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছির সরবরাহও পেয়েছি! তাই যাওয়ার আগে তোমার জন্য কিছু একটা করতে চাই।’
সাজ্জাদ বেশ জোরে হেসে ফেলল। বলল, ‘আমার বাসায় একজন বিশিষ্ট গেস্ট এসে গবেষণাকাজ চালিয়ে যাচ্ছে; অথচ আমিই জানি না! সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র আমার জীবন!’
‘এসব কী আবোল তাবোল বলছো! কী করলে তোমার উপকার হবে, তাই বলো প্লিজ।’
‘উপকার যদি করতেই চাও, তাহলে তোমার গবেষণার এলিমেন্ট মাছিগুলো আমার বাসা থেকে তাড়াও।’
‘ঠিক আছে, তাড়াব। তবে একটু সময় লাগবে ওদের ব্রেন ওয়েভের অর্থ বুঝতে!’
‘নো প্রবলেম। টেক ইওর টাইম!’
আলাপের এ পর্যায়ে দুজনই বাসার পাশের রাস্তা থেকে শোরগোলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। ধীরেধীরে আওয়াজ বাড়ছেই। কোনো চোর ধরা পড়েছে বলে মনে হচ্ছে!
সাজ্জাদের বাসা দোতলায়। বাসার বারান্দায় গিয়ে সে দেখল, এক চোরকে গণপিটুনি দেওয়া হচ্ছে! সবাই বেশ উৎসবের আমেজে চোর ব্যাটাকে পেটাচ্ছে। সাজ্জাদের মস্তিষ্কে হঠাৎ ফিটু কথা বলে উঠল, ‘চোর বলে সবাই যাকে মারছে, সে একটা মুদি দোকানের ক্যাশবাক্স থেকে টাকা নিয়ে দৌড় দিয়েছিল!’
সাজ্জাদ খেয়াল করেনি যে ফিটুও তার সাথে বারান্দায় এসে হাজির হয়েছে। সাজ্জাদ টেলিপ্যাথিক উপায়ে ফিটুকে বলল, ‘কেন যে লোকটা ক্যাশ থেকে এভাবে টাকা নিয়ে পালাতে গেল! এখন তো নির্ঘাত মারা পড়বে!’
‘মনে হচ্ছে, চোরটা মারা গেছে! কারণ একটু আগেও তার ব্রেনে ওয়েভ জেনারেট হচ্ছিল। আমি তার মস্তিষ্কের তথ্য পড়তে পারছিলাম। এখন কোনো ওয়েভ পাচ্ছি না। ব্রেনে ঢুকতেও পারছি না। ডেড হওয়াতে মনে হয় তার ব্রেন ইনঅ্যাকসেসিবল হয়ে গেছে!’
‘কী বলছ, মানুষটা মারা গেছে! অথচ দেখো, লোকগুলো কীভাবে পিটিয়ে যাচ্ছে!’
এরই মধ্যে মোটাতাজা এক ব্যক্তি কোথা থেকে ইটের একটি টুকরা জোগাড় করে এনেছে। জোরে সেটি চোরের মাথায় ভাঙল! তারপর বাহবা পাওয়ার জন্য ছ্যাবলার মতো চারপাশে তাকাচ্ছে। ফিটু বলল, ‘যে লোকটা ইট দিয়ে মারল, সে খুনের আসামি!’
‘বলো কী!’
‘হুম। আমি তার ব্রেনের তথ্য থেকে পেলাম। আর এখনও কিল-ঘুষি দিয়ে যাচ্ছে যে লোকটা, সে বউয়ের সাথে ঝগড়া করে মাত্রই রাস্তায় নেমেছে। ঝগড়ার সময় নিজের মধ্যে দমিয়ে রাখা রাগ, জমিয়ে রাখা ঝাল এখন চোরটার ওপর ঝাড়ছে!’
‘ইস, চোরটার জন্য মায়া লাগছে!’
‘আমারও।’
‘তুমি কি সবার সম্পর্কেই বলতে পারো?’
‘হুম। এই টেকনোলজির মাধ্যমে আমি ব্রেনের স্টোরড ডাটাও পড়তে পারি। লাল টি-শার্ট পরা চ্যাংড়া ছেলেটা একটু আগে প্রেমিকার হাতে ধরা খেয়েছে। গোপনে তার আরেক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল! ধরা খাওয়ায় তার মেজাজ হাইপার হয়ে আছে। সেই ক্রোধ সে প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে চোরকে পিটিয়ে!’
‘উফ, আর বোলো না। খারাপ লাগছে চোরটার জন্য!’
‘আর স্যুটেড-বুটেড লোকটা ইনসিওরেন্স কোম্পানির। আজকে সে কোনো ক্লায়েন্ট জোগাড় করতে পারেনি। তাছাড়া জ্যামের কারণে রাস্তাতেই আজকে তার অর্ধেক দিন কাটাতে হয়েছে। সেজন্য তার মেজাজও ভয়ঙ্কর খারাপ। সেই খারাপ মেজাজের ঝাল গেছে চোর বেচাররা ওপর!’
‘এখন তো মনে হচ্ছে, যারা পেটাচ্ছে, তারাও কম খারাপ মানুষ না!’
‘ওহ!’
‘কী হলো?’
‘এখানে অনেক বড় একটা ভুল হয়েছে!’
‘কী ভুল?’
‘চোর বলে যাকে মারা হলো, সে আসলে চোর না!’
‘কী বলছো!’
‘তার চার বছরের একটি মেয়ে আছে। মেয়েটি ভীষণ অসুস্থ। ডাক্তার দেখানোর টাকা ছিল না লোকটির হাতে। সকালে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার লোকজন টাকা ছাড়া কিছু করতে রাজি হয়নি। তারপর লোকটি অনেক মানুষের কাছে টাকা ধার চেয়েছে। কেউ দেয়নি। সে যখন টাকার খোঁজ করছিল জনেজনে, তখন বাসা থেকে তার স্ত্রী ফোন করে বলল, মেয়ের জ্বর এত বেশি যে বাঁচানোই মুশকিল হয়ে যাবে! সেসময়ই লোকটির চোখ যায় মুদি দোকানের ক্যাশবাক্সের দিকে! তার ব্রেন অকার্যকর হওয়ার আগে সেখানে এ তথ্যগুলোই প্রসেস হচ্ছিল। আমি তখন কিছু তথ্য এক্সট্রাক্ট করতে পেরেছি। এখন বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখছি লোকটি চোর নয়! সম্ভবত, মৃত্যুর আগে সে তার ছোট্ট মেয়েটির মুখই বারবার মনে করছিল!’
‘ইস! তার বাসার ঠিকানা কী?’
‘সেটি এক্সট্রাক্ট করতে পারিনি; আগেই তার ব্রেন ডেড হয়ে গেছে। মানুষটা এখন মৃত!’
৩
বারান্দায় দাঁড়িয়ে মানুষ মারার দৃশ্য সাজ্জাদ সহ্য করতে পারেনি। যে মানুষগুলো ঠাণ্ডা মাথায় প্রকাশ্যে একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, তাদের বিচার কে করবে? গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া সবাই হয়তো জানেও না যে মৃত লোকটির অপরাধ কী ছিল! সমাজে এভাবে গণপিটুনি চলতে থাকলে তো যে কেউ যেকোনো সময় ভিকটিম হতে পারে! সাজ্জাদের এখন বাইরে যেতেও ভয় লাগছে; অথচ রাতের খাওয়াটা বাইরে কোনো হোটেলে গিয়ে খাওয়া দরকার। হঠাৎ ফিটু বলে উঠল, ‘তুমি বাইরে খাওয়ার কথা ভাবছ কেন? বুয়া তো রান্না করে গেল মাত্র।’
ফিটু সাজ্জাদের চিন্তার বিষয় জেনে যাচ্ছে-এই ব্যাপারটিতে সাজ্জাদের রেগে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন সে রাগল না। বলল, ‘বুয়ার রান্না ইদানিং এত বাজে হয় যে মুখে দেওয়া যায় না। মুরগি রান্না করলে কাঁচা থাকে। ডালে লবণ হয় না। তরকারিতে লবণ বেশি! কী যে অবস্থা!’
‘তুমি কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?’
‘বলো।’
‘তোমার উচিত এই বুয়াকে বিদায় করে দেওয়া। তার রান্নার হাত খুব ভালো। এজন্য তার স্বামী তাকে “রন্ধনরানী” বলে। অথচ তোমার এখানে সে উল্টা-পাল্টা করে রান্না করে; যাতে তুমি না খাও! পরদিন সে খাবারগুলো নিজের বাসায় নিয়ে যায়। বাসায় সেগুলো ঠিকমতো রান্না করে খায়।’
‘কী বলছ এসব!’
‘যা ঘটছে, তা-ই বলছি। তুমি ব্যাচেলর মানুষ, বাসায় একাই; তার ওপর সারাদিনই থাকো বাসার বাইরে-বুয়ার তো পোয়াবারো!’
‘এসব তুমি জানলে কীভাবে?’
‘বুয়ার ব্রেনের তথ্যভাণ্ডার থেকে।’
‘পৃথিবীতে তো টিকে থাকাই মুশকিল দেখছি! সব মানুষই যদি এমন হয়, তাহলে কাকে বিশ্বাস করব!’
‘এজন্যই মনে হয় তোমাদের এক কবি বলেছেন, “অবিশ্বস্ত পৃথিবী আমার”!’
‘তুমি তো দেখি আমাদের গল্প-কবিতাও পড়েছ!’
‘কিছু কিছু পড়েছি। মানুষের ব্রেনে পেয়েছি।’
‘বুয়াটা খুব ক্ষতি করছে। নতুন কাউকে পেলেই একে বিদায় করে দেব। আচ্ছা, তুমি ব্রেনের তথ্য কীভাবে জানো?’
‘এই টেকনোলজি আমরা আবিষ্কার করেছি বেশি আগে না; মাত্র দুই শতক আগে। আমরা কারও ব্রেনে ঢুকে তার তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য এক্সট্রাক্ট করতে পারি, ব্রেনে তাৎক্ষণিকভাবে জেনারেটেড ব্রেন-ওয়েভের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারি তার চিন্তার বিষয়। আবার, কারও ব্রেন কোনো সিগন্যাল পাঠালে সেটিও ক্যাচ করতে পারি। আরও অনেক জটিল ব্যাপার-স্যাপার এখন আমাদের আয়ত্তের মধ্যে; কিন্তু সেগুলো এত কম সময়ে বোঝানো পসিবল না। এমনকি এই টেকনোলজি পুরোপুরি বুঝতে আমি পড়াশোনা করেছি পাঁচ বছর! আমাদের গ্রহেরও অনেকে এই টেকনোলজির ব্যবহার জানে না।’
‘থাক, আমারও জানার দরকার নেই। তাড়াতাড়ি খেয়ে এসে ঘুমানো দরকার। কালকে সকালেই এক কোম্পানিতে চাকরির ইন্টারভিউ আছে।’
‘সকালে যে ইন্টারভিউ আছে, তা আমি জানি। টিউশনির টাকায় তুমি খরচ কুলাতে পারছ না। তাছাড়া মা-বাবাকেও কিছু করে টাকা পাঠাতে চাও তুমি। একটা চাকরি তোমার ভীষণ দরকার।’
‘সবই তো দেখি জেনে বসে আছো! এভাবে না জানিয়ে অন্যের ব্রেনে ঢুকে পড়া অপরাধ!’ ভঙ্গি দেখে বোঝাই যাচ্ছে, সাজ্জাদ ফান করে কথাটা বলল। ফিটুও কৌতুক করে বলল, ‘ঠিক আছে, এরপর থেকে ফরম্যাল অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে অনুমতি নিয়ে তারপর ব্রেনে ঢুকব।’
সাজ্জাদ হাসল; কিছু বলল না। ফিটু বলল, ‘তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে, আমি তোমার সঙ্গে ইন্টারভিউ বোর্ডে যেতে চাই। কেউ আমাকে খেয়ালই করবে না।’
‘খামোকা গিয়ে কী লাভ বলো?’
‘লাভ আছে বলেই তো বলছি! কারণ আমি প্রশ্নকর্তার ব্রেন থেকে তার কোশ্চেনের উত্তর নিয়ে তোমাকে জানিয়ে দেব। আর তাহলেই তো চাকরি নিশ্চিত!’
‘বাহ, দারুণ আইডিয়া! কিন্তু...’
‘কিন্তু কী?’
‘এভাবে উত্তর ফাঁস করা কি ঠিক হবে?’
‘সবসময় ঠিক-বেঠিক ভাবতে গেলে এই অবিশ্বস্ত গ্রহে টিকে থাকা আসলেই মুশকিল! তোমাদের বিভিন্ন পরীক্ষার যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, এটা তো মহাপাপ! কিন্তু তারপরও কি প্রশ্নফাঁস থেমে আছে?’
‘না, তা থেমে নেই!’
‘গিয়ে দেখো, কার চাকরি হবে, হয়তো আগে থেকেই ঠিক করা আছে! তোমরা হচ্ছো একটা প্রক্রিয়া চালানোর গিনিপিগ মাত্র! তাই একটু ট্যাক্টফুল হতে হবে।’
সাজ্জাদ আর কথা বাড়াল না। বলল, ‘ঠিক আছে, কালকে আমার সঙ্গে যেতে পারো।’
৪
সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সাজ্জাদের দেখা হলো আলমাস আঙ্কেলের সঙ্গে। সাজ্জাদ ফিটুকে টেলিপ্যাথির সাহায্যে বলল, ‘আজকের দিনটা মনে হয় ভালো কাটবে! কারণ আলমাস আঙ্কেল অত্যন্ত ভালো মানুষ। ভালো মানুষের মুখ দেখে দিন শুরু করছি।’
ফিটু সাজ্জাদকে থামিয়ে দিল। বলল, ‘এভাবে বোলো না। কারণ লোকটা এক নম্বরের বদমাশ। দেখে মনে হয়, ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না। কিন্তু সে যে বেশ আতঙ্কে তোমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল, তা তুমি বুঝতে পারোনি!’
সাজ্জাদ অবাক হয়ে বলল, ‘আমাকে দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কী আছে?’
‘তার স্ত্রী অফিশিয়াল ট্রেনিংয়ে দেশের বাইরে; আর তার ঘরে এখন অন্য এক মেয়ে! এখনও আলমাস মানুষটার ঘরে ঢুকলে সেই মেয়েকে পাওয়া যাবে। সে বাইরে গেল তাদের দুজনের জন্য সকালের নাশতা আনতে।’
‘কী বলছ এসব!’
‘যা ঘটছে, তা-ই বলছি। মানুষের মনে এক কথা, মুখে আরেক কথা থাকতে পারে; কিন্তু আমাদের মনে ও মুখে একই কথা!’
‘এমন হলে মানুষ চিনব কীভাবে?’
‘মানুষ চেনা অসম্ভব!’
রাশভারী চেহারার ভদ্রলোক সাজ্জাদের সিভি দেখছেন। তার রুমের বাইরে নেমপ্লেটে লেখা রয়েছে:
কফিল শিকদার
সিইও
শিকদার ক্যাট
এখানে ক্যাট অর্থ বেড়াল নয়। ক্যাট এসেছে ‘ক্যাটারপিলার’ শব্দটি থেকে। এই প্রতিষ্ঠানটি ক্যাটারপিলার, বয়লার, জেনারেটর ইত্যাদি বিক্রি করে। আজকের ইন্টারভিউ ‘সেলস এক্সিকিউটিভ’ পদের জন্য। এই পদে লোক নিবে মাত্র একজন! এখানে পদে এক্সিকিউটিভ শব্দটি দেখে যতটা আরামের মনে যাচ্ছে; কাজটি ততটাই পরিশ্রমের! শুধু পরিশ্রমের বললে ভুল হবে, দারুণ চ্যালেঞ্জিংও।
কফিল শিকদারের পাশে বসে আছে তরুণ এক ছেলে। সে এই প্রতিষ্ঠানের কোন পদে আছে, তা এখনো জানা যায়নি। শিকদার ক্যাটের কফিল শিকদার সাজ্জাদের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বললেন, ‘আগে কোনো চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছ?’
‘জি, দিয়েছি। এটা সাঁইত্রিশতম ইন্টারভিউ।’
‘কী বলো! চাকরি হয়নি?’
‘না, স্যার। আমার তো স্যার খুঁটির জোরও নেই, সেই হ্যাডমও নেই! তাছাড়া টাকা-পয়সা ছাড়া তো আজকাল...’
কথার এই পর্যায়ে ফিটু সাজ্জাদকে থামিয়ে দিতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদের কথাবার্তার ধরনে ফিটু হতাশ। এগুলো কী বলছে ছেলেটা! এটা তো নিজস্ব দুঃখ-শোক প্রকাশসভা না; নীতিকথা বলার মজলিশও না!
সাজ্জাদের কথাবার্তা আসলেই একটু কাটাকাটা; বেশ গায়ে বিঁধে মাঝেমাঝে। যাহোক, ফিটু যথারীতি টেলিপ্যাথিক উপায়ে বলল, ‘এভাবে কথা বোলো না! এভাবে কথা বললে তোমার চাকরি পাওয়ানো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না! এই ভদ্রলোকই এই কোম্পানির প্রধান। আর বাম পাশে বসে আছে তারই ডান হাত। সুতরাং যা বলবে, সাবধানে ভেবেচিন্তে বলো। ভদ্রলোক বিনয় পছন্দ করেন। মন থেকে বিনয় না এলে আলগা বিনয় দেখালেও প্রবলেম নেই। তিনি স্রেফ বিনয় চান।’
সাজ্জাদ মনেমনে ফিটুকে বলল, ‘ঠিক আছে।’ তারপর মিস্টার শিকদারের দিকে তাকিয়ে সাজ্জাদ বলল, ‘আসলে স্যার, রিজিক ভাগ্যেরও ব্যাপার। আর এখন তো প্রতি ক্ষেত্রে প্রতিযোগী অত্যধিক বেশি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভাগ্য আর আপনাদের দয়ায় আশাকরি একসময় চাকরি হবে।’
‘হুম। আচ্ছা, বলতো, যারা কখনো তেঁতুল খায়নি, তারা তেঁতুল দেখলে কি তাদের জিভে পানি আসবে?’
সাজ্জাদ ভীষণ বিরক্ত। কোম্পানি হলো বয়লার বেচার কোম্পানি; তেঁতুল বেচার কোম্পানি তো না! ভাইভাতে অপ্রাসঙ্গিক তেঁতুলবিদ্যা নিয়ে কামড়াকামড়ির কোনো মানেই হয় না।
সাজ্জাদ একটা কড়া জবাব দিতে যাবে, ঠিক তখনই ফিটু তাকে আটকাল। বলল, ‘এসব এলোমেলো কী চিন্তা করছো!? এত নীতিকথা দিয়ে গীত রচনা করা যায়, শীত আটকানো যায় না! যা বলছি, তা-ই বলো। এই ভদ্রলোকের ব্রেনে যে উত্তর পাচ্ছি, সেটাই বলছি। প্রশ্নটির উত্তর হবে, “না”।’
সাজ্জাদ ফিটুর কথামতো উত্তর দিল, ‘না’।
কফিল শিকদার বলে উঠলেন, ‘ব্রেভো! এক শব্দে সঠিক উত্তর দিয়েছ। এতক্ষণ কেউ-ই এক শব্দে উত্তর দেয়নি; সবাই অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে শুরু করে! যতসব বাচাল গাধা আসে ইন্টারভিউ দিতে। তোমার চাকরি ফাইনাল। কাল..’
শিকদার সাহেবের কথা শেষ না হতেই পাশের ছেলেটা বলে উঠল, ‘স্যার, আমি একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাই।’
ফিটু সাজ্জাদকে মনেমনে বলল, ‘মহাবিপদ দেখছি!’
‘কেন?’
‘ওই চ্যাংড়ার একটা ক্যান্ডিডেট আছে! ও তোমাকে ভয়ংকর কঠিন কোশ্চেন করে আটকাতে চাইছে। তোমার চাকরি যাতে না হয়, সেটাই চায় বদমাশটা।’
‘কোশ্চেন করলে তো প্রবলেম নাই। উত্তর তুমি আমাকে জানিয়ে দিও।’
‘এটা এত বড় বদমাশ যে প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না! তুমি না পারলে সে বলবে ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে উত্তর খুঁজে নিতে!’
‘তাহলে উপায়!’
‘দাঁড়াও, দেখছি।’
এরপর যা ঘটল, তার জন্য সাজ্জাদ মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মিস্টার শিকদার তার পাশে বসা চ্যাংড়া ছেলেটাকে কষে এক চড় লাগিয়ে দিলেন! চড়তরঙ্গের ঝাপটায় টেবিল পর্যন্ত কেঁপে উঠল। চ্যাংড়া চেয়ারসহ উল্টে পড়ল। দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, কফিল শিকদারকে তার কথার মাঝখানে থামিয়ে নিজে প্রশ্ন করতে যাওয়ায় শিকদার সাহেব খেপে গেছেন; আর খেপে চ্যাংড়া ছেলেকে এই চড় কষেছেন।
নিজেকে সামলে নিয়ে মাটি থেকে কোনোমতে উঠল ছেলেটি। কিন্তু কী আশ্চর্য, ছেলেটার মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালা ঝরছে! মনে হচ্ছে, ছেলেটির চোখের সামনে পড়ে রয়েছে প্রচণ্ড টক তেঁতুলের স্তূপ; তাই দেখে তার জিভে পানি চলে এসেছে! লালাময় দৃশ্যে কফিল শিকদারও কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন। এসব কী ঘটছে! তিনি পিয়ন, সিকিউরিটি গার্ডকে ডাকলেন। তারা চ্যাংড়া ছেলেটিকে ধরাধরি করে রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল; তার মুখ দিয়ে ক্রমাগত লালা ঝরছেই!
মিস্টার শিকদার সাজ্জাদকে আগামীকালই কাজে যোগ দিতে বললেন। কথা শেষে সাজ্জাদ ও ফিটু রুম থেকে বের হয়ে এল। সাজ্জাদ ফিটুকে বলল, ‘ওই ছেলের অমন অবস্থা তুমি করেছ?’
‘দুষ্ট লোক তো; একটু শিক্ষা দিলাম।’
‘কীভাবে করলে এসব?!’
‘ব্রেনকে নিয়ন্ত্রণের কিছু মেকানিজম আমি জানি। ভদ্রলোকের ব্রেনে ওই চ্যাংড়াকে কষে চড় দেওয়ার কমান্ড পাঠালাম। সেই অনুযায়ী যখন কাজ হলো, তখন ছেলেটির ব্রেন থেকে তার স্যালাইভারি গ্ল্যান্ডে সিগন্যাল পাঠাতে থাকলাম; শুরু হলো বেচারার অনিয়ন্ত্রিত স্যালাইভেশন! যেহেতু ভাইভাতে জিভের পানি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, তাই তারই একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ হাজির করলাম-এই আর কী!’
‘তুমিও তো দেখছি কম দুষ্টু না!’
‘দুষ্টু হলেও ক্ষতিকারক দুষ্টু না।’
‘তা ঠিক! তুমি চাকরিটার ব্যবস্থা করে আমার যে উপকার করলে, তার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।’
‘এভাবে বলছো কেন? লজ্জা লাগে!’
‘তোমাকে আমি ট্রিপ এবং ট্রিট দিতে চাই।’
‘তার মানে?’
‘ট্রিপ মানে কোনো দর্শনীয় জায়গা ঘুরিয়ে দেখাতে চাই।’
‘তাহলে আমাকে টাওয়ার ঘুরিয়ে দেখিয়ো।’
‘টাওয়ার!’
‘হুম, টাওয়ার। আমাদের প্রিয় স্থান টাওয়ার। তাই আমাদের গ্রহে গেলেও দেখতে পাবে শুধু টাওয়ার আর টাওয়ার! আমি পৃথিবীর টাওয়ারগুলো দেখতে চাই!’
সাজ্জাদ মনেমনে চিন্তা করতে লাগল, টাওয়ার কোথায় কোথায় আছে। গাজীপুরের দিকে বনাঞ্চলের মধ্যে ওয়াচ টাওয়ার আছে। কিন্তু সেটা তো অনেক দূরে! ঢাকা শহরের মধ্যেই পানির ট্যাংক স্থাপনের জন্য নির্মিত টাওয়ারগুলো দেখানো যেতে পারে। অবশ্য সেটি টাওয়ার হিসেবে দেখালে এক ধরনের প্রতারণা হবে! সাজ্জাদ বলল, ‘আসলে শহরের মধ্যে তেমন টাওয়ার নেই। অন্য কিছু দেখার শখ থাকলে বলো।’
‘এত ঘোরাঘুরির দরকার নেই। আমাকে ছমছম দেখতে দিলেই হবে। সেখানেই তো অনেক জায়গা দেখায়। কখনো কখনো টাওয়ারও দেখাতে দেখেছি!’
‘ছমছম!’
‘হ্যাঁ। তোমার বাসায় তুমি যেটা দেখো!’
মাছিম্যানের সঙ্গে টেলিপ্যাথিক উপায়ে মুখ না নাড়িয়ে মনেমনে কথা হলেও সাজ্জাদ সশব্দে হেসে উঠল। বলল, ‘ওটা ছমছম না, স্যামসাং টিভি!’
‘ও! ট্রিট কী?’
‘পছন্দের খাবার খাওয়ানোকে ট্রিট বলে।’
‘তাহলে তো চমচম! তোমাদের চমচম আমার খুব ভালো লাগে।’
‘ঠিক আছে তাহলে; আজ রাতেই হবে আমাদের ছমছম অ্যান্ড চমচম পার্টি!’
কথা বলতে বলতে সাজ্জাদ সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে এসেছে রাস্তায়। ফিটুও সঙ্গেই আছে। রাস্তায় নেমেই তারা একটি সিএনজি পেয়ে গেল। ইদানিং সিএনজি-র ভাড়া দিতে হয় মিটার অনুযায়ী। অবিশ্বাস্য হলেও ব্যাপারটি দেশে সম্ভব হয়েছে! আগে তো সিএনজিতে চড়ার কথা চিন্তাও করত না সাজ্জাদ। এখনও বিপদে না পড়লে উঠে না। বাস-রিকশাই তার চলাচলের যান। আজকে সঙ্গে ভিনগ্রহী গেস্ট আছে; তাই এই ব্যবস্থা।
৫
রাস্তায় ভীষণ জ্যাম। সিএনজি এক হাত আগায় তো দুই হাত পেছায়-এমন অবস্থা! মিটারে ভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে! আগে গান লেখা হতো এমন, ‘দিন যায়, কথা থাকে।’ আর এখন লেখা উচিত, ‘দিন যায়, জ্যাম থাকে’!
কিছুদূর যাওয়ার পর ফিটু বলল, ‘ওহো!’
‘কী হলো?’
‘আমাদের গ্রহ থেকে আমাকে নিতে চলে এসেছে।’
‘কী বলো!’
‘হুম। সিগন্যাল পাঠাচ্ছে।’
‘এত তাড়াতাড়ি! কোথায় এসেছে?’
‘তোমার বাসায়; যেখানে আমি প্রথম পৌঁছেছিলাম। এখনই যেতে হবে।’
‘তা কী করে হয়! তাহলে ট্রিপ অ্যান্ড ট্রিট-এরই বা কী হবে?’
‘পাওনা রইল।’
‘আজকে আমার এত খুশির দিন; চাকরি পেয়ে গেলাম; অথচ তুমি থাকবে না!’
‘বেঁচে থাকলে আবারও কোনো এক সময় হয়তো দেখা হবে।’
‘কিন্তু পরে গেলে সমস্যা কী? যারা তোমাকে নিতে এসেছে, তাদেরকে সহ আমরা ট্রিপ অ্যান্ড ট্রিট উপভোগ করব! এতে মজা আরও বেশি হবে!’
‘সেটি সম্ভব না। আমাদের গ্রহ থেকে এই গ্রহে আসা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ একটি ব্যাপার! প্রতিটা মুহূর্তের সঙ্গে বিশাল অঙ্কের ব্যয় জড়িত! এই খরচ সম্পূর্ণটাই আমাদের গ্রহ বহন করছে এবং এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী আমি সামান্য দেরি করলেও আমাকে তার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আর বেশি দেরি করলে তো আমার বিরূদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে!’
‘তুমি বিপদে পড়ো, সেটি আমি কখনোই চাই না। কিন্তু আমাদের আবার কবে দেখা হবে?’
‘ঠিক বলতে পারছি না। একার খরচে এখানে আসা সম্ভব হলে আমি কদিন পরপরই তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম! কিন্তু সেটি অসম্ভব। আমাকে গ্রহ থেকে গবেষণার জন্য মনোনীত করে এখানে পাঠিয়েছে বলেই আসা সম্ভব হয়েছে। পরেও হয়তো পাঠাবে। তখন দেখা হবে।’
‘আশাকরি, আবার দেখা হবে। তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। অনেক ভালো থেকো। গুড লাক, মাছিম্যান!’
‘তোমাকেও আমার ভালো লেগেছে। তুমি অন্য মানুষদের মতো ভেতরে এক, বাইরে আরেক না। সেজন্য তোমার ব্যবহার মাঝেমাঝে খারাপ লাগে সত্যি; কিন্তু সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশ করাটাই বেশি সুন্দর! যাহোক, বিদায়! তুমিও ভালো থেকো।’
‘বিদায়!’
বাসায় ফিরে সাজ্জাদ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, বাসাতে একটি মাছিও নেই! খেতে বসেও সাজ্জাদ ভীষণ অবাক হলো। বুয়ার রান্না আজ অসাধারণ হয়েছে! এসব কীভাবে সম্ভব হয়েছে সাজ্জাদ ধারণা করতে না পারলেও, কে সম্ভব করেছে সেটি ধারণা করতে পারল খুব সহজেই।
৬
সাজ্জাদ এখন ‘শিকদার ক্যাট’-এ চাকরি করে। খুব ব্যস্ততার মধ্যে তার দিন কাটে। অফিসে তার আলাদা একটি রুম আছে। সেখানে বসার জন্য রয়েছে দামি চেয়ার। ব্যস্ততার ফাঁকে হঠাৎ অবসর জুটলে চেয়ারটিতে সে গা এলিয়ে দেয়। তখন তার কল্পনায় ভর করে অতীতের সুন্দর স্মৃতিমালা। মনে পড়ে যায় মাছিম্যানের কথা। বিদায়ের পর মাছিম্যানের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। তবে সাজ্জাদ অনুভব করতে পারে, বহু আলোকবর্ষ দূরের এক মাছিম্যান ক্ষণিকের পরিচয়েই তার হৃদয়...।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now