বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
(১ম পর্বের পর)
রানু প্রসঙ্গে পাওয়া সব তথ্য লিখে রাখবার জন্যে মিসির আলি সাহেব মোটা একটা খাতা কিনে এনেছেন। খাতাটির প্রথম পাতায় লেখ-
‘এক জন মানসিক রুগীর পর্যায়ক্রমিক মনোবিশ্লেষণ।’ দ্বিতীয় পাতায় কিছু ব্যক্তিগত তথ্য। যেমন-
নাম : রানু আহমেদ।
বয়স : সতের বৎসর (রুপবতী)।
বৈবাহিক অবস্থা : বিবাহিম। (তের মাস আগে বিয়ে হয়)।
স্বাস’্য : রুগ্ন।
ওজন : আশি পাউন্ড।
স্বামী : আনিস আহমেদ। দি জেনিথ ইন্টারন্যাশনালের ডিউটি অফিসার। বয়স ৩৭। স্বাস’্য ভালো। তৃতীয় পাতার হেডিংটি হচ্ছে-‘অডিটরি হেলুসিনেশন’। এর নিচে লাল কালি দিয়ে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা। এই পাতায় অনেক কিছুই লেখা হয়েছে, আবার কাটাকুটি করা হয়েছে। যেন মিসির আলি সাহেব মনস্থির করতে পারছেন না কী লিখবেন। দুটি লাইন শুধু পড়া যায়। লাইন দুটির নিচে লাল কালি দিয়ে দাগ দেয়া।
‘মেয়েটি অডিটরি হেলুসিনেশন হচেছ: সে একা থাকাকালীন শুনতে পায় কেউ যেন তাকে ডাকছে।’
পরের কয়েকটি পাতায় রানুর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় লেখা। এ পাতাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, মিসির আলি নামের এই লোকটির স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। অতি তুচ্ছ ব্যাপারগুলোও লেখা আছে। যেমন, এক জায়গায় লেখা-মেয়েটি বেশ কয়েকবার শাড়ীর আঁচল টেনেছে। দুই বার শব্দ করে আঙুল ফুটিয়েছে। আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটি পানি খেল মাথা নিচু করে। বেশ খানিকটা নিচু করে। যেন পানি পান করার ব্যাপারটি সে আড়াল করতে চায়।
নদীতে গোসলের গল্পটি লেখা আছে। গল্পের শেষে বেশ কিছু প্রশ্ন করা আছে। যেমন-
- একজন মৃত মানুষ পানিতে ভেসে থাকবে। ডুবে থাকবে না। গল্পে মৃত মানুষটির ডুবে-ডুবে চলার কথা আছে। এ রকম থাকার কথা নয়।
- পাজামা খুলে ফেলার কথা আছে। কিশোরীরা সাধারণত শক্ত গিট দিয়ে পাজামা পরে। গিট খুলতে হলে ফিতা টানতে হবে। ঐ মানুষটি কি ফিতা টেনেছিল, না পাজামাটাই টেনে নামিয়েছে?
- তার আনুমানিক বয়স কত ছিল?
- প্রথম অসুস্থতার সময় কি মেয়েটি ঘুমের মধ্যে কোনো কথাবার্তা বলত? কী বলত?
- মেয়েটি বলল, লোকটির নাম জালাল উদ্দিন। কীভাবে বলল? লোকটির নাম তো জানার কথা নয়। নাকি পরে শুনেছে?
- জালালউদ্দিন-জাতীয় নামের কারো সঙ্গে কি এই মেয়েটির পূর্বপরিচয় ছিল?
প্রশ্ন শেষে তিনটি মন্তব্য লেখা আছে। মন্তব্যগুলো সংক্ষিপ্ত। প্রথম মন্তব্য-মেয়েটি যে ঘটনার কথা বলছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। দ্বিতীয় মন্তব্য- এই ঘটনা অন্য যেসব ব্যক্তি প্রত্যক্ষ করেছে তাদের সঙ্গে প্রথমে আলাপ করতে হবে। দ্বিতীয় মন্তব্যটি লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইন করা ও পাশে লেখা-অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয় মন্তব্য-মেয়েটির অবশ্যই কিছু পরিমাণ এক্সট্রান্সেরি পারসেপশন আছে। সে কার্ডের সব ক’টি চিহ্ন সঠিকভাবে বলতে পেরেছে। আমি এ রকম আগে কখনো দেখি নি। এই বিষয়ে আমার ধারণা হচ্ছে, মানসিকভাবে অসুস্থ রুগীদের এই দিকটি উন্নত হয়ে থাকে। আমি এর আগেও যে ক’টি অসুস্থ মানুষ দেখেছি, তাদের সবার মধ্যেই এই ক্ষমতাটি কিছু পরিমাণে লক্ষ্য করেছি। দি জার্নাল অব প্যারাসাইকোলজির তৃতীয় ভল্যুমে(১৯৭৩) এই প্রসঙ্গে রিভিউ পেপার আছে। অথর জন নান এবং এফ টলম্যান।
৭
নীলু ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসে দেখে তার বিছানার উপর চমৎকার একটি প্যাকেট পড়ে আছে। ব্রাউন কাগজে মোড়া প্যাকেটে গোটা-গোটা করে তার নাম লেখা। নীলুর বুক কেঁপে উঠল, বিলুর চোখে পড়ে নি তো? বিলুর খুব খারাপ অভ্যাস আছে, অন্যের চিঠি খুলে-খুলে পড়বে। হাসাহাসি করবে। নীলু দরজা বন্ধ করেই প্যাকেটটি খুলল। ছোট্ট চিঠি, কিন্তু কী চমৎকার করেই না লেখা:
কল্যাণীয়াসু,
ইচ্ছা করেই তোমাকে আমি কম লিখি। তোমার চিঠি পড়ে-পড়ে খুব
মায়া জন্মে যায়। এ বয়সে আমার মায়া বাড়াতে ইচ্ছা করে না।
মায়া বাড়ালেই কষ্ট পেতে হয়। আরেকটি সামান্য উপহার পাঠালাম।
গ্রহণ করলে খুব খুশি হব।
আহমেদ সাবেত
উপহারটি বড় সুন্দর! নীল রঙের একটি ডায়েরি। অসম্ভব নরম প্লাষ্টিকের কভার, যেখানে ছোট্ট একটি শিশুর ছবি। পাতাগুলো হালকা গোলাপী। প্রতিটি পাতায় সুন্দর-সুন্দর দুই লাইনের কবিতা। ডায়েরিটির প্রথম পাতায় ইংরেজিতে লেখাঃ
‘I wish I could be eighteen again’
- A.S.
পড়তে গিয়ে কেন জানি নীলুর চোখে জল এল। এক জন সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা মানুষের জন্যে মন কেমন করতে লাগল। লোকটি দেখতে কেমন কে জানে? সুন্দর নয় নিশ্চয়ই। বয়স্ক মানুষ, হয়তো চুলটুল পেকে গেছে। তাতে কিছু যায় আসে না। মানুষের বয়স হচ্ছে তার মনে। মন যত দিন কাঁচা থাকে, তত দিন মানুষের বয়স বাড়ে না। এই লোকটির মন অসম্ভব নরম। শিশুর মতো নরম। নীলুর মনে হলো এই লোকটি স্বামী হিসেবে অসাধারণ ছিল। তার স্ত্রীকে নিশ্চয়ই সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছে।
নীলু রাতের বেলা দরজা বন্ধ করে দীর্ঘ একটা চিঠি লিখল-আপনি এমন কেন? নিজের কথা তো কিছুই লেখেন নি! অথচ আমি আমার সমস্ত কথা লিখে বসে আছি। তবু মনে হয় সব বুঝি লেখা হলো না। অনেক কিছু বুঝি বাকি রয়ে গেল। আপনি আমাকে এত সুন্দর-সুন্দর উপহার দিয়েছেন, কিন্তু আমি তো আপনাকে কিছুই দিই নি। আমার কিছু-একটা দিতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আমি তো জানি না আপনি কী পছন্দ করেন। আচ্ছা, আপনি কী টাই পড়েন? তাহলে লাল টকটকে একটা টাই আপনাকে দিতে পারি। জানেন, পুরুষমানুষের এই একটি জিনিস আমি পছন্দ করি। কিন্তু হয়তো আপনি টাই পরেন না, ঢিলেঢালা ধরণের মানুষদের মতো চাদর গায়ে দেন। আপনার সম্পর্কে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। এক দিন আসুন না আমাদের বাসায়, এক কাপ চা খেয়ে যাবেন। জানেন, আমি খুব ভালো চা বানাতে পারি। অন্য কেউ চা বানিয়ে দিলে আমার বাবা খেতে পারেন না। সব সময় আমাকে বানাতে হয়। গত রোববারে কী হলো, জানেন? রাত তিনটেয় বাবা আমাকে ডেকে তুললেন-মা, এক কাপ চা বানা তো, বড্ড চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে।
‘আপা, দরজা বন্ধ করে কী করছ?’
নীল অপ্রস্তুত হয়ে দরজা খুলল। বিলু দাঁড়িয়ে আছে। সন্দেহজনকভাবে তাকাচ্ছে।
‘কী করছিলে?’
‘কিছু করছিলাম না।’
বিলু বিছানায় এসে বসল, ‘আপা,তোমার মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি।’
‘কী পরিবর্তন?’
‘অস্থির-অস্থির ভাব। লক্ষণ ভালো না আপা। বল তো কী হয়েছে।?’
‘কী আবার হবে? তোর শুধু উল্টোপাল্টা কথা।’
‘কিছু-একটা হয়েছে আপা। আমি জানি।’
‘কী যে বলিস!’
‘আমার কাছে লুকোতে পারবে না আপা। আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল।’
‘যা ভাগ, পাকামো করিস না।’
বিলু গেল না। কাপড় ছাড়তে-ছাড়তে বলল, ‘রানু আপাকেও বললাম তোমার পরিবর্তনের কথা। তারও ধারণা, তুমি কারো প্রেমে পড়েছ।’
‘হুঁ, আমার খেয়েদেয়ে কাজ নেই। তা ছাড়া প্রেমটা আমার সঙ্গে করবে কে? চেহারার এই তো অবস্থা।’
‘খারাপ অবস্থাটা কী? রঙটা একটু ময়লা। এ ছাড়া আর কি?’
নীলু ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
‘নিঃশ্বাস ফেললে কেন আপা? নিজের চেহারা সম্পর্কে তোমার এমন খারাপ ধারণা থাকা উচিত নয়।’
‘উচিত নয় কেন?’
‘সুন্দরী মেয়েদের অনেক রকম প্রবলেম থাকে।’
‘কী প্রবলেম?’
‘রানু আপার মাথা খারাপ-সেটা তুমি জান?’
‘কী বলছিস এসব!’
‘ঠিকই বলছি। আকবরের মা একদিন দুপুরে কি জন্যে যেন গিয়েছিল, শোনে রানু আপা নিজের মনে হাসছে এবং কথা বলছে।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। কথাগুলো বলছে আবার দুই রকম গলায়। আকবরের মা প্রথম ভেবেছিল কেউ বোধহয় বেড়াতে এসেছে। শেষে ঘরে ঢুকে দেখে কেউ নেই।’
‘সত্যি?’
‘হুঁ। রহমান সাহেবের স্ত্রী বললেন, একদিন নাকি আনিস সাহেব গভীর রাতে রহমান সাহেবকে ডেকে নিয়ে গেলেন তাঁর স্ত্রীর খুব অসুখ, এই কথা বলে। রহমান সাহেব গিয়ে দেখেন অসুখটসুখ কিচ্ছু নেই, দিব্যি ভালো মানুষ।’
নীলু মৃদু স্বরে বলল, ‘রানুর মতো সুন্দরী হলে আমি পাগল হতেও রাজি।’
বিলু হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতে বলল, ‘কথাটা ঠিক বলেছ আপা।’
রানু প্রসঙ্গে পাওয়া সব তথ্য লিখে রাখবার জন্যে মিসির আলি সাহেব মোটা একটা খাতা কিনে এনেছেন। খাতাটির প্রথম পাতায় লেখ-
‘এক জন মানসিক রুগীর পর্যায়ক্রমিক মনোবিশ্লেষণ।’ দ্বিতীয় পাতায় কিছু ব্যক্তিগত তথ্য। যেমন-
নাম : রানু আহমেদ।
বয়স : সতের বৎসর (রুপবতী)।
বৈবাহিক অবস্থা : বিবাহিম। (তের মাস আগে বিয়ে হয়)।
স্বাস’্য : রুগ্ন।
ওজন : আশি পাউন্ড।
স্বামী : আনিস আহমেদ। দি জেনিথ ইন্টারন্যাশনালের ডিউটি অফিসার। বয়স ৩৭। স্বাস’্য ভালো। তৃতীয় পাতার হেডিংটি হচ্ছে-‘অডিটরি হেলুসিনেশন’। এর নিচে লাল কালি দিয়ে একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকা। এই পাতায় অনেক কিছুই লেখা হয়েছে, আবার কাটাকুটি করা হয়েছে। যেন মিসির আলি সাহেব মনস্থির করতে পারছেন না কী লিখবেন। দুটি লাইন শুধু পড়া যায়। লাইন দুটির নিচে লাল কালি দিয়ে দাগ দেয়া।
‘মেয়েটি অডিটরি হেলুসিনেশন হচেছ: সে একা থাকাকালীন শুনতে পায় কেউ যেন তাকে ডাকছে।’
পরের কয়েকটি পাতায় রানুর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয় লেখা। এ পাতাগুলো পড়লেই বোঝা যায়, মিসির আলি নামের এই লোকটির স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। অতি তুচ্ছ ব্যাপারগুলোও লেখা আছে। যেমন, এক জায়গায় লেখা-মেয়েটি বেশ কয়েকবার শাড়ীর আঁচল টেনেছে। দুই বার শব্দ করে আঙুল ফুটিয়েছে। আমি লক্ষ্য করলাম মেয়েটি পানি খেল মাথা নিচু করে। বেশ খানিকটা নিচু করে। যেন পানি পান করার ব্যাপারটি সে আড়াল করতে চায়।
নদীতে গোসলের গল্পটি লেখা আছে। গল্পের শেষে বেশ কিছু প্রশ্ন করা আছে। যেমন-
- একজন মৃত মানুষ পানিতে ভেসে থাকবে। ডুবে থাকবে না। গল্পে মৃত মানুষটির ডুবে-ডুবে চলার কথা আছে। এ রকম থাকার কথা নয়।
- পাজামা খুলে ফেলার কথা আছে। কিশোরীরা সাধারণত শক্ত গিট দিয়ে পাজামা পরে। গিট খুলতে হলে ফিতা টানতে হবে। ঐ মানুষটি কি ফিতা টেনেছিল, না পাজামাটাই টেনে নামিয়েছে?
- তার আনুমানিক বয়স কত ছিল?
- প্রথম অসুস্থতার সময় কি মেয়েটি ঘুমের মধ্যে কোনো কথাবার্তা বলত? কী বলত?
- মেয়েটি বলল, লোকটির নাম জালাল উদ্দিন। কীভাবে বলল? লোকটির নাম তো জানার কথা নয়। নাকি পরে শুনেছে?
- জালালউদ্দিন-জাতীয় নামের কারো সঙ্গে কি এই মেয়েটির পূর্বপরিচয় ছিল?
প্রশ্ন শেষে তিনটি মন্তব্য লেখা আছে। মন্তব্যগুলো সংক্ষিপ্ত। প্রথম মন্তব্য-মেয়েটি যে ঘটনার কথা বলছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। দ্বিতীয় মন্তব্য- এই ঘটনা অন্য যেসব ব্যক্তি প্রত্যক্ষ করেছে তাদের সঙ্গে প্রথমে আলাপ করতে হবে। দ্বিতীয় মন্তব্যটি লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইন করা ও পাশে লেখা-অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয় মন্তব্য-মেয়েটির অবশ্যই কিছু পরিমাণ এক্সট্রান্সেরি পারসেপশন আছে। সে কার্ডের সব ক’টি চিহ্ন সঠিকভাবে বলতে পেরেছে। আমি এ রকম আগে কখনো দেখি নি। এই বিষয়ে আমার ধারণা হচ্ছে, মানসিকভাবে অসুস্থ রুগীদের এই দিকটি উন্নত হয়ে থাকে। আমি এর আগেও যে ক’টি অসুস্থ মানুষ দেখেছি, তাদের সবার মধ্যেই এই ক্ষমতাটি কিছু পরিমাণে লক্ষ্য করেছি। দি জার্নাল অব প্যারাসাইকোলজির তৃতীয় ভল্যুমে(১৯৭৩) এই প্রসঙ্গে রিভিউ পেপার আছে। অথর জন নান এবং এফ টলম্যান।
৮
সোহাগী হাইস্কুলের হেডমাষ্টার সাহেব দারুণ অবাক হলেন। রানুর ব্যাপারে খোঁজখবর করার জন্যে এক ভদ্রলোক এসেছেন-এর মানে কী? অতো দিন আগে কী হয়েছিল, না-হয়েছিল, তা কি এখন আর কারো মনে আছে? আর মনে থাকলেও এইসব ব্যাপার নিয়ে এখন ঘাঁটাঘাঁটি করাটা বোধহয় ঠিক নয়। কিন্তু যে ভদ্রলোক এসেছেন, তাঁকে মুখের ওপর না বলতেও বাধছে। ভদ্রলোক হাজার হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন শিক্ষক। মানী লোক। তা ছাড়া এত দূর এসেছেন, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। মুখে বলছেন রানু অসুস্থ এবং তিনি রানুর এক জন চিকিৎসক, কিন্তু এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারণ মাস খানেক আগেই রানুকে তিনি দেখে এসেছেন। কিছুমাত্র অসুস্থ মনে হয় নি। আজ হঠাৎ এমন কি হয়েছে যে ঢাকা থেকে এই ভদ্রলোককে আসতে হলো?
‘রানুর কী হয়েছে বলবেন?’
‘মানসিকভাবে অসুস্থ।’
‘আমি তো সেদিনই তাকে দেখে এলাম।’
‘যখন দেখেছেন তখন হয়তো সুস্থই ছিল।’
‘কী জানতে আপনি, বলেন।’
‘নদীতে গোসলের সময় কী ঘটেছিল, সেটা বলেন?’
‘সে সব কি আর এখন মনে আছ্ে?’
‘ঘটনাটা বেশ সিরিয়াস এবং নিশ্চয়ই আপনাদের মধ্যে বহু বার আলোচিত হয়েছে, কাজেই মনে থাকার কথা। আপনার যা মনে আসে তাই বলেন।’
হেডমাস্টার গম্ভীর স্বরে ঘটনাটা বললেন। রানুর গল্পের সঙ্গে তাঁর গল্পের কোনো অমিল লক্ষ্য করা গেল না। শুধু ভদ্রলোক বললেন, ‘মেয়েরা গোসল করতে গিয়েছিল দুপুরে, সন্ধ্যায় নয়।’
‘পায়জামা খোলার ব্যাপারটি বলেন। পায়জামাটা কি পাওয়া গিয়েছিল?’
‘আপনি কী বলছেন বুঝতে পারছি না।’
‘রানু বলছিল, নদীতে গোসল করবার সময় সেই মরা মানুষটি তার পায়জামা খুলে ফেলে।’
‘আরে না না, কী বলেন!’
‘ওর পরনে পায়জামা ছিল?’
‘হ্যাঁ, থাকবে না কেন?’
‘আপনার ঠিক মনে আছে তো?’
‘মনে থাকবে না কেন? পরিষ্কার মনে আছে। আপনি অন্য সবাইকেও জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’
‘ঐ মরা মানুষটি সম্পর্কে জানেন?’
‘কিছুই জানি না রে ভাই। থানায় খবর দিয়েছিলাম। থানা হচ্ছে এখান থেকে দশ মাইল। সেই সময় যোগাযোগ ব্যবসা ভালো ছিল না। থানাঅলারা আসে দুই দিন পরে। লাশ তখন পচে-গলে গিয়েছে। শিয়াল-কুকুর কামড়াকামড়ি করছে। থানাঅলারা এসে আমাদের লাশ পুঁতে ফেলতে বলে। আমরা নদীর ধারেই গর্ত করে পুঁতে ফেলি।
‘আচ্ছা, ঐ লাশটি তো উলঙ্গ ছিল, ঠিক না?’
‘জ্বি-না, ঠিক না। হলুদ রঙের একটা প্যান্ট ছিল আর গায়ে গেঞ্জি ছিল।’
মিসির আলি সাহেবের ভ্রু কুঞ্চিত হলো।
‘আপনার ঠিক মনে আছে তো ভাই?’
‘আরে, এটা মনে না-থাকার কোনো কারণ আছে? পরিষ্কার মনে আছে।’
‘লাশটি কি বুড়ো মানুষের ছিল?’
‘জ্বি-না, জোয়ান মানুষের লাশ।’
‘আর কিছু মনে পড়ে?’
‘আর তো কিছু নেই মনে পড়ার।’
‘আপনার ঐ মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে চাই, অনুফা যার নাম। শুনেছি ওর শ্বশুরবাড়ি কাছেই।’
‘হরিণঘাটায়। আপনি যেতে চান হরিণঘাটা?’
‘জ্বি।’
‘কখন যাবেন?’
‘আজকেই যেতে পারি। কত দূর এখান থেকে?’
‘পনের মাইল। বেবিট্যাক্সি করে যেতে পারেন।’
‘রাতে ফিরে আসতে পারব?’
‘তা পারবেন।’
‘বেশ, তাহলে আপনি আমাকে ঠিকানাটা দিন।’
‘দেব। বাড়িতে চলেন, খাওয়াদাওয়া করেন।’
‘আমি হোটেল থেকে খেয়েদেয়ে এসেছি।’
‘তা কি হয়, অতিথি-মানুষ! আসুন আসুন।’
ভদ্রলোক বাড়িতে নিয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু বড়ই গম্ভীর হয়ে রইলেন। মাথার ওপর হঠাৎ এসে পড়া উপদ্রবে তাঁকে বেশ বিরক্ত মনে হলো। ভালো করে কোনো কথাই বললেন না। অকারণে বাড়ির এক জন কামলার ওপর প্রচন্ড হম্বিতম্বি শুরু করলেন।
কিন্তু অনুফার বাড়িতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার ঘটল। মেয়েটি আদর-যত্নের একটি মেলা বাধিয়ে ফেলল। মিসির আলি অবাক হয়ে দেখলেন, মেয়েটির স্বামী সন্ধ্যাবেলাতেই জাল নিয়ে পুকুরে নেমে গেছে। অনুফা পরিচিত মানুষের মতো আদুরে গলায় বলল, ‘রাতে ফিরবেন কি-কাল সকালে যাবেন।’ লোকজন মিসির আলিকে দেখতে এল। এরা বেশ সম্পন্ন গৃহস্থ। মেয়েটিও মনে হয় বেশ ক্ষমতা নিয়ে আছে। সবাই তার কথা শুনছে।
ঘন্টাখানেকের মধ্যে তাঁকে গোসলের জন্যে গরম পানি করে দেয়া হলো। একটা বাটিতে নতুন একটা গায়ে মাখার সাবান। মোড়কটি পর্যন্ত ছেড়া হয় নি। বাংলাঘরে নতুন চাদর বিছিয়ে বিছানা করা হলো। মেয়েটির বৃদ্ধ শ্বশুর একটি ফর্সী হুক্কাও এনে দিলেন এবং বারবার বলতে লাগলেন, খবর না-দিয়ে আসার জন্যে ঠিকমতো খাতির-যত্ন করতে না পেরে তিনি বড়ই শরমিন্দা। তবে যদি কালকের দিনটা থাকেন, তবে তিনি হরিণঘাটার বিখ্যাত মাগুর মাছ খাওয়াবেন। খাওয়াতে না-পারলে তিনি বাপের ব্যাটা না-ইত্যাদি ইত্যাদি।
মিসির আলিরও বিস্ময়ের সীমা রইল না। তিনি সত্যি-সত্যি এক দিন থেকে গেলেন। মিসির আলি সাহেব এ রকম কখনো করেন না।
৯
রানু মৃদু স্বরে বলল, ‘ভেতরে আসব?’
‘এস রানু, এস।’
‘গল্প করতে এলাম।’
‘খুব ভালো করেছ।’
নীলু উঠে গিয়ে রানুর হাত ধরল। রানু বলল, ‘তুমি কাঁদছিলে নাকি, চোখ ভেজা!’ নীলু কিছু বলল না। রানু বলল, ‘এত কিসের দুঃখ তোমার যে দুপুরবেলায় কাঁদতে হয়?’
‘তোমার বুঝি কোনো দুঃখটুঃখ নেই?’
‘উঁহু আমি খুব সুখী।’
রানু হাসতে লাগল। নীলু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুমি বলেছিলে, একটা খুব অদ্ভুদ কথা আমাকে বলবে।’
‘বলেছিলাম নাকি?’
‘হ্যাঁ। আজ সেটা বলতে হবে। তারপর আমি আমার একটা অদ্ভুদ কথা বলব।’
রানু হাসতে লাগল।
‘হাসছ কেন রানু?’
‘তোমার অদ্ভুদ কথা আমি জানি, এই জন্যে হাসছি।’
‘কী আবোলতাবোল বলচ! তুমি জানবে কী?’
‘জানি কিন্তু।’
নীলু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘জানলে বল তো।’
‘তোমার এক জন প্রিয় মানুষ তোমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছে। ঠিক না?’
নীলু দীর্ঘ সময় কোনো কথাবার্তা বলল না। রানু বলল, ‘কি ভাই, বলতে পারলাম তো?’
‘হ্যাঁ, পেরেছ।’
‘ও কি বাসায় আসবে?’
‘বলব তোমাকে। তার আগে তুমি বল, তুমি কী করে জানলে? বিলু তোমাকে বলেছে? কিন্তু বিলু তো কিছু জানে ন!’
‘আমাকে কেউ কিছু বলে নি।’
‘তাহলে তুমি জানলে কী করে?’
‘আমি স্বপ্ন দেখেছি।’
‘স্বপ্ন দেখেছি মানে?’
‘নীলু, মাঝে-মাঝে আমি স্বপ্ন দেখি। সেগুলো ঠিক স্বপ্নও নয়। তবে অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেগুলো সব সত্যি। গত রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, তুমি একটি চিঠি পেয়ে খুব খুশি। সেই চিঠিতে একটি লাইন লেখা আছে, যার মানে হচ্ছে-তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে বা এই রকম কিছু।’
‘এসব কি তুমি সত্যি-সত্যি বলছ রানু?’
‘হ্যাঁ। কবে তাঁর সঙ্গে তোমার দেখা হবে?’
‘আজ বিকেলে। আমি নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকানের সামনে একটা সবুজ রুমাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকব। তিনি আমাকে খুঁজে বের করবেন।’
‘বাহ, খুব মজার ব্যপার তো!’
রানু হাসতে লাগল। এক সময় হাসি থামিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘শুধু গল্প-উপন্যাসেই এসব হয়। বাস্তবে এই প্রথম দেখছি। তোমার ভয় করছে না?’
‘ভয় করবে কেন?’
‘তোমার কিন্তু নীলু ভয় করছে। আমি বুঝতে পারছি। বেশ ভয় করছে। করছে না?’
‘নাহ।
রানু ইতস্তত করে বলল, ‘ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পার। আমি দূরে থাকব।’
‘থাক, দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না।’
মনে হলো নীলু রানুর কথাবার্ত সহজভাবে মেনে নিতে পারছে না। তার চোখ-মুখ গম্ভীর। রানু বলল, ‘কি, নেবে?’
‘না। আমার একা যাবার কথা, একাই যাব।’
‘আর যদি গিয়ে দেখ, খুব বাজে ধরণের একটা লোক। তখন কী করবে?’
‘বাজে ধরণের লোক মানে?’
‘অথ্যাৎ যদি গিয়ে দেখ দাঁত পড়া, চুল পাকা এক বুড়ো?’
‘তোমার কি সে রকম মনে হচ্ছে?’
রানু মাথা দুলিয়ে হাসল, কিছু বলল না। নীলুকে দেখে মনে হলো রানুর ব্যবহারে সে বেশ বিরক্ত হচ্ছে। দুটো বাজতেই সে বলল, ‘এবার তুমি যাও, আমি সাজগোজ করব।’
‘এখনই? চারটা বাজতে তো দেরি আছে।’
‘তোমার মতো সুন্দরী তো আমি না। আমাকে সময় নিয়ে সাজতে হবে।’
রানু উঠে পড়ল। নীলু সত্যি সাজতে বসল। কিন্তু কী যে হয়েছে তার, চোখে পানি এসে কাজল ধুয়ে যাচ্ছে। আইল্যাশ পরার ইচ্ছা ছিল, একা-একা পরা সম্ভব নয়। অনেক বেছেটেছে শাড়ি পছন্দ করল। সাদার উপর নীলের একটা প্রিন্ট। আগে সে কখনো পরে নি।
‘নীলু মা, কোথাও যাচ্ছ নাকি?’
নীলু তাকিয়ে দেখল-বাবা।
‘কোথায় যাচ্ছ গো মা?’
‘এক জন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। তোমার কি চা লাগবে?’
‘হলে ভালো হত। থাক, তুই ব্যস্ত।’
‘চা বানাতে আর কয় মিনিট লাগবে! তুমি বস, আমি বানিয়ে আনছি।’
নীলুর বাবা চেয়ার টেনে নীলুর ঘরেই বসলেন।
‘চা কি চিনি ছাড়া আনব বাবা?’
‘না, এক চামচ চিনি দিস। একটু-আধটু চিনি খেলে কিছু হবে না।’
নীলু চা নিয়ে এসে দেখে বাবা ঝিমুচ্ছেন। ঝিমুনিরও বেশি, প্রায় ঘুমাচ্ছেন বলা চলে। বাবা যেন বড় বেশি দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন। বড় মায়া লাগল নীলুর।
‘বাবা, তোমার চা।’
‘কোন বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছিস মা?’
নীলু খানিক ইতস্তত করে বলল, ‘তোমাকে আমি পরে বলব বাবা।’
‘সন্ধ্যার আগেই আসবি তো?’
‘হ্যাঁ, বাবা।’
‘গাড়ি নিয়ে যাবি?’
‘না, গাড়ি নেব না।’
‘নিয়ে যা না। ড্রাইভার তো দিন-রাত বসে-বসেই মায়না খায়।’
‘বাবা, আমি গাড়ি নেব না।’
নীলুর সাজ শেষ হলো সাড়ে তিনটায়। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে তার পছন্দই হলো। যে মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে, সে বেশ রুপসী। তার মায়া-কাড়া দুটি চমৎকার চোখ আছে। কিশোরীদের মতো ছোট ছোট চিবুক। ভালোই তো! এ রকম একটি মেয়েকে পুরুষরা কি ভালোবাসে না? নাকের কাছে মুক্তোর মতো কিছু ঘামের বিন্দু। নীলু তার সবুজ রুমাল দিয়ে সাবধানে ঘাম মুছে ফেলল। তারপর উঠে এল তিনতলায়।
‘রানু, রানু।’
রানু যেন তৈরি হয়েইছিল। সে বেরিয়ে এল সঙ্গে-সঙ্গে।
‘তুমি যাবে বলেছিলে আমার সঙ্গে। চল।’
‘চল।’
রানু তালা লাগাল। নীলু মৃদু স্বরে বলল, ‘তুমি জানতে আমি আসব?’
‘হ্যাঁ, জানতাম।’
সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করল। কারো দেখা পাওয়া গেল না। এক সময় নীলু বলল, ‘এখন চলে যেতে চাও রানু?’
‘আরো খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। তোমার এখনো যেতে ইচ্ছা করছে না।’
‘এক জায়গায় দাঁড়িয়ে না থেকে চল হাঁটি।’
তারা বেশ কয়েক বার নিউ মার্কেট চক্কর দিয়ে ফেলল। কেউ এগিয়ে এসে বলল না, ‘তোমাদের মধ্যে নীলু কে?’
‘রানু, তোমার কি হাঁটতে টায়ার্ড লাগছে?’
‘না।’
‘রানু, তুমি তো অনেক কিছু বুঝতে পার, তাই না?’
‘মাঝে-মাঝে পারি।’
‘লোকটি এসেছে কি না বুঝতে পারছ না?’
‘না নীলু, পারছি না। আমি সব সময় পারি না।’
রানু লক্ষ্য করল, নীলুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে তার সবুজ রুমাল দিয়ে চোখ চেপে ধরল। রানু গাঢ় স্বরে বলল, ‘কাঁদে না নীলু।’
‘কান্না এলে কী করব?’
‘মনটা শক্ত কর ভাই। পৃথিবীটা খুব ভালো জায়গা নয়।’
লোকজন তাকাচ্ছে ওদের দিকে। রানু নীলুর হাত ধরে বাইরে নিয়ে এল। বেশ অস্বস্তিকর অবস্থা।
তার প্রায় চার দিন পর নীলু একটি চিঠি পেল।
প্রিয় নীলু,
ঐদিন তোমাকে দেখলাম। তুমি তো ভারি মিথ্যুক! কেন বললে তুমি দেখতে
সুন্দর নও? তোমাকে বর্ষার জলভারে নত আকাশের মতো লাগছিল। আমি ছুটে
যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার বান্ধবিকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছি। কথা ছিল
একা আসবে। তাই নয় কি?
শুধু আমরা দুই জন থাকব। আমাকে দেখে যদি তোমার কথা বলতে ইচ্ছে
করে, তাহলে কোনো একটি রেস্টুরেন্টে বসে দুই জনে চা খেতে-খেতে গল্প করব।
আর যদি তোমার আমাকে পছন্দ না-হয়, তাহলে তুমি তোমার সবুজ রুমালটি
তোমার হ্যান্ডব্যাগে লুকিয়ে ফেলবে।
তোমাকে কিছুই বলতে হবে না। আমি মন-খারাপ করব ঠিকই, কিন্তু বিদায়
নেব হাসিমুখে, এবং আর কোনো দিনই তুমি আমাকে দেখবে না। তবে নীলু,
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আমাকে তুমি অপছন্দ করবে না। এ রকম মনে
করার কোনোই কারণ নেই, তবু মনে হচ্ছে। খুব সম্ভব উইশফুল থিংকিং। না মেয়ে?
নীলু চিঠিটি সমস্ত দিনে প্রায় একশ’ বার পড়ল এবং প্রতি বারই তার কাছে নতুন মনে হলো। রাতে সে অদ্ভুদ সুন্দর একটি স্বপ্ন দেখল-যেন পুরোনো আমলের একটি পালতোলা জাহাজে সে বসে আছে। জাহাজের পালটি গাঢ় সবুজ রঙের। প্রচন্ড বাতাস দিচ্ছে। বাতাসে জাহাজ ছুটে চলেছে বিদ্যুৎগতিতে। নীলুর একটু ভয়ভয় লাগছে, কারণ জাহাজে আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। নীলু এক সময় বলল, ‘আমার ভয় লাগছে জাহাজে। আর কেউ কি আছে?’ সঙ্গে-সঙ্গে একটি ভারি পুরুষালি গলা শোনা গেল, ‘ভয় নেই নীলু। আমি আছি।’ স্বপ্ন এত সুন্দর হয়!
নীলুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাকি রাত সে আর ঘুমোতে পারল না। বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। বিলু জেগে উঠে বলল, ‘কী হয়েছে রে আপা?’
‘নীলু ভেজা গলায় বলল, ‘পেট ব্যথা করছে। এখন একটু কম। তুই ঘুমো।’
১০
অনুফার কাছ থেকে নতুন কিছু জানা গেল না। সেও খুব জোর দিয়ে বলল, রানুর পরনে পায়জামা ছিল এবং মৃত লোকটির পরনেও কাপড় ছিল।
‘আপনি লোকটিকে দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি করে বলছেন কেন? মুরুব্বি মানুষ আপনি। আমি আপনার মেয়ের বয়েসী।’
‘লোকটিকে কেমন দেখলে বল তো!’
‘চাচা, আমার কিছু মনে নেই। সেই সময় আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম। পরদিন আমার বিয়ে।’
‘হ্যাঁ, তা আমি জানি। লোকটিকে নদীর পাড়ে পুঁতে রাখা হয়, তাই না?’
‘জ্বি। তারপর অনেক দিন কেউ ওদিকে যেত না। সবাই বলাবলি করত, রাতে কী জানি দেখতে পায়।’
‘কী দেখতে পায়?’
‘ছায়া-ছায়া কী নাকি দেখে। তবে এইসব সত্যি না চাচা। সব মনগড়া।’
‘তাই নাকি?’
‘জ্বি। ভূতপ্রেত বলতে কিছু নেই।’
মিসির আলি বড়ই অবাক হলেন। গ্রামের কোনো মেয়ে এই চিন্তা করে না। এতটা মুক্তচিন্তা তাদের থাকার কথা নয়। মিসির আলি বললেন, ‘তুমি পড়াশোনা কত দূর করেছ?’
‘চাচা, আই.এ. পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়েছে। তারপর আর পড়াশোনা হয় নি। গ্রামে বিয়ে হয়েছে তো! পড়াশোনা করার আমার খুব শখ ছিল।’
‘মানুষের সব শখ মেটা উচিত নয়। একটা ডিসস্যাটিসফেকশন থাকা দরকার।’
‘কেন?’
‘তাহলে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। সব শখ মিটে গেলে বেঁচে থাকার প্রেরণা নষ্ট হয়ে যায়। যে সব মানুষের শখ মিটে গেছে, তারা খুব অসুখী মানুষ।’
অনুফা চুপ করে রইল। মিসির আলি মৃদু স্বরে বললেন, ‘এবার রানুর কথা বল।’
‘কী কথা জানতে চান?’
‘সব কথা।’
‘ও খুব অদ্ভুদ মেয়ে। ও মানুষের ভবিষ্যত বলতে পারে।’
‘কীভাবে বলে?’
‘তা জানি না, তবে বলতে পারে। একবার কী হয়েছে, শোনেন। আমি আর ও গল্প করছি, সে হঠাৎ গল্প থামিয়ে বলল-কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বাড়িতে শ্রীপুরের খালারা বেড়াতে আসবেন। আর সত্যি-সত্যি তাঁরা এলেন।’
‘এটা তো এমনিতেও হতে পারে। মানুষ বেড়াতে আসে না?’
‘তা আস্ে কিন্তু শ্রীপুরের খালা পাঁচ বছর পর প্রথম এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আমাদের কী-একটা ঝগড়া চলছিল।’
‘ও, তাই নাকি?’
‘জ্বি। আরেক গল্প বলি শোনেন, তখন আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে রানুদের ওখানে বেড়াতে গিয়েছি-না, এটা আপনাকে বলা যাবে না।’
‘বলা যাবে না কেন?’
‘গল্পটা ভালো না।’
‘থাক, তাহলে অন্য গল্প বল।’
অনুফার স্বামীকেও মিসির আলি সাহেবের বেশ লাগল। গোঁয়ারগোবিন্দ ধরনের লোক। স্ত্রীর খুবই অনুগত। সে মিসির আলিকে নিয়ে প্রচুর ঘুরল। লোকটির যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তিও দেখা গেল। মধুপুর থানার ওসি সাহেব ওর কথাতেই পুরোনো ফাইলপত্র ঘেঁটে দেখলেন যে, একটি মরা লাশ পাওয়ার খবরে এফআইআর করা হয়েছিল। তখন ওসি ছিলেন ব্রজগোপাল হালদার, তাঁর নোটে লেখা-
একটি কলেরায় মৃত মানুষের লাশ (৩০/৩৫) মধুপুরের নিমশাসা গ্রামে পাওয়া যায়। লাশটির পচন ধরিয়া গিয়াছিল। প্রথামিক পরীক্ষার পর আমি লাশটির পুঁতিয়া ফেলিবার নির্দেশ দেই। লাশটির কোনো পরিচয় জানা যায় নাই।
মিসির আলি বললেন, ‘কলেরায় মৃত, এটা বোঝা গেল কী করে?’ ওসি সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সেটা আমি কী করে বলব? রিপোর্ট তো আমার লেখা না। ব্রজগোপাল বাবুকে জিজ্ঞেস করেন। তিনি জানবেন।’
তাঁকে কোথায় পাওয়া যাবে?’
‘পুলিশ ডাইরেক্টরেটে খোঁজ করেন। তবে এই সব খোঁজাখুঁজির কোনো অর্থ নেই। দশ বৎসর আগের ঘটনা মনে করে বসে আছেন নাকি? পুলিশকে আপনারা কী মনে করেন বলেন তো?’
‘ঘটনাটি অস্বাভাবিক। সে জন্যই হয়তো তাঁর মনে থাকবে।’ ‘একটা ডেড বডি পাওয়া গেছে পানিতে, এর মধ্যে আপনি অস্বাভাবিক কী দেখলেন? বাংলাদেশে প্রতি দিন কয়টা ডেড বডি পাওয়া যায় জানেন?’
‘জ্বি-না, জানি না।’
‘পুলিশের লাইনে ডেড বডি পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা, বুঝলেন?’
মিসির আলি মধুপুরে আরো একদিন থাকলেন। দেখে এলেন, যে জায়গায় লোকটিকে পোঁতা হয়েছিল সেই জায়গা। দেখার মতো কিছু নয়। ঘন কাঁটাবন হয়েছে, যার মনে হচ্ছে এই জায়গাটিকে বেশ কিছু দিন লোকজন ভয়ের চোখে দেখেছেন। হাঁটাচলা বন্ধ করে দিয়েছে নিশ্চয়ই।
মিসির আলি অনেকের সঙ্গেই কথা বললেন-যদি নতুন কিছু পাওয়া যায়। নতুন কোনো তথ্য, যা কাজে লাগবে, কিন্তু কিছুই জানা গেল না। দশ বৎসর দীর্ঘ সময়। এই সময়ে মানুষ অনেক কিছু ভুলে যায়।
মধুপুর থেকে তিনি গেলেন রানুদের আদি বাড়িতে। সেখানে যাবার তাঁর একটি উদ্দেশ্য, খুঁজে দেখা-জালালউদ্দিন নামে কাউকে পাওয়া যায় কি না। এই লোকটিকে পাওয়া খুবই প্রয়োজন।
আনিস লক্ষ্য করল, রানু ইদানীং বেশ অস্বাভাবিক। এর প্রধান কারণ বোধহয় বাড়িঅলার দুটি মেয়ে। ওদের সঙ্গে সে বেশ মিলেমিশে আছে। গল্পের বই আনছে। ভালোমন্দ কিছু রান্না হলেই আগ্রহ করে নিচে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়িঅলাদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা আনিসের পছন্দ নয়। বাড়িঅলাদের সে সব সময় শত্রুপক্ষ মনে করে। কয়েক বার ভেবেছিল বলবে মেলামেশাটা কমাতে। না বলে ভালোই হয়েছে, এত যদি অসুখটা চাপা পড়ে তো ভালোই।
কাজের একটি ছেলে পাওয়া গেছে-জিতু মিয়া। এই ছেলেটিও রানুকে বেশ ব্যস্ত রাখছে। ছেলেটির বয়স দশ-এগার, তবে মহাবোকা। কোনো কাজই করতে পারে না। করার আগ্রহও নেই। রানু ক্রমাগত বকঝকা করেও কিছু করাতে পারে না। তবে তার সময় বেশ কেটে যায়।
সন্ধ্যাবেলা সে আবার জিতু মিয়াকে নিয়ে পড়াতে বসে। জিতু ঘুমঘুম চোখে পড়ে ‘স্বরে অ স্বরে আ’। এই পড়াটি গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে। জিতু মিয়া কিছুই মনে রাখতে পারছে না, কিন্তু তাতে রানুর উৎসাহে ভাটা পড়েছে না।
আনিস মিয়া একদিন ঠাট্টা করে বলেছে, ‘তুমি দেখি একে বিদ্যাসাগর বানিয়ে ফেলছ!’ রানু তাতে বেশ রাগ করেছে। গম্ভীর হয়ে বলেছে, ‘ঠাট্টা করছ কেন? বিদ্যাসাগর তো একদিন হতেও পারে।’
অবশ্য অদূর-ভবিষ্যতে তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ভবিষৎ-বিদ্যাসাগর রোজ রাতেই পড়তে-পড়তে ঘুমিয়ে পড়ছে এবং রানু প্লেটে খাবার বেড়ে প্রতি রাতেই প্রাণাস্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। এতটা বাড়াবাড়ি আনিসের ভালো লাগে না, কিন্তু সে কিছুই বলে না। থাকুক একটা কিছু নিয়ে ব্যস্ত।
এর মধ্যে একদিন আনিস গিয়েছিল মিসির আলি সাহেবের কাছে। ভদ্রলোক বেশ কিছু দিন ঢাকায় ছিলেন না। সবে ফিরেছেন। তাঁর চোখ হলুদ, গা হলুদ।
আনিস অবাক হয়ে বলেছে, ‘হয়েছে কী আপনার?’
‘জন্ডিস। জন্ডিস বাধিয়ে বসেছি।’
‘বলেন কী!’
‘ইনফেকটাস হেপাটাইটিস। লিভারের অবস্থা কাহিল রে ভাই! আপনার স্ত্রী কেমন আছেন?’
‘ভালো।’
‘আর ভয়টয় পাচ্ছেন না?’
‘জ্বি-না।’
‘খুব ভালো খবর। আমি একটু সুস্থ হলেই যাব আপনার বাসায়।’
‘জ্বি আচ্ছা।’
‘আমি কিছু খোঁজখবর পেয়েছি। মনে হয় আপনার স্ত্রীর সমস্যাটি ধরতে পেরেছি।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ, একটু ভালো হলেই এনিয়ে কথা বলব।’
রানু মিসির আলি সাহেবের জন্ডিসের খবরে খুবই মন-খারাপ করল।
‘আহা, বেচারা একা-একা কষ্ট করছে।চল এক দিন দেখে আসি। যাবে?’
‘ীঠক আছে, যাব একদিন।’
‘কবে যাবে? কাল যাব?’
‘এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? জন্ডিস যখন হয়েছে, তখন বেশ কিছু দিন থাকবে। এক দিন দেখে এলেই হবে।’
‘আমি এই অসুখরে ভালো অষুধ জানি। অড়হড়ের পাতার রস। সকালবেলা এক গ্লাস করে খেলে তিন দিনে অসুখ সেরে যাবে।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। আমার দাদা এই অষুধটা দিতেন। তুমি কিছু অড়হড়ের পাতা ঐ লোকটিকে দিয়ে এস না।’
‘ঢাকা শহরে আমি অড়হড়ের পাতা কোথায় পাব? কী যে বল!’
‘খুঁজলেই পাবে। জংলা গাছ সব জায়গায় হয়।’
আনিস যথেষ্ট বিরক্ত হলো। রানুর এই একটা প্রবলেম-কোনো-একটা জিনিস মাথায় ঢুকলে ওটা নিয়েই থাকবে। আনিস বলল, ‘আচ্ছা, দেখি।’
‘দেখাদেখি না,তুমি খুঁজবে । আর শোন, কাল তো তোমার অফিস নেই, চল ওনাকে দেখে আসি।’
‘এত ব্যস্ত কেন? ভদ্রলোক তো আর পালিয়ে যাচ্ছেন না।’
রানু থেমে- থেমে বলল, ‘আমি অন্য একটা কারণে যেতে চাই।’
‘কি কারণ?’
‘ভদ্রলোক আমার সম্পর্কে খোঁজখবর করার জন্যে মধুপুর গিয়েছিলেন,কী খোঁজ পেলেন জানতে ইচ্ছা করছে।’
‘মধুপুরের খবর পেলে কীভাবে? স্বপ্নে?’
‘না, স্বপ্নটপ্ন না। অনূফা চিঠি দিয়েছে।’
‘কবে চিঠি পেয়েছ?’
‘গতকাল।’
আনিস চুপ করে গেল। রানু তার নিজের চিঠিপত্রের কথা আনিসকে কখনো বলে না। বিয়ের পর রানু তার আত্মীয়স্বজনের যত চিঠিপত্র পেয়েছে তার কোনোটি সে আনিসকে পড়তে দেয় নি। এ নিয়ে আনিসের গোপন ক্ষোভ আছে।
‘কি আমাকে নিয়ে যাবে?’
‘আমি আগে গিয়ে দেখে ভদ্রলোকের অবস্থা কেমন।’
মিসির আলিকে পাওয়া গেল না। বাড়িতে তাঁর এক ছোট ভাই ছিল, সে বলল, ‘ভাইয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অবস্থা বেশি ভালো না। বিলরুবিন নাইন পয়েন্ট ফাইভ। লিভার খুবই ড্যামেজ্ডৃ।
১১
মিসির আলি হাসপাতালে এসেছেন একগাদা বই নিয়ে। তাঁর ধারণা ছিল বই পড়ে সময়টা খুব খারাপ কাটবে না, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সে রকম হয়নি। ডাক্তাররা বই পড়তে নিষেধ করেন নি, কিন্তু দেখা গেল বই পড়া যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই মাথার ভেতর ভোঁতা এক ধরনের যন্ত্রণা হয়। যন্ত্রণা নিয়ে এই বই পড়ে ফেললেন এবং মৃত্যু ব্যাপারটিতে যথেষ্ট উৎসাহ বোধ করতে লাগলেন। তাঁর স্বভাবই হচ্ছে কোনো বিষয় একবার মনে ধরে গেলে সে বিষয়ে সম্পর্কে চূড়ান্ত পড়াশোনা করতে চেষ্টা করেন।
মৃত্যু সাবজেক্টটি তাঁর পছন্দ হয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে পারছেন না। বইপত্র নেই। ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে কিছু থাকার কথা, কিন্তু আনাবেন কাকে দিয়ে? তাঁকে কেউ দেখতে আসছে না। তিনি এমন কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তি নন যে তাঁর অসুস্থতার খবরে মানুষের ঢল নামবে। তা ছাড়া অসুখের খবর তিনি কাউকে জানান নি। হাসপাতালে ভর্তি হবার ইচ্ছাও ছিল না, কিন্তু ঘরে দেখাশোনার লোক নেই। কাজের মেয়েটি তিনি মধুপুর থাকাকালীন বেশ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে ভেগে গেছে। এমন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়া উপায় কী?
বিকালবেলা তাঁর কাছে কেউ আসে না। সবারই আত্মীয়স্বজন আসে দেখতে, তাঁর কাছে কেউ আসে না। এই সময়টা তিনি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকেন এবং এখনো মানুষের সঙ্গ পাবার জন্যে তাঁর মন কাঁদে দেখে নিজের কাছেই লজ্জিত বোধ করেন।
আজ সারা দিন মিসির আলির খুব খারাপ কেটেছে। তাঁর রুমমেট ছাব্বিশ বছরের ছেলেটি সকাল ন’টায় বিনা নোটিসে মারা গেছে। মৃত্যু যে এত দ্রুত মানুষকে ছুঁয়ে দিতে পারে তা তার ধারণাতেও ছিল না। ছেলেটা ভোরবেলায় নাস্তা চেয়েছে, তার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথাবার্তাও বলেছে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘আজ কেমন আছ?’
‘আজ বেশ ভালো।’
‘লিভার ব্যাথা করছে না?’
‘নাহ্,তবে তলপেটের দিকে একটা চাপা ব্যাথা আছে।’
‘এটা একটা সায়েন্স ফিকশন-“ফ্রাইভে দি খার্টিস’”। বেশ ভালো বই। তুমি পড়বে?’
‘জ্বি-না। ইংরেজি বই আমার ভালো লাগে না। বাংলা উপন্যাস পড়ি।’
‘কার লেখা ভালো লাগে? এ দেশের-মানে বাংলায়, কার লেখা তোমার পছন্দ?’
‘নিমাই ভট্টাচার্য।’
‘তা নাকি?’
ছেলেটি আর জবাব না দিয়ে কাৎরাতে থাকে। সকাল সাড়ে আটটায় বলল,‘এক জন ডাক্তার পাওয়া যায় কি না দেখবেন?’ তিনি অনেকক্ষণ বোতাম টিপলেন,কেউ এল না। শেষ পর্যন্ত নিজেই গেলেন ডিউটি রুমে। ফিরে এসে দেখেন ছেলেটি মরে পড়ে আছে।
মৃত্যুর সময় পাশে কেউ থাকবে না, এর চেয়ে ভয়াবহ আর কিছু নেই। শেষ বিদায় নেবার সময় কোনো-একজন মানুষকে বলে যাওয়া দরকার। নিঃসঙ্গ ঘর থেকে একা-একা চলে যাওয়া যায় না। যাওয়া উচিত নয়। এটা হৃদয়হীন ব্যাপার।
এত দিন যে ছেলেটি ছিল, এখন আর সে নেই। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তার সমস্ত চিহ্ন এ ঘর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিছানায় নতুন বালিশ ও চাদর দিয়ে গেছে-হয়তো সন্ধ্যার মধ্যে কোনো নতুন পেশেন্ট এসে পড়বে।
মিসির আলি সমস্ত দিন কিছু খেতে পারলেন না। বিকেলের দিকে তাঁর গায়ে বেশ টেম্পারেচার হলো। প্রথম বারের মতো মনে হলো একজন-কেউ তাঁকে দেখতে এলে খারাপ লাগবে না। ভালোই লাগবে। কেউ না এলে এক জন রোগী হলেও আসুক, একা-একা এই কেবিনে রাত কাটানো যাবে না। ঠিক এই সময় ইতস্তত ভঙ্গিতে রানু এসে ঢুকল।
‘আপনি ভালো আছেন?’
‘না, ভালো না। তুমি কোথেকে?’
‘বাসা থেকে।ইস্! আপনার এ কী অবস্থা!’
‘অবস্থা খারাপ ঠিকই।আনিস সাহেব কোথায়?’
‘ও আসে নি, আমি একাই এলাম। ওর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়েছি।’
‘বস তুমি। ঐ চেয়ারটায় বস। ফ্লাস্কে চা আছে। খেতে চাইলে খেতে পার।’
‘উঁহু, চা-টা খাব না। আপনার কাছে একটা খবর জানতে এসেছি।’
‘কোন খবরটি?’
‘মধুপুরে গিয়ে আপনি কী জানলেন?’
‘তেমন কিছু জানতে পারি নি।’
‘তবু যা জেনেছেন তা-ই বলুন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে। অনুফা লিখেছে, আপনি নাকি হাজার-হাজার মানুষকে নানা রকম প্রশ্ন করেছেন।’
মিসির আলি হাসলেন।
‘হাসলে হবে না, আমাকে বলতে হবে।’
‘প্রথম যে জিনিসটি জানলাম-সেটি হচ্ছে, তুমি অনেকগুলো ভুল তথ্য দিয়েছ।’
‘ আমি কোনো তথ্য দিই নি।’
‘তুমি নিজে হয়তো জান না সেগুলো ভুল। যেমন পায়জামা খোলার ব্যাপারটি-এ রকম কোনো কিছু ঘটে নি।
রানু চোখ লাল করে বলল, ‘ঘটেছে।’
‘না রানু। এইসব তুমি নিজে ভেবেছ এবং আমার ধারণা এ জাতীয় স্বপ্ন তুমি মাঝে-মাঝে দেখ। দেখ না?’
‘কী রকম স্বপ্নের কথা বলেছেন?’
মিসির আলি কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করলেন। স্পষ্ট গলায় বললেন, ‘তুমি প্রায়ই স্বপ্ন দেখ না- এক জন নগ্ন মানুষ তোমার কাপড় খোলার চেষ্টা করছে?’
রানু উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে থাকল।
‘বল রানু। জবাব দাও।’
‘হ্যাঁ, দেখি।’
‘কখনো কি ভেবে দেখেছ এ স্বপ্ন কেন দেখ?’
‘না, ভাবি নি।’
‘আমি ভেবিছি এবং কারণটাও খুঁজে বের করেছি। আজ সেটা বলতে চাই না, অন্য একদিন বলব।’
‘না, আপনি আমাকে আজই বলেন।’
‘মিসির আলি ফ্লাস্ক থেকে চা ঢাললেন। শান্ত স্বরে বললেন, ‘চা খেতে-খেতে শোন। চায়ে ক্যাফিন আছে। ক্যাফিন তোমার নার্ভগুলোকে অ্যাকটিভ রাখবে।’
রানু চায়ের পেয়ালা নিল, কিন্তু চুমুক দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। মিসির আলি ঠান্ডা গলায় বলতে লাগলেন, ‘রানু, তোমাকে নিয়ে এই গল্পটি আমি তৈরি করেছি। তুমি মন দিয়ে শোন। তুমি যখন বেশ ছোট-নয়, দশ বা এগার বছর বয়স, তখন এক জন বয়স্ক লোক তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নির্জন কোনো জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। তোমাদের গ্রামে এরকম একটা নির্জন জায়গায় খোঁজে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে জঙ্গলের কাছে একটা ভাঙ্গা বিষ্ণুমন্দির দেখেছি। মনে হয় ঐ জায়গাটাই হবে। কারণ সাপের ভয়ে ওখানে কেউ যেত না। রানু, তুমি কি আমার কথা শুনেছ?’
‘শুনছি।’
‘তারপর সেই বয়স্ক মানুষটি মন্দিরে তোমাকে নিয়ে গেল।’
‘আমাকে কেউ নিয়ে যায় নি। আমি নিজেই গিয়েছিলাম। ঐ মন্দিরে খুব সুন্দর একটি দেবীমূর্তি আছে। আমি ঐ মূর্তি দেখার জন্যে যেতাম।’
‘তারপর কী হয়েছ, বল।’
রানু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তীব্র স্বরে বলল, ‘আমি বলব না, আপনি বলুন।’
মিসির আলি শান্ত স্বরে বললেন,‘ঐ লোকটি তখন টেনে তোমার পায়জামা খুলে ফেলল।’
রানুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
‘ঐ লোকটির নাম ছিল জালালউদ্দিন।’
রানু কিছু বলল না। মিসির আলি বললেন, ‘তোমার অসুখ শুরু হলো সেদিন থেকে। তোমার মনের মধ্যে ব্যাপারটি গেঁথে গেল, পরবর্তী সময়ে গোসলের সময় যখন মরা মানুষটি তোমার পায়ে লেগে গেল, তখন তোমার মনে পড়ল মন্দিরের দৃশ্য। বুঝতে পারছ?’
রানু জবাব দিল না।
‘অসুখের মূল কারণটি আলোয় নিয়ে এলেই অসুখ সেরে যায়; এ জন্যেই আমি এটা তোমাকে বললাম। তুমি নিজেও এখন গোড়া থেকে সমস্ত ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা করবে। তোমার অসুখ সেরে যাবে।’
রানু মৃদু স্বরে বলল, ‘আপনি কি ঐ লোকটির সঙ্গে কথা বলেছেন?’
‘বলেছি।’
‘ও কী বলেছে?’
‘তেমন কিছু বলে নি।’
‘না, বলেছে, আপনি আমাকে বলতে চাচ্ছেন না। একটা যখন বলেছেন, তখন বাকিটাও বলুন।’
রানু তীব্র চোখে তাকাল। মিসির আলি বললেন, ‘দেখ রানু, আমি খুবই যুক্তিবাদী মানুষ। অলৌকিক কোনো কিছুতে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি সব কিছুরই একটি ব্যাখা আছে। জালালউদ্দিন যা বলেছে, তাও নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করা যায়।’
‘আপনি জালালউদ্দিনের কথা বিশ্বাস করেন না?’
‘না ওর মনে পাপবোধ ছিল। মন্দিরটন্দির নিয়ে মূর্খ মানুষদের মনে অনেক রকম ভয়-ভীতি আছে। তা থেকেই সে একটা হেলুসিনেশন দেখেছে। তুমি নিজে তো কিছু দেখ নি।’
‘না।’
‘তাহলেই হলো। জালালউদ্দিন কী দেখেছে না-দেখেছে, সেটা তার প্রবলেম, তোমার নয়।’
রানু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘কিন্তু একটা জিনিস কি জানেন? ঐ ঘটনার পর থেকে আমি অসম্ভব সুন্দর হয়ে গেলাম।’
মিসির আলি শব্দ করে হাসলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘সুন্দর তুমি সব সময়ই ছিলে। ঘটানাটি ঘটেছে তোমার বয়ঃসন্ধিতে। বয়ঃসন্ধির পর মেয়েদের রূপ খুলতে শুরু করে। এখানেও তাই হয়েছে।’
‘কিন্তু ঐ দেবীমূর্তিটিকে এর পর আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।’
‘তুমি কিন্তু খুব ছেলেমানুষের মতো কথা বলছ রানু। মূর্তিটি চুরি গেছে, কেউ নিয়ে পালিয়ে গেছে, ব্যস।,
‘মূর্তিটি চুরি যায় নি।’
‘তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস কর না-একটা পাথরের মূর্তি তোমার মধ্যে ঢুকে আছে? কি, কর?’
রানু তীব্র কণ্ঠে বলল, ‘আমার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলুন, আমাকে কি অনেকটা মূর্তির মতো দেখায় না?’
‘না রানু, মূর্তির মতো দেখাবে কেন? অসম্ভব রূপবর্তী একটি তরুণী-এর বেশি কিছু না। তোমার মতো রূপবর্তী মেয়ে এ দেশেই আছে এবং তারা সবাই রক্ত-মাংসের মানুষ।’
‘রানু উঠে দাঁড়াল। মিসির আলি বললেন, ‘চলে যাচ্ছ রানু?’
‘হ্যাঁ।’
‘অসুখ সারলে তোমাদের ওখানে একবার যাব।’
‘না, আপনি আসবেন না। আপনার আসার কোনো দরকার নেই।’
রানু ঘর ছেড়ে চলে গেল। মিসির আলি ক্ষীণস্বরে বললেন, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং।’ তাঁর ভ্রূ কুঞ্চিত হলো।তিনি ব্যাপরটি ঠিক বুঝতে পারছেন না। যতটা সহজ মনে হয়েছিল এখন ততটা মনে হচ্ছে না। তিনি মৃত্যু-বিষয়ক বইটি আবার পড়তে শুরু করলেন। সাবজেক্টটি তাঁকে বেশ আকর্ষণ করেছে। ফ্যাসিনেটিং টপিক।
১২
গভীর রাতে আনিস জেগে উঠল। শুনশান নীরবতা চারদিকে। রানু হাত-পা ছড়িয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো ঘুমোচ্ছে। জানলার আলো এসে পড়েছে তার মুখে। অদ্ভুদ সুন্দর একটি মুখ। শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। আনিস ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল। বাথরুমে যেতে হবে।
বাথরুমে পানি জমে আছে। পাইপ জ্যাম হয়ে গেছে। বাড়িঅলাকে বলতে হবে। আনিস নোংরা পানি বাঁচিয়ে সাবধানে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই শুনল ঝুমঝুম করে শব্দ হচ্ছে। নতুন বাজছে যেন। এর মানে কী? মানের ভুল কি? মনের ভুল হবার কথা নয়। বেশ বোঝা যাচ্ছে নূপুর পায়ে দিয়ে ঝমঝম করতে-করতে কেউ-একজন এঘর-ওঘর করছে। শব্দটা অনেকক্ষণ ধরইে হচ্ছে। মনের ভুল হবার কথা নয়।
বাথরুমের দরজা খুলতেই শব্দটা চট করে থেমে গেল। শুধু একটা তীব্র ফুলের গন্ধ আনিসকে অভিভুত করে ফেলল। একটু আগেও তো এ রকম সৌরভ ছিল না।আনিসের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। বিস্ময়ের ঘোর অবশ্যি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আনিসের মনে পড়ল একতলার বাগানে হাস্নাহেনার প্রকাণ্ড একটা ঝাড় আছে। বাতাসের ঝাপটায় ফুলের গন্ধই উড়ে এসেছে বারান্দায়। আনিস কিছুক্ষণ একা-একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল-নূপুরের শব্দ আবার যদি পাওয়া যায়।
দোতলায় একটা বাচ্চা ছেলে শুধু কাঁদছে। তার মা তাকে শান্ত করবার চেষ্টা করছে। একটা রিকশা গেল টুনটুন করে। ব্যস, আর কিছু শোনা গেল না।
শোবার ঘরে রানু ঘুমাচ্ছে। মড়ার মতো। জানালা খোলা। ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে ঘরে। আনিস জানালা বন্ধ করতে গিয়ে শুনল, রান্নাঘর থেকে জিতু মিয়া সাড়াশব্দ দিচ্ছে। কান্না চাপার আওয়াজ।
‘জিতু মিয়া।’
জিতু ফুঁপিয়ে উঠল। আনিস রান্নাঘরে ঢুকে বাতি জ্বালাল। জিতু মশারির ভেতর জুবথবু হয়ে বসে আছে।
‘জিতু, কি হয়েছে রে?’
‘কিছু হয় নাই।’
‘বসে আছিস কেন?’
‘ঘুম আহে না।’
‘স্বপ্ন দেখেছিস?‘
জিতু মাথা নাড়ল।
‘কী স্বপ্ন?’
‘এক জন মাইয়া মানুষ পাকের ঘরে হাঁটতে আছিল।’
‘এই দেখেছিস স্বপ্নে?’
‘স্বপ্নে দেখি নাই। নিজের চোখে দেখলাম।’
‘দূর ব্যাটা, অন্ধকারে তুই মানুষ দেখলি কীভাবে? যা, ঘুমো তুই।’
‘আচ্ছা।’
জিতু শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এল। আনিস একটি সিগারেট ধরাল। ঘুম চটে গেছে। তাকে এখন দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হবে। এক পেয়লা চা খেতে পারলে মন্দ হত না। রাত তো বাজে প্রায় সাড়ে তিনটা। বাকি রাতটা তার জেগেই কাটবে মনে হয়। সিগারেট টানতে ভালো লাগছে না। পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠছে।
ঘুমের মধ্যে রানু শব্দ করে হাসল। আনিস মৃদু স্বরে ডাকল, ‘এই রানু।’রানু খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, ‘কি?’
‘জেগে আছ নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী আশ্চার্য, কখন জাগলে?’
‘অনেকক্ষণ। তুমি বাথরুমে গেলে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলে।’
‘আমাকে ডাকলে কেন?’
আনিস সিগারেট টানতে লাগল। রানু বলল, ‘বড্ড গরম লাগছে। জানালা বন্ধ করলে কেন?’
‘গরম কোথায়? বেশ ঠাণ্ডা তো!’
‘আমার গরম লাগছে। ফ্যানটা ছাড় না।’
‘এই ঠাণ্ডার মধ্যে ফ্যান ছাড়ব কি, কী যে বল!’
রানু ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘তুমি যখন বাথরুমে ছিলে তখন কি নূপুরের শব্দ শুনেছ?’
আনিস ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘না তো কেন?’
‘না, এমনি। আমি শুয়ে-শুয়ে শুনছিলাম।’
‘ঘুমাও রানু।’
‘আমার ঘুম আসছে না।’
‘ঘুম না এলে উঠে বস, গল্প করি। চা খাওয়া যেতে পারে, কি বল?’
রানু উঠে বসল, কিন্তু জবাব দিল না। আনিস দেখল রানু কোন ফাঁকে গায়ের কাপড় খুলে ফেলেছে। ক্লান্ত স্বরে বলল, ‘বড্ড গরম লাগছে। তুমি আমার দিকে তাকিও না, প্লীজ।’
‘এইসব কী রানু? ঘরে একটা বাচ্চা ছেলে আছে।’
‘কী করব, বড্ড গরম লাগছে। তুমি বরং রান্নাঘরের বাতি নিভিয়ে সব অন্ধকার করে দাও।’
‘না, বাতি জ্বালানো থাক।’
‘আনিস দ্বিতীয় সিগারেট ধরাল। রানু বলল, ‘আমাদের গ্রামে একটা মন্দির আছে, তার গল্প এখন শুনব না।’
‘আহ্, মন্দির-ফন্দিরের গল্প এখন শুনব না।’
‘আহ্, শোন না। আমার বলতে ইচ্ছে করছে। আমি যখন খুব ছোট, তখন একা-একা যেতাম সেখানে।’
‘কি মন্দির? কালীমন্দির?’
‘নাহ্, বিষ্ণূমন্দির বলত ওরা।তবে কোনো বিষ্ণূমুর্তি ছিল না। একটি দেবী ছিল। হিন্দুরা বলত রুকমিনী দেবী।’
‘তুমি মন্দিরে যেতে কী জন্যে?’
‘এমনি যেতাম। ছোট বাচ্চা পুতুল খেলে না?’
‘কী করতে সেখানে?’
‘দেবীমূর্তির সাথে গল্পগুজব করতাম। ছেলেমানুষি খেলা আর কি!’
বলতে-বলতে রানু খিলখিল করে হেসে উঠল। আনিস স্পষ্ট শুনল সঙ্গে-সঙ্গে ঝমঝম করে কোথাও নুপুর বাজছে। রানু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘শুনতে পাচ্ছ?’
‘কী শুনব?’
‘নূপুরের শব্দ শুনছ না?’
আনিস দৃঢ় স্বরে বলল, ‘না। তুমি ঘুমাও রানু।’
‘আমার ঘুম আসছে না।’
‘শুয়ে থাক। তুমি অসুস্থ।’
‘রানু ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি অসুস্থ।’
‘তোমাকে খুব বড় ডাক্তার দেখাব আমি।’
‘আচ্ছা।’
‘এখন শুয়ে থাক।’
রানু মৃদু স্বরে বলল, ‘আমি ঐ দেবীকে গান গেয়ে শোনাতাম।’
‘ঐ সব অন্য দিন শুনব।’
‘আজ রাতে আমার বলতে ইচ্ছে করছে।’
আনিস এসে রানুর হাত ধরল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। আনিস অবাক হয়ে বলর, ‘তোমার গা তো পুড়ে যাচ্ছে!’
‘হুঁ, বড্ড গরম লাগছে। ফ্যানটা ছাড়বে?’
আনিস উঠে গিয়ে জানালা খুলে দিল। ঘর ভর্তি হয়ে গেল ফুলের গন্ধে। আর তখনি রানু অত্যন্ত নিচু গলায় গুনগুন করে কী যেন গাইতে লাগল। অদ্ভুত অপার্থিব কোনো-একটা সুর-যা এ জগতের কিছু নয়। অন্য কোনো ভূবনের। রান্নাঘর থেকে জিতু ডাকতে লাগল, ‘ও ভাইজান, ভাইজান।’
আনিস রানুকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে গায়ের চাদর টেনে দিল। জিতুকে বলল, এ ঘরে যেন না আসে। তারপর নেমে গেল নিচে, বাড়িঅলার মেয়েটিকে খবর দিয়ে নিয়ে আসতে।
নীলু এল সঙ্গে সঙ্গে। আনিস দেখল রানু শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে। জিতু মিয়া শুধু জেগে আছে। কাঁদছে ব্যাকুল হয়ে। নীলুর সঙ্গে তার বাবাও আসছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘হয়েছেটা কি?’ আনিস ভাঙ্গা গলায় বলল, ‘বুঝতে পারছি না, কেমন যেন করছে।’
‘কী করছে?‘
আনিস জবাব দিল না। নীলু বলল, ‘বাবা, তুমি শুয়ে থাক গিয়ে, আমি এখানে থাকি। রাত তো বেশি নেই।’ ভদ্রলোক কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নিচে নেমে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন,‘হাসপাতালে নিতে হলে বলবেন, ড্রাইভারকে ডেকে তুলব।’
‘জি আচ্ছা।’
রানু বাকি রাতটা ঘুমিয়ে কাটাল। একবারও জাগল না। নীলু সারাক্ষণ তার পাশে রইল। আনিসের সঙ্গে তার কথাবার্তা কিছু হলো না। আনিস বসার ঘরের সোফায় বসে ঝিমুতে লাগল।
১৩
মিসির আলি লোকটির ধের্য প্রায় সীমাহীন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি দ্বিতীয় দফায় রানুদের গ্রামে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁর সঙ্গে প্রত্নতও্ব বিভাগের এক ভদ্রলোক, জয়নাল সাহেব। উদ্দেশ্য রুকমিনী দেবীর মন্দির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।
জয়নাল সাহেব মন্দির দেখে বিশেষ উল্লসিত হলেন না। তিন শ’ বৎসরের বেশি এর বয়স হবে না। এরকম ভগ্নস্তূপ এ দেশে অসংখ্য আছে। মিসির আলি বললেন, ‘তেমন পুরোনো নয় বলেছেন?’
‘না রে ভাই। ইটের সাইজ দেখলেন বুঝবেন। ভেঙে-টেঙে কী অবস্থা হয়েছে দেখেন!’
‘যত্ন হয় নি। মন্দির যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি হয়তো মারা গেছেন কিংবা তাঁর উৎসাহ মিইয়ে গেছে।’
গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে অল্প কিছু তথ্য পাওয়া গেল-পালবাবুদের প্রতিষ্ঠিত মন্দির। পালরা স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তার পরপরই তাদের ভাগ্য-বিপর্যয় শুরু হয়। তিন-চার বছরের মধ্যে পালরা নির্বংশ হয়ে পড়ে। দেবীকে তুষ্ট করার জন্যে তখন এক রাতে কুমারীকন্যাকে অমাবস্যা রাত্রিতে মন্দিরের সামনে বলি দেয়া হয়। দেবীর তুষ্টি হয় না তাতেও। পাথরের মূর্তি এত সহজে বোধহয় তুষ্ট হয় না। তবে গ্রামের মানুষেরা নাকি বলি দেয়া মেয়েটিকে এর পর থেকে গ্রামময় ছুটোছুটি করতে দেখে। ময়মনসিংহ থেকে ইংরেজ পুলিশ সুপার এসে মন্দির তালাবন্ধ করে পালদের দুই ভাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান।
পালরা অত্যন্ত ক্ষমতাবান ছিল। কাজেই ছাড়া পেয়ে এক সময় আবার গ্রামে ফিরে আসে, কিন্তু মন্দির তালাবন্ধই পড়ে থাকে।
ইতিহাস এইটুকুই। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত মূর্তি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা গেল না। দুই-এক ঘর নিম্নবর্ণের হিন্দু যারা ছিল, তারা বিশেষ কিছু বলতে পারে না। হরিশ মণ্ডল বলল, ‘বাবু, আমার কেউ ঐ দিকে যাই না। ঐ মন্দিরে গেলে নির্বংশ হতে হয়, কে যাবে বলেন?’
‘আপনি তো শিক্ষক লোক, এইসব বিশ্বাস করেন?’
‘করি না, কিন্তু যাইও না।’
‘মূর্তিটা আপনি দেখেছেন?’
‘আমি দেখি নাই, তবে আমার জ্যাঠা দেখেছে।’
‘তিনি কি নির্বংশ হয়েছেন?’
‘না তাঁর তিন ছেলে। এক ছেলে নান্দিনা হাইস্কুলের হেড মাস্টার।’
‘মূর্তিটা কেমন ছিল বলতে পারেন?’
‘শ্বেত পাথরের মূর্তি। কৃষ্ণনগেরর কারিগরের তৈরি। একটা হাত ভাঙা ছিল।’
‘মূর্তিটা নাকি হঠাৎ উধাও হয়েছে?’
‘কেউ চুরিটুরি করে নিয়ে বিক্রি করে ফেলেছে। গ্রামে চোরের তো অভাব নাই। এ রকম একটা মূর্তিতে হাজার খানিক টাকা হেসেখেলে আসবে। সাহেবেরা নগদ দাম দিয়ে কিনবে।’
‘আচ্ছা, একটা বাচ্চা মেয়ে যে বলি দেয়া হয়েছিল, সে নাকি অমাবস্যার রাত্রে ঘুরে বেড়ায়?’
‘বলে তো সবাই। চিৎকার করে কাঁদে। আমি শুনি নাই। অনেকে শুনেছে।’
অমাবস্যার জন্যে মিসির আলিকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হলো। তিনি অমাবস্যার রাত্রে একটা পাঁচ-ব্যাটারির টর্চ আর একটা মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে মন্দিরের চাতালে বসে রইলেন। তিনি কিছুই শুনলেন না। শেয়ালের ডাক শোনা গেল অবশ্যি। শেষ রাত্রের দিকে প্রচণ্ড বাতাস বইতে লাগল। বাতাসে শিষ দেবার মতো শব্দ হলো। সে সব নিতান্তই লৌকিক শব্দ। অন্য জগতের কিছু নয়। রাত শেষ হবার আগে-আগে বর্ষণ শুরু হলো। ছাতা নিয়ে যান নি। মন্দিরের ছাদ ভাঙা। আশ্রয় নেবার জায়গা নেই। মিসির আলি কাকভেজা হয়ে গেলেন।
ঢাকায় ফিরলেন প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে। ডাক্তার পরীক্ষা করে শুকনো মুখে বললেন, ‘মনে হচ্ছে নিউমোনিয়া। একটা লাংস এফেকটেড, ভোগাবে।’
মিসির আলিকে সত্যি-সত্যি ভোগল। তিনি দীর্ঘ শয্যাশায়ী হয়ে রইলেন।
[চলবে...]
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now