বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মাহিনের মোবাইল

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোঃ ছহিনুর রহমান বিন মনির (০ পয়েন্ট)

X উসকোখুসখো চুল আর ধূলায় ধূসরিত জামাকাপড়ে,জেলা সড়কের ব্যস্ত রাস্তার কিনারা দিয়ে হেঁটে আসছে একটা ছেলে।ভাবভঙ্গিতে তার ক্ষুদা আর ক্লান্তির ছাপ।হাঁটছেও মাথা নিচু করে।ছেলেটা টোকাই হতে পার।না,টোকাই না।টোকাইরা এরকম ভালো পোশাক পরে না।তাছাড়া টোকাইরা রাস্তায় এভাবে চলেও না।এটা কোনো ভদ্র ঘরের . . . . এইই. . . . ছেলেটা তো রাস্তার মাঝখানে চলে এসেছে।ওহহহ।ধাক্কা দিয়ে দিল ? কি রক্ত বের হচ্ছে হাত আর পায়ের ছেড়া জায়গা দিয়ে ! মাথাও ফেটেছে বোধহয় ।তাড়াতাড়ি মেডিকেলে নিতে হবে . . . . . অল্প কিছুদিন হলো মাহিনদের জে এস সি ফল বেরিয়েছে।নিয়মিত পড়াশুনা আর বাবা-মা,স্যারদের সাহায্যে স্কুলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে মাহিন।প্রতিবেশি,আত্মীয়-স্বজন সবাই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। . মাহিনরা থাকে শহর এবং গ্রামের মাঝামাঝি একটা জায়গায়।জেলা শহর নীলফামারী মাত্র পাঁচ-সাত কিলোমিটার। মাহিনের বাবা জিনাত আলি খুব বেশি পড়াশুনা করতে পারেন নি,কাজ করেন স্থানীয় একটা প্লাস্টিক কারখানায়।মাহিনের মা মহুয়া বেগম গৃহকর্মের পাশাপাশি বাড়িতেই কাপড় সেলাই করেন।একমাত্র ছেলে মাহিনকে নিয়ে অভাব-অনটনে,সুখে শান্তিতে কেটে যায় তাদের। মাহিন খুব দূরন্ত ছেলে।বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় দূরন্তপনাটা যেন একটু বেশিই।এ জন্য ওকে মাঝে মাঝে কথাও শুনতে হয়।মা যখন রাগ দেখান,ও তখন বাবার কাছে যায়।আর বাবা রাগলে লুকায় মায়ের আঁচলে ! কিন্তু অন্যছেলেদের মতো সে বাবা মায়ের অতো অবাধ্য নয়।মা যদি বলে,'বাবা মাহিন,এটা করা যাবে না,ওটা বলবেনা,যাও পড়তে বসো 'তাহলে সে লক্ষ্মী ছেলের মতো মায়ের কথা শোনে।তাই তো বাবা-মা হাজারো কষ্টের মাঝে ছেলের সব চাওয়া পূরণ করার চেষ্টা করেন। . জে এস সি পরীক্ষার আগে মাহিন মার কাছে আবদার করেছিল,পরীক্ষার পর যেন ওকে একটা মোবাইল কিনে দেওয়া হয়।'বাড়িতে একটায় মোবাইল,তাও আবার অনেক পুরানো,বাবার কাছে থাকে।বাড়িতে একটা ভালো ফোন থাকলে ভালো হয়। বন্ধুদের প্রায় সবার কাছেই স্মার্টফোন আছে।তাই তাকেও ফোন কিনে দিতে হবে।'এই হলো মাহিনের যুক্তি। ওর আম্মু শুধু বলেছিল,'ভালো করে পড়।ভালো রেজাল্ট কর আগে।তারপর দেখা যাবে।' পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার অনেক কয়েকদিন হয়ে গেল।তবুও ওকে কেন ফোন কিনে দেওয়া হচ্ছে না ,সব সময় শুধু এ চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে ওর মাথায়। আজ রাতের খাবার খাওয়ার পর বিষয়টা মাকে আবার খেয়াল করে দিল মাহিন।মেশিনে কাপড় ঢোকাতে ঢোকাতে ,মা বলছে - ---বাবা মাহিন,এতো কম বয়সে মোবাইল ব্যবহার করার দরকার নাই।আর একটু বড় হ,তোর বাবা না দিক,আমি তোকে ফোন কিনে দিব।তুই শুধু ভালোভাবে পড়াশুনা কর। ---তোমরা সেই কবে থেকে বলছো বড় হ,ভালো করে পড়,ফোন কিনে দিব।সেটা কবে দিবা,ভালো করে বলোতো। ---তুই এখনই ফোন দিয়ে কি করবি ? ফোনে তোর কি ? ---আমার সব ফ্রেন্ডের ই ফোন আছে।শুধু আমারই নাই।আমার ও তো ফোন ইউস করতে মন চায় . . . --- বাবা,আর কিছুদিন যাক ? ---পরীক্ষার পর ফোন কিনে দিতে চাইছিলা।এখন দিবা না ক্যান ? ---তোর বাবা দুমাস থেকে বেতন পায় নাই।বাড়িতে টাকা নাই।তাছাড়া তোরতো এখন মোবাইল ফোনের অতো দরকার নাই। ---আমি কিছু বুঝি না।আমাকে মোবাইল কিনে দিতেই হবে। ---মোবাইল থাকলে পড়াশুনা ভালো করে করতে . . . মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই টেবিলে রাখা বোতামের কৌটাটা মাটিতে ছুড়ে দিয়েই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল মাহিন।একটু পরেই দ্রুম করে শব্দ হলো।ঘরের দরজা লাগিয়ে ঘুমাতে গেলো মাহিন। মহুয়া বেগম মেশিন চালাচ্ছে আর ভাবছে,পরীক্ষার পর পড়াশুনা না থাকায় বন্ধুদের সাথে বেশি বেশি মেলামেশা করায় ছেলেটা অনেকটা জেদি আর অবাধ্য হয়ে গেছে।আগে তো এমন ছিল না ! তবুও ওর আব্বুকে বলবে,ফোনের জন্য।এসব ভাবতে ভাবতেই মাহিনের আব্বু বাড়ি ফিরলেন । হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে,ভাত তুলে দিতে দিতে মহুয়া বেগম ফোন কেনার কথা আর আজকে মাহিনের ব্যবহার তুলে ধরল স্বামীর কাছে। জিনাত সাহেব কিছু না বলেই খাওয়া শেষ করে সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়লেন। . মাহিনকে কোনো কিছুই বাবার কাছে চাইতে হয়না,ও মাকে বলে,মা বাবাকে জানায়,বাবা এনে দেয়।বাবা কাছে থাকলেও ও বাবাকে বলে না।কিন্তু মা বলতে দেরি করছে দেখে আজকে সকালে,নাস্তার টেবিলে,একটু সাহস করেই বাবাকে বলল - ---বাবা . . . .মোবাইল . . . কিনতে . . .চাইছিলা যে ? ---কার মোবাইল ? ---আমার জন্য . . . . ---তোর এখনই মোবাইল ফোন ব্যবহারের দরকার নাই । ---আমার অন্যবন্ধুদের আছে।আমার থাকবে না ক্যান ? ---অন্যদের মতো কি আমাদের বাড়ি গাড়ি আছে ? ---না,ওগুলা আমি শুনতে চাই না।তোমরা আমাকে মোবাইল কিনে দিবা ? ---না দিলে ? ---আমি বাড়িতে থাকব না। ---মাহিন !এত্তোবড় কথা কবে শিখলি, শয়তান ?বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবি ? যা,কোথায় যাস দেখি ? ততক্ষণে মাহিনের দুইগালে দুইটা চরে গাল লাল হয়ে উঠেছে।মহুয়া বেগম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে মাহিনকে ছাড়িয়ে নিলেন। ---থামো তো।ছেলেটাকে মেরে ফেলবে নাকি ? (মহুয়া বেগম) ---ও এখন কার সাথে মিশে খেয়াল রাখ? ---কই ? কার সাথে মিশে ? ---টাকা কত কষ্ট করে রোজগার করতে হয় জানা আছে ওর ? বাড়িতে বসে বসে খাচ্ছে তো . . . মাহিন এক হাতে গাল চেপে ধরে দ্রুত তার ঘরে এসে শুয়ে পড়ল বিছানায়। বালিশে মুখ মুছতে মুছতে ভাবতে লাগল- 'বাবা-মা আর আমাকে আগের মতো আদর করে না।কিছু চাইলে কিনে দেয় না।ভালোবাসলে নিশ্চয় একটা মোবাইল কিনে দিত ! তাছাড়া ও তো শুধু একটা মোবাইলই কিনতে চেয়েছিল।তার জন্য বাবা এভাবে মারল ?' এ সময় মাহিনের মনে পড়ে গেল সুজনের কথা।গতকাল ওর কাছে ফোনটা চাইতে গিয়ে ও কি বলেছিল ? 'নিজে কিনতে পারো না।অন্যের মোবাইল টেপার এতো শখ কেন ?' . এসব ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ায় মাহিন।নিঃশব্দে দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে বাইরে।মাঝখানে মহুয়া বেগম একবার এসেছিল মাহিনকে ডাকতে।কিন্তু দরজা লাগা দেখে দরজার বাইরে থেকেই ডাকাডাকি করে চলে গিয়েছিলেন।এখন তিনি রান্না ঘরে। মাহিনের আব্বু,জিনাত সাহেব ও ততক্ষণে কাজে চলে গিয়েছিলেন। যেভাবে,যে পোশাকে আছে ঠিক সেভাবেই বেড়িয়ে পড়ে মাহিন।জেলা শহরের রাস্তা ধরে , একা একা চলতে চলতে ও ভাবে 'এ বাড়িতে আর থাকব না।যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে যাব ।কোনো বন্ধুর বাসা যাব ? না,যাব না।ছোট খালার বাসা যাব নাকি ? নাহ,পরিচিত কারো বাসায়ই যাব না।ঢাকা যাব,রিকশা চালাব,আর বাড়িতে ফিরব না।' চলতে চলতে এরকম অনেক কিছু সে ভেবে নেয়। . বিকেলের দিকে,ও খুবই ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছে।সেই সকালে বাড়িতে নাস্তা খেয়েছে,আর দুপুরে এক মসজিদের কল থেকে একটু পানি খেয়েছে।তারপর থেকে আর কিছু খাওয়া হয় নাই।পকেটে এক টাকা নাই যে কিছু কিনে খাবে।ওকে তো কেউ চিনেও না যে খেতে দিবে।কেউ কি আর ফ্রি ফ্রি খেতে দেয় ? . সারাদিন একটানা হাঁটা আর পথের ধুলাবালিতে ওর চুল উসকোখুসকো হয়ে গেছে,সারা শরীরে ক্লান্তি আর ক্ষুধার ছাপ।ওকে এখন রাস্তার টোকাইদের মতো দেখাচ্ছে।কিন্তু টোকাইরা রাস্তায় অনেক সচেতন,মাহিনের মতো বোকা নয়।ও হাঁটছেও এখন হেলেদুলে,রাস্তার কিনারা দিয়ে। এভাবে চলতে চলতে জেলা শহরের কাছে এসে গেছে ও।যাক, শহরে গেলেই আর চিন্তা নাই,এরকম ভাবতে ভাবতে কখন যেন রাস্তার মাঝখানে চলে এসেছে,খেয়াল এ করেনি মাহিন। হঠাৎ দ্রুতবেগে ছুটে আসা একটা মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয় ওকে।রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে যায় মাহিন।মুহূর্তেই মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসে।ছিড়ে,থেঁতলে যায় হাত পায়ের বিভিন্ন জায়গা।ছুটে আসে আশেপাশের মানুষ ।ভিড়ের মাঝে জিনাত সাহেবের এক পরিচিত ভদ্রলোক আরো কয়েকজনকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।খবর শুনে হাসপাতালে ছুটে আসে মহুয়া বেগম। রাতে জ্ঞান ফিরে মাহিনের।মা তখন হাসপাতালে,ওর বেডের পাশেই।মায়ের দিকে একটু তাকিয়েই কেঁদে ফেলে মাহিন। ---মা ,আমি ভূল করেছি।আমি মোবাইল চাই না।আমি বাড়ি যাব। ছেলেকে বুকে টেনে নেন মহুয়া বেগম। ---হ্যাঁ বাবা,বাড়ি যাবি।একটু সুস্থ হয়ে নে . . . ও দিকে বাড়ি ফিরছেন মাহিনের বাবা , জিনাত সাহেব ।হাতে তার নতুন মোবাইলফোন।দুমাসের বেতন একসাথে পাওয়ায় তিনি আজ কিনেছেন,ছেলের জন্য নতুন মোবাইল ফোন . . . . ! .


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মাহিনের মোবাইল

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now