বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রবাদ আছে - টাইম ইস আ গ্রেইট হিলার। সময় নাকি ধীরে ধীরে সব ক্ষতে বিস্মৃতির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়! কথাটা পুরোটা নয়, আংশিক সত্য হয়েছে, অন্তত যাঈদের ক্ষেত্রে। এরই মাঝে সময়ের গর্ভে গড়িয়ে গেছে অনেকটা জল। অনাকাঙ্খিত ঘটনা কিংবা অঘটন যাই হোক, ঠেলতে ঠেলতে যাঈদকে নিয়ে গিয়েছিলো পতনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। তবে শেষে হয়তো ঈশ্বরের মায়া হয়ে থাকবে। যাঈদ বাঁচলো বটে, কিন্তু পল্লবীহীণ জীবন স্থায়ীভাবে বড্ড পানসে হয়ে গেলো! মনের আকাশে খয়েরী বেদনায় সেই যে ভরে গেলো, আর ফর্সা হলো না! যাবতীয় রংয়ের খেলা এখনো সেই আকাশে প্রবল অপমানে নির্বিচারে লাঞ্ছিত হয়ে চলেছে। সে উদাসীন ছিলো, আরও উদাসীন হয়ে গেলো। জীবনের কোলাহল দূর থেকে দেখছে নির্মোহ ভঙ্গীতে!
এখনো মাঝে মাঝে কোনো কোনো নিরালা একান্তে পল্লবী এসে হানা দেয়। অসহ্য ব্যথা বুকের পাঁজরে বাজতে থাকে – না-পাওয়ার কিংবা পেয়েও হারিয়ে ফেলার ব্যথা। সে নাকি কোনোদিনই কোনো মেয়ের মনের কথা বুঝতে চায় নি! কিন্তু এইতো এখন সে দিব্যি পল্লবীকে বুঝছে...বড় দেরীতে যদিও। লাবণী ওর একটা বড় উপকার করেছে – নতুন করে দেখবার একটা চোখ খুলে দিয়েছে। আচ্ছা, কেমন আছে পল্লবী? সেও কি ওর মত কষ্ট পাচ্ছে? কী যা-তা ভাবছে? ও কষ্টে থাকবে কেন? ভালো থাকুক, পল্লবী ভালো থাকুক। যেখানে থাকুক পল্লবী ভালো থাকলেই যে সে খুশী! বিসর্জনেও যে একধরণের আনন্দ থাকতে পারে, তা কে জানতো?
এমনি যখন চলছিলো অনুল্লেখ্য যাপিত জীবন, তখন হঠাত করেই দৈবের হাতে গিয়ে পড়ে নিরামিষ জীবনের নেতানো লাটাই! আচমকা টান খেয়ে উদাসীন ঘুড়িটা জীবনের কোলাহল শুনতে পায় অনেক দিন পর।
ট্রেনটা আজকে ভীষণ লেইট। তাড়াতাড়ি পৌঁছানো দরকার, কিন্তু এ কী বিপত্তি! হইহই করে একদঙ্গল ইশকুলের মেয়ে ট্রেনের কামরাটায় উঠছে। এদের চিৎকার চেঁচামেচি, অকারণ হাসি-ঠাট্টায় ব্রহ্মতালু জ্বলে গেলো প্রায়! আজকে কপালে খারাবি আছে। হইচই ইদানীং সহ্যই হচ্ছে না- বয়স হয়তো গুটিগুটি পায়ে থাবা মেলে এগিয়ে আসছে। চুলোয় যাক বয়স! মুখের উপর একটা পত্রিকা ঝুলিয়ে কিছু একটা পড়তে চেষ্টা করলো। এমন সময়,
- এক্সকিউজ মি, আপনি বোধহয় আমার সীটটায় বসেছেন...
মিষ্টি কণ্ঠটা কি চেনা চেনা ঠেকলো? অনেককাল আগে শোনা টুংটাং জলতরঙ্গ... না! তা হয় কীভাবে? কিন্তু সে যাক, সে নিজের আসনেই তো বসেছে। এখন উটকো এই ঝামেলার মানে কী? রাগ হয়ে গেলো খুব। সপাং করে পত্রিকাটি সরিয়েই...স্রেফ কট এণ্ড বোল্ড! হায় খোদা! এ যে পল্লবী! বিস্ময়ে ঝাড়া কয়েকটা মিনিট কেটে গেলো। কেউই কোনো কথা বলতে পারলো না। পল্লবী আর যাঈদ একে অপরকে দেখছে। ঘোর ভেঙ্গে যায় কয়েকটা মেয়ের উৎকণ্ঠিত প্রশ্নে,
- ম্যাম, কী হলো? আমরা বসব কোথায়, বলে দেন?
- হ্যাঁ, অ্যাঁ ...কী বললে? ওহ, তোমাদের নিয়ে আর পারি না। দাঁড়াও দেখছি। এই যে মেয়েরা, এসো এদিকে এসো, এই যে এখানটায় বসো। একদম চেঁচামেচি করবে না; সবাই সবার ব্যাগ ঠিকমত গুছিয়ে রাখো...আরও কত কী একগাদা হাবিজাবি বলতে থাকলো আর যাঈদের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা বল্লো, যার অর্থ – দাঁড়াও আসছি। তারপর ঝাড়া বিশ মিনিট চড়কি নাচন নাচলো। যাঈদের চোখ সরছে না। এখনও ঐরকম ছিপছিপেই আছে।
যাঈদের মনে অনেক প্রশ্ন। সর্বশেষ কার জন্য এত কৌতুহল বোধ করেছে, মনে করতে পারলো না। মনের ভেতর ফ্ল্যাশব্যাকে চলতে লাগলো বেদনার্ত অতীত। ব্যথার সাগর যেন উথলে উঠলো; চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলো।
- যাঈদ, শুনছো? কোমল গলায় ডাকে পল্লবী। চোখ মেলে যাঈদ,
- পল্লবী, তুমি এখানে? কী আজব! কোনোদিন ভাবিনি তোমার সাথে আবার দেখা হয়ে যাবে।
- হ্যাঁ, আজবই বটে! অনেকদিন হয়ে গেলো, তাই না?
- হ্যাঁ, অনেকদিন। কেমন ছিলে? যাঈদ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে।
আনমনা হয়ে গেলো পল্লবী। ফেলে আসা স্মৃতিগুলো কি ওকে নাড়িয়ে দেয়? চোখে কেমন একটা কষ্টের বুদবুদ উঠেই যেন মিলিয়ে যায়! এই তো বেশ পড়তে পারছে যাঈদ। অবশ্য ভুলও হতে পারে।
- আমার কথা থাক, তুমি কেমন ছিলে বলো?
জবাব দেয় না যাঈদ। কেমন ছিলো? কী জবাব দেবে এর? সত্যটা তো আর এখন বলা যায় না, হয়তো শোভনও হবে না! কেবল নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে।
- কী দেখছো অমন করে? খুব কুৎসিত হয়ে গেছি, তাই না? হেসে ফেলে পল্লবী।
হেসে ফেলে যাঈদও। সেই ক’বেকার হন্তারক সেই হাসি। হাসতে হাসতেই বলে,
- হ্যাঁ, ভীষণ কুৎসিত! কী দিয়ে এমন ধার দিলে বাঁকগুলোতে? আমি তো চোখই ফেরাতে পারছিলাম না...হাহাহা
- বয়স হয়ে গেলো তবুও তোমার অসভ্যতা দেখি যায় নি!
- হ্যাঁ, তাইতো দেখছি। কাউকে কাউকে দেখলে হয়তো আজীবন তা -ই করে যাব।
- বিয়ে করেছো? আচমকা শুধায় পল্লবী। গম্ভীর হয়ে যায় যাঈদ।
- ক্ষেপেছো, আবার? একটা মানুষ ক’বার মরতে পারে কিংবা মারা যায়, বলতে পারো? আমাকে তো মেরেই ফেলেছিলে...
পল্লবীর মুখে আঁধার ঘনিয়ে আসে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উদাস মুখে বাইরে জানালা দিয়ে ছুটে যাওয়া প্রকৃতি দেখতে থাকে। দৃশ্যটাতে আহতবোধ করে যাঈদ। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলে,
- তোমাদের কথা বলো। কেমন চলছে তোমাদের সংসার? রিয়াজ আর তোমার না ইংল্যন্ড যাবার কথা ছিলো?
- সংসার? একটা বিচিত্র হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায় পল্লবীর মুখে, কই সংসারই তো হলো না! আর ইংল্যন্ড যাওয়া?
- মানে? বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় যাঈদ।
মানেটা আর বলা হলো না। ট্রেনটা যেন মোক্ষম সময়ে এসে স্টেশানে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে! ঝট করে উঠে দাঁড়ায় পল্লবী।
- চলি, আমাদের নামবার সময় হয়ে এলো। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও – অনেক কষ্ট তোমাকে দিয়েছি, তা ভাবলে এখনো নিজের কাছে খুব ছোট হয়ে যাই। ভালো থেকো, কেমন?
ঘটনার আকস্মিকতায় থ’ মেরে গিয়েছিলো যাঈদ। কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলো। যখন হুঁশ এলো, তখন দেখলো, ওরা সবাই নেমে গেছে। হঠাত পল্লবী কি পিছু ফিরে চাইল? বিষন্ন সে মুখে আরো গভীর কী একটা অভিব্যক্তি থাকে, যাতে যাঈদের বুকের জমাট অভিমান আচমকা গলতে শুরু করে। আর তখনই হতাশায় হাত কামড়াতে ইচ্ছে হলো। ‘ ইস, মনের ভুলে ঠিকানাটাও নেয়া হলো না!’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now