বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

প্রত্যাবর্তন-(শেষ পর্ব)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X ট্যাক্সিটা ঝড়ের বেগে চলছে। বাড়ি ফেরার তাড়া যেন ড্রাইভার –এরই বেশি! অবশ্য সেদিকে তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই পল্লবীর। কারণ মনের তুফান আরো বেশি বেগে বইছে যে! ২৯ জুলাই...জুলাই ২৯...ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারিখটা বার বার মনের দেয়ালে আচঁড় কাটছে। কেন যাঈদ এই দিনটাকেই স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে? মনে হচ্ছে – স্মৃতির গভীরে কালের ধূলো নিয়ে অভিমানে জমে আছে কিছু কষ্টের পদচ্ছাপ, কিন্তু কিছুতেই ঠাহর হচ্ছে না। একটা প্রবল অনিশ্চিতের বোঝায় বুকটা ক্রমশঃ ভারী হয়ে উঠতে থাকে। ঠিক তখনই হুশ করে ট্যাক্সিটা থেমে যায় এবং পল্লবীর সেই দিনটির কথা মনে পড়ে যায় – বিদায়ের বাদল-ঘন সেই দিন! ভুলতে চাইলেও ভোলা কি যায়? পল্লবী চলে গেলে যাঈদ কেমন মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ – কমপ্লিটলি লস্ট ইন হিজ ঔন থট। প্রতীক্ষায় থাকবে...হাহ, সেই ক’বে থেকেই তো প্রতীক্ষায় আছে – নতুন আর কী! অবুঝ হৃদয় তো পাওয়া না-পাওয়ার জটিল সমীকরণ বোঝে না, কোন যুগেইবা বুঝেছে? এতো উত্থান-পতনের পরেও এ কোন অসম্ভব আবার নব সূচনার সাজে পল্লবিত হতে চাইছে? শুধুই কি কাকতালীয়? কাকতালের সাধ্য কি মিলোনন্মুখ মালার দু’টো উদ্গ্রীব ছিন্ন প্রান্তের উন্নদ্ধ ব্যাকুলতা ধারণ করে? ২৮ জুলাই। পল্লবীর অস্থিরতা নির্ঘুম রাতের দ্বিপ্রহর ছুঁয়ে ফেললো। রাত পেরোলেই জুলাই ২৯ –এর সেই কালো দিন। এতদিন প্রাণপণে ভুলে থাকতে চেয়েছিলো, পেরেও ছিলো প্রায়, কিন্তু ধূমকেতুর মত যাঈদের উত্থান যেন সব পণ গুড়িয়ে দিতে চাইছে। সেদিনের যাঈদের সেই আহ্বান তার বুকের গভীরে সুপ্ত ইচ্ছের যে কুঠুরিটা আছে, তার দরজায় সজোরে করাঘাত করতে থাকে। সেই একই দৃষ্টি – কাতর অনুনয়! সে কি পারবে আবারও এই আবেদন উপেক্ষা করতে? আর কত নিজেই নিজেকে ফাঁকি দেয়া? সিঙ্গল বেডখানি তার যত নিঃস্ব একাকীত্বের প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ সত্বেও পল্লবীর বেদনার্ত কান্নায় ভারাক্রান্ত হতে থাকে। ভোরের পাখিরা জাগতে শুরু করলে পল্লবী একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে; সুন্দর একটা স্বপ্ন – ধোঁয়া ধোঁয়া তাল তাল নরম মেঘের উপর আলতো পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। অজানা ভালোলাগার শিহরণ জাগানো মৃদুমন্দ হাওয়ার উড়ছে ওর রুপালি শাড়ির উন্মন আঁচল। তাকিয়ে আছে সামনেই বাড়িয়ে দেয়া একটা হাতের নিমন্ত্রণে। অবাক ব্যাপার – শুধু হাতটাই দৃশ্যমান, বাকীটুকু বিলীন হয়ে গেছে নীরব মধুর এক রহস্যে। কী ভেবে কাঁপা কাঁপা হাতখানি রাখতেই এক অদ্ভূত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। বেদনাগুলো পুড়ে গিয়ে নিমিষে নির্ভার মনে হয়। উড়তে উড়তে ব্ড় ইচ্ছে হয় সব দ্বিধা ভুলে সেই মানুষটিকে এক নজর দেখবার। অবাক কাণ্ড – তখনই রহস্য ফিকে হতে থাকে। মানুষটি যে তার বড় চেনা, বড়ই চেনা! ঘুম ভেঙ্গে গেলেও স্বপ্ন-সুখে লেগে থাকা হাসিটি পল্লবীর ঠোঁটে আঁকা হয়ে থাকে। কে জানে আজ হয়তো কারও কোথায় ফেরার দিন! ঘুম ছিলোনা যাঈদের চোখেও। সারারাত পায়চারি করেই কেটেছে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, শংকা প্রভৃতির ডামাডোলেও একটা অনন্য আশার সুর চোরা ধূনে বেজে যাচ্ছিলো। এ উপলব্ধি অনস্বীকার্য। তার আহত প্রেম সুদীর্ঘ সময়ের কষ্টিপাথরে হয়তোবা যাচাই হয়ে গেছে, তাই বিধাতাও হয়তো আর তাকে নিরাশ করবেন না। এখন শুধু শেষবারের মত প্রতীক্ষা – কঠিন প্রতীক্ষা! পথ চেয়ে অধীর হয়ে বসে থাকবার মত কষ্টকর সম্ভবত আর কিছু নেই! অনেক দিন পর আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে পল্লবী এবং লজ্জা পেয়ে চটে ওঠে আয়নাটার উপর। আয়নাটা যেন কোন পুরুষের সপ্রশংস চোখ! আয়নার আর দোষ কী? অনাবিল লাবণ্যে আর নিটোল যৌবনে পল্লবী যেন সুজলা প্রকৃতির মতই দৃষ্টিনন্দন ও সজীব! হাল্কা প্রসাধনেই অসহ্য সুন্দর লাগতে থাকে। তবুও চোখে একটু কাজল পরে নেয়। সে কাজলে আনন্দ ও বিষাদ জমে থাকা সব বিবাদ ভুলে একাকার হয়ে পড়ে থাকে। পথে যেতে যেতে পল্লবী আনমনা হয়ে পড়ে। আচ্ছা, এই মানুষটার সাথে তার কত দিনের পরিচয়? হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে কৈশোরের এক টুকরো স্মৃতির আঙ্গিনায় – পল্লবীর প্রথম শাড়ি পরার দিনটা। প্রথম শাড়ি পরে ফিঙ্গে পাখির মত নাচতে নাচতে চলে গিয়েছিলো যাঈদদের বাড়িতে। আনন্দের আতিশয্যেই কিনা ভুল করে ঢুকে পড়ে শত্রুর ঘরে। হ্যাঁ, যাঈদ কে তখন শত্রুই মনে হতো – সুযোগ পেলেই দিব্যি ভালো ছেলেটি কী করে যেন অসভ্য হয়ে উঠতো। নানান যন্ত্রণায় পল্লবী নাকাল হয়ে যেত। সে কথা কাউকে বলে বিশ্বাস করাতে পারতো না! বুঝতে বুঝতে বড় দেরী করে ফেলে...ঘুরে বেড়িয়ে যেতে গিয়ে দেখে দরজা ধরে সেই ল্যাজ বিশিষ্ট দিব্যি মূর্তিমান – মুখে মিটমিটে শয়তানি হাসি। কুলকুল করে ঘামতে থাকে পল্লবী। তোতলাতে তোতলাতে – আ আ আমি যাব – সরে দাঁড়ান বলছি। ‘যাও না, কে আটকাচ্ছে?’ পথ আগলে রেখেই যাঈদের উত্তর। - বাই দ্য ওয়ে, এই বিচ্ছিরি আকাশী শাড়িটাতে তোমাকে কী যে কুৎসিত লাগছে...আয়নায় দেখো নাই নাকি? পল্লবীর বড় বড় চোখ জলে ভরে ওঠে। বয়ঃসন্ধির যে সময়টাতে অকারণেই অশ্রুজলের শতেক আনাগোনা, সেখানে এমন নির্দয় মন্তব্য! নতমুখে টপাটপ ঝরতে থাকে অপমানের বৃষ্টি। আর ঠিক তখনই খুব কাছে চলে আসে যাঈদ। হয়তো আলতো করে পল্লবীর মুখটা তুলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার আগেই পল্লবী চোখ তুলে চেয়ে ফেলে। দু’জোড়া চোখের অভূতপূর্ব মিলন। সেখানে দু’টো কিশোর-কিশোরি কী দেখল কেউ জানে না, তবে প্রেমের প্রাচীন রসায়ন হয়তো আপনা হতেই কাজে লেগে গিয়েছিলো। পলাতক হরিণীর মত ছুটে পালিয়ে যেতে চাইল পল্লবী। তখন পেছন থেকে যাঈদ, - এই আমি মিথ্যে বলেছিলাম – তোমাকে দারুণ লাগছে! আর শোন – আমার বউ হবে? বড় হলে আমি কিন্তু তোমাকেই... - ইস, কী শখ! পাজি, শয়তান। সব বলে দেব। - আফসোস, কেউ বিশ্বাস করবে না। চুকচুক শব্দে গা-জ্বালানো একটা হাসি। সেই –ই প্রথম ভাললাগা কিংবা ভালোবাসা পল্লবীর জীবনে। তার কিশোরি হৃদয়ে যাঈদ –ই যে প্রথম অনুরাগের রাগিণী বাজিয়েছিলো। সেই সুর হয়তো অজান্তেই পল্লবীর হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে কী একটা আজন্মের পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকবে। যার দরুন যাঈদ চোখের এবং মনের আড়ালে চলে গেলেও সর্বত্র এমনকি পরবর্তী ব্যর্থ প্রেমটিতেও অজ্ঞাতসারে কেবল একজনের আদলই খুঁজেছে! আজ বেশ বুঝতে পারছে – অহর্নিশ কাকে খুঁজে এসেছে... কার কারণে মনের ভেতরের মনটি ছিলো তেমন উতলা? ভাবতে ভাবতেই চেনা পথ তার গন্তব্যে এসে জিরোয় – একদা পল্লবীর হাতে গড়া একটি তাসের ঘর! সত্যিই কী আশ্চর্য নিয়তির খেলা – চিরদিনের জন্য মাড়িয়ে গেছিলো যে দুয়ারের ধূলো, এই ক্ষণে আজ আবার তারই সামনে দণ্ডায়মান! ভাবনায় হারিয়ে গিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে পল্লবী - বলতে পারে না। হঠাত খেয়াল হয় – আরে, বেলটাতো চাপতে হবে! কাঁপা হাতে সমস্ত লজ্জা ও জড়তার হার হলে টুংটাং শব্দের লহরী ওঠে। খানিকটা সময় কেটে যায়, কিন্তু কোনো সাড়া নেই! মৃদু আঙ্গুলে বেলটা আবার চেপে দেয়। আবারও শব্দ এবং অসহ্য নীরবতা – কেউ খুলতে এলো না। আশ্চর্য! বুকটা ধড়াস করে উঠলো...তবে কি সে ভুল ভেবেছিলো? কিন্তু সে হয় কী করে? একজীবনে আর কত ধোঁকা খাবে সে? আর কত আঘাত পেলে পাথর হতে পারবে, যখন কোনো চাওয়া-পাওয়াই আর তাকে ছুঁতে পারবে না? আর কত কাঁদলে জল শুকিয়ে যাবে যখন কারো কথা মনে করে আর বুক ভিজে উঠবে না! ক্লান্ত পায়ে উল্টোপথে পা বাড়ায় পল্লবী। ঠিক তখনই পেছনে খুট করে দরজাটা খুলে যায় এবং একটা দরাজ গলা গমগম করে ওঠে, পল্লবী!! পল্লবী জমে গেলো। নিরাশায় ধু ধু করা বুকে হঠাত যেনো একটা দমকা হাওয়া বয়ে যায় যাতে মিশে থাকে একটা অদ্ভূত সুখের গুনগুনানি। পিছু ফিরে ভেজা চোখে চেয়ে দেখে যাঈদের মুখে গা-জ্বালানো একটা হাসি! আকস্মিক অভিমানে বড্ড রাগ হয়ে যায় পল্লবীর। সামনে পা বাড়ায় কিন্তু এক পাও যেতে পারে না! পারবে কী করে? পল্লবীর পেলব হাতখানি যে যাঈদের শক্ত মুঠোয় উশখুশ করছে! - বারে বারে আমাকে ফেলে চলে যেতে যাও? উহুঁ, মেয়ে, এবার সেটা হচ্ছে না। পেয়েছো কী, হ্যাঁ? পল্লবী কিছু বলবার সুযোগই পায় না। যাঈদ একটানে পল্লবীকে ভেতরে নিয়ে দরজাটা এঁটে দেয়। তারপর...তারপর দৃঢ় বাহুডোরে নিষ্পেষিত হতে থাকে দু’টো তৃষ্ণার্ত হৃদয়! যাঈদের বুক ভিজে চলে কারো বেদনা, অনুযোগ আর অনুক্ত কৈফিয়তের গভীর ক্ষরণে। পল্লবীর মুখখানা দু’হাতে নিয়ে বলে, - আমাকে ক্ষমা করে দিও। তোমাকে কেন যে ধরে রাখতে পারি নি...কী থেকে কী যে হয়ে গেলো? আমি, আমি একটা... কথাটা শেষ করতে পারে না যাঈদ। আচমকা এক জোড়া উষ্ণ মধুর অমৃতের স্পর্শে বিহ্বল হয়ে যায়। কথা সেখানে স্রেফ বাহুল্য হয়ে অনাদরে লুটাতে থাকে... তারপর যাঈদ একটা নাটকীয় কাজ করে ফেলে – হাঁটু গেরে পল্লবীর একখানা হাতে মুখ ছুঁয়ে, - উইল ইয়্যু ম্যারি মি, প্লীজ? আহেম, ওয়ান্স এগেইন। - আহ, ঢং দেখে বাঁচি না। তোমার পেটে পেটে এত শয়তানি! সারা জীবন জ্বালিয়ে এলে...হাসছে পল্লবী। অনাবিল হাসি – ভারমুক্তির হাসি। হাসি বড় সংক্রামক। যাঈদও হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই চোখে চোখে কিছু একটা বলে ফেলে। লজ্জায় পল্লবীর মুখ লাল হয়ে ওঠে, অসভ্য কোথাকার! পরিশিষ্ট এর কিছুদিন পরেই পল্লবী এবং যাঈদের আবার বিয়ে হয়ে যায়। ছোট মামা বেজায় খুশি। মহানন্দে যাঈদের একটা কান ঝাকাতে ঝাকাতে আশীর্বাদ বর্ষন করে যাচ্ছেন! লাবণী সারাদিন বেজায় দৌড়ঝাঁপ করে ক্লান্ত। হয়তো কেউই খেয়াল করে নি – থেকে থেকে মেয়েটি কেমন আনমনা হয়ে যাচ্ছিল। কিছু কিছু বেদনা থাকে যার কোনো নাম থাকে না। না থাকুক নাম, লাবণী কিন্তু ঠিক অখুশি নয়। আর সবার মত সেও যাঈদ ও পল্লবীর অসাধারণ প্রত্যাবর্তনে নির্নিমেষ মুগ্ধ! সমাপ্ত


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now