বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
- বাড়ি যাবিনে? এই ম্যাশিনির ঘ্যাড়ঘ্যাড় শব্দের মধ্যি কতক্ষুন থাকপি? চল, বাড়ি চল।
- না রে ভাই। তুই যা। আমার কাজ আছে। মালিকরে কইছি এক্সট্রা টাইম কাজ করব।
- ক্যান? এক্সট্রা টাইম কি জন্যি? রুজার মাসে এরাম করলি শরীল টেকবে?
- সেইতা পরের কথা। তুই যা। পরে কথা কবানে।
- এর চেয়ে চল দুইজনে দু বতল মেরে বাড়ি যেয়ে ঘুমোয়।
- বললাম না যাবনা। তুই যা। কাজ আছে। ঝামেলা করিসনে।
রফিক আর আজম দুই বন্ধু। দুজনেই ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে। আজমের বাড়ি কুমিল্লা আর রফিকের যশোর। জীবিকার তাড়নায় তারা বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় থাকে। তাদের টাকায় তাদের এবং তাদের পরিবার চলে। আনন্দ ফুর্তির তেমন কোন অবকাশ নেই। তাই মাঝে মাঝে তারা দু বোতল মদেই শান্তি খুঁজতে চেষ্টা করে। রোজার আগে তারা বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে। বাড়ি আসার পর থেকেই রফিক কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। রোজা পড়ার পর থেকে এক্সট্রা টাইম কাজ করছে। আগে তারা দু’জন কত ইয়ার্কি করত। কিন্তু এখন তা হয়না। বন্ধুর এ আকস্মিক পরিবর্তন আজম কেন যেন মেনে নিতে পারেনা। বাধ্য হয়ে ঠিক করে ফেলে রফিকের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলবে।
-এ রফিক, কি হয়েছ তোর?
-আমার আবার কি হতি যাবে!
-বাড়িততে আসার পর থেকে কিরাম জানি হয়ে গিছিস তুই। কি হয়েছ বল।
-বাদ দে। আমাদের মত গরীব মানষির আবার হওয়া না হওয়া।
-তার পরেও ক কি হয়েছ?
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর রফিক শুরু করে।
-বাড়ি গিলাম। যেয়ে দেখি মার শাড়িখান ছিঁড়ে গেছ। আব্বার লুংগিতি একগাদা তালি মারা। ছোট বুনডা (বোনটা) টাকার জন্যি ইস্কুলি যাতি পারছেনা। আমার পাটানো টাকায় কোনোরকম দুডো খেয়ে-পরে থাইকতেছ। আমি না-ই পড়তি পারলামনা। আমার বুনডাও পারবেনা? আর অন্য কথাতো বাদই দিলাম। তালি(তাহলে) ক কিরাম লাগে। আবার বাড়িততে আসার আগে বুনডা কইল ঈদির জন্যি একখান লাল জামা কিনে দিতি। ও আমার কাছে কখনো কিচ্ছু চায়না। কত শখ করে আবদারখান করেছ। এখন যদি দিতি না পারি তালি কিরাম হবে ক! তাই কষ্ট হলিও এবার ঈদি আব্বা,মা আর বুনডারে নতুন জামা দেব।
-ভাই তুই চিন্তা করিসনে। সব ঠিক হয়ি যেবেন। তুই তো চিষ্টা করছিস। আর যদি আমার সাহায্য লাগে তালি কইস।
-হাহাহাহাহা। আচ্ছা লাগলি কবানে। এখন চল কাজে দেরি হলি মালিক টাকা কেটে নিবেনে।
-চল।
দুজনের কাজ চলতেই থাকে। আড্ডা-খুনশুটি-কাজের মধ্যে দিয়ে সময় চলতে থাকে। কিন্তু যা-ই হোক রফিকের মাথা থেকে চিন্তা নামেনা। বোন ও পরিবারের কথা সবসময় মাথাই চরকির মত ঘুরতে থাকে। দেখতে দেখতে রোজা শেষ হয়ে যায়। রফিক ব্যাকুল হয় বাড়ি যাওয়ার জন্য। ঈদের ২ দিন আগেই গার্মেন্টস ছুটি দিয়ে দেয়। বেতন,বোনাস পেয়ে কিছুটা শান্তির পরশ পায় সে। সেদিন রাতেই আজমকে নিয়ে কেনাকাটা করতে যায় রফিক। তার মায়ের জন্য একটা শাড়ি কেনে,বাবার জন্য লুংগি,পাঞ্জাবী,গেঞ্জি। আর ছোট বোনটার জন্য কেনে লাল টুকটুকে ১ টা জামা,জুতা,চুলের ফিতা,সুগন্ধি তেল। কেনার সময় রফিক শুধু বাচ্চাদের মত স্বপ্নবিলাশ করতে থাকে। আজমও তার পরিবারের জন্য কেনাকাটা করে। রাতে খাওয়ার সময় দুই বন্ধুর ভেতর কেনাকাটা নিয়ে কিছুটা কথোপকথনও হয়।
-দোস্ত দেখিস আব্বা-মা এবার মেলা খুশি হবে।
-হবেনা কেন! আলবৎ হবে। তুই তোর পরিশ্রমের টাকা দিয়ে তাদের নতুন জামা দিচ্ছিস, আর তারা খুশি হবেনা!
-হুমম।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর রফিক আবার বলে ওঠে,
-বুনডা কইল শুধু জামা দিতি। তা শুধু জামা দিলি কি হয়! দেখিস দোস্ত বুনডা আমার অনেক খুশি হবেনে। আর ফর্সা মানুষ লালজামা পরলি পুরো লালপরী লাগবে।
-হুমম লাগবেই তো। আচ্ছা এখন ঘুমো। কাইল আবার বাড়ি যাওয়ার জন্যি বেরুতি হবে। সকাল সকাল বেরুতি না পারলি সমেস্যা হবে।
-হুমম।
পরদিন সকালেই আজম আর রফিক বেরিয়ে পড়ে শেকড়ের টানে। বাস কাউন্টারে গিয়ে যশোরের টিকিট পায়না রফিক। কিন্তু আজম কুমিল্লায় যাওয়ার বাস পেয়ে যায়। আজমকে বিদায় জানিয়ে সাবধানে যেতে বলে রফিক। আজমের গমন পথের দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা খুঁজতে থাকে রফিক। টাকা বেশি দিয়ে, কালোবাজারির মাধ্যমে বা অন্য কোন মাধ্যমে সে বাসের টিকিট যোগাড় করতে পারেনা। নিরুপায় হয়ে যায় ট্রেনের খোঁজে। কিন্তু এখানেও আশাতীত কোন ফল পায়না সে। অবশেষে চিন্তা করে ট্রেনের ছাদে করে বাড়ি যাবে সে। উঠেও পড়ে সে গন্তব্যের পথে। ট্রেন পাড়ি দেয় তার স্বপ্নের পথে। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হতে চায়না। তাই ব্যাগ থেকে বোনের লাল জামাটা বের করে রাখে সে। বোনকে দেখলেই জামাটা দিয়ে দেবে। আর খুশি মুখের হাসিটা দেখে প্রাণ জুড়াবে। হাতে নিয়ে অপেক্ষা করে যশোর স্টেশনের।
কিন্তু পথিমধ্যেই রাস্তার পাত খুলে ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। রফিকসহ অন্যান্য যাত্রীরা মারাত্মক আহত হয়। ছাদ থেকে পড়ে যায় সে। ট্রেনের ১ টা বগি রফিকের পায়ের উপর পড়ে। চেষ্টা করেও বের হতে পারেনা। এছাড়া পড়ে গিয়ে মারাত্মক জখম হয় সে। দেহের সমস্ত শক্তি যেন শেষ হয়ে আসে তার। রক্তে ভেসে যায় তার জামা,মুখ আর হাতে থাকা বোনের লাল জামাটা। লাল জামাটা যেন আরো বেশি লাল হয়ে ওঠে। এতকিছুর পরও হাতছাড়া করেনা সে জামাটা। কথা বলতে কষ্ট হয় তার। চোখটা কষ্টে বুজে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার পরিবারের সকলের মুখ। ভেসে ওঠে তার মায়ের আদরের কথা। বাবার নধুর শাসনের কথা। বোনের জন্মের সময়টা, তার আবদার করার সময়কার মুখটা, আর তার হাসি মাখা মুখটা। বুঝতে পারে মৃত্যু তার সন্নিকটে। তখন তার মুখ দিয়ে বের হয় শুধু ১ টাই কথা।
-বুন! তোরে আর জামাডা দিতি পারলামনা। তোর আবদারডা রাখতি পারলামনা।
আর কোন শব্দ পাওয়া যায়না রফিকের মুখ থেকে। আশেপাশে শুধু কান্না আর আহাজারি। বগির নিচে পড়ে থাকে রফিকের মত আর অনেক রফিকের নিথর দেহ। যাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবতার কাছে হার মেনেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now