বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"বালাই"
ইমরান খান
-------------
৩ য় পর্ব
-------------
দুই নম্বর ওয়ার্ডের দিকে রওনা দিলেন ডাঃ রহমান।
পথে রিনার সঙ্গে দেখা, সে একজন নার্স, নাইট
ডিউটিতে ব্যস্ত এখন। ডাঃ রহমানকে দেখে সে
সেলাম দিল। ডাঃ রহমান তার দিকে চেয়ে অমায়িক
ভঙ্গিতে হাসলেন, অর্থাৎ, " খবর ভাল?"
হাসপাতালে আজ একটি নতুন রোগী ভর্তি
হয়েছে, ডাঃ রহমানই এনেছেন তাকে।
হাসপাতালের বাউন্ডারি পেরোলেই নুড়ি বিছনো
রাস্তা। তার ওপাশে ঘন শালবন। ডাঃ রহমান মাঝেমাঝেই
ঐ শালবনে ঢুকে পড়েন। একাকী হাঁটেন,
কখনো চুপচাপ বসে থাকেন ঘাসের ওপর,
কোথাও। কাজের ফাঁকে চুপচাপ প্রকৃতির
কোলে বসে থাকতে বড় ভাল লাগে তাঁর, মনে
হয় তাঁর আয়ু যেন বেড়ে গেছে, রিচার্জ হয়ে
গেছেন তিনি। আজ একটু বেশীই ভেতরে
চলে গিয়েছিলেন তিনি। ঘন শালবনের মধ্যে হঠাৎ
ফোঁসফোঁস শব্দ আর গোঙানির শব্দ শুনতে
পেলেন তিনি। কোনও হিংস্র পশু যেন প্রচণ্ড
রাগে গজরাচ্ছে। থমকে গেলেন ডাঃ রহমান। তিনি
যতদূর জানেন, এই জঙ্গলে কোনও হিংস্র পশু
নেই। তবে কি সাপ? কিন্তু এই শীতকালে তো
সাপ বেরনোর কথা নয়। তবে কি মেছোবাঘ? ডাঃ
রহমান পিছু হটলেন না। ভয়ের মুখোমুখি হওয়া
উচিত। প্রশ্রয় পেলেই ভয় ডালপালা মেলে মাথাচাড়া
দেবে। তাঁর হয়ত শালবন বিহারই বন্ধ হয়ে যাবে।
ডাঃ রহমান শব্দ লক্ষ্য করে এগোলেন,
কোনওরকম শব্দ না করে। একটা শালগাছের
গোড়ায় একটা অল্পবয়সী মেয়েকে উবু হয়ে
বসে থাকতে দেখলেন।
গোঙানির মতো শব্দটা আর শোনা যাচ্ছিল না।
কিন্তু মেয়েটি বসে বসে অল্প অল্প হাঁফাচ্ছিল।
ডাঃ রহমান সেদিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, " তুমি
কে? এই বনের ভেতর তুমি একা কি করছ?"
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত
স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, " আসসালামুআলাইকুম।"
ডাঃ রহমান মেয়েটিকে ভাল করে দেখলেন। বছর
পঁচিশ বয়স হবে, মাঝারি উচ্চতা, শ্যামরঙা মেয়েটির
চোখদুটি পদ্মপাতার মতো, রুক্ষ্ম চুল, পরনে
শতচ্ছিন্ন সুতির শাড়ি, খালি পা। ডাঃ রহমান মেয়েটির
সেলামের উত্তর দিয়ে বলল, " তুমি কোথা
থেকে আসছ? জঙ্গলে পথ হারিয়েছ? যাবে
কোথায়?"
" আমি অনেকদূর থেকে আসতেছি। যাব
হাসপাতালে। এদিকে নাকি একটা হাসপাতাল আছে। "
" তা আছে, কিন্তু সেখানে কেন? কে ভর্তি
হবে?"
" আমি। আমার মাথা খারাপ তো, তাই চিকিৎসা দরকার।"
মানসিক রোগী নিজেই নিজের চিকিৎসা করাতে
এসেছে, এমন ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে
সত্যিই বিরলতম। ডাঃ রহমান মেয়েটির চোখদুটোর
দিকে তাকালেন। কোনওরকম অশান্ত ভাব নেই
চোখে, দুটি চোখই অত্যন্ত উদাসীন। সুস্থ
স্বাভাবিক মানুষের চোখে এত উদাসীনতা থাকে
না। মানসিক অসুস্থতার কিছুটা লক্ষণ এর ভেতরে
আছে। ডাঃ রহমান মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে
এলেন। মেয়েটি জানাল তার নাম তরী।
কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রেখে বোঝা গেল,
তরী অতি শান্ত স্বভাবের মেয়ে। তাই তাকে
শান্ত রোগীদের ওয়ার্ডে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া
হল। দুজন নার্স তাকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে
গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরাল। পুরো সময়টা
সে চুপচাপ রইল। তখনো তাকে বেডে নেওয়া
হয় নি। ডাঃ রহমানের ঘরে চুপচাপ একটা চেয়ারে
বসেছিল সে আর নার্স তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছিল।
ঠিক এইসময় ঘরে ঢুকলেন জিন্নাত আলি। সাপ্তাহিক
পরিদর্শনে এসেছেন তিনি। তাঁর আবির্ভাবের
সাথে সাথে একটা ব্যাপার ঘটল। অতি শান্ত স্বভাবের
তরী হঠাৎ ভয়ানক ক্ষেপে উঠল।
একলাফে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, নার্সের
হাত থেকে ছিটকে পড়ল চিরুনি। দুই লাফে তরী
ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো লাফিয়ে পড়ল জিন্নাত আলির
গায়ের ওপর। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে
সকলেই হতভম্ব হয়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে
ওঠার আগেই তরীর আঁচড়ে কামড়ে জিন্নাত
আলির শরীরের বেশ কিছু জায়গা ক্ষতবিক্ষত
হয়ে গেল। ডাঃ রহমান সহ তিনজন ডাক্তার, একজন
নার্স আর একজন শক্তসমর্থ দারোয়ানের
সাহায্যে তরীকে অনেক কষ্টে ছাড়ান হল। এই
কাজ করতে গিয়ে তরীর গায়ে কতখানি শক্তি
টের পেলেন ডাঃ রহমান। আসুরিক শক্তি মেয়েটির
গায়ে। অন্তত পাঁচজন পালোয়ানের মিলিত শক্তির
চেয়ে ঢের বেশি তো হবেই।
অতি কষ্টে তরীকে চেয়ারে বসিয়ে চেপে
ধরে রাখল সবাই। তরী তখনো অগ্নিদৃষ্টিতে
চেয়ে আছে জিন্নাত আলির দিকে। চুল
এলোমেলো হয়ে তখন দু এক গোছা তার
আগুনজ্বলা চোখের ওপর দিয়ে ঝুলে
পড়েছে। নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। ওর
জ্বলন্ত চোখদুটো দেখে ডাঃ রহমানের কেন
জানে সিতারার মুখে শোনা শয়তানের চোখের
বর্ননার কথা মনে পড়ে গেল। সবচেয়ে বড়
কথা, তরী গোঙাচ্ছে। ঠিক সেই গোঙানি যা ডাঃ
রহমান শালবনে শুনেছিলেন। কোনও মানুষ যে
এভাবে গজরাতে পারে, তা তাঁর ধারণারও বাইরে
ছিল।
আচানক এই ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন
জিন্নাত আলি। ডাঃ রহমান তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, "
জিন্নাত আলি সাহেব, মেয়েটা যে কোনও
কারণেই হোক, আপনাকে সহ্য করতে পারছেন
না। আপনার এখন এখানে না থাকলেই ভাল হয়। তাছাড়া
আপনার এখন ফার্স্ট এইড দরকার। নার্স!"
বাঁ হাত দিয়ে চশমাটা ঠিক করে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে
গেলেন জিন্নাত আলি। তরীও ধীরেধীরে
শান্ত হয়ে এল। তবে তাকে শান্ত ওয়ার্ডে রাখার
পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। একবার যখন ক্ষেপে
উঠেছে তখন যে কোনও সময় এই ঘটনার
পুনরাবৃত্তি হতে পারে। দুই নম্বর ওয়ার্ডে বেড
আর একগোছা শেকল বরাদ্দ হল তার জন্য।
জিন্নাত আলি রাতেই ঢাকায় ফিরবেন। তাঁকে গাড়ি
পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন ডাঃ রহমান। জিন্নাত
আলি বললেন, " ডাঃ রহমান, ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।"
ডাঃ রহমান শার্টের একটা বোতাম খুলে দিয়ে
বললেন, " আমিও না।"
" মেয়েটি কে?"
" মেয়েটি আজই ভর্তি হয়েছে। ওর নাম তরী।"
" তরী!", জিন্নাত আলি যেন একটু চমকালেন। ডাঃ
রহমানের তা নজর এড়াল না। তাই বললেন, "
চেনেন নাকি?"
জিন্নাত আলি একটু আমতা আমতা করে বললেন, "
না, মানে নামটা একটু আনকমন নয় কি?"
" তা ঠিক।"
" ও আমায় দেখে অত ক্ষেপে উঠল কেন?"
" বুঝতে পারছি না। আপনি আসার আগে পর্যন্ত
ঠিকই তো ছিল। এর কারণ হয়ত আপনার চশমা। "
" কি?"
" হ্যাঁ, ওইসময় ওই ঘরে একমাত্র আপনি ছাড়া আর
কারোর চোখেই চশমা ছিল না। কিছু কিছু মানসিক
রোগীর কোনও কোনও নির্দিষ্ট জিনিসের
ওপর ব্যাখ্যাহীন আক্রোশ থাকে। তবে এ
নিয়ে চিন্তিত হবেন না। মানসিক রোগীর সব
আচরণ চট করে ঠিক বোঝা যায় না।"
" আর সুস্থ মানুষের?"
" জ্বি?"
" সুস্থ মানুষের সব আচরণ কি বোঝা যায়, ডাঃ
রহমান? "
" আপনার কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আপনি ঠিক
কি বোঝাতে চাচ্ছেন? "
" কিছু না, চলি।"
জিন্নাত আলি গাড়িতে চড়ে হুশ করে বেরিয়ে
গেলেন।
সিতারা বলছিল হাসপাতালে আজ বালাই ঢুকেছে।
তরী ছাড়া তো গত কয়েকদিনে হাসপাতালে
কেউ ভর্তি হয় নি। সিতারা কি তবে তরীকেই বালাই
বলেছে? তার চেয়েও বড় কথা, হাসপাতালে যে
নতুন রোগী এসেছে আর সে যে আজই
ভর্তি হয়েছে, সেকথা সিতারা জানবে কিভাবে?
আজ সন্ধ্যায় ডাঃ রহমানের ঘরে যে হাঙ্গামা হয়ে
গেল, সেটা কি সিতারার কান অবধি পৌঁছেছে? অথচ
এমন তো হবার কথা নয়, হাসপাতালের প্রত্যেকটা
ঘরই সাউন্ডপ্রুফ। রোগীদের শান্তি নির্বিঘ্ন
রাখতেই এই ব্যয়বহুল ব্যবস্থা অবলম্বন করতে
হয়েছে। কঠোর যুক্তিবাদী মানুষ ডাঃ রহমান,
নিরেট যুক্তি ছাড়া কোনও কিছুই বিশ্বাস করেন না।
কিন্তু এই মূহুর্তে যে অজানা আশঙ্কা তার মনকে
ক্রমশ গ্রাস করছে, তার পেছনে তিনি কোনও
যুক্তি খুঁজে পেলেন না।
তরীর কেবিনের সামনে এসে একমূহুর্ত
থামলেন ডাঃ রহমান।
অনুভব করলেন একজন ডাক্তার হয়ে রোগীর
কেবিনে ঢুকতে একটু ভীতি অনুভব করছেন
তিনি। সামান্য লজ্জিত হলেন ডাঃ রহমান। বড় একটা শ্বাস
নিয়ে তিনি কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকে
পড়লেন ভেতরে। চিত হয়ে সটান শুয়ে
রয়েছে তরী। দেখেই বোঝা যায়, ঘুমিয়ে
রয়েছে। তার হাতদুটো শেকল দিয়ে খাটের
রডের সাথে বাঁধা। নিঃশব্দে খাটের পাশে রাখা
চেয়ারে বসলেন ডাঃ রহমান। একটু ঝুঁকে গভীর
মনোযোগ সহকারে তরীর মুখের ওপর
ঝুঁকলেন ডাঃ রহমান। চোখের বন্ধ পাতার ওপর
দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বুঝতে চেষ্টা করলেন,
মেয়েটি কোনও স্বপ্ন দেখছে কিনা। স্বপ্ন
বিশ্লেষণ করে কোনও মানুষের মানসিকতা
আন্দাজ করা যায়। দেখলেন, তরীর চোখের
পাতার আড়ালে চোখের মণিদুটো একেবারেই
স্থির, এদিকওদিক নড়ছে না একটুও। অর্থাৎ
মেয়েটি গভীর ঘুমে, থিটা লেভেলে আছে।
ঘুমের এই স্তরে মানুষ কখনো স্বপ্ন দেখবে
না। মানুষ স্বপ্ন দেখবে হালকা স্তরে, আলফা
অথবা বিটা লেভেলে।
ডাঃ রহমান এবার তরীর শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে
মনোযোগ দিলেন। ঘনঘন, অনিয়মিত বা খুব
ধীরলয়ে শ্বাস প্রশ্বাস অসুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু
তরীর মধ্যে সেরকম কোনও সিম্পটম দেখা
গেল না। দিব্যি একজন সুস্থ, ঘুমন্ত মানুষের
মতো শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছে। এই মেয়ের সমস্যা
ঠিক কোথায় তা বোঝা যাচ্ছে না। কথা বলে সুস্থ
মানুষের মতো, আবার হঠাৎ ক্ষেপেও ওঠে।
কাল এই মেয়ের সাথে ভালভাবে কথা বলতে
হবে। তরীর দিকে আরেকবার তাকাতেই
হৃদপিন্ডটা ধড়াস করে উঠল ডাঃ রহমানের। তরীর
চোখদুটো খোলা, মরা মাছের মতো স্থির দৃষ্টি
মেলে সে তাকিয়ে আছে ডাঃ রহমানের দিকে।
তাকে দেখে মনে হতে পারে সে মৃত।
শ্বাসপ্রশ্বাসও চলছে কিনা সন্দেহ। দুই চোখে
শীতল, সর্পিল দৃষ্টি। ওই জীবন্মৃত চোখদুটো
যেন শুকনো একখণ্ড ব্লটিংপেপারের মতো ডাঃ
রহমানের গলার সবটুকু আদ্রতা শুষে নিয়ে একটা
শুষ্ক বালুচরে পরিণত করল। কোনওরকমে
ঢোক গিলে ডাঃ রহমান বললেন, " তুমি
ঘুমোওনি?"
" জিন্নাত আলি কোথায়?", অদ্ভুত ঠাণ্ডা গলায়
জিজ্ঞেস করল তরী। ডাঃ রহমানের মনে হল,
বহুকাল আগের মৃত কোনও মানুষ বুঝি হঠাৎ
জেগে উঠে কথা বলছে।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now