বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বালাই—পর্ব ২

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "বালাই" ইমরান খান ------------ ২ য় পর্ব ------------ চশমাটা চোখে দিয়ে বই খুললেন ডাঃ রহমান। এম. আর. জেমসের লেখা ভূতের গল্পের বই। গভীর রাতে কেন জানে তাঁর ভারী, বাস্তবধর্মী বই পড়তে ভাল লাগে না। তিনি মনে করেন, সব মানুষেরই উচিত, বাস্তব জগত থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও কল্পনার জগতে ঘুরে আসা। এতে শরীর -মন দুই-ই তাজা হয়। আর কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়ানোরর জন্য ভূতের গল্পের চেয়ে কিছু ভাল আছে বলে মনে হয় না। কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতালের সমস্ত ওয়ার্ডগুলোতে এক রাউন্ড চক্কর লাগিয়ে এসেছেন তিনি। একটু পরে যাবেন আবারও। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে চক্কর লাগানোর ফাঁকে গল্পের বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করেন তিনি, চায়ের কাপে, সিগারেটের ধোঁয়ায় আর নিজের মনের অলিগলিতে। দ্বিতীয় সিগারেট ধরালেন ডাঃ রহমান। ভাবতে বড় ভাল লাগে তাঁর। মানবজীবনটা বড়ই রহস্যময় লাগে তাঁর কাছে। দুদিনের এই জীবন নিয়ে কতই না আয়োজন মানুষের। সত্যিই কি জীবনটা দুদিনের? অধিকাংশ মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে, সত্যিই কি জীবনটা তাই? কতই না তাৎপর্যহীন জীবন কাটায় বেশীরভাগ মানুষ। খাওয়া, ঘুম, গোসল করা, বাথরুম করা, যৌনতা ছাড়াও আর একটা কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে অধিকাংশ মানুষ.... টাকা কামানো। ডাঃ রহমানের কাছে জীবনটা আরও প্রসারিত। টাকার প্রয়োজন আছে বটে, কিন্তু যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু। বিলাসিতা ডাঃ রহমানের একেবারেই অপছন্দ। যেমন শো পিস। যে জিনিস শারীরিক অথবা মানসিক ভাবে কোনও কাজে আসছে না, সেই জিনিস ঘরে সাজিয়ে রেখে লাভ নেই। আর বইয়ের চেয়ে ভালো শো পিস কিছু আছে বলে মনে করেন না ডাঃ রহমান। এক সেলফ ভর্তি বইয়ের চেয়ে দৃষ্টিনন্দন আর কিছু থাকতে পারে? মোবাইলে এলার্ম বাজতেই সচকিত হয়ে ওঠে ডাঃ রহমান। নিজের মস্তিষ্কটাকে মাঝেমাঝে আটলান্টিক মহাসাগর মনে হয়, তাঁর কাছে। ভাবনার এতই গভীরে তলিয়ে যান যে সময়ের ব্যবধান মুছে যায়। নিজেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে সেলফোনে এলার্ম দিয়ে রাখেন তিনি। এলার্ম শুনে বুঝতে পারেন, হাসপাতালে চক্কর দেবার সময় হয়েছে। আধপোড়া সিগারেটটা এসট্রেতে গুঁজে, বইটা বন্ধ করে উঠে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে। স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে হাঁটা দিলেন রোগীদের ওয়ার্ডের দিকে। আপাতত হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ড....ওয়ার্ড এ এবং ওয়ার্ড বি। একটি ওয়ার্ড শান্তশিষ্ট রোগীদের জন্য, যারা সাইকোলজিক্যাল ডিসওর্ডারড ঠিকই, কিন্তু কোনও পাগলামি করে না। নিজের মনে থাকে, আপনমনে কথা বলে। অন্য ওয়ার্ডটি হচ্ছে যারা সুযোগ পেলেই পাগলামি করে, যাকে সামনে পায়, তাকেই মারতে আসে, এমনকি নিজেকে মারাত্মকভাবে আহত করার প্রবণতাও দেখা যায়। এদের সাধারণত ঘুমের ওষুধ বা ইঞ্জেকশন দিয়ে, বা এনেস্থিসিয়া দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। ঘুমোনর পর হাতে পায়ে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি হালকা অথচ মজবুত বেড়ি পরিয়ে রাখতে হয়। নইলে কে জানে, রাতে ঘুম ভেঙে কার ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে। আবার কয়েকজন আছে, যাদের চব্বিশ ঘন্টাই ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখতে হয়। অতিশয় বিপজ্জনক এরা। প্রথমে শান্ত ওয়ার্ডটির দিকে রওনা হলেন ডাঃ রহমান। এই ওয়ার্ডের একটি রোগী সম্প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তার নাম সিতারা। অশিক্ষিত, মধ্যবয়স্কা ও অন্ধ এই মহিলার বাড়ি এখান থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরের এক গ্রামে। তার স্বামী তাকে এখানে রেখে গেছে। তার ভাষ্যমতে, সিতারা তন্ত্রমন্ত্র চর্চা করত। তাদের গ্রামের কবরস্থানে এক সন্ন্যাসী আশ্রয় নিয়েছিল। সিতারা কিভাবে যেন তাকে খুশী করে তার কাছ থেকে তান্ত্রিক দীক্ষা নিয়েছিল। সন্ন্যাসী একদিন চলে গেল, কিন্তু সিতারা তন্ত্রসাধনা ছাড়ল না। এ'ও এক ধরনের নেশা। যা কিছু নিষিদ্ধ, তাই আকর্ষণীয়। তন্ত্রসাধনা করতে করতে সিতারা রাত-দিন এক করে ফেলল। সন্ন্যাসী তাকে একটি সীমারেখা বেঁধে দিয়ে গিয়েছিল, যা সে মানেনি। সিতারা স্বচক্ষে শয়তানকে দেখতে চেয়েছিল, যার পূজা তান্ত্রিকরা যুগ যুগ ধরে করে আসছে। সন্ন্যাসী তাকে বলেছিল, যার আরাধনায় শয়তান তুষ্ট হয়, তাকে সে একবার দেখা দেয়। আর শয়তানকে একবার দেখে নিতে পারলে অসীম ক্ষমতা এসে যাবে তার হাতে। বহুদূর থেকেও শায়েস্তা করতে পারবে তার শত্রুকে, চাইলেই লাখ লাখ টাকা জমা হবে তার ভাঙা আলমারিতে, আসন্ন বিপদের সম্ভাবনা আগে থেকে বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে। তবে সন্ন্যাসী একটা ব্যাপারে সিতারাকে সতর্ক করেছিল, শয়তানের চেহারা স্বচক্ষে দেখার সহ্যক্ষমতা থাকা চাই। আর সহ্য না করতে পারলে, ক্ষমতা তো দূরের কথা, হয় সে মারা যাবে নয়তো বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাবে। সিতারার দ্বিতীয়টি হয়েছে। তার স্বামী বলেছিল, অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার লোভ সিতারাকে অন্ধ করে দিয়েছিল। রাতভর জেগে সে তন্ত্রসাধনা করত। এক রাতে সিতারার মরণ চিৎকার শুনে তার স্বামীর ঘুম ভেঙে যায়। সে ছুটে পাশের ঘরে গিয়ে দেখে, সিতারা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে আর তার দুচোখ ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। একটা খুব দ্রুত অপসৃয়মান অতিকায় ছায়াও সে দেখতে পেয়েছিল ঐ সময়। তবে সেই ছায়া শয়তানের ছিল কিনা না তার চোখের ভুল, তা সে বলতে পারে না। তবে সবার ধারণা, শয়তানকে দেখে তার ঐ রূপ সিতারা সহ্য করতে পারেনি। ক্ষমতার লোভ তাকে অন্ধ ও উন্মাদ করে দিয়েছিল। ডাঃ রহমানের অবশ্য ধারণা, ভন্ড এক সন্ন্যাসীর প্রলোভনে পড়ে অশিক্ষিত এই মহিলার মানসিক বৈকল্য দেখা দিয়েছে। আর শয়তানকে দেখতে না পারার ক্ষোভে সে নিজেই নিজের চোখ গলে দিয়েছে। কিন্তু এই মহিলাটির দু একটি ব্যাপার তাকে বিস্মিত করে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে, কেউ ওর ঘরে ঢুকলে সিতারা সহজেই বুঝতে পারে এবং কে ঢুকেছে, তাও বলে দিতে পারে। আজও যেমন ডাঃ রহমান নিঃশব্দে ঘরে ঢুকতেই সিতারা বলে উঠল, " আসুন, ডাক্তারবাবু, কেমুন আছ?" ডাঃ রহমানের পায়ে রবারসোলের জুতো এবং স্বভাবতই তিনি নিঃশব্দে হাঁটেন। সিতারার ঘরে ঢোকার সময় তিনি আরও নিঃশব্দে ঢুকেছেন। কিন্তু সিতারার সঠিক অনুধাবন তাঁকে প্রতিদিনের মতো বিস্মিত করল। তাঁর কঠোর যুক্তিবাদী মনটা ঈষৎ টলে উঠেই আবার স্থির হয়ে গেল। তিনি জানেন, দৃষ্টিশক্তিহীন মানুষের শ্রবণশক্তি স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে একটু বেশী প্রখর হয়। এমনকি যে শব্দ সাধারণত কানে বাজে না, সেই শব্দও এদের কর্ণগোচর হয়। কিন্তু এতটাই কি প্রখর হয় যে নিস্তব্ধতাও শুনতে পায়? ডাঃ রহমান সিতারার বেডে তার পাশে বসে বললেন, " ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?" ফোকলা দাঁতে হেসে সিতারা বলল, " ভালোই।" ডাঃ রহমান সিতারার ব্লাড প্রেশার মাপলেন, হৃদস্পন্দন পরীক্ষা করলেন, তারপর বললেন, " আমি ঘরে আসলে আপনি টের পান কিভাবে?" আবার হাসল সিতারা। বলল, " শুধু তুমি না, যে কেউ আউক, আমি ঠিক টের পামু। ওই যে ছুকরি নার্সটা....কি যেন নাম, একটু আগে আমার ঘরে উঁকি দিয়া গেল, তাও টের পাইছি।" " কিভাবে টের পান? শব্দ শুনে?" এই কথায় সিতারা তো হেসে বাঁচে না, বলে, " ধুয়ো যা ডাক্তার, কি যে কও! শব্দ শুইন্যা কি মানুষ চিনন যায়? তুমি যখন ঘরে ঢুক্যাইছ, তুমি কি শব্দ কইরাছ? কর নাই। আমি মানুষ চিনি গন্ধ শুঁইক্যা।" বলে কি মহিলা! ডাইনে বামে মাথা নেড়ে হাসলেন ডাঃ রহমান। বললেন, " মানুষ কি কুকুর যে গন্ধ শুঁকে চিনতে পারো?" " না, মানুষ কুত্তা নয়। তয় শয়তানও কুত্তা নয়।" চমকে উঠলেন ডাঃ রহমান। সিতারা কি থট রিডিং জানে নাকি? এই ধরনের রোগী তিনি জীবনে দেখেন নি। মানসিক রোগীদের টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা প্রখর হয় কিনা তাঁর জানা নেই। তিনি এবার জিজ্ঞেস না করে পারলেন না, " আমি কি ভাবছি, আপনি কি করে জানলেন? " " বুঝি, বুঝি। শয়তানের চেহারাডা ঠিকমতো দেহাইতে পারিলে আরও কিছু দেহাইতে পারিতাম। " " শয়তানের চেহারাটা কেমন? ", সিতারার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে জিজ্ঞেস করলেন ডাঃ রহমান। " ঠিকমতো তো দেহিতে পারি নাই। যদ্দুর দেহেছি, আর দেহনের সাধ নাই। তার কয়লার লাহান দুইখানা চক্ষু দেহিয়াছি, সেই চক্ষের আগুনে আমার চক্ষুদুইখানা জ্বইল্যা গিয়াছিল, আর কিছু মনে নাই। তয় আমার মন্ত্রতন্ত্র এক্কেবারে ফেল মাইরে নাই, বুঝলা? কিছু কিছু আগে থেইক্যাই বুঝিতে পারি, গন্ধ শুঁইক্যা। তোমারে একখানা কথা কমু, আমল দিয়া শুইনো, কহিত্যাছি।" " জ্বি, বলুন। " " দাঁড়াও, কেউ শুনত্যাছে কিনা বুইঝ্যা লই।" চোখদুটো বন্ধ করে নাক উপরে তুলে নেকড়ের মতোইই শব্দ করে নিশ্বাস নিল সিতারা। তারপর ডাঃ রহমানের দিকে ঝুঁকে পড়ে নিচু গলায় বলল, " হাসপাতালে বালাই ঢুক্যাইয়াছে। চোখকান খোলা রাইখো।" " মানে?" " আইজ রাইতের আকাশের চাঁদডা দেহিয়াছ?" " চাঁদ? হ্যাঁ, দেখেছি। তো?" " চাঁদডা একটু তেরছ্যা উঠছ্যা, খেয়াল কইরা দেহ।" " কি করে বুঝলেন? গন্ধ শুঁকে? আপনি চাঁদেরও গন্ধ পান বুঝি?" ফোকলা দাঁতে হাসল সিতারা। বলল, " টের পাই। আইজ বড় খারাপ রাইত। সাবধানে থাইকো। হাসপাতালে বালাই ঢুকত্যাছে।" " বালাই জিনিসটা কি?" " হেইডা ঠিক জানি না। এত ক্ষমতা তো পাই নাই। হেইরা এক ধরনের পিশাচ। ভালও হতে পারে আবার মন্দও.....হেই বালাইডা ভাল না মন্দ, তা বুঝত্যাছি না। ভাল হলে তো ভালোই, কিন্তু যদি খারাপ হয়......" " খারাপ হলে কি হবে?" " সায়লাব আসবে।" (চলবে)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ বালাই—পর্ব ৭
→ বালাই—পর্ব ৬
→ বালাই—পর্ব ৫
→ বালাই—পর্ব ৪
→ বালাই—পর্ব ৩

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now