বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"বালাই"
ইমরান খান
-------------
১ ম পর্ব
-------------
রাস্তার ওপাশে শেষ দোকানের আলোটাও
নিভে গেল। শীতজর্জর অন্ধকারে আরেকবার
চোখ বুলিয়ে নিয়ে সিগারেটের শেষ টুকরোটা
ক্যারাম বোর্ডের গুটির মতো টোকা দিয়ে
ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ডাঃ রহমান। নিশ্ছিদ্র
অন্ধকারে আলো ছড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা
করতে করতে সেটা কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে
গেল। জানলার সার্শি টেনে দিয়ে নিজের রিভলভিং
চেয়ারে এসে বসলেন ডাঃ রহমান। নাইট ডিউটি
করতে মন্দ লাগে না তাঁর। তাঁর ইনসমনিয়া আছে।
অতিশয় কষ্টদায়ক এই রোগটিকে কাজে লাগান
গেছে হাসপাতালে এই চাকরীটা নিয়ে।
' আখতার বানু মেমোরিয়াল সাইকোলজিক্যাল
ক্লিনিক ' একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ঢাকা থেকে
সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দূরে এক অজপাড়াগাঁয়ে
এর অবস্থান। জিন্নাত আলি নামে ঢাকার একজন প্রথম
স্থানীয় শিল্পপতির স্বপ্নের সার্থক বাস্তবায়ন এই
ক্লিনিক। জিন্নাত আলি তাঁর স্ত্রী আখতার বানুকে
অত্যধিক ভালবাসতেন। আখতার বানুও তাই। ঈর্ষা করার
মতো সুখী দম্পতি ছিলেন তাঁরা।
একটাই অপূর্ণতা ছিল তাঁদের, তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান।
ডাক্তার দেখিয়েছেন দুজনে বিস্তর। কোনও
লাভ হয় নি। শুধু জানা গিয়েছে, সমস্যাটা জিন্নাত
আলির। সন্তান দত্তক নেবার কথাও ভেবেছিলেন
দুজনে।
তার আগেই আখতার বানু, কে জানে কেন, মানসিক
রোগে আক্রান্ত হন। রাতে ঘুমোতেন না
আখতার বানু, ঘরময় নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াতেন আর
বিড়বিড় করে কিসব বলতেন।
খুব খেয়াল করে কান পাতলে শোনা যেত তিনি
কিছু অর্থহীন অবোধ্য শব্দ উচ্চারণ করছেন...
... নারা রিকা রিসা বিও....নারা রিকা রিসা বিও.....।
তাঁর সঙ্গে জিন্নাত আলিকেও রাত জাগতে হত।
ভাগ্যের কি পরিহাস, জিন্নাত আলির প্রিয়তমা স্ত্রী
একসময় জিন্নাত আলিকে অপছন্দ করতে শুরু
করলেন। ক্রমশ ঊর্ধগামী এই অপছন্দ একসময়
চূড়ান্ত ঘৃণার রূপ নিল এবং আখতার বানু একসময় বলতে
শুরু করলেন, তাঁর গর্ভে সন্তান এসেছিল কিন্তু
জিন্নাত আলি সেই সন্তানকে হত্যা করেছেন।
সম্ভবত জিন্নাত আলির সন্তান জন্মদানের
অক্ষমতাকে নির্দেশ করতেন তিনি। প্রিয়তমা
স্ত্রী র মুখে এসব প্রলাপ জিন্নাত আলিকে
অত্যন্ত মনোকষ্ট দিত। তবু নিজেকে সামলে
স্বাভাবিক জীবনযাপনের চেষ্টা করতেন তিনি।
মনোবিকারগ্রস্ত মানুষের কথায় রাগ করার কোনও
মানেই হয় না।
অবশেষে এল একদিন সেই অভিশপ্ত দিন।
এপার্টমেন্টের বাইশ তলার ব্যালকনি থেকে ঝাঁপ
দিয়ে সুইসাইড করেন আখতার বানু। সকালবেলা
লাশের আঙুলে বিয়ের আংটি দেখে শনাক্ত
করেন জিন্নাত আলি।
বাইশ তলা থেকে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়েছিলেন
আখতার বানু। চেহারা থেঁতলে বীভৎস হয়ে
গিয়েছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে প্রকাশিত
হল, মৃত্যুর সময় আখতার বানু সন্তানসম্ভবা ছিলেন।
জিন্নাত আলি বললেন, এই সন্তান তাঁরই ছিল, অনেক
চিকিৎসা করাবার পর অবশেষে তাঁরা বাবা-মা হতে
চলেছিলেন।
দু একদিনের মধ্যেই তাঁরা এই সুখবরটা প্রকাশ
করতেন। স্ত্রী এবং অনাগত সন্তানকে
একসঙ্গে হারিয়ে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত জিন্নাত
আলি কিছুদিন সবার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে
রাখলেন। স্ত্রীকে সুস্থ করতে তাঁর চেষ্টার
ত্রুটি ছিল না।
দেশের সকল শীর্ষস্থানীয় মনোরোগ
বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছিলেন তিনি; এমনকি
স্ত্রীকে বিদেশেও নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু
কোনও ফল পান নি। এসবই বছর পঁচিশেক আগের
কথা।
জিন্নাত আলির অভিযোগ, যত নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট তিনি
দেখিয়েছিলেন, তাঁরা প্রফেশনাল হলেও
আন্তরিক নন কেউই। মানসিক ভাবে অসুস্থ একজন
রোগীকে চিকিৎসা করার চেয়ে সবচেয়ে
আগে ভালবাসা দরকার। তিনি নিয়ত করলেন, সৃষ্টিকর্তা
যদি সামর্থ্য দেন তাহলে তিনি মানসিক
রোগীদের জন্য একটি উচ্চমানের দাতব্য
চিকিৎসালয় স্থাপন করে দেবেন।
এইজন্য তিনি নিরিবিলিতে একটি সুপ্রশস্ত জায়গার
খোঁজ লাগালেন। পেয়েও গেলেন একসময়।
তারপর এই আড়াই বিঘে জমির ওপর গড়ে উঠল
একটি অত্যাধুনিক মানের মানসিক হাসপাতাল....আখতার
বানু মেমোরিয়াল সাইকোলজিক্যাল ক্লিনিক। জিন্নাত
আলি ইচ্ছে করেই ' মেন্টাল' শব্দের
পরিবর্তে ' সাইকোলজিক্যাল ' শব্দটা ব্যবহার
করলেন।
'মেন্টাল' শব্দটা শুনলেই কেমন যেন পাগল পাগল
মনে হয়। অথচ মানসিক রোগী মাত্রেই কিন্তু
পাগল নয়। পঁচিশ বছর পর নিজের নিয়তের সার্থক
পরিণতি ঘটালেন তিনি। এই হাসপাতালের জন্য ডাক্তার,
নার্স এবং দারোয়ান চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল।
অফার করা হল আকর্ষণীয় বেতন। নইলে ঢাকা
ছেড়ে এই অজগাঁয়ে আধুনিক ডাক্তাররা আসবেন
কেন।
জিন্নাত আলি আবেদনকারীদের কাছে সনির্বদ্ধ
অনুরোধ করেন, রোগীদের সত্যিকার
ভালবাসতে না পারলে যেন আবেদন না করা হয়।
চিকিৎসা করতে হবে মমতা মিশিয়ে। অনেক বাছাবাছির
পর আপাতত চারজন ডাক্তার নেওয়া হল।
এদের মধ্যে ডাঃ রহমান বয়োজ্যেষ্ঠ। তিনি
অবসরপ্রাপ্ত সাইকোলজিস্ট। জাতীয় মানসিক
স্বাস্থ্য হাসপাতালে দীর্ঘদিন কাউন্সেলর
হিসেবে কাজ করেছেন। অবসর নিলেও হিউম্যান
সাইকোলজি নিয়ে কাজ করার নেশাটা ছাড়তে
পারেন নি। মানব মনের দূর্গম গলি ঘুপচিতে ঘুরে
বেড়ানোটাও একটা নেশা। ডাঃ রহমান বিপত্নীক।
একমাত্র ছেলে বউ বাচ্চা নিয়ে বিদেশে থাকে।
নিঃসঙ্গতা আর কর্মহীনতা ক্রমে অসহ্য হয়ে
উঠছিল ডাঃ রহমানের কাছে।
তাঁর মনে হচ্ছিল, তাঁকে জোর করে অবসর
দেওয়া হয়েছে। তার ওপর ইনসমনিয়ার মতো
অনিদ্রাজনিত রোগটা তাঁকে একেবারে কাবু করে
ফেলেছিল। এই হাসপাতালে চাকরীটা নিয়ে তিনি
বেশ স্বস্তি পেয়েছেন। অনিদ্রা রোগটাকে
তিনি ব্যবহার করতে পারছেন। সারা রাত ডিউটি করেই
কাটিয়ে দেন।
হাসপাতালটা আপাতত আড়াইশো সিটসহ দোতলা করা
হয়েছে। পরে আরও বাড়ানো হবে।
হাসপাতালের পেছন দিকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে
ডক্টরস কোয়াটার্স। তার একটু ডানদিকে স্টাফ
কোয়াটার্স। পুরো কম্পাউন্ডটা বিশাল উঁচু পাঁচিল
দিয়ে ঘেরা।
ডাঃ রহমান নিজে যেচে হাসপাতালে নাইট ডিউটি
নিয়েছেন। একঘণ্টা পর পর তিনি পুরো হাসপাতালটা
চক্কর দেন। দুজন নার্স আর দুজন দারোয়ান
জেগে থাকে সারারাত। তাঁর টেবিলে সবসময়
ফ্লাস্কভর্তি চা রেডি থাকে। আর থাকে বই।
কোনও রোগীর কোনও অসুবিধে হলেই
নার্স এসে তাঁকে খবর দেয়, তিনি ছুটে যান।
জিন্নাত আলি প্রতি সপ্তাহে একবার এসে হাসপাতাল
পরিদর্শন করেন; ডাক্তার আর স্টাফদের সুবিধে
অসুবিধের খোঁজ নেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা
নেন। নিজের ব্যবসায়ীক কাজের বাইরে এই
প্রথম অন্য কোনও কাজে হাত দিয়েছেন তিনি।
মোটামুটি নির্জন জায়গা দেখেই হাসপাতাল
বানিয়েছিলেন জিন্নাত আলি। হাসপাতালের
আশেপাশে কোয়ার্টার মাইলের মধ্যে কোনও
জনবসতি নেই; শুধু শালবন আর ফসলের ক্ষেত।
এরপর গ্রাম আছে কয়েকটা। এই হাসপাতালকে
কেন্দ্র করে তিনটে চায়ের দোকান বসেছে
এই জনবিরল জায়গায়। দোকানদাররা ঐসব গ্রামেরই
বাসিন্দা। অফ টাইমে ডাক্তার আর স্টাফরা এইসব
দোকানগুলোতে চা খায়, আড্ডা দেয়।
পতিত জায়গা বলে এখনো সরকারি সোডিয়াম বাতি
বসে নি হাসপাতালের সামনের নুড়ি বিছনো পথে।
ফলে আশেপাশের চায়ের দোকানগুলো বন্ধ
হয়ে গেলেই সারা চরাচর অন্ধকারে ঢেকে যায়।
অথৈ সমুদ্রের মাঝে তখন এক টুকরো প্রবাল
দ্বীপের মতো আলোকিত হয়ে থাকে
হাসপাতালটা, জেনারেটরের আলোর দৌলতে।
এইসব এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছয়নি।
বেশ কেটে যাচ্ছিল হাসপাতালের দিনগুলি। কিন্তু ডাঃ
রহমানের মনে হচ্ছে আজ রাতটা বড়ই অশুভ।
(চলবে)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now