বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ইরাবান হাত বাড়িয়ে তার ব্যাঙ বৌয়ের স্যাঁতসেতে গায়ে আলতো হাত বোলাতে বোলাতে কান্না চেপে বলে, "না না তোমার আর কি দোষ বলো। সবই আমার কপাল।"
ব্যাঙ খুব নরম গলায় বলে,"তুমি খুব ভালো ইরাবান, তুমি খুব ভালো।" তারপরে রাজপুত্তুরের হাতের আঙুলের উপরে নিজের মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। রাজপুত্র ক্লান্তিতে ভেঙে ঘুমিয়ে পড়ে বলে টের পায় না যে সে ঘুমোলেই ব্যাঙ ছদ্মবেশ ত্যাগ করে হয়ে যায় এক অপরূপা রাজকন্যা। তার রূপের ছটায় ঘর আলো হয়ে যায়।
বেশ কয়েক দিন গেছে কেটে। রাজা এবার ঠিক করেছেন তার বৌমাদের পরীক্ষা নেবেন। প্রথমদিন হবে তাদের রন্ধনের পরীক্ষা। তিনি তার প্রিয় পদটি রান্না করার নির্দেশ দিলেন বৌমাদের। পরদিন সকালে তিনি তা চাখবেন ও নম্বর দেবেন। শুনে তো ইরাবানের মাথায় হাত। দুই দাদা হাসতে হাসতে চলে গেল, সে মাথা নীচু করে চোখের জল চেপে ঘরে এলো। এসে সে বসেই আছে, কপাল টিপে ধরে, দেখে ব্যাঙ কাছে এলো। বললো," কি হয়েছে,রাজপুত্র?"
রাজপুত্র টের পেয়েছে যে তার ব্যাঙ বৌ এমনিতে ভালো। তাই বললো," সে কথা শুনে আর কি করবে বৌ? যা হবার নয়,তা তো আর করতে বলতে পারিনা তোমায়।"
"কি সে জিনিস,ইরাবান?"
"বাবা তার প্রিয় পদটি রান্না করতে বলেছেন তার বৌমাদের। কাল সকালে তিনি তা খেয়ে দেখবেন কে কেমন রাঁধলো।তুমি তো মানুষ নও, ব্যাঙ, কিকরে তুমি রান্না করবে লুচি আর মাংসের ঝোল?"
"এই কথা? এই জন্য তুমি ভাবছো এত? ভেবো না, ঘুমোতে এসো, দেখো রাত পোহালে সব ঠিক হয়ে যাবে। জানোনা, রাত পোহালে বুদ্ধি বাড়ে?"
হতাশ ইরাবান ভাবে, না ঘুমিয়ে জেগে জেগে ভাবলেই কি আর সমস্যা সমাধান হবে? তার চেয়ে ঘুমোনোই ভালো। এই ভেবে সে তার ব্যাঙ বৌকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সে ঘুমোলেই ব্যাঙ ছদ্মবেশ খসিয়ে হয়ে যায় রাজকন্যা।
বিছানা ছেড়ে জানালার কাছে গিয়ে সে ডাকে তার যাদুকরী সহকারিণীদের। রাত্রির আকাশে উড়ে উড়ে এসে পড়ে তারা। সে বলে, "সখীরা, তোমরা বানাও সেরা ময়দার সেরা লুচি আর বানাও লবঙ্গ এলাচ দারুচিনি দেওয়া চমত্কার মশলাদার মাংসের ঝোল। সঙ্গে বড়ো বড়ো আলু দিতে ভুলো না যেন।ঠিক যেরকম আমার বাবা, যাদুকর সম্রাট, উত্সবের দিনে খেতে ভালোবাসতেন।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই সখীরা সব তৈরী করে, সোনারুপোর পাত্রে রেখে রেশমী রুমাল ঢাকা দিয়ে আবার উড়ে যায় আকাশে। রাজকন্যা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুম যায়।
পরদিন সকালে যখন সে আবার ব্যাঙের বেশে,তখন ইরাবান ওঠে ঘুম থেকে।সে তো লুচি মাংসের ঘ্রাণে অবাক।রেশমী রুমালের ঢাকনা সরিয়ে ফুলকো ফুলকো লুচি দেখে তো সে প্রায় মেঝেতে পড়ে যায়।সত্যি সত্যি তার ব্যাঙ বৌ এইসব বানিয়েছে? সে মহানন্দে সব নিয়ে চললো রাজার কাছে।সেখানে অন্য রাজপুত্ররা তখন এসে পড়েছিল।
প্রথমে বড়ো বৌমার হাতের রান্না চেখে দেখতে ঢাকনা খুললেন রাজা। লুচি তুলে ছিঁড়তে গেলেন, উ:, লুচি তো নয়, যেন চামড়া। কোনোক্রমে একটুকরো ছিঁড়লেন। তারপরে মাংসের ঝোলে ডুবিয়ে মুখে দিয়েই রাজা মহা খাপ্পা। এ কেমন ঠাট্টা! ঝোলে এতটুকু নুন নেই? রাজা রেগে বললেন," এ যা রান্না হয়েছে দশে চারও পাবে না। টেনেটুনে সাড়ে তিন।"
অপ্রসন্নমুখে বড়ো বৌমার খাবার একপাশে সরিয়ে রেখে রাজা এবার মেজো বৌমার লুচিতে হাত দিলেন। এ লুচি যদিও একেবারে চামড়া নয়, তবু সেরকম উঁচুদরেরও নয়। এবার মাংসের ঝোলে লুচির টুকরো ডুবিয়ে মুখে দিয়েই বিষম খেলেন রাজা। নুনে একেবারে পোড়া! এ জিনিস খেতে পারে মানুষে? রাজা রেগে লালচে হয়ে বললেন, "এই নাকি রাজাকে খেতে হলো!এই রান্না দশে পাবে মোটে দুই।"
রাজা হতাশ হয়ে ছোটো বৌমার খাবারের পাত্রের ঢাকনা সরালেন। এখানে লুচিগুলিকে দেখেই তিনি খুশী হয়ে উঠলেন। মুচমুচে ফুলকো লুচি। তিনি তুলে এক কামড় দিলেন। আহা, মুখে যেন অমৃতের স্বাদ। তিনি শুধু শুধু লুচিই খেয়ে নিলেন কয়েক কামড়। তারপরে মাংসের ঝোলের ঢাকনা খুলে খাবেন কি! সুগন্ধেই তো তিনি প্রায় বিবশ। তারপরে ধাতস্থ হয়ে লুচির খন্ড দিয়ে মুড়ে খানিকটা ঝোল আর মাংস খেলেন। একবার খেয়ে আবার খেলেন, আবার খেলেন। তারপর মুখ টুখ মুছে বলনে," হ্যাঁ, এই হলো প্রকৃত ভালো রান্না। রাজকীয় রান্না। বাবা ইরাবান, ছোটো বৌমার যদি এই রান্না হয়ে থাকে, তবে সত্যিই এর তুল্য আমি আর দেখিনি আমার সারা জীবনে। কত সময় কত দেশে গিয়েছি নিমন্ত্রণে আমন্ত্রনে উত্সবে অনুষ্ঠানে। খেয়েছি কতরকমের ভালো ভালো রান্না। কিন্তু এর তুল্য স্বাদ আমি আর কোথাও পাই নি আগে। শুধু একবার যাদুসম্রাটের দেশের উত্সবে নিমন্ত্রিত হয়ে প্রায় এইরকম জিনিস খেয়েছিলাম। ছোটো বৌমাই যদি এ জিনিস বানিয়ে থাকে সে দশে দশ পাবারই যোগ্য। বরং কয়েক নম্বর বোনাস পাবে, এক্সট্রা ক্রেডিট।"
ইরাবান মাথা নীচু করেই দাঁড়িয়ে ছিল।তাই সে দেখতে পায় নি দাদারা তার দিকে কেমন হিংসুটে চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে। রাজা হাত নেড়ে বড়ো দুই ছেলেকে চলে যেতে বললেন। তারপরে ছোটো ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন," খোকা, সেদিন তোকে নিয়ে সবাই অনেক ঠাট্টা ইয়ার্কি করেছিল। আমিও তো কোনো বাধা দিই নি ওদের।আমারও দোষ আছে। জানি তুই খুব কষ্ট পেয়েছিস। আজ তোকে আর তোর বৌকে ভালো ভালো উপহার দেবো। আর কষ্ট পাসনা, কেমন?"
ছোটো রাজপুত্তুরের চোখে জল আসছিল। কিন্তু সে কোনোক্রমে সামলে নিয়ে বললো," না না, ঠিক আছে। সবই আমার কপাল। তোমার দোষ কেন হবে? তোমার কোনো ত্রুটি নেই। উপহার দিতে হবে না। আমার ব্যাঙ বৌ কি করবে উপহার নিয়ে? সে তো আর মানুষ নয়, ব্যাঙ মাত্র। আর আমারও কিছু চাই নে, এমনিই আমার অনেক আছে।"
রাজা তার অভিমানী ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে ওর মাথার চুল ঘেঁটে দেন। জোর করে ওকে অনেক উপহার দেন। সোনার কুন্ডল, স্বর্ণহার, রেশমী কাপড়, ধাতুর তীর ও তূণ, কারুকাজ করা তীক্ষ্ণ তলোয়ার। ছোটো বৌমার জন্যও দেন স্বর্ণালংকার, রেশমবস্ত্র ইত্যাদি। ইরাবান সেসব নিয়ে হরিষে বিষাদে ঘরে ফিরে যায়।
আরো কেটে গেছে বেশ কিছুকাল। রাজার আবার খেয়াল চাপলো বৌমাদের পরীক্ষা নেবেন। এবারে কী পরীক্ষা? এবারে নেবেন বৌমাদের শিল্পদক্ষতার পরীক্ষা। তিনি নির্দেশ দিলেন এক সপ্তাহের মধ্যে প্রত্যেক পুত্রবধূকে তৈরী করে দিতে হবে সুন্দর রাজপোশাক। নির্দিষ্ট দিনে (এক সপ্তাহ পরে)তিনি তা পরে পরে দেখবেন ও নম্বর দেবেন। শুনে তো ইরাবানের মাথায় হাত। কি করে তার বেচারা ব্যাঙ বৌ বানাবে রাজপোশাক?
দুই দাদা হাসতে হাসতে চলে গেল, যাবার সময় তাকে ছোট্টো করে একটু টিটকিরি দিতেও ভুললো না। ইরাবান কোনোরকমে টলতে টলতে, হোঁচোট খেতে খেতে নিজের ঘরে এলো। এসে সে বসেই আছে, আলো জ্বালে নি, কিচ্ছুনা, বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবছে। মুখ তার রীতিমতো কালো হয়ে গেছে। ব্যাঙ তখন ঘরে ছিল না, ইরাবানের মহলের বাগানে ঘুরছিল।
ঘরে ফিরে ইরাবানকে অন্ধকার ঘরে মাথা টিপে ধরে বসে থাকতে দেখে চমকে গিয়ে থপ থপ করে কাছে এলো।বললো," প্রিয় রাজপুত্র, কী হয়েছে? কেন তোমার মুখ শুকনো? চোখ বসে গেছে? কী হয়েছে আমায় বলো।"
ইরাবান তার ব্যাঙ বৌকে হাতে তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে বলে,"কি হবে তোমায় বলে? শুধু শুধু দু:খ বাড়বে। বাবা আবার পরীক্ষা নিতে চান।এবার সব বৌমাকে বানাতে হবে রাজপোশাক। এক সপ্তাহ সময় দিয়েছেন।তারপরে তিনি পোশাক পরে দেখবেন আর নম্বর দেবেন।" এই পর্যন্ত বলে দু:খে বেচারার গলা বুজে যায়।
ব্যাঙ বৌ হেসে ওঠে। বলে,"এই কথা? এই জন্য তুমি এতো ভাবছো রাজপুত্তুর? মুখে হাসি নেই, ঘরে আলো নেই? ভেবো না রাজপুত্তুর। ভেবো না। নিশ্চিন্তে ঘুম যাও রাতে। দেখবে সকালে সব ঠিক হয়ে গেছে। জানোনা রাত পোহালে বুদ্ধি বাড়ে?"
ইরাবান তার ব্যাঙ বৌয়ের দিকে চেয়ে দেখে। আগেরবারের অবাক ব্যাপার স্মরণ করে তার মনে হয়, হয়তোবা হতেও পারে। ভাবে রাত জেগে জেগে বসে বসে ভাবলে কি আর সমস্যা সমাধান হবে? তার চেয়ে ঘুমোনোই ভালো। এই ভেবে সে তার ব্যাঙ বৌকে পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সে ঘুমোলেই ব্যাঙের ছদ্মবেশ খসিয়ে উঠে বসে যাদুকর সম্রাটের কন্যা,অপরূপা যাদুকরী বিশ্ববিমোহিনী ভানুমতী। তার রূপের ছটায় ইরাবানের ঘর দুলে ওঠে।
সে নবনীতকোমল দুগ্ধফেননীভ শয্যা ছেড়ে বাতায়নের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।মন্ত্র পড়ে ডাক দেয় তার যাদু সহকারিনীদের। রাতের আকাশে উড়ে উড়ে এসে পড়ে তারা।তখন ভানুমতী বলে,"সখীরা, তোমারা তৈরী করো সেরা রেশমের সেরা রাজপোশাক, ঠিক যেমনটি আমার বাবা উত্সবের দিনে পরতে ভালোবাসতেন। তাতে গেঁথে গেঁথে দিও মণি মুক্তা হীরা জহরত্। সঙ্গে আরো তৈরী করো সেরা উষ্ঞীষ, তাতে গাঁথা থাকবে মস্তো বড়ো আলো ঝলকানো হীরে।"
যাদুকরী রাজকুমারীর সহকারিনীরা সঙ্গে সঙ্গে কাজে লেগে যায়। প্রথম রাতে তৈরী হয় পোশাকের এক সপ্তমাংশ, তারপরে তারা উড়ে চলে যায়। রাজকুমারী আবার ব্যাঙের ছদ্মবেশ ধরে রাজপুত্র ইরাবানের পাশে শুয়ে পড়ে। এইভাবে প্রতি রাত্রে তৈরী হতে থাকে রাজপোশাক। ইরাবান এর কিছুই জানতে পারেনা।সে তখন থাকে ঘোর নিদ্রায় অভিভূত। সাত রাত কাজ হবার পরে রাজপোশাক ও উষ্ণীষ তৈরী শেষ হয়। সবকিছু গুছিয়ে ভাঁজ করে রেশমী ঢাকনায় ঢেকে এতদিন পরে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যায় যাদুকরী ভানুমতী।
পরদিন সকালে উঠে ইরাবান তো পোশাক দেখে একেবারে চমকে মেঝেতে পড়ে যায় আরকি। এত সুন্দর সূক্ষ্ম কারুকার্য করা মহার্ঘ্য পোশাক তো সে জীবনেও দেখেনি। এত হীরা মণিমুক্তা জহরত্ পান্না চুনী পোশাকে! আলো ঠিকরে যাচ্ছে রত্নগুলি থেকে। সদ্য ঘুমভাঙা চোখ একবার কচলিয়ে নিয়ে আবার ভালো করে দেখে ইরাবান। সত্যি এসব তৈরী করেছে তার ব্যাঙ বৌ? এ তো সামান্য ব্যাঙ নয়! নিশ্চয় এ ব্যাঙের ছদ্মবেশে অন্য কেউ।
সে তার ব্যাঙ বৌকে চেপে ধরে,"বলো তুমি কে? বলতেই হবে। নিশ্চয় তুমি ছদ্মবেশিনী। বলো তুমি কে।"
ব্যাঙ বলে,"আজকে নয় রাজপুত্র, দোহাই তোমার। আজকে আমাকে ছেড়ে দাও। সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে বলবো আমার সব কাহিনি। দয়া করে আজকে আমাকে ছেড়ে দাও, জোর কোরো না, তাতে খুব ক্ষতি হবে। কটা দিন ধৈর্য ধরো। দোহাই তোমার।"
ব্যাঙের গলা এত কাতর শোনালো যে ইরাবান তাড়াতাড়ি তার মুঠো আলগা করে ফেললো। অত্যন্ত অনুতপ্ত গলায় বললো,"আমি বুঝতে পারিনি। তোমায় আমি কক্ষণো জোর করবো না। তোমার যখন ইচ্ছে হবে তখনই বোলো।"
রাজার কাছে তিন রাজপুত্রই এসে পৌঁছলো প্রায় একই সময়ে। সঙ্গে রেশমী পেটিকায় তাদের বৌদের বানানো রাজপোশাক। প্রথমে রাজা বড়ো ছেলের হাত থেকে নিলেন পেটিকা। পোশাক বার করে ঝেড়ে খুললেন তার ভাঁজ।নিতান্ত সাদামাঠা পোশাক। রাজা অবহেলায় নিজের গায়ের উপরে ফেলে দেখে বললেন, "পোশাক হয়েছে বটে। তবে রাজার উপযুক্ত নয়। চাষীদের গায়ে মানাবে। মেরেকেটে এ পাবে দশে তিন।" শুনে বড়ো রাজপুত্রের মুখ ধূসর হয়ে গেল।
এরপরে মেজো ছেলের হাত থেকে পেটিকা নিয়ে পোশাক বার করলেন। কিন্তু যেই না ভাঁজ খুলতে গেলেন, অমনি বেকায়দার টানে সেলাই খুলে এলো। ফরফর করে উড়তে লাগলো পোশাকের রেশম কাপড়। পট পট করে খুলে পড়লো কয়েকটা সোনার বোতাম। রাজা তো রেগে মেগে একাকার। বললেন,"আমার সঙ্গে ঠাট্টা হচ্ছে? হ্যাঁ? এসব কী? এত সোনারূপো মণিমুক্তো সাঁটতে গেছে,অথচ সেলাইটুকু শক্ত করে করতে পারেনি? যাও,এ পাবে দশে আড়াই।"
এরপরে তিনি ইরাবানের হাতের পেটিকা খুললেন।খুলেই তার মুখ আলো হয়ে গেল।ঝলমলে সেই রাজপোশাক সতর্ক যত্নের সঙ্গে বার করলেন পেটিকা থেকে। নিজের পোশাকের উপরেই গলিয়ে নিলেন সেটি। উঁচুদরের সূক্ষ্ম সূচীকর্ম করা সেই পোশাক রাজ-অঙ্গে সগৌরবে শোভা পেতে লাগলো।অজস্র রত্ন থেকে আলো ঝলকিত হয়ে সকলের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। এরপরে পেটিকায় আবার উষ্ঞীষও আছে দেখে তো রাজা একেবারে আহ্লাদে আটখানা। রাজমুকুট খুলে রেখে তিনি সেই উষ্ঞীষ মস্তকে ধারণ করলেন।
রাজার মুখে হাসি তো আর ধরে না। বললেন,"হ্যাঁ, এই হলো প্রকৃত রাজপোশাক। এ তার থেকেও উঁচুদরের। এ সম্রাটের উপযুক্ত পোশাক। সত্যি করে বলো পুত্র ইরাবান, এ কি সত্যি তোমার ব্যাঙ বৌয়ের তৈরী করা?"
ইরাবান মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে বলে,"হ্যাঁ। তারই করা। আমার এর বেশী কিছু জানা নেই পিতা।"
তার দুই দাদা তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে ছিল।তারা এবার দুজনেই রাজাকে বললো,"পিতা, আমাদের অনুরোধ,আপনি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আপনার সব বৌমাদের তাতে নিমন্ত্রণ করুন। সকলে আসবে তাদের সেরা পোশাকে সেজে,সেই সভায় হবে তাদের রাজকীয় আদবকায়দার পরীক্ষা। এটা কি ভালো প্রস্তাব নয়?"এই বলে তারা একবার নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে হেসে নিল।
ইরাবান মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছিল, যেন রাজা কিছুতে রাজী না হন।রাজী হয়ে গেলে যে একেবারে সাড়ে সব্বোনাশ। কিকরে তার বৌ সভায় এসে রাজকীয় আদবকায়দার পরীক্ষা দেবে? সে যে মানুষই নয়, ব্যাঙ! কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধে হয়।জানাই তো আছে। রাজার শুনে খুবই পছন্দ হয়ে গেল প্রস্তাবটি। তিনি মহা উত্সাহে রাজী হয়ে গেলেন।
বললেন "ঠিক আছে,তাই হবে। আগামী শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সব বৌমা আসবেন আমার সভাগৃহে, সেখানে তাদের নিমন্ত্রণ।" শুনে ইরাবানের মুখ সাদা হয়ে গেল ভয়ে। কেমন করে এই পরীক্ষায় পাশ করবে তার বেচারা ব্যাঙ বৌ?
দাদারা হাসতে হাসতে নিজের মহলে যাবার সময় বলে গেল,"ইরাবান, তোর বৌকে সাজিয়ে গুছিয়ে আনিস কিন্তু। পিছলিয়ে না পড়ে লোকে। ব্যাঙের গা যা পেছল, বেকায়দায় কারু পা পড়লে আর দেখতে হবে না। সাবধানে, ইরাবান। ভগবান না করুন, বাবাই যদি পিছলে যান!"
ইরাবানের চোখে সত্যি সত্যি এবার জল আসছিল। কি অসহায় সে, কি নিরুপায়! কি করবে এবার? দু দুবার পাশ করে গেছে বৌ,কিন্তু এবার? শুকনো মুখে ঠোক্কর খেতে খেতে নিজের মহলে ফিরল ইরাবান। সে সত্যিই সব অন্ধকার দেখছিল এবার। এসে সে বসেই আছে মাথা নীচু করে,মুখে কোনো কথা নেই।
দেখে ব্যাঙ থপথপিয়ে কাছে এলো। বললো,"কী হয়েছে রাজপুত্তুর? কী হয়েছে তোমার? আমাকে বলবে না?"
ইরাবান তার ব্যাঙ বৌকে হাতে তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে ওর পিছলে গায়ে আঙুল বোলাতে লাগলো, কিন্তু কিছুতেই বললো না কি হয়েছে। ব্যাঙ বহু অনুনয় করলো, বহু কাকুতিমনতি করলো, কিন্তু ইরাবানের মুখে রা নেই। সে কিছুতেই বলবে না।
শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ব্যাঙ বললো, "ঠিক আছে বলবে না তো বলবে না। বয়ে গেল। কিন্তু এভাবে বসে বসে রাত কাটিয়ে দেবে নাকি? চলো ঘুমোতে চলো।"
ইরাবান এত ক্লান্ত ছিল যে এই কথা ঠেলতে পারলো না। কোনোরকমে খাটে এসে বিছানায় গা ঢেলে দিলো। ভাবলো, আ:, এবার ঘুমোতে হবে। কিন্তু ঘুমোতে সে পারলো না।বিছানায় শুয়ে ছটফট করতে লাগলো।এদিকে সে না ঘুমোলে তো ভানুমতীও ব্যাঙের ছদ্মবেশ ছাড়তে পারছে না! মহা মুশকিল।
রাজপুত্র একবার এপাশ একবার ওপাশ করে।কিছুতেই ওর চোখে ঘুম আসে না।ব্যাঙরূপী যাদুকরী রাজকন্যা চীনাংশুকের বালিশে মাথা দিয়ে শুয়ে মিটমিট করে দেখে,কখন ঘুমে চোখ বুজে আসে ইরাবানের। মাঝরাত প্রায় নিঘুমে পার হয় দেখে শেষে ভানুমতী নিদ্রা-যাদু প্রয়োগ করে। এবার আর কি করে না ঘুমিয়ে পড়ে জেগে থাকবে ইরাবান? ও ঘুমোলেই ছদ্মরূপ ছেড়ে ভানুমতী নিজের রূপ ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
এইভাবে দিন যায়,রাত কাটে।চাঁদ ক্ষয় হতে হতে একদিন মিলিয়ে যায়, অমাবস্যার আকাশে তারা ফুটফুট করে। যাদুতে ঘুমে অচেতন ইরাবানের পাশে জেগে বসে থাকে যাদুকরী। জানালা দিয়ে আকাশের ছায়াপথের দিকে চেয়ে চেয়ে তার চোখ জলে ভরে যায়। কতকাল সে নিজের মাকে বাবাকে দেখতে পায় নি!সেই যাদুরাজ্যের রাজপ্রাসাদ, সখাসখীরা, শোভন-উদ্যান,সভাগৃহ-স্বপ্নের মতো মনে পড়ে তার।
আসে শুক্লপক্ষ। রাজপুত্তুরের ছট-ফটানি বাড়ে। এখন যাদুপ্রয়োগেও ওকে ঘুমপাড়াতে বেশ কষ্ট হয় ভানুর। চতুর্থীর রাতে সম্পূর্ন ভেঙে পড়ে ইরাবান। পরদিন যে তার ব্যাঙ বৌকে রাজসভায় গিয়ে আদবকায়দায় পরীক্ষা দিতে হবে! এদিন আর না বলে পারলো না ইরাবান। কিন্তু শেষে বললো,"যদি ওরা তোমায় অপমান করে বৌ, তাহলে আমি তক্ষুণি তোমায় নিয়ে এই রাজ্য ছেড়ে চলে যাবো।"
ব্যাঙ ওকে বলে,"তুমি চিন্তা কোরো না রাজপুত্র। সেসব কিছু হবে না।তুমি রাজপুত্র, তুমি সেজেগুজে আগে একা যাবে। ওরা জিজ্ঞেস করলে বলবে, বৌ পরে আসবে। জানেই সবাই যে মেয়েদের সাজতেগুজতে একটু বেশী সময় লাগে। পরে যখন কড় কড়াৎ করে শব্দ হবে খুব জোরে, সবাই ভয় পেয়ে যাবে, তখব বোলো,"ও কিছু নয়, আমার ব্যাঙ বৌ এলো কৌটোয় চড়ে।" পারবে তো বলতে?
রাজপুত্তুর ঘাড় হেলিয়ে বলে, "হ্যা, পারবো।"
ধীরে ধীরে লোকজন আসতে আরম্ভ করলো। প্রথমে বড়ো রাজপুত্র তার স্ত্রীকে নিয়ে,তারপরে মেজো রাজপুত্র তার বৌকে নিয়ে,তারপরে গুটি গুটি পায়ে ইরাবান,নতমুখ।
"সে কি রে,তোর বৌকে আনলি না?"বড়দা জিজ্ঞাসা করলো।
"সে আসছে,একটু পরে।"কোনোরকমে বললো ইরাবান।
দেখতে দেখতে ঘন্টা কেটে গেল,এরপর রাজার আদেশে বড়ো টেবিলে খাবার পরিবেশন যেই শুরু হয়েছে, সকলে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিয়েছে মাত্র, এমন সময় ঘড় ঘড়াম ঘড়াম্ম্ম করে ভীষন আওয়াজে সকলে কেঁপে ওঠে। রাজামশাইএর ভুরু কুঁচকে ওঠে। "কিসের আওয়াজ?"
ইরাবান আস্তে আস্তে আস্তে ভয়ে ভয়ে বলে,"ও কিছু না,আমার ব্যাঙ বৌ বুঝি এলো কৌটোয় চড়ে।"
রাজসভাগৃহের সমস্ত সোনারূপাহীরাজহরতের ঝালকানিকে নিষ্পভ্র করে দিয়ে দুয়ার ঠেলে প্রবেশ করে এক অপরূপা রাজকন্যা।আকাশের মতো নীল তার শাড়ী,তাতে অসংখ্য তারার চুমকি বসানো। তার চুলে পম্পাসরোবরের ঢেউ,তার মধ্যরাত্রিনীল দুচোখের তারায় উজ্বল আলোর কারুকাজ।তার দুইটি বাহু পুষ্পিত লতার মতো, তার চলা উর্মিল। সকালবেলাকার শ্বেতপদ্মের মতো সুন্দর তার মুখ, তাতে আনন্দের জ্যোতি।
রাজকন্যা এসে রাজামশাইকে প্রণাম করে বলে,"পিতা, আমি আপনার কনিষ্ঠা পুত্রবধূ। আপনার আশীর্বাদ চাই।" অতি মধুর সুরেলা তার কন্ঠস্বর। রাজামশাই ভারী খুশী হয়ে আশীর্বাদ করেন।
এরপর রাজকন্যা তার ডানহাত নড়ায়, নীলশাড়ীর আঁচল ওড়ে, সভার ডানপাশে দেখা দেয় আশ্চর্য সুন্দর এক সরোবর। তাতে কলহংসেরা খেলা করে বেড়ায়। রাজকন্যা তাঁর বাঁহাত নাড়ায় , সভার বাঁপাশে সৃষ্টি হয় এক তুষারাবৃত পর্বত, তাতে ঝর্ণারা স্তব্ধ হয়ে আছে। হাতে তালি দিতেই ঝর্ণাগুলি প্রাণ পেয়ে ঝরঝর করে ঝরে পড়তে থাকে সে যাদুপাহড় বেয়ে,নদী হয়ে বয়ে যায়-যাদুসরোবরে এসে মেশে।
রাজারানী খুব খুশী,অন্যরাও খুশী,শুধু ইরাবানের দুই দাদা আর তার বৌরা খুশী নয়। রাজারানী তাদের এই যাদুকরী পুত্রবধূকে আদর করে নিমন্ত্রণ খাওয়াচ্ছেন, এমন সময় দেখা গেল ইরাবান সভায় নেই।
চমকে উঠে ভানুমতী রাজার অনুমতি নিয়ে প্রায় দৌড়ে এলো তার মহলে। এসে দেখে যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে গেছে। ইরাবান ভানুমতীর রেখে যাওয়া ব্যাঙের ছালটা পুড়িয়ে দিয়েছে। সে বুঝতেই পারেনি কি করে বসেছে।সে ভাবছে বেশ বাহাদুরির কাজ করেছে। ভানু কপাল চাপড়ে মাটিতে পড়ে কাঁদতে লাগলো একেবারে একটা বাচ্চা মেয়ের মতো। ইরাবান বিস্মিত।
একটু পরে ভানুমতী বললো,"এ কী করলে রাজপুত্র? এক বছর এইভাবে ব্যাঙ সেজে থাকতে পারলেই আমার অভিশাপের মুক্তি হতো। তুমি সেটুকু ধৈর্য ধরতে পারলে না ইরাবান? তোমার প্রাসাদে তোমার রানী হয়ে সারাজীবন আমি সুখে থাকতে পারতাম।কিন্তু এখন? আর উপায় নেই। এখুনি আমাকে নিয়ে যাবে অমর। সে আমাকে বন্দী করে রাখবে। সে বড়ো নিষ্ঠুর। আর আমার মুক্তি হবে না।"
ইরাবান এসে জড়িয়ে ধরলে রাজকন্যাকে। বললো, "কে তোমাকে নিয়ে যাবে রাজকুমারী? কেউ নিয়ে যেতে পারবে না।মিথ্যে তুমি ভয় পাচ্ছো ভানুমতী। দেখো, এই তো আমি। চোখ মোছো। কেন তুমি কাঁদছো?"
কিন্তু তখনি একটা দারুণ ঝড় এলো,তার মধ্যে থেকে হা হা হা হা করে একটা বিকট হাসি ভেসে এলো। ঝড়ের ধাক্কায় উল্টে পড়ে গেলো ওরা দুজন। বিদ্যুত্ চমকে উঠলো আকাশে, ভীষন বজ্রের ধ্বনি কানে তালা লাগিয়ে দিলো প্রায়। ভয়ে ইরাবান চোখ বন্ধ করলো। ঝড় থামলে যখন রাজপুত্র উঠে বসলো, তখন ঘরে সে একা।রাজকুমারী ভানুমতী আর কোথাও নেই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now