বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
নাদের আলীর দ্বিতীয় ব্যবসা শুরু যখন তার ইন্টার পরীক্ষা শেষ হয়। রেজাল্ট বের হতে ২/৩ মাস সময় লাগবে। হাতে অফুরন্ত সময়। এই অবসর সময় কি করা যায় ভাবছেন। মেট্রিক পাশ করার পর থেকেই তার ঢাকা যাতায়াত শুরু। মামারা সব ঢাকা থাকে সেই সুবাদে মাসে একবার হলেও ঢাকা আসা চাই। জাহাঙ্গীর তার দূর সম্পর্কের মামা’ত ভাই। বাড়ীর পাশেই তাদের বাড়ী। প্রায় সম বয়সী তারা। ২/১ বছরের ছোট বড়। এক সাথেই চলাফেরা করতো তারা। জাহাঙ্গীর ইন্টার পাশ করার পর ঢাকা চলে যায়। তার বড় ভাইয়ের বাসায় থেকে লেখাপড়া করত। কলেজ বন্ধ হলেই বাড়ী চলে আসতো। জাহাঙ্গীরের সাথে মৃদুল নামে এক লোকের সখ্যতা ছিল। যে কিনা ভবঘুর টাইপের। ফ্লিম লাইনে বিভিন্ন প্রযোজনা অফিসের সাথে তার যোগাযোগ ভালো। সে বিবাহিত। এক সন্তানের জনক। থাকে বাংলা মটরের মোড়ে। জহুরা ম্যন্সনের পিছনে। মৃদুল অনেক দিন থেকেই জাহাঙ্গীরকে বলে আসছিল তার সাথে ফ্লিমের ব্যবসা করতে। কিন্তু জাহাঙ্গীরের সমর্থ ছিল না টাকা জোগাড় করার। নাদের আলীর ইন্টার পরীক্ষা শেষ। ঢাকা এসেছে মামা বাড়ী বেড়াতে। একদিন জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করার জন্য নাদের আলী মগবাজার দিলু রোডে গেল। তার সাথে অনেকক্ষণ আড্ডা দিল একসময় জাহাঙ্গীর ব্যবসার কথাটা উত্থাপন করলো শুনে নাদের আলীর ব্যবসায়ী মন চনমন করে উঠল। তারা ঠিক করলো আগামী শুক্রবার মৃদুলের সাথে দেখা করবে এবং ব্যবসায়ীক আলাপ আলোচনা করবে। শুক্রবার মৃদুলকে বাসায় পাওয়া গেল। পরিচয় পর্ব শেষ করে ব্যবসায়ীক আলাপ শুরু করলো তারা। নাদের আলী মৃদুলকে জিজ্ঞাস করলো- কি ধরনের ব্যবসা? মৃদুল বলল- ফ্লিম রেন্ট ব্যবসা।
নাদের আলী বলল- একটু বুঝিয়ে বলবেন?
মৃদুল বলল- আমারা বিভিন্ন প্রযোজক অফিস থেকে ছবি ভাড়া করবো এবং তা মফঃস্বলে হল মালিকদের কাছে ভাড়া দিব। ধরুন, আমারা একটা ছবি যদি পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া করি এক সপ্তাহের জন্য তা হল মালিকদের কাছে আট থেকে দশ হাজার টাকায় ভাড়া দিব। যা লাভ হবে অর্ধেক আপনার অর্ধেক আমার। নাদের আলী জিজ্ঞাস করলো- কতো টাকা আমাকে দিতে হবে?
মৃদুল বলল- আপাতত পাঁচ হাজার টাকা হলেই চলবে। এর অর্ধেক মানে আড়াই হাজার আপনি এবং আড়াই হাজার আমি দিব। ব্যবসাটা নাদের আলীর মনপুতঃ হল। তখন থেকেই নাদের আলী সপ্ন দেখা শুরু। মাসে আঠার বিশ হাজার, বছরে লক্ষপতি। স্বপ্ন দেখতে দেখতে নাদের আলী বাড়ী ফিরল। বাড়ী ফিরে টাকা জোগাড় করার ধান্দা করতে লাগলো। কার কাছ থেকে নিবে, কে দিবে টাকা? বাবা সংসার সামলাতেই দিশাহারা। আর কে দিবে? একমাত্র অবলম্বন মা। একদিন তার মা খুব খোশমেজাজে ছিল। নাদের আলী সুযোগ বুঝে মা’র সাথে আহ্লাদ করতে করতে বলল- মা আমাকে আড়াই হাজার টাকা দিবা? তোমাকে ২/৩ মাস পর ডবল টাকা দিব।মা বলল- আমি টাকা পাবো কোথায়? নাদের আলী বলল- আমি দেখেছি আলমারিতে, তোমার কাপড়ের ভাঁজে আছে।
মা বলল- আলমারি হাতিয়েছিস কেন? তোর যন্ত্রণায় কোথাও টাকা রেখে শান্তি পাই না। তুই আমার সব টাকা নিয়ে যাস। অনেক অনুনয় বিনুনয় করে মা’কে রাজী করাল। টাকা হাতে পাওয়ার এক সপ্তাহ পর নাদের আলী ঢাকা গেল। ঢাকা এসে জাহাঙ্গীরের সাথে যোগাযোগ করলো। শুক্রবার জাহাঙ্গীরসহ মৃদুলের বাসায় গেল। মৃদুলের সাথে কথা পাকাপাকি করে আড়াই হাজার টাকা তার হাতে তুলে দিল। মৃদুল বলল- আগামী কাল শনিবার সকাল দশটায় আপনারা গুলিস্থান কামানের সামনে থাকবেন। কথামত নাদের আলী এবং জাহাঙ্গীর গুলিস্থানের কামানের সামনে অপেক্ষা করতে থাকল। সাড়ে দশটা নাগাদ মৃদুল আসলো। তিনজন মিলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে একটা বিল্ডিং-এর চার তলায় একটা অফিসে ঢুকল। অফিসের পরিবেশ এবং চতুর্দিকে টানানো বিভিন্ন ফিল্মের ছবি দেখে বুঝা গেল এটা একটা প্রযোজনা অফিস। অফিসের মালিক প্রযোজক সফি বিক্রমপুরী সাহেব। মৃদুল একটা ছবি পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া করলো এক সপ্তহের জন্য। এ কাজ গুলোর দায়িত্ত মৃদুলের উপর ন্যস্ত ছিল কারন এই ব্যবসা নাদের আলী বা জাহাঙ্গীরের বোঝে না। ছবিটার নাম এখন আর নাদের আলীর মনে নাই। ইতিমধ্যে জামালপুরে নান্দাইলের এক হল মালিকের সাথে চুক্তি হয়, এক সপ্তাহের জন্য তারা ভাড়া নিবে ন’হাজার টাকায়। প্রতিদিন আনুপাতিক হারে এক সপ্তাহে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করবে। অফিসের ঝামেলা মিটিয়ে ছবি কমলাপুর রেল ইস্টেশনে নেওয়া হল। দুপুর ১২/১ তা নাগাদ ট্রেন ছাড়ল। ট্রেন পৌঁছল বিকাল ৫টায়। ছবি হলে রেখে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল। রেস্টুরেন্ট বললে ভুল হবে বলা চলে ছালাদিয়া হোটেল। তরকারীতে শুধু হলুদের গন্ধ। নাদের আলী কোন রকম নাক কান বুজে খেয়ে উঠল। রাতে হলে ম্যানেজার রুমে তাদের শোয়ার ব্যবস্থা হল। কাল থেকে তাদের ছবি হলে চলবে। পরদিন দুপুর পর্যন্ত নাদের আলী আশেপাশের জায়গা গুলো ঘুরে দেখল। বিকেল তিনটা থেকে শো শুরু হল। দর্শক মোটামুটি পরিপূর্ণ ছিল। রাত বারটায় সব শো শেষ হল। ম্যানেজার এসে নয় শত টাকা ধরিয়ে দিল। আনুপাতিক হারে বার’শ টাকার উপর দেওয়ার কথা। প্রশ্ন করায় ম্যানেজার বলল, কাল দিবে। পরদিন টাকা না দিয়েই হল মালিক বাড়ী চলে গেল। নাদের আলী, মৃদুল ও জাহাঙ্গীর হল মালিকের বাসায় গেল। তাকে বাড়ীতেই পাওয়া গেল। মৃদুল বলল- আপনি টাকা না দিয়েই চলে আসলেন কেন? মালিক ধানাই পানাই শুরু করলো। বলল- তার এই সমস্যা ঐ সমস্যা। আজ সব টাকা পরিশোধ করে দিব। এ ভাবে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করলো না। হল থেকে ছবিও নামানো হলো না। ছবি নামালেই অন্য ছবি হলে উঠবে। অন্য ছবি হলে উঠলেই আর টাকা পাওয়া যাবে না। ঢাকা অফিস থেকে টাকার জন্য তাগাদা শুরু করল। এক সপ্তাহের জন্য ভাড়া করা ছবি দেড় সপ্তাহ হয়ে গেল ছবিও ফেরত পাঠানো হচ্ছে না, টাকাও দেওয়া হচ্ছে না, তাগাদা তো দিবেই। এই সব কাণ্ড কীর্তি দেখে নাদের আলীর মন বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। তাছাড়া বাড়ীর জন্যও মন খারাপ লাগছিল। মৃদুলকে কিছুটা মন্দ কথা শুনিয়ে বলল- আমি বিকালের ট্রেনে বাড়ী চলে যাচ্ছি। ঢাকা এসে আমার টাকা ফেরত দিবেন। আর জাহাঙ্গীরকে বলল- তুই থাক, আমার টাকা কি ভাবে উদ্ধার করবি তুই জানিস। নাদের আলী বিকেল পাঁচটার ট্রেন ধরল। ঢাকা পৌছতে পৌছতে রাত্র ন’টা। তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নেমে ইষ্টিশনের বাহিরে আসলো বাসায় ফিরার জন্য। দেখল রাস্তা ঘাট সুনসান কোন লোকজন নাই, গাড়ি ঘোড়া কিছুই নাই। ইষ্টিশনে অপেক্ষারত লোকজনের কাছে জানতে পারল সন্ধ্যা ছ’টা থেকে ভোর ছ’টা পর্যন্ত কার্ফু জারি করা হয়েছে। তখন এরশাদ সরকার ক্ষমতা নিয়েছে। কি আর করার। ক্ষুধার্ত ক্লান্ত নাদের আলী ফেরিওয়লা থেকে কলা রুটি খেয়ে কিছুক্ষণ প্ল্যাটফরমের এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটাহাঁটি করলো। ঘুমে তার চোখ বুজে আসছিল। সে শোয়ার জায়গা খুঁজতে লাগল। অবশেষে আবিস্কার করলো ইষ্টিশনের দোতলায় উঠার জন্য যে সিঁড়ী আছে তার প্রতিটি ধাপে একজন করে শুয়ে আছে। এখনও দুই তিনটা ধাপ খালি আছে। জায়গাটা তার মনপুতঃ হল। তাড়াতাড়ি দুই টাকা দিয়ে একটা পত্রিকা কিনল এবং খুলে একটা ধাপে বিছাল। তারপর একহাত মাথার নিচে রেখে আরামসে এক ঘুম। বাহিরে লোকজনের কোলাহলে তার ঘুম ভাঙল। ধীরে ধীরে উঠে মাথা কাপড় চোপর ঠিক করল তারপর পেপারের বিছানাটা দলামুচড়া করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নাদের আলী বাড়ীর উদ্দেশে রওনা দিল।
অবশেষে নাদের আলী আড়াই হাজার টাকা মূলধন থেকে নয়শত টাকা ফেরত পেয়েছিল। বাকীটা বাউণ্ডুলে মৃদুল না বাটপার হল মালিকের পেটে গিয়েছিল নাদের আলী তার খবর আর রাখেনি। লস এক হাজার ছয় শত টাকা মাত্র।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now