বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
অনীশ-পর্ব ৮
বাচ্চার নমাসের সম্য ডাক্তার খুবই চিন্তিত হয়ে
পড়লেন। বললেন, বাচ্চার সাইজ অত্যন্ত ছোট,
মুভমেন্ট কম। আপনি হাসপাতালে ভরতি হয়ে যান।
মনে হচ্ছে বাচ্চা যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না।
হাসপাতালে ভরতি হলাম। দুর্বল, অপুষ্ট একটি শিশুর
জন্ম দিলাম। নিজেও খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম।
বাচ্চাকে রাখা হল ইনকিউবিটরে। অসুস্থ অবস্থায়
একদিন দেখি দরজায় আমার স্বামী দাঁড়িয়ে। ক্রুদ্ধ
দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি
বললাম, ভেতরে আসো।
সে হিসহিস করে বলল, বিষের পুটলিটা কই? এখনও
বেঁচে আছে? এখনও বেঁচে আছে কেন তা
তো বুঝলাম না! তার তো মরে যাওয়া উচিত ছিল।
আমি দরগায় মানত করেছি। এমন দরগা যেখানে মানত
মিস হয় না।
আমি আঁতকে উঠলাম। সে ঘরে ঢুকল না,
খানিকক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল।
আমি মাকে বললাম, কিছুতেই আমি হাসপাতালে থাকব
না। কিছুতেই না। হাসপাতালে থাকলেই সে এসে
কোনো-না কোনোভাবে বাচ্চার ক্ষতি করার
চেষ্টা করবে।
মা বললেন, তোর এই অবস্থায় হাসপাতাল ছাড়া ঠিক
হবে না। বাচ্চা খানিকটা সামলে নিয়েছে, কিন্তু
তোর অবস্থা খুব খারাপ। বাড়িতে নিয়ে গেলে
তুই মরে যাবি।
‘মরে গেলেও আমি বাড়িতেই যাব। এখানে থাকব
না।’
‘ডাক্তার তোকে ছাড়বে না।’
‘ডাক্তারকে তুমি ডেকে আনো মা। আমি তাঁর পা
জড়িয়ে ধরব।’
ডাক্তার আমাকে ছাড়লেন। বাচ্চা নিয়ে আমি বাসায়
চলে এলাম। দারোয়ানকে বলে দিলাম দিনরাত যেন
গেট বন্ধ থাকে। কাউকেই যেন ঢুকতে দেয়া না
হয়। কাউকেই না।
আমার শরীর খুবই খারাপ হল। এক রাতের কথা-
ঘুমুচ্ছি। মা ঘরে ঢুকে বললেন, বাচ্চাটা যেন
কেমন করছে।
আমার বুক ধড়াস করে উঠল। আমি ক্ষীণস্বরে
বললাম, কেমন করছে মানে কী মা?
‘মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।’
‘তুমি বসে আছ কেন? তাকে হাসপাতালে নিয়ে
যাও।’
‘অ্যাম্বুলেন্স খবর দিয়েছি।’
‘অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি করবে। তুমি
বেবিট্যাক্সি করে যাও।’
এমন সময় বাচ্চা দুর্বল গলায় কেঁদে উঠল। মা ছুটে
পাশের ঘরে গেলেন। পরক্ষণেই আমার ঘরে
ফিরে এলেন। তাঁর মুখ সাদা। হাত-পা কাঁপছে। আমি
চিৎকার করে জ্ঞান হারালাম।
জ্ঞান ফিরল চারদিন পর হাসপাতালে। আমি বললাম,
আমার বাচ্চা, আমার বাচ্চা?
মা পাথরের মতো মুখ করে রইলেন। আমি আবার
জ্ঞান হারালাম।
আমার বাচ্চার কবর হল আমাদের বাড়ির পেছনে।
আমগাছের নিচে। ছোট্ট একটা কবর ছাড়া বাড়িতে
কোনোরকম পরিবর্তন হল না। সবকিছু চলতে
লাগল আগের মতো। আমার স্বামী ফিরে
এলেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, এই
অ্যাম সরি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তুমি শোক
কাটিয়ে উঠবে। আমি তোমাকে সাহায্য করব।
আমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম শোক কাটিয়ে
উঠতে।
প্রবল শোক একবার আসে না। দুবার করে
আসে। তা-ই নাকি নিয়ম। অন্যের কথা জানি না, আমার
বেলায় নিয়ম বহাল রইল। চারমাসের মাথায় মা মারা
গেলেন। মা শেষের দিকে খুব চুপচাপ হয়ে
গিয়েছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলতেন না।
নিজের ঘরে দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে
থাকতেন। মৃত্যুর দুদিন আগে আমাকে কাছে
ডেকে নিয়ে বললেন, আমার বিরুদ্ধে তোর কি
কোনো অভিযোগ আছে?
আমি বললাম, না।
‘আমি মায়ের গায়ে হাত দিয়ে স্পষ্ট করে বললাম,
তোমার বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ
নেই।
‘সত্যি!’
‘হ্যাঁ সত্যি। শুধু খানিকটা অভিমান আছে।’
‘অভিমান কেন?’
‘তোমার জামাই যেমন মনে করে – আমার
ছেলের বাবা সে নয়। তুমিও তা-ই মনে কর।’
মা চমকে উঠে বললেন, এই কথা কেন বলছিস?
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, তুমি রাতদিন এত
নামাজ-রোজা পড়। কিন্তু কখনো তুমি আমার
ছেলের কবরের কাছে দাঁড়িয়ে একটু দোয়া
পড়নি। তার থেকেই এই ধারণা হয়েছে। বিশ্বাস কর
মা, আমি ভাল মেয়ে।
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ঐ কবর আমি সহ্য
করতে পারি না বলে কাছে যাই না। দূর থেকে
দোয়া পড়ি না। দিনরাতই আল্লাহ্কে ডেকে তোর
ছেলের মঙ্গল কামনা করি।
মা মারা গেলেন।
যতটা কষ্ট পাব ভেবেছিলাম ততটা পেলাম না। বরং
নিজেকে একটু যেন মুক্ত মনে হল। অতি সূক্ষ্ম
হলেও স্বাধীনতার আনন্দ পেলাম। মনের এই
বিচিত্র অবস্থার জন্যে লজ্জাও পেলাম।
মা’র মৃত্যুর মাসখানিকের মধ্যে আমার মধ্যে
মস্তিষ্কবিকৃতির লক্ষণ দেখা গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে
আছি। সন্ধ্যা হয়হয় করছে। হঠাৎ শুনলাম আমার বাচ্চাটা
কাঁদছে। ওঁয়াওঁয়া করে কান্না। এটা যে আমার বাচ্চার
কান্না তাতে কোনও সন্দেহ রইল না। আমার সমস্ত
শরীর কাঁপতে লাগল।
এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতে লাগল। রাতে ঘুমুতে
যাচ্ছি – বাতি নিভিয়ে মশারির ভেতর ঢুকছি – অমনি
আমার সমস্ত শরীর ঝনঝন করে উঠল। আমি
শুনলাম, আমার বাচ্চা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে
কাঁদছে। আমি ছুটে গেলাম কবরের কাছে। আমার
স্বামী এলেন পেছন পেছন। তিনি ভীত গলায়
বললেন, কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?
আমি বললাম, কিছু না।
‘কিছু না, তা হলে দৌড়ে চিৎকার করে নিচে নেমে
এলে কেন?’
‘এম্নি এসেছি। কোনও কারণ নেই।’
‘তোমার মাথাটা আসলে খারাপ হয়ে গেছে রূপা।’
‘বোধহয় হয়েছে।’
‘ভাল কোনো ডাক্তারকে দিয়ে চিকিৎসা করাও।’
‘আচ্ছা করাব। এখন তুমি আমার সামনে থেকে যাও।
আমি এখানে একা একা খানিকক্ষণ বসে থাকব।’
‘কেন?’
‘আমার ইচ্ছা করছে তাই।’
‘এখন বৃষ্টি হচ্ছে। তুমি অকারণে বৃষ্টিতে
ভিজবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে তোমার
দেখা করা দরকার।’
‘দেখা করব। এখন তুমি যাও।’
সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গেও দেখা করলাম। স্বামী
নিয়ে যায়নি, রূপা একাই গিয়েছে; কাউকে না
জানিয়ে – একা একা। সাইকিয়াট্রিস্ট বেশ বয়স্ক মানুষ।
মাথার চুল ধবধবে শাদা। হাসিখুশি মানুষ। তিনি চোখ বন্ধ
করে আমার সব কথা শুনলেন। কেউ চোখ বন্ধ
করে কথা শুনলে আমার ভাল লাগে না। মনে হয়
কথা শুনছেন না। এঁর বেলা সেরকম মনে হল না।
আমি যা বলার সব বললাম। তিনি চোখ মেলে
হাসলেন। সান্ত্বনা দেয়ার হাসি। যে হাসি বলে দেয়
– আপনার কিছুই হয়নি। কেন এমন করছেন?
সাইকিয়াট্রিস্ট বললেন, কফি খাবেন?
আমি বললাম, না।
‘খান, কফি খান। কফি খেতে খেতে আমার কথা
বলি।’
‘বেশ, কফি দিতে বলুন।’
কফি চলে এল। তিনি বললেন, আপনার ধারণা আপনি
আপনার ছেলের কান্না শুনতে পান?
‘ধারণা না। আমি সত্যি সত্যি শুনতে পাই।’
‘আপনি কান্না শুনতে পান তার মানে এই না যে
আপনার ছেলের কান্না। ছোট বাচ্চাদের কান্না
একরকম।’
‘আমি আমার ছেলের কান্নাই শুনতে পাই।’
‘আচ্ছা বেশ। সবসময় শুনতে পান? না মাঝে মাঝে
পান?’
‘মাঝে মাঝে পাই।’
‘আগে থেকে কি বুঝতে পারেন যে এখন
কান্না শুনবেন?’
‘তার মানে কী?’
‘গা শিরশির করে, কিংবা মাথা ধরে। যার পরপর কথা
শোনা যায়?’
‘না, তেমন কিছু না।’
‘আপনার মা মারা গিয়েছেন – তাঁর কথা কি শুনতে
পান?’
‘না।’
‘আপনার সমস্যাটা তেমন জটিল নয়। আপনার
ছেলের মৃত্যুজনিত আঘাতে এটা হয়েছে। আঘাত
ছিল তীব্র। এতে মস্তিষ্কের ইকুইলিব্রিয়াম খানিকটা
ব্যাহত হয়েছে। আপনার কোলে আরেকটা শিশু
এলে সমস্যা কেটে যাবে। আপনার যা হয়েছে
টা হল জীবনের দুঃখজনক স্মৃতি মনে অবদমিত
অবস্থায় আছে। আপনি চলে গেছেন Anxiety
state-এ, সেখান থেকে নিউরাসথেনিয়া …’
‘আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘বোঝার দরকার নেই। এমন-কিছু করুন যেন
নিজে ব্যস্ত থাকেন। ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি। রাতে
ঘুমুবার সময় খাবেন যাতে ঘুমটা ভাল হয়। যখন আবার
কান্নার শব্দ শুনবেন তখন দৌড়ে কবরের কাছে
যাবেন না, কারণ কান্নার শব্দ কবর থেকে আসছে
না। শব্দ তৈরি হচ্ছে আপনার মস্তিষ্কে। আপনি
নিজেকেই নিজে বোঝাবেন। মনেমনে
বলবেন, এসব কিছু না। এসব কিছু না। বাড়িটাও ছেড়ে
দিন। ঐ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যান।
ডাক্তার সাহেবের ঘর থেকে বের হয়ে
বেবিট্যাক্সি নিয়েছি ঠিক তখন স্পষ্ট আবার কান্নার
শব্দ শুনলাম। আমার বাচ্চাটিই যে কাঁদছে এতে
কোনো সন্দেহ নেই। আমি মনেমনে বললাম,
আমি কিছু শুনছি না। আমি কিছু শুনছি না। তাতে লাভ হল
না। সারাপথ আমি আমার বাচ্চার কান্না শুনতে শুনতে
বাড়িতে এলাম।
আমার স্বামী খুব ভাল্ভাবে পাশ করলেন।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং – এ প্রথম শ্রেণীতে
প্রথম স্থান পেয়ে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়েই
তাঁর একটা চাকরি হল। আমরা আমাদের বাড়ি ছেড়ে
কলাবাগানে দু-কামরার ছোট একটা ঘর ভাড়া নিলাম।
আমি সংসারে মন দেয়ার চেষ্টা করলাম। প্রচুর কাজ
এবং প্রচুর অকাজ করি। রান্নাবান্না করি। সেলাইয়ের
কাজ করি। আচার বানানোর চেষ্টা করি। যে-ঘর
একবার মোছা হয়েছে সেই ঘর আবার ভেজা
ন্যাকড়ায় ভিজিয়ে দিই। কাজের একটা মেয়ে ছিল
তাকেও ছাড়িয়ে দিলাম। কারণ একটাই, আমি যাতে
ব্যস্ত থাকতে পারি।
সারাদিন ব্যস্ততায় কাটে। রাতের বেলায়ও আমার
স্বামী আমাকে অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে
রাখেন। শারীরিক ভালবাসার উন্মাদনা এখন আমার
নেই- তবু ভান করি যেন প্রবল আনন্দে সময়
কাটছে। আসলে কাটে না। হঠাৎ হঠাৎ আমি আমার
বাচ্চার কান্না শুনতে পাই। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় অবশ
হয়ে আসে।
আমার স্বামী বিরক্ত গলায় বল্লেন,কী হল?
এরকম করছ কেন?
আমি নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করি। তিনি তিক্ত
গলায় বলেন, এইসব ঢং কবে বন্ধ করবে? আর
তো সহ্য হয় না! মানুষের সহ্যের একটা সীমা
আছে।
আমি কাঁদতে শুরু করি। তিনি কুৎসিত গলায় বললেন –
বাথরুমের দরজা বন্ধ করে কাঁদো। সামনে না।
খবরদার চকের সামনে কাদবে না।
ভাড়াবাসায় বেশিদিন থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হল না।
আমি প্রায় জোর করেই নিজের বাড়িতে ফিরে
গেলাম। যে-বাড়িতে আমার ছোট্ট বাবার কবর
আছে সেই বাড়ি ছেড়ে আমি কী করে দূরে
থাকব!
নিজের বাড়িতে ফেরার পরপর আলস্য আমাকে
জড়িয়ে ধরল। কোনো কাজেই মন বসে না।
আমি বেশির ভাগ সময় বসে থাকি আমার বাবুর
কবরের পাশে। দোতলার সিঁড়ি থেকে ক্রুদ্ধ
চোখে আমাকে দেখেন আমার স্বামী। তার
চোখে রাগ ছাড়াও আর যা থাকে তার নাম ঘৃণা।
(চলবে...)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now