বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"অসমাপ্ত ভালোবাসা "(৩য় পর্ব)
লিখেছেনঃ রাসেল পারভেজ
আজ সপ্তাহ খানিক হইল, আয়েশা নতুন বধূ হইয়া আসিয়াছে, নতুন বধু বলিয়া আলাদা একটা খাতির টের পাইতেছে,তবে মাঝেমধ্যে উহার শাশুড়ি কারণ অকারণে ঠেস পাড়িয়া কথা বলিতেছে। আয়েশা নতুন বধু বলিয়া কিছু কহিতে গিয়াও কহিতে পারিতেছে না, নয়লে অমন কথার জবাব দিতেও সেও প্রস্তুত আছে।এদিকে স্বামী বেচারা অনেক অনুরোধ করিয়া কহিয়াছে মায়ের কথা যেন কিছু মনে না করি।
আয়েশা বড় গৃহস্থ্য বাড়ির বউ , বাড়িতে দু চারটে কাজের লোক রাখা আছে, তাই কাজও তেমন একটা করিতে হয়না, প্রথম কয়েকদিন রান্না করিতে গিয়েছিল কিন্তু নতুন বউ বলিয়া কেহ কাজ করিতে দেয় নাই, তাই নিজে থেকে যাচিয়াও কিছু করিতে চাহেনা তাই সারাদিন শুইয়া বসিয়াই কাটাইতে হয়।
মাঝেমধ্যে ছোট ননদ পাপিয়া আসিয়া গল্প করিয়া যায়, কিন্তু আয়েশার ইহাতেও কোন আগ্রহ নাই, চুপ করিয়া শুধু শুনিয়া যায়, মাঝেমধ্যে হা, হু করিয়া সায় দেয়, নিজ থেকে যাচিয়া কিছু জিজ্ঞেস করে না তাই ইদানিং পাপিয়াও গল্প বকিতে চাহে না, এদিকে তেমন একটা আসিতেও চাহেনা। তাই আয়েশার সারাদিন একাএকাই কাটিয়া যায়। বিকালে মাঝেমধ্যে বাড়ির নব নির্মিত ছাদে গিয়া বসিয়া থাকে।
আজ আয়েশার মনটা তেমন একটা ভাল যায়তেছে না, বাড়িতে মনের কথা কহিবে তেমন কোন লোক নেই, সেই বাসর রাতের পর হইতে স্বামীর সহিতে ও তেমন একটা কথা হয়না, ছোট ননদ পাপিয়াকে ও তেমন একটা পছন্দ হয় না, কারন অকারণে শুধু শুধু বকিয়া যায়। তাই জরুরি কাজ ছাড়া পাপিয়াকে ডাকা হয়না।
বিকালে ছাদে বসিয়া দুরের আকাশ দেখিতেছে, ধবল বকের সারি উড়িয়া যাইতেছে, বিটপির পত্র পল্লব দুলিয়া দুলিয়া যেন নাচিতেছে। ওই যে রাস্তা দিয়া হাটুরেরা হাট সারিয়া বাড়ি ফিরিতেছে, আজ মঙ্গলবার জানিপুরে হাট বসিয়াছে, আয়েশা পথ পানে চাহিয়া আছে, মাঝেমধ্যে আয়েশাদের গাঁয়ের লোক এখানে হাট করিতে আসে, যদি কাহারও সহিত দেখা হয় তাহলে গাঁয়ের কথা জিজ্ঞেস করিবে, মা কেমন আছে, সোহান কি এখনও তাহার কথা মনে রাখিয়াছে ইত্যাদি ইত্যাদি কথা ভাবিতেছে কিন্তু কোনও পরিচয় মুখ খুজিয়া পাইতেছে না। সন্ধ্যা না নামা অবধি ওখানেই বসিয়া রহিলো।
•
আজকে বিবাহের অষ্টম দিন পুর্ন হইলো, তাই বিবাহের রিতিমত বাপের বাড়িতে আট মোল্ল্যা ভাঙ্গিতে যাইতে হইবে। অনেকদিন পর বাড়ি ফিরিতেছ, তাই আর আনন্দ যেন ধরে না। আয়শা স্বামী মাহাবুব বারান্দায় বসিয়া আপিসের ফাইল -পত্তর দেখিতেছিল আয়েশা কাছে আসিয়া গলার খাকারি দিয়া কহিল, 'আপনার কাজ কতদূর হল '
মাহাবুব মুখ তুলিয়া চাহিয়া রইলো, আয়েশা একটা লাল পেরে সবুজ শাড়ি পরিয়াছে, কপালে কালো টিপ, ডাগর চোখ দুটিতে কাজল টানা। আয়েশা এমনিতেই সুন্দরী আজিকে আরোও সুন্দর লাগিতেছে, যেন পল্লী প্রান্তের নিভৃত চুত-বকুল বীথির প্রগাঢ় শ্যাম স্নিগ্ধতা ডাগর চোখ দুটির মধ্যে অর্ধসুপ্ত রহিয়াছে। প্রভাত এখনও হয় নাই, রাত্রি শেষের অলস অন্ধকার এখনো জুড়িয়া আছে।
মাহাবুব দৃষ্টি ফিরাইয়া মৃদু হাসিয়া কহিল, 'এই হল বৈকি, তুমি গুছিয়ে নাও আমি এই আসছি '
আয়েশা ঘরে যায়তেছিল আবার ফিরিয়া আসিয়া লজ্জিত কন্ঠে কহিল, 'আজকে কিন্তু সোহানের!
•
বেলা ২টা নাগাদ আয়েশারা বাপের বাড়ির দেশে প্রত্যাবর্তন করিল। সেই চিরচেনা গাঁ, সেই চিরচেনা গড়াই নদী, সেই চিরচেনা পথ, নদীর ধারে নারান কাকার সেই ছোট্ট কুটির, সেই নদীর পাড় যেখানে বসিয়া শৈশব কৈশোর কাটাইয়াছে। সোহান কি আজিকে ও সেখানে বসিয়া থাকে,,,??? যেখানে বসিয়া কত বিকাল কাটাইয়াছে, কত স্বপ্ন বুনিয়াছে, কত স্নৃতি লুকাইয়া আছে ওই নদী পাড়ে।
একবার মাথা উচাইয়া দেখিতে চাহিল, কিন্তু পাছে লোকজন কি মনে করে ভাবিয়া চাহিল না ।
•
কয়েকদিন হইল সোহান খালাদের বাড়িতে আসিয়াছে,খালা ওর বিবাহের সমন্ধ খুজিতেছে। খালার ধারনা ওর মত ছেলে দু চারটে গ্রাম খুজিলেও মিলবে না, কেন একটা মেয়ের জন্য গাজা খাইয়া বেড়াইবে, দুনিয়ায় কি মেয়ের আকাল পড়িয়াছে,,,,??? আমাদের ছেলে কি দেখিতে শুনিতে খারাপ ...??? ওর থেকে ভালো মেয়ে দেখিয়া বিবাহ দেব।
সোহান অবশ্য আসিতে চাহিয়াছিল না। সারাদিন ছন্নছাড়ার মত ঘুরিয়া বেড়ায়, ইহা দেখিয়া মায়ের মন কাঁদে, সোনার মত ছেলের রোদে মুখ পুড়িয়া কালা হইয়া গিয়াছে, শরীরের হাড্ডি কখানা গোনা যাইতেছে। সবেমাত্র অসুখ ছাড়িয়া উঠিয়াছে তারপর আবার গাজা ধরিয়াছে, এমন চলিলে বাছাধন কখন কি করিয়া ফেলে ইহা ভাবিয়া তাই খালার বাড়িতে পাঠাইয়াছে।
পরন্তু বৈকাল। খালাদের বাড়ি হইতে দুদিন পর বাড়ি ফিরিতেছে। বাড়ির বাইরে মোটেও থাকিতে ইচ্ছে করে না তবুও দুদিন কাটিয়া গিয়াছে। বাড়িতে ও যায়তে ইচ্ছা করিতেছে না বাড়ি যাবার পথটা যে আয়েশাদের বাড়ির সামনে দিয়েই। ও বাড়ির সামনে গেলে কিংবা দুর হইতে দেখিলেই মনের মধ্যে কেমন একটা অজানা আর্তনাদ জাগিয়া ওঠে তারপর আজিকে নাকি আয়েশাদের আসিবার কথা আছে। সোহানের মনটা বরই ছন্নছাড়া। দুঃখকে ভুলিতে চেষ্টা করিতেছে কিন্তু ফল পাইতেছে না। সোহান একটা গান ধরিল দুঃখ যদি লাঘব হয়, তারপর ও বাড়ির সামনে দিয়েই যাইতে হইবে কেউ যেন টের না পায়।
এদিকে আয়েশা বাড়ি আসিয়া কয়েকবার সোহানের খোজ লইয়াছে, ও নাকি বাড়িতে নাই। নব বিবাহিত পতিকে লইয়া বাড়ির বাহিরের দরজার সিঁড়িতে বসিয়া আছে।
সোহান সাইকেল চালাইয়া গান গাইতে গাইতে আসিতেছিল।
আয়েশাদের বাড়ির সামনে আসিয়া দেখিল আয়েশা পতিকে লইয়া বসিয়া গল্প করিতেছে, সোহান পাশ কাটাইয়া যায়তে চাহিল। হঠাৎ পিছন হইতে কার যেন ডাক, 'হ্যালো সোহান ভাই একটু দাড়ান প্লিজ '
পিছনে চাহিয়া দেখিল আয়েশার স্বামী কাতর নয়ন চাহিয়া ডাকিতেছে' শত আপত্তিকে মনের মধ্যে চাপিয়া রাখিয়া ফিরিয়া আসিয়া মুখে হাসির রোল তুলিয়া কহিল, 'কেমন আছেন দুলাভাই...??? আর আপনি আমাকে চিনলেন বা কিভাবে,,? আগে বোধহয়. তো আমাদের দেখা হয়নি '
মাহাবুব হাসিয়া কহিল, 'কাউকে চিনতে হলে কি পুর্ব পরিচিত হওয়ায় প্রয়োজন আছে কি, মন থেকে খুজলেই চেনা যায় '
--তাই বুঝি।
--হুম সেটাই, আপনারা কথা বলুন।
এই বলিয়াই মাহাবুব একটু দুরে সরিয়া গেল। সোহান কিছু বুঝিতে পারিতেছে না, উনি আমাকে চিনলোই বা কিভাবে আর আয়েশার সাথে কথা বলিতে বলারই বা কারণ কিসের?
এতক্ষণ আয়েশা চুপ করিয়া ছিল, এখন আর চুপ থাকিতে পারিল না, দৌড়াইয়া আসিয়া সোহানকে জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিয়া ফাটিয়া পড়িয়া কহিল, 'তুমি এখনই আমাকে নিয়ে পালিয়ে চল, আমি আর থাকতে পারছি না '
সোহান সচকিত হইয়া উহাকে ছাড়াইয়া দিয়া কহিল, 'আহা, এ কি করছ, পাগল হয়েছ নাকি , উনি দেখলে কি ভাববেন...?'
--সমস্যা নাই, আমি বাসর রাতেই উনাকে সব বলে দিয়েছি, উনি সব জানে '
--তাই বলে উনার সামনে? তাছাড়া তুমি উনার স্ত্রী।
এই বলিয়া মাহাবুবকে ডাকিয়া কহিল, 'দুলাভাই এখন একটু যায়, বাড়িতে অনেক কাজ সময় পেলে আবার আসব '
মাহাবুব কাছে আসিয়া হাত চাপিয়া ধরিয়া কহিল, 'চলেন ওই দিক থেকে একটু হেটে আসি, আপনার সাথে কিছু কথা ছিল '
সোহান হাত ছাড়াইয়া কহিল, একটু কাজ আছে সময় হলে আমি নিজে থেকেই আসব' কথাবার্তা সাংগ করিয়া চলিয়া আসিলো ।
তারপর আয়েশা সোহানকে অনেক খবর পাঠাইলো কিন্তু সোহানের কোন খবর মিলিল না। মাহাবুব নিজেও কয়েকবার খুজিতে গেল কিন্তু উহাকে পাইলো না।
আয়েশার শশুর বাড়ি ফিরিবার সময় ঘনাইয়া আসিতেছে। যতই সময় ঘনাইয়া আসে ততই উদ্ধেগ বাড়িয়া যায়। সোহানের কোন খোঁজ নাই, সোহান কি তাহলে আমাকে ভুলে গেল...?
•
একমাস কাটিয়া গেল আয়েশা শশুর বাড়িতে গিয়াছে, সোহানকে উদ্দেশ্য করিয়া কয়েকটা চিঠি পাঠাইয়াছে, সোহান কোন উত্তর দেয়নি। সে এখন পরের বধূ। আপনার কপালে সুখ নাই বলিয়া কি অপরের কপালে ও থাকিবে না। চিঠির উত্তর পাঠাইলেই নিশ্চয়ই পাগলামি শুরু করিয়া দেবে, তাই কোন উত্তর পাঠাইনি।
ওদিকে সোহানের খালা বিবাহের জন্য তলব পাঠাইতেছে, কিন্তু সেখানেও যাইতেছে না। সারাদিন কদম তলায় গিয়া বসিয়া থাকে, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়াও করে না।
একদিন জরুরি একটা কাজে আয়েশাদের গ্রামে যায়, ফিরিবার সময় আয়েশাদের ফিরিতেছিল, ভাগ্যক্রমে দেখাও হইয়া যায়। কথা বলে নাই কিন্তু কাতর নয়নে চাহিয়া ছিল সোহানের দিকে।
সোহান আয়েশাকে উদ্দেশ্য করিয়া একটা চিঠি লিখিয়া ফেলিলঃ
" অনেকদিন পর তোমাকে দেখিলাম। তোমার রুমের জানালার ওপাশ থেকে অনলস ভঙ্গিতে চাহিয়াছিলে আমার দিকে। স্মৃতিগুলো ঝুলছিল জানালায়। অভিমানের অধিনিয়মকে ভঙ্গ করে আমিও তাকালাম ক্ষণিকের জন্য। মুহুর্তগুলো প্রসন্নতায় ভরে গেল। পরক্ষণেই তোমার দেওয়া কষ্টের দল সংহতি পোষণে আমাকে জানান দিল ভালই আছি, তুমিও ভাল থেকো। তোমাদের নবনির্মিত বাড়ির ছাঁদে বসিয়া অভ্রভেদী স্বপ্ন দেখ। আর আমাকে আমার মতো থাকতে দাও; আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি।"
চলবে...........
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now