বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
১.
আমার কিছুতেই কিছু ভালো লাগছেনা । আমি কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না , গতকাল রাতে আমার হোস্টেলের প্রায় অর্ধেক ছাত্রের মৃতদেহের উপর দিয়ে আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছি , সেই সব ছাত্রের মধ্যে আমার নিজের রুমমেট ছিল যে আমাকে ছাড়া রাতে রুম থেকে ভয়ে বের হতো না ! কালরাতে আমি আমার সেই বন্ধুর রক্তাক্ত বুকের উপর দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি যে আমার হোস্টেলের না ঘুমানোর রাতগুলোয় আমার জন্য , হ্যাঁ হ্যাঁ শুধু আমার জন্যই আমার পাশে বসে কাটিয়ে দিতো !
তপ্ত হয়ে যাওয়া চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে চাচ্ছে , আমি বাঁধা দিয়ে রাখতে চাচ্ছি , কোনভাবেই আমি কাঁদবোনা , কাল রাতের পর আমার আর কাঁদা উচিত্ না , আমার দুঃখে কষ্টে শোকে লজ্জায় ঘৃণায় পাথর হয়ে যাওয়া উচিত্ , কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আমি পাথর হয়ে যাইনি ..
শুধু আমার ভেতরে একটা ভয়াবহ ক্রোধ ফুঁসে উঠছে , আমি দমকে দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছি । কাঁপতে কাঁপতেই আমি হঠাত্ মাটিতে বসে পড়লাম , চোখের সামনের মাটি গুলো তখনো রক্তাক্ত । সেই রক্তাক্ত মাটি ছুঁয়ে আজ প্রতিজ্ঞা করছি , আমি এই জীবনে বেজন্মা খুনীদের ক্ষমা করবো না , আমার বন্ধুদের রক্তের বদলা আমি নিবো , কীভাবে আমি জানি না । শুধু জানি , আমাকে প্রতিশোধ নিতে হবে , রক্তের প্রতিশোধ ।
২.
আমি এখন যে জায়গাতে আছি , সেখান থেকে আমাদের বাড়ী মাত্র ৪০ কিঃমিঃ । অনেক ইচ্ছা করছে , একবার বাড়ী যেয়ে মা কে দেখে আসতে । গত কয়েকদিন ধরেই করছে । ক্যাম্পে কাটানো চার মাসের কথা আমি আগে চিন্তাও করতে পারতাম না । এই আমার এককালে শুচিবায়ু ছিলো , এই আমি গায়ে একটু ধুলো লাগলে দশবার গোসল করতাম । আচ্ছা মা কি আমাকে দেখলে চিনতে পারবে ? মা কি জানে তার আলাভোলা ছেলেটা আজকাল বেঁচে থাকে নিকোটিনের প্রশ্বাসে ?
৩.
সেক্টর দুইয়ে আছি আমি । এখন ফেনী বর্ডারের কাছাকাছি । আজকে একটা আনন্দের দিন গেছে আমার । কতদিন পর আজ পাতে গরম ভাত আর ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোল পড়লো , এলাকার মাস্টার পাঠিয়েছে , বুড়ো মানুষটাকে কষ্ট দিতে আমরা কেউই চাইনি । আমাদের লীডার মতিভাইয়ের চাচা হন মাস্টার , সম্পর্কটা লতায়পাতায় প্যাঁচানো । আজরাতের অপারেশনে মাস্টার চাচার ছেলে কমল ও যাচ্ছে । আহারে বাচ্চা ছেলেটা , যদি কখনো দেশ স্বাধীন করতে পারি , এই ছেলেকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবো , কমল একদম আমাদের ছোটনের মত দেখতে । হারানো ভাইকে খোদা বুঝি এই দুর্দিনে ফিরিয়ে দিলেন !
মতিভাইয়ের তাগাদা আসে , গোগ্রাসে গিলতে থাকি , আজরাতে বড় অপারেশন ।
এটার পরেই বাড়ি যাবো , ওহ্ কতদিন মা কে দেখিনা ! খবর পেয়েছি , মায়ের শরীর খুব একটা ভালো নেই , যক্ষাতে পুরো শরীর খেয়েছে ।
৪.
যুদ্ধ !!
তুই আর কত কেড়ে নিবি ? আমি নিজ হাতে আর কয়টা লাশ দাফনের পর তুই থামবি বল ?
কমলকে শুইয়ে দিয়ে এসেছি , সেই রক্তে ভেজা মাটিতেই , মাস্টার চাচার কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়নি , এই প্রথম যুদ্ধ শুরুর পর কাঁদলাম , কমল ছেলেটার একটা কথা খুব কানে বাজছে ,
ভাই . আপনি বলেন তো বাংলাদেশ নামটা এতো সুন্দর কেন ? এই নামটা পাওয়ার জন্যে তো হাসতে হাসতে দশবার মরা যায় ! আমি অবশ্য একবার মরব , আমি বীরপুরুষ কি না !
ওহ্ খোদা , চারপাশ আঁধার করে দাও , আমি চাইনা কেউ আমাকে কাঁদতে দেখুক , যোদ্ধাদের কাঁদতে নেই ।
৫.
মৃত্যু জিনিসটা মাঝে মাঝে উত্সবের মত মনে হয় । মায়ের সময় বেশি নেই জানার পুরো বাড়িতেই লোক গমগম করছে , বড়বাড়িতে এটাই সমস্যা , কোলাহলের কমতি নেই , হয়না কখনো ।
মায়ের ঘরে বাড়ীর মহিলাদের ভীড় , বড় ভাইরা কেউ এসে পৌঁছেননি এখনো । ভীড় ঠেলে মায়ের কাছে যেয়ে বসি , উনার পুরো শরীরটা যেন বিছানায় মিশে গেছে ।
আমি ডাকার আগেই চোখ খুললেন , খুব কষ্টে কি যেন বললেন , ঠিক বুঝলাম না । মাথা টা নিচু করে আবার শোনার চেষ্টা করি , ক্ষীণ কন্ঠ এইবার শুনতে পাই , ঠা ঠা ঠা বুলেটের শব্দে কান অনেকটাই গেছে , বেশ বুঝতে পারছি ।
মায়ের যে কথাটা পরিস্কার কানে আসে তা হলো-
বাবারে , তুই তো বড় হয়ে গেছিস বাপ .. ক দিন খাসনি বলতো ? আলমারিতে পিঠা তুলে রেখেছি , সবুরনকে ডাক এনে দিতে বলি ..।
মা বলতেই থাকেন , একসময় সবুরন বুয়া আসেন , আলমারি থেকে পোকায় খাওয়া , পঁচে গলে যাওয়া পুলি পিঠা এনে দেন , মাকে স্বান্তনা দিতে না , মায়ের হাতের খাবারের লোভেই সেই পিঠা মুখে তুলতে নিই , কিন্তু তার আগেই মাঝ উঠোন থেকে ফাঁকায় ছোড়া গুলির আওয়াজ টা বেশ কানে আসে !
৬.
শান্তি কমিটির শফি চেয়ারম্যান , আমার বংশের ই রক্ত , আমার ই চাচাতো ভাই !
মুখে থুতুর দলা টা ছুড়ে দেয়ার অদম্য ইচ্ছা টাকে মাটি চাপা দিই ।
এতোদিন কোই আসিলা ,বেণু ?
শফি চেয়ারম্যানের কথা শুরু হয় ।
হিন্দু গো মত দেশই মা , দেশই মা করো , নিজের মা যে মরতে বসছে , তার কাছে তোমরা কোন ভাই নাই এটা কেমন কথা ? আমরা আর কত ? তা চলো , একটু ক্যাম্পে চলো ।
শফি ভাই , আমারে একটু সময় দেন , আম্মার অবস্থা টা তো ...
কথা শেষের আগেই বেজন্মা কুত্তা শফি চেয়ারম্যান খ্যাক খ্যাক হাসি দিয়ে বলে ,
তোমাদের ভাই সবগুলার তেল হইসে না ? সেই তেলে হিন্দুয়ানি দেশমাতার জন্যে ভালবাসার পিঠা ভাজো , আগে তার মজা পাও , পরে নিজের মায়ের সেবা করো নাহলে ..তাছাড়া তুমি আর তোমার ভাইদের মত কুসন্তান জন্ম দিয়েছে , চাচীআম্মাকে তো শেষ পানিটাও দেয়া ঠিক না । চলো , চলো ।
ব্যার্থ আমি শেষবারের মতোই হয়তো ঘুরে বাড়িটাকে দেখে নিই ।
৬.
রাইফেলের বাঁট টা যখন ঠাস করে আমার চোয়ালে আঘাত করে , আমি না চাইলেও প্রচন্ড কাতরে উঠি । আমার ডান হাতের একটা আঙ্গুল ও আর অবশিষ্ট নেই । যতটুকু জেনেছি আজ ই আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে ।
ডান হাতের দিকে আমি তাকাতে চাই না , তবু ও বারবার চোখ চলে যায় ..
আমার স্কুলের কথা মনে পড়ে । আমি এখন যেই ঘরটায় , সেই ঘরেই আমি টানা দশবছর হাতের লেখার সেরা পুরষ্কার পেয়ে এসেছি , এই ডান হাতের লেখা এক মানপত্র এখনো এই রুমের দেয়ালে টাঙানো ...
ভাই চলেন চেয়ারম্যানসাবে ডাকে , এক পাতি রাজাকারের ডাকে আমার চিন্তার জালের সুতো কেটে যায় । আমি বহুকষ্টে উঠে দাঁড়াতে চেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাই , ওরা আমাকে টেনে তোলে ।
৭.
তুই একবার বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ , খোদার কসম আমি তোরে ছাইড়া দিবো । একবার বল , শুধু একবার ।
আমি বলবো না , আপনি জানেন এইটা ।
তাইলে খালের দিকে উলটা ঘুর । তোরে বাঁচাইতে পারলাম না ।
আমি আপনের রাইফেলের দিকেই তাকাবো , আপনি আমার বুকে গুলি করেন ।
তোর ভয় লাগে না ? সত্যি ক , তোর মনে ভয় নাই ?
না নাই ।
তোর মনে কোন কষ্ট নাই ?
না । আমি জানি , সংখ্যায় আমরাই বেশী । কয়জনরে মারবা তোমরা ? আমি জানি , একদিন বাংলাদেশ হবেই ।হয়তো আমি থাকবো না , কিন্তু তুমি বা তোমরা যদি থাকোও , তোমরা থাকবা বেজন্মা হিসেবে । মানুষ তোমাগোরে কুত্তার থেকে বেশী ঘেন্না করবে ।
তুই একবার বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ , তোরে আমি ছাইড়া দিবো , মায়ের কবরে একমুঠা মাটি দিতে পারবি , এখনো সময় আসে , একবার বল ।
না !
৮.
ঘাসে ঢাকা মাটির উপর একটা রক্তে ভেজা শরীর পড়ে আছে । কেউ যদি তার কাছে যেতো ঐ মুহুর্তে শুনতে পেতো , খুব ক্ষীণ স্বরে সে কিছু বলছে । কথা গুলো খুব সাধারণ ..
বাংলাদেশ !!!
কোন দেশের নাম কি এতো সুন্দর হতে পারে ?
হায় আমি এতো অভাগা , এতোটাই অভাগা যে , আমি স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারবো না , আল্লাহ একবারের জন্য কি আমি স্বাধীন দেশটাকে দেখে যেতে পারবো না ?
[ মাঝে মাঝে কত সাধারণ কথা অসাধারণ হয়ে উঠে ! একজন মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জানতেও পারলেন না , জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু তিনি দেশের সবুজ ঘাস আর বুকের রক্তে মিলে মিশে একাকার হয়ে তৈরি হওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার উপর ত্যাগ করেছেন । ]
লিখেছেন - নূহা চৌধূরী
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now