বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
----------------
(পর্ব ১২)
▪▪▪বিনি-মেঘে বাজ▪▪▪
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম তা জানি না, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল!..উঠতে গিয়ে উঠতে পারলুম না, আমার বুকের উপরে কে যেন চেপে বসে আছে। ভয়ে আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, বিমল, বিমল!
অন্ধকারের ভিতরে কে আমার গলা চেপে ধরে হুমকি দিয়ে বললে, 'খবৰ্দার, চ্যাঁচালেই টিপে মেরে ফেলব?
আমি একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেলুম, অনেক কষ্টে বললুম, গলা ছাড়ো, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে!
আমার গলা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে সে বললে, আচ্ছা, ফের চ্যাঁচালেই কিন্তু মরবে!
সেই ঘুট-ঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, আমার বুকের উপরে কে এ, ভূত না মানুষ?...ঘরের অন্য কোণেও একটা ঝটাপটি শব্দ শুনলুম।.তারপরেই একটা গ্যাঙানি আওয়াজ—কে যেন কি দিয়ে কাকে মারলে—তারপর আবার সব চুপচাপ।
অন্ধকারেই হেঁড়ে-গলায় কে বললে, শম্ভু, ব্যাপার কি?
আর একজন বললে, বাবু, এ ছোড়ার গায়ে দস্তির জোর, আর একটু হলেই আমাকে বুক থেকে ফেলে দিয়েছিল। আমি লাঠি দিয়ে একে ঠাণ্ডা করেছি?
—একেবারে শেষ হয়ে গেল নাকি?
—না, অজ্ঞান হয়ে গেছে বোধ হয়।
—আচ্ছা, তাহলে আমি আলো জ্বালি
—বলেই সে ফস করে একটা দেশলাই জ্বেলে বাতি ধরালে। দেখলুম, এ সেই লোকটা— ইষ্টিমারে আর ইষ্টিশানে যে গোয়েন্দার মত পিছু নিয়ে আমার পানে তাকিয়েছিল।
আমাকে তার পানে চেয়ে থাকতে দেখে সে হেসে বললে, “কিহে স্যাঙাত, ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে আছ যে ! আমাকে চিনতে পেরেচ নাকি?
আমি কোন জবাব দিলুম না। আমার বুকের উপরে তখনো একটা লোক চেপে বসেছিল। ঘরের আর এককোণে বিমলের দেহ স্থির হয়ে পড়ে আছে, দেহে প্রাণের কোন লক্ষণ নেই। দরজাজানলার দিকে তাকিয়ে দেখলুম—সব বন্ধ। তবে এরা ঘরের ভিতরে এল কেমন করে?
বাতি-হাতে লোকটা আমার কাছে এগিয়ে এসে বললে, ছোকরা, ভারি চালাক হয়েছ—না? যকের ধন আনতে যাবে? এখন কি হয় বল দেখি?
আমি ভয়ে ভয়ে বললুম, কে তোমরা?
—অত পরিচয়ে তোমার দরকার কিহে বাপু?
—তোমরা কি চাও?
—পকেট-বই চাই—পকেট-বই! তোমার ঠাকুরদাদার পকেটবইখানা। আমাদের দরকার। মড়ার মাথা আমরা পেযেছি, এখন পকেট-বইখানা কোথায় রেখেছ বল।
এত বিপদেও মনে মনে আমি না হেসে থাকতে পারলুম না। এরা ভেবেছে সেই জাল মড়ার মাথা নিয়ে সকের ধন আনতে যাবে। পকেট-বইয়ের কথাও এরা জানে। নিশ্চয় এরা করালীর লোক।
লোকটা হঠাৎ আমাকে ধমক দিয়ে বললে, এই ছোকরা! চুপ করে আছ যে? শীগগির বল পকেট-বই কোথায়—নইলে, আমার হাতে কি, দেখছ? সে কোমর থেকে ফস করে একখান। ছোরা বার করলে, বাতির আলোয় ছোরাখানা বিদ্যুতের মত জল, জল, করে উঠল।
আমি ভাড়াতাড়ি বললুম, ঐ ব্যাগের ভেতরে পকেট-বই আছে।
লোকটা বললে, ‘হু, পথে এস বাবা, পথে এস। শম্ভু ব্যাগটা খুলে দ্যাখ তো।
শম্ভু বিমলের দেহের পাশে বসেছিল, লোকটার কথায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ঘরের অন্য কোণে গিয়ে আমাদের বড় ব্যাগট। নেড়ে-চেড়ে বললে, ব্যাগের চাবি বন্ধ।
বাতি-হাতে লোকটা আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাগের চাবি কোথায়?
আমি কিছু বলবার আগেই বিমল হঠাৎ একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, এই যে, চাবি আমার কাছে।—বলেই সে হাত তুললে—তার হাতে বন্দুক।
লোকগুলো যেন হতভম্ব হয়ে গেল। আমিও অবাক ।
বিমল বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে বললে, যে এক-পা নড়বে, তাকেই আমি গুলি করে কুকুরের মত মেরে ফেলব।
যার হাতে বাতি ছিল, সে হঠাৎ বাতিটা মাটির উপর ফেলে দিলে —সমস্ত ঘর আবার অন্ধকার। সঙ্গে সঙ্গে আগুনের ঝলক তুলে দুম করে বিমলের বন্দুকের আওয়াজ হল, একজন লোক ‘বাবা রে, গেছি রে’ বলে চীৎকার করে উঠল, আমার বুকের উপরে যে চেপে বসেছিল, সেও আমাকে ছেড়ে দিলে,—তারপরেই ঘরের দরজা খোলার শব্দ, বাঘার ঘেউ ঘেউ, রামহরির গলা। কি যে হল কিছুই বুঝতে পারলুম না, বিছানার ওপর উঠে আচ্ছন্যের মতন আমি বসে পড়লুম।.
বিমল বললে, ‘কুমার, আলো জ্বালো—শীগগির। আমি আমতা আমত করে বললুম, কিন্তু-কিন্তু— —‘ভয় নেই, আলো জ্বালো, তারা পালিয়েছে।’ কিন্তু আমাকে আর আলো জ্বালতে হল না—রামহরি একটা লণ্ঠন হাতে করে তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল।
ঘরের ভিতরে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। বিমল মেঝের দিকে হেঁট হয়ে পড়ে বললে, এই যে রক্তের দাগ।
গুলি খেয়েও লোকটা পালাল! বোধ হয় ঠিক জায়গায় লাগেনি— হাত-টাত জখম হয়েছে।
রামহরি উদ্বিগ্ন মুখে বললে, ব্যাপার কি বাবু?
বিমল সে কথায় কান না দিয়ে বললে, কিন্তু জানলা-দরজা সব বন্ধ—অথচ ঘরের ভেতরে শক্র, ভারি আশ্চর্য তো! তারপরে একটু থেমে, আবার বললে, ও, বুঝেছি। নিশ্চয় আমরা যখন ও-ঘরে খেতে গিয়েছিলুম, রাস্কেলরা তখনি ফাঁক পেয়ে এ-ঘরে ঢুকে খাটের তলায় ঘুপটি মেরে লুকিয়েছিল?
কথাটা আমারও মনে লাগল। আমি বললুম, ঠিক বলেছ! কিন্তু বিমল, তুমি তো অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে, হঠাৎ কি করে দাঁড়িয়ে উঠলে?
বিমল বললে, আমি মোটেই অজ্ঞান হইনি, অজ্ঞান হওয়ার ভান করে চুপচাপ পড়েছিলুম! ভাগ্যি বন্দুকটা আমার বিছানাতেই ছিল। এমন সময়ে বাঘা ল্যাজ নাড়তে নাড়তে ঘরের ভিতরে এসে, আদর করে আমার পা চেটে দিতে লাগল। আমি দেখলুম বাঘার মুখে যেন কিসের দাগ! এ যে রক্তের মত। তবে কি বাঘা জখম হয়েছে? তাড়াতাড়ি তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখে বললুম, ‘না অন্য কারুর রক্ত। বাঘা নিশ্চয় সেই লোকগুলোর কারুকে না কারুকে তার দাঁতের জোর বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে।
তারিফ করে তার মাথা চাপড়ে আমি বললুম, সাবাস বাঘ, সাবাস —বাঘা আদরে যেন গলে গিয়ে আমার পায়ের তলায় পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
বিমল বললে, এবার থেকে বাঘাকেও আমাদের সঙ্গে নিয়ে ঘুমবে। বাঘ আমাদের কাছে ঘরের ভেতরে থাকলে এ বিপদ হয়তে। ঘটত না।
আমি বললুম, ত তো ঘটত না, কিন্তু এখন ভবিষ্যতের উপায় কি? করালী নিশ্চয়ই আমাদের ছাড়ান দেবে না, এবার তার চরের হয়তো দলে আরও ভারি হয়ে আসবে।
বিমল সহজভাবেই বললে, তা আসবে বৈকি।
আমি বললুম, আর এটাও মনে রেখো, কাল থেকে আমরা লোকালয় ছেড়ে পাহাড়ের ভেতরে গিয়ে পড়ব। সেখানে আমাদের রক্ষা করবে কে?
বিমল বন্দুকটা ঠক করে মেঝের উপরে ঠুকে, একখানা হাত তুলে তেজের সঙ্গে বললে, আমাদের এই হাতই আমাদের রক্ষা করবে। যে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, তাকে বাঁচাবার সাধ্য কারুর নেই।
—কিন্তু—
—আজ থেকে “কিন্তু” র কথা ভুলে যাও কুমার, ও হচ্ছে ভীরু, কাপুরুষের কথ৷ বলেই বিমল এগিয়ে গিয়ে ঘরের একটা জানলা খুলে দিয়ে আবার বললে, চেয়ে দেখ কুমার!
জানলার বাইরে আমার চোখ গেল। নিঝুম রাতের চাঁদের আলো মেখে স্বর্গের মত খাসিয়া পাহাড়ের স্থির ছবি আঁকা রয়েছে! চমৎকার, চমৎকার। শিখরের পর শিখরের উপর দিয়ে জ্যোৎস্নার ঝরনা রূপোলী লহর তুলে বয়ে যাচ্ছে, কোথাও আলো, কোথাও ছায়া—ঠিক যেন পাশাপাশি হাসি আর অশ্রু। বিভোর হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলুম—এমন দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি!
বিমল বললে, কি দেখছ?
আমি বললুম, স্বপ্ন।
বিমল বললে না, স্বপ্ন নয়—এ সত্য। তুমি কি বলতে চাও কুমার, এই স্বর্গের দরজায় এসে আবার আমরা খালিহাতে ফিরে যাব?
আমি মাথা নেড়ে বললুম, না বিমল, না,—ফিরব না, আমরা ফিরব না। আমার সমস্ত প্রাণ-মন ঐখানে গিয়ে লুটিয়ে পড়তে চাইছে। যকের ধন পাই আর না পাই—আমি শুধু একবার ঐখানে যেতে চাই।
বিমল জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে বললে, কাল আমরা ওখানে যাব। আজ আর কোনো কথা নয়, এস আবার নাক ডাকানে যাক—বলেই বন্দুকটা পাশে নিয়ে বিছানার উপরে লম্ব হয়ে শুয়ে পড়ল। খানিক পরেই তার নাকের গর্জন শুরু হল । তার নিশ্চিন্ত ঘুম দেখে কে বলবে যে, একটু আগেই সে সাক্ষাৎ যমের মুখে গিয়ে পড়েছিল। বিমলের আশ্চর্য সাহস দেখে আমিও সমস্ত বিপদের কথা মন থেকে তাড়িয়ে দিলুম। তারপর খাসিয়া পাহাড় আর যকের ধনের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লুম, তা আমি জানি না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now