বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
-----------------
(পর্ব ২)
▪▪▪যকের ধন▪▪▪
এই অদ্ভুত অঙ্কগুলোর মানে কি? অনেক ভাবলুম, কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারলুম না।
হঠাৎ মনে পড়ল ঠাকুরদাদার পকেট-বইয়ের কথা। সেখানাও তো এই খুলির সঙ্গে ছিল, তার মধ্যে এই রহস্যের কোন সদুত্তর নেই কি?
তখনি উপরে গিয়ে তাক থেকে পকেট-বইখানা পাড়লুম। খুলে দেখি, তার গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত লেখায় ভরতি। গোড়ার দিকের প্রায় ষোল-সতেরো পাতা পড়লুম, কিন্তু সেসব বাজে কথা। তারপর হঠাৎ এক জায়গায় দেখলুম;
‘১৯২০ সাল, আশ্বিন মাস —আসাম থেকে ফেরবার মুখে একদিন আমরা এক বনের ভিতর দিয়ে আসছি। সন্ধ্যা হয়-হয়—আমরা এক উঁচু পাহাড়ে-জমি থেকে নামছি। হঠাৎ দেখি খানিক তফাতে একটা মস্ত-বড় বাঘ। সে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে যেন কার উপরে লাফিয়ে পড়বার জন্যে তাক করছে –আরো একটু তফাতে দেখলুম, একজন সন্ন্যাসী পথের পাশে, গাছের তলায় শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। বাঘটার লক্ষ্য তাঁর দিকেই!
আমি তখনি চীৎকার করে উঠলুম। আমার সঙ্গের কুলিরাও সে চীৎকারে যোগ দিল। সন্ন্যাসীর ঘুম ভেঙে গেল, বাঘটাও চমকে ফিরে আমাদের দেখে একলাফে অদৃশ্য হল।
সন্ন্যাসী জেগে উঠেই ব্যাপারটা সব বুঝে নিলেন। আমার কাছে এসে কৃতজ্ঞ স্বরে বললেন, ‘বাবা, তোমার জন্যে আজ আমি বাঘের মুখ থেকে বেঁচে গেলুম?
আমি বললুম, ঠাকুর, বনের ভেতরে এমনি করে কি ঘুমোতে আছে?
সন্ন্যাসী বললেন, বনই যে আমাদের ঘর-বাড়ী বাবা?
আমি বললুম, কিন্তু এখনি আপনার প্রাণ যেত!
সন্ন্যাসী বললেন, ‘কৈ বাবা, গেল না তো। ভগবান ঠিক সময়েই তোমাকে পাঠিয়ে দিলেন।
শুনলুম, আমরা যেদিকে যাচ্ছি, সন্ন্যাসীও সেই দিকে যাবেন। তাই সন্ন্যাসীকেও আমরা সঙ্গে নিয়ে চললুম।
সন্ন্যাসী দুদিন আমাদের সঙ্গে রইলেন। আমি যথাসাধ্য তাঁর সেবা করতে ত্রুটি করলুম না। তিন দিনের দিন বিদায় নেবার আগে তিনি আমাকে বললেন, ‘দেখ বাবা, তোমার সেবায় আমি বড় তুষ্ট হয়েছি। তুমি আমার প্রাণ রক্ষেও করেছ। যাবার আগে আমি তোমাকে একটি সন্ধান দিয়ে যেতে চাই।’
আমি বললুম, কিসের সন্ধান?
সন্ন্যাসী বললেন, ‘যকের ধনের!’
আমি আগ্রহের সঙ্গে বললুম, যকের ধন! সে কোথায় আছে ঠাকুর?
সন্ন্যাসী বললেন, খাসিয়া পাহাড়ে।
আমি হতাশভাবে বললুম, কোনখানে আছে আমি তা জানব কেমন করে?
সন্ন্যাসী বললেন, আমি ঠিকানা বলে দিচ্ছি। খাসিয়া পাহাড়ের রূপনাথের গুহার নাম শুনেছ?
আমি বললুম, শুনেছি। প্রবাদ আছে যে, এই গুহার ভেতর দিয়ে চীনদেশে যাওয়া যায়, আর অনেক কাল আগে এক চীন-সম্রাট এই গুহাপথে নাকি সসৈন্যে ভারতবর্ষ আক্রমণ করতে এসেছিলেন।
সন্ন্যাসী বললেন, হ্যাঁ এই রূপনাথের গুহা থেকে পঁচিশ ক্রোশ পশ্চিমে গেলে, উপত্যকার মাঝখানে একটি সেকেলে মন্দির দেখতে পাবে। সে মন্দির এখন ভেঙে পড়েছে, কিছুদিন পরে তার কোন চিহ্নও হয়তো আর পাওয়া যাখে না। একসময়ে এখানে মস্ত এক মঠ ছিল, তাতে বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীরা থাকতেন। সেকালের এক রাজা বিদেশী শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করার আগে এই মঠে নিজের সমস্ত ধন-রত্ন গচ্ছিত রেখে যান। কিন্তু যুদ্ধে তার হার হয়। পাছে নিজের ধন-রত্ন শত্রুর হাতে পড়ে, এই ভয়ে রাজা সে সমস্ত এক জায়গায় লুকিয়ে এক যককে পাহারায় রেখে পালিয়ে যান। তারপর তিনি আর ফিরে আসেননি। সেই ধন-রত্ন এখনো সেইখানেই আছে—তারপর সন্ন্যাসী আমাকে বৌদ্ধমঠে যাবার পথের কথা ভালো করে বলে দিলেন।
আমি বললুম, কিন্তু এতদিন আর কেউ যদি সেই ধন-রত্নের সন্ধান পেয়ে থাকে?
সন্ন্যাসী বললেন, কেউ পায়নি। সে বড় দুর্গম দেশ, সেখানে যে বৌদ্ধমঠ আছে, তা কেউ জানে না, আর কোন মানুষও সেখানে যায় না। মঠে গেলেও, সারা জীবন ধরে ধন-রত্ন খুঁজলেও কেউ পাবে না। কিন্তু তোমাকে সেখানে গিয়ে খুঁজতে হবে না; ধন-রত্ন ঠিক কোনখানে পাওয়া যাবে, তা জানবার উপায় কেবল আমার কাছে আছে ? এই বলে সন্ন্যাসী তার ঝোলা থেকে একটি মড়ার মাথার খুলি বার করলেন ।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, ‘ওতে কি হবে ঠাকুর : সন্ন্যাসী বললেন, যে যক ধন-রত্নের পাহারায় আছে, এ তারই খুলি। এই খুলিতে আমি মন্ত্র পড়ে দিয়েছি, এ খুলি যার কাছে থাকবে যক তাকে আর কিছুই বলবে না। খুলিতে এই যে অঙ্কের মত রেখা রয়েছে, এ হচ্ছে সাঙ্কেতিক ভাষা। এই সঙ্কেত বুঝবার উপায়ও আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, তাহলেই তুমি জানতে পারবে কোনখানে ধন-রত্ন আছে?—এই বলে সন্ন্যাসী আমাকে সঙ্কেত বুঝবার গুপ্ত উপায় বলে দিলেন।
তারপর এক বৎসর ধরে অনেক ভাবলুম। কিন্তু একলাটি সেই দুৰ্গম দেশে যেতে ভরসা হল না। শেষটা আমার প্রতিবেশী করালীকে বিশ্বাস করে সব কথা জানিয়ে বললুম, ‘করালী, তোমার জোয়ান বয়স, তুমি যদি আমার সঙ্গে যাও, তবে তোমাকেও ধন-রত্নের অংশ দেব।’
কিন্তু করালী যে বেইমান, আমি তা জানতুম না। সে ফাঁকি দিয়ে মড়ার মাথার খুলিটা আমার কাছ থেকে আদায় করবার চেষ্টায় রইল। দু-একবার লোক লাগিয়ে চুরি করবার চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু পারেনি। ভাগ্যে আমি তাকে যকের ধনের ঠিকানাটা বলে দিইনি।
কিন্তু খাসিয়া-পাহাড়ে যাবার আশা আমি ছেড়ে দিয়েছি। এই বুড়োবয়সে টাকার লোভে একলা সেই অজানা দেশে গিয়ে শেষটা কি বাঘ-ভাল্ল ক-ডাকাতের পাল্লায় প্রাণ খোয়াব? অন্য কারুকেও সঙ্গে নিতে ভরসা হয় না,—কে জানে, টাকার লোভে বন্ধুই আমাকে খুন করবে কি না।
তবে, এই পকেট-বইয়ে আমি সব কথা লিখে রাখলুম। ভবিষ্যতে এই লেখা হয়তো আমার বংশের কারুর উপকারে আসতে পারে। কিন্তু আমার বংশের কেউ যদি সত্যিই সে বৌদ্ধমঠে যাত্রা করে, তবে যাবার আগে যেন বিপদের কথাটাও ভালো করে ভেবে দেখে। এ কাজে পদে পদে প্রোণের ভয়।’
পকেট-বইখানা হাতে করে আমি অবাক হয়ে বসে রইলুম।
(ক্রমশ)
----------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now