বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
-------
- দোস্ত, কি করছিস? দেখে ফেললে মেরে ফেলবে কিন্তু
- ধুর ব্যাটা। কিচ্ছু হবে না। তুই শুধু এখানে দাঁড়া। বাকি কাজ আমার। আমি প্যাকেট দিলে, নিয়ে দৌড় দিবি।
- না তুই চল এখান থেকে। আমি এইসব পারব না। চল ভেতর থেকেই নিয়ে আসি।
- ভেতর থেকে আনলে একটা পাবি। এখানে পুরা থালা, তাও নানা ফ্লেভারের। যা করার আমি করছি। তুই শুধু এখানে থাক।
- ওই যে কে যেন আসতেছে। আমি গেলাম। তুইও চল। দোস্ত চল বলতেছি
- শালা ভীতুর ডিম।
- আমি গেলাম। কিছু হলে নিজে সামলাবি
বন্ধু ফেলে চলে গিয়েছে তাতে কি? নাড়ুগুলো তার চাই চাই। প্রায় প্রতি বছরই পূজার সময় মন্দিরের পেছন থেকে লাড্ডু আর নাড়ু চুরি করে ফাহিম আর তার আরেক বন্ধু লাবিব। ভার্সিটির সুবাদে এই বছরই লাবিবের পুরো পরিবার চট্টগ্রাম চলে যাওয়ায় ফাহিমকে বেশ বেগ পেতে হল। বেচারা নিজেও বুঝে নাই তার প্ল্যানে সামিল হওয়া নতুন বন্ধুটা এত বড় ভীতু। এখন ফাহিমের নিজেরও কেমন ভয় ভয় লাগছে।
মন্দিরের পিছে ছোট একটা ঘরে পুরোহিত আর অতিথিদের জন্য আলাদা আলাদা করে হরেক রকম নাড়ু আর নানা পদের মিষ্টি সাজিয়ে রাখা আছে। ফাহিম লোভ সামলাতে না পেরে তখনই কয়েকটা টপাটপ মুখে পুরে ফেলে। ধরা পড়ার কথা মাথায় আসতেই সাথে আনা প্যাকেটে দ্রুত নাড়ু আর মিষ্টি গুলা ভরতে থাকে। কারো পায়ের শব্দ কানে আসতেই ফাহিমের মুখ বাংলার পাঁচ হয়ে যায়। এতদিন বড়দের কাছে শুনেছিল চোর একদিন না একদিন ধরা পরেই। আজকে সেদিন এসেই পড়লো। কেন যে বন্ধুর কথা শুনলো না!
- এই কে আপনি?
এক মেয়ের কন্ঠে কথাটা শুনে নিজেকে সামলে নিয়ে পিছে ঘুরল ফাহিম। কলেজে থাকতে ক্লাস মিস করলে জবাবদিহি করার সময় যেই পদ্ধতি খাটাতো আজকে সেটাই আজকে করতে হবে। কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শিপ্রা। মন্দিরটা ওদেরই। এলাকার বেশ নামডাক ওদের পরিবারের। ছোট্ট এই মন্দিরে বেশ জমকালো ভাবেই পারিবারিক ভাবে প্রতি বছর দুর্গা পূজার আয়োজন করে শিপ্রার বাবা। এলাকার সবাই আসে পূজা দেখতে, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই। আর অতিথিদের খাতিরে কোন কমতি রাখে তারা। ব্যবসার সুবাদে ফাহিমের বাবার সাথে শিপ্রার বাবার বেশ ভাল খাতির। কিন্তু ফাহিমের এই কান্ডের কথা জানলে নির্ঘাত বাসায় বিচার যাবে।
শিপ্রা মেয়েটার সাহস আছে বটে। এমন আচমকা কাওকে দেখলে ঘাবড়ে যাওয়ার কথা। অথচ মেয়েটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখে ‘আজকে মেরেই ফেলব’ টাইপের একটা ভাব।
- আরে ফাহিম ভাই না?
- হেহে শিপ্রা কেমন আছ? দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা। পূজা দেখতে এসেছিলাম।
- কিন্তু পূজা তো মন্দিরে হচ্ছে। আপনি এখানে কি দেখতে এসেছেন?
- না না। ওই যে আঙ্কেল বলল প্রসাদ গুলা নিয়ে যেতে। তাই আর কি এলাম
- কিন্তু বাপি তো প্রতিবছর আমার আর দিদির হাত দিয়েই সবাইকে প্রসাদ দেয়ায়। আমি সেটাই নিতে এসেছি
- ওহ! না মানে আমি চেক করতে এসেছিলাম সব ঠিক মত আছে কিনা। ইয়ে মানে আর কি...
- চোর তো একদিন ধরা পরেই, জানেন না? এত বছর ধরতে পারি নাই। কিন্তু আজকে আপনার রেহাই না। আপনার জন্য প্রতি বছর দিদিকে কত কষ্ট করতে হয়
- শিপ্রা দেখ আমরা ফ্রেন্ডরা জাস্ট ফান করার জন্য এমন করি। তুমি প্লিজ কাওকে বল না। প্লিজ, তোমার পায়ে পড়ি। আব্বু জানলে বাসা থেকে বের করে দিবে। প্লিজ। আর কখনো করব না। প্রমিজ। প্লিজ
- ফান? এখানে ফানের কি আছে?
- এভাবে ফ্রেন্ডরা মিলে কিছু খাওয়ার মজাই আলাদা। তুমি কখনো এমন কর নাই? ইশ তুমি তো তাহলে লাইফে কোন মজাই কর নাই। পিচ্চি
- শুনেন আপনি আমার থেকে মাত্র একটু বড়। তারমানে এই না যে আমি কোন ফান করি না। নেক্সট ইয়ার ভার্সিটি উঠে গেলে আরো করব। কিন্তু তাই বলে এইসব চুরি ফুরি না
“এই শিপ্রা মা কই রে? আয় তাড়াতাড়ি। কোন সমস্যা? আমি আসবো?” শিপ্রার বাবার কন্ঠ শুনে আবারো ফাহিমের মুখটা পাংশু হয়ে যায়। দুই হাত জোড় করে শিপ্রার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একটা মুচকি হাসি দিয়ে বাবার কথার উত্তর দেয়,
- না না বাপি আমি আসছি। কিছু হয় নাই। সব গুছিয়ে আনছি তো
- থ্যাংকইউ শিপ্রা
- আপনার জন্য...আপনার জন্য আমি আমার ভগবানের কাছে আজকে মিথ্যা বলেছি। পাপ লাগবে এখন আমার
- অ্যা?!
- আমি আমার বাপিকে ভগমান মানি। মা মারা যাওয়ার পর বাপি আমার আর দিদির জন্য যত কষ্ট করেছে তা আর কেওই করে না
- ওহ সরি শিপ্রা। আমার জন্য তোমাকে মিথ্যা বলতে হল
- সরি বললে হবে না। আপনাকে আমার জন্য কিছু করতে হবে
- হ্যা সমস্যা নাই। ইয়ে...কি করতে হবে?
- সেটা পরে বলব। সাতদিন পর আমার সাথে আরমানিটোলা মাঠে বিকালে দেখা করবেন
- কেন?!
- বললাম না পরে বলব?
- আচ্ছা! এখন যাই?
- আচ্ছা। আর আপনার হাতের প্যাকেটটা দেন, ভরে দিচ্ছি। সবাই মিলে খেয়েন। ভগবানের ঘর থেকে খালি হাতে যেতে হয় না। যেমন আপনাদের ঈদে আন্টি না খেয়ে আসতে দেন না। আর সবাই পূজা দেখতে এসেন আবার
- অনেক অনেক থ্যাংকস
- সাতদিন পর, বিকালে। মনে থাকে যেন
২
- হাই ভাইয়া। সরি। বেশি লেইট করে ফেললাম?
- না আসলে আরো ভাল হত! আমার টেনশনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কি করাবা সেটা ভেবে
- আরেহ এত টেনশনের কি আছে? এই নেন বাদাম খান
- তুমি আমার সাথে বাদাম খেতে এখানে এসেছ? আমি জানতাম না তুমি আমাকে এত পছন্দ কর
- ছিঃ! কিসব বলে। সারাদিন মাথায় এইসব বাজে চিন্তা ঘুরে নাকি?
- তাহলে আপা কেন ডেকেছেন?
- আপনি আমাকে ঘুড়ি বানানো আর ওড়ানো শেখাবেন। আমার অনেক শখ। আগে চান্স পাই নাই কখনো। কিন্তু এবার সাকরাইনে আমি ঘুরি ওড়াবোই। শুনলাম আপনি নাকি অনেক ভাল ঘুড়ি ওড়ান? দেখি এবার কেমন শেখান!
- ম্যাডাম। ঘুড়ি ওড়াতে বাতাস লাগে। আজকে একটুও বাতাস নাই। আর এটা একদিনে শেখা যায় না।
- তো আপনাকে একদিনে কে শেখাতে বলেছে?! সাকরাইনের এখনো অনেক দেরি
- তোমার মতে আমি প্রতিদিন তোমাকে এখানে ঘুড়ি ওড়ানো শেখাতে আসব?
- অবশ্যই!
- আমি আর তোমাদের কোন পূজাতে যাব না। পাক্কা কথা দিলাম। আমি এখন গেলাম
- আর এতদিন যতগুলা নাড়ু আর মিষ্টি পেটে পুড়েছেন সেটার হিসাব আছে বুঝি? গেলে যান। আমি বাপিকে বলে দিব
- এই জন্য বলি সিরিয়াল টিরিয়াল দেইখো না। আচ্ছা শিখাব
সাকরাইনে এবার তোমার সাথেই কম্পিটিশন দিব। দেখব কি পার।
রঙ বেরঙের ঘুড়িতে ভরে যেতে থাকে ফাহিম আর শিপ্রার ঘর। মেয়েটা এখন খুব সুন্দর করে ঘুড়ি বানায়। বেশ ভালভাবে উড়াতেও পারে। প্রতিদিন বিকাল হলেই মাঠে চলে গিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা হয়ে গিয়েছে দুইজনের। যেদিন বাতাস পড়ে যায় সেদিনও দুইজন ঘুড়ি উড়ায়, দুইজনার মনের আকাশে। আসলে নেশা তো হয়েছে অন্যকিছুর। খুব ব্যস্ত জীবনের কোলাহলে খুব ভাললাগার কারো জন্য সময় চুরি করে নেয়াটাও ফাহিম এখন জানে। নিজের ছোট একটা ইচ্ছে পূরণ করতে গিয়ে জীবনে এভাবে কেও চলে আসবে শিপ্রাও কখনো ভাবেনি। মাঝে মাঝে রাতে ছাদে বসে সবকিছু নিয়ে ভাবতে ভাবতে, সেদিনের ফাহিমের মিষ্টি চুরি করার ঘটনা মনে পড়লে, নিজেই একা হেসে কুটিকুটি হয়ে যায়। শিপ্রার দিদি এসে কিছু জিজ্ঞেস করলেই কোন একটা সিরিয়ালের কিছু ঘটনা বলে লজ্জায় লাল হয়ে ঘরে দৌরে পালায়। শিপ্রার দিদি সব বুঝে মনে মনে হাসে, কিন্তু কিছু বলে না।
এদিকে ফাহিমের হয়েছে মহা জ্বালা। এমনিতেই তার পড়ায় মন বসে না। তার উপর এখন মন পড়ে থাকে সেই মাঠে, আকাশের ঘুড়িতে আর শিপ্রার খিলখিল করে হেসে ওঠা হাসিতে। তবে এই সুযোগে ফাহিমের বন্ধুরা ভালমতই পেট পূজা করে নিচ্ছে। এসাইন্মেন্ট, প্রক্সি ইত্যাদির সুবাদে প্রায় রোজ ফাহিমের থেকে ট্রীট হাকিয়ে নিচ্ছে তারা।
পরপর দুটো সাকরাইন তাদের একসাথে চলে যায়। বেশ ভালমত। যদিও দুইবারই ফাহিম ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতায় জিতে যায়, তবে দুইজনের মধ্যে কম্পিটিশন ভালমতই জমেছিল। বিপত্তি বাঁধে তৃতীয় সাকরাইনে। হঠাত করে গ্রাম থেকে শিপ্রার কাকু এসেছিলেন। এসেই তিনি ছোটদের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুড়ি উড়ানোতে যোগ দিলেন। যদিও সেবার ফাহিম আর শিপ্রা একে অপরের সাথে একটা কথাও বলেনি, তবুও তিনি কোনভাবে বুঝে গিয়েছিলেন যে শিপ্রা আর ফাহিমের মধ্যে কিছু চলছে। ব্যস! দুই বাসায় শুরু হয়ে গেল বিচার সালিশ। তারা দুইজনেই জানত দুই পরিবার জানলে এমন হবে। এমন না যে দুই পরিবারের কেও ওদের কাওকে অপছন্দ করে। সমস্যাটা সমাজ, সমাজের ধর্ম!
পরিবার থেকে কড়াভাবে তাদের আর দেখা করতে মানা করে দেয়া হয়। চাইলেও তখন তারা আর রোজ দেখা করতে পারত না। তবুও দুইজনের মাঝে কিছুই বদলায়নি। প্রতিদিন দুটো রঙ্গিন ঘুড়ি এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে উড়ে বেড়াত। কিছু ভালবাসার কবিতা অথবা টুকরো কথন নিয়ে। আর সুযোগ পেলেই পুরনো বড় মন্দিরের পিছে এক ঝলক দেখার জন্য, মন খুলে কিছুক্ষণ কথা বলার জন্য ছুটে যেত দুইজন।
৩
- এই ঘুড়িটা তুমি বানিয়েছ?
- হ্যাঁ! সুন্দর না?
- এত রং ঢং?
- ধুর! দাও তো ওটা। দিব না তোমাকে। ভাল জিনিস ভাল লাগে না। খ্যাত কোথাকার।
- নাও। নিলাম না তোমার ঘুড়ি।
- তা নিবা কেন? চার বছর পর কোন নতুন মেয়ে জুটল শুনি?
- শিপ্রা এমন কর না। মন মেজাজ খারাপ। চাকরি পাচ্ছি না।
- চাকরির জন্য এত টেনশন কর কেন? হবেই তো কোন না কোন একদিন।
- কে জানি ভেগে গিয়ে আমার সাথে ঘর সংসার করতে চায়? কি যেন নাম হবে? ওহ ঘুড়িঘর। সেটা বানাতে চাকরি লাগবে। আমার ফ্যামিলি তোমাকে মানবে, আমি ফ্যামিলিকে না। সো বাবার বিজনেসে আমার বসার আর সুযোগ নাই।
- আচ্ছা বেশি টেনশন কর না। আমি তোমার জন্য ব্রত পালন করব।
- শিপ্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধর তো।
- ফাহিম জানো? আগে পাড়ার এক বড় আপুর কাছে শুনতাম, মানুষের নাকি প্রচন্ড ভালবাসায় মরে যেতে ইচ্ছে করে। আসলেই তাই। আমারো না মাঝে মাঝে এমন ইচ্ছে করে!
- তোমার এই ইচ্ছেও পূরণ হোক!
- যাহ! ছিঃ! ভগবানের ঘরের পাশে এসব বলে বুঝি? কবুল হয়ে গেলে?
- যদি তোমার ভগবানও এটা চায়?
- না না! তা চাবে না! প্রতিদিন তার ঘরে প্রদীপ জ্বালাই, মাথা ঠেকাই। এমনটা চাইবে কোন শত্রুতায়?
- এই কারণেই। তুমি মাথা ঠেকাও মন্দিরে, আমি মসজিদে। তোমার ভগবান মানবে না!
- মানবে। আমার ভগবান আমার সব ইচ্ছা পূরণ করে।
- করে। শুধু এই ইচ্ছাটা পূরণ করবে না। তোমার আমাকে পাওয়ার ইচ্ছা উনি কখনোই পূরণ হতে দিবে না। আমি তোমার বাবার কথা বলছি। আজকে আঙ্কেল মেনে নিলে সবকিছু কত সহজ হত।
- বাপি তোমাকে অপছন্দ করে না। শুধু ধর্মের প্রতি বিশ্বাস বেশি। আর বাপি কখনোই ধর্মের বাইরে গিয়ে কিছু করবে না।
- তাই বলে এভাবে? প্রতিদিন আমাকে তার দোকানের লোক এসে থ্রেট দিয়ে যায়। নিজেকে দাগী আসামির মত লাগে।
- ফাহিম?!
- সরি, শিপু। সো সরি। আমার আসলে মাথা কাজ করছে না। এভাবে বলতে চাই নাই। সরি।
- আমি বুঝি। আচ্ছা তোমারও কি প্রচন্ড ভালবাসায় মরে যেতে মন চায় মাঝে মাঝে?
- না! মোটেও না! মরিতে নাহি চাই আমি এই সুন্দর ভুবনে।
- এত ভাল লাগে দুনিয়া?
- হুম! দুনিয়াটা খারাপ না। আমার না পড়ালেখায় কখনো মন ছিল না। ছোটবেলা থেকে জানতাম বাবার বিজনেস সব আমার। তাই আর পড়ালেখার প্রতি গুরুত্ব দেই নাই। ভাবতাম বিজনেস দেখব আর নিজের সব ইচ্ছা পুরণ করব। কিন্তু এখন বুঝতেছি ঠিকমত পড়া কত দরকার ছিল।
- ইচ্ছেগুলা একটু শুনি তো।
- আমি না সবসময় স্বাধীন পাখির মত উড়তে চেয়েছি। একদম নিজের মত করে। কোন বাঁধা, কোন টেনশন ছাড়া। অনেক ইচ্ছে আছে, শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে একটা দেড় তলা ঘর বানাবো। একতলা বাসা। আর ছাদে অর্ধেকটা জুড়ে টিনের ছাদের চিলেকোঠা, যেখানে বৃষ্টির দিন এক কাপ গরম কফির সাথে গিটারে সুর তুলে গুনগুন করব। বাকি ছাদ জুড়ে একটা ছোট বাগান, ফুলের বাগান। সেখানে কবুতরও পালব। আর...
- ফাহিম তুমি না খুলনা যাবা?
- হ্যাঁ যাব তো। সাতদিন থাকতে হবে। রাতে বাস।
- বাসায় গিয়ে সব গুছায় একটু রেস্ট নাও। এভাবে জার্নি করতে হয় না। শরীর খারাপ করবে। এই নাও আমি তোমার জন্য তোমার পছন্দের নাড়ু বানিয়েছি। রাস্তায় খেয়ে নিও।
- থ্যাংকইউ। আর প্রমিজ মি। তুমি নিজের খেয়াল রাখবা।
- রাখব। তুমি না থাকলে আর তো কোন কাজ থাকবে। নিজের খেয়ালই রাখব আর তোমার জন্য প্রার্থনা করব।
- কি প্রার্থনা করবেন ম্যাডাম?
- এই যেন তোমার জার্নি ভাল হয়, যেই কাজে যাচ্ছ সেটা যেন ঠিকমত হয় আর তোমার সব ইচ্ছা যেন পূরণ হয়। আর আমি জানি সেটা হবেই। নাহলে ভগবানের একদিন কি আমার একদিন
- ওরে বাপরে! আচ্ছা ঝাঁসি কি রাণী। আপনি ঝগড়া করেন। আমি যাই। উপস! গিয়ে আসি।
ফাহিম যাওয়ার পর আরো অনেকক্ষণ শিপ্রা মন্দিরেই বসে থাকে। ওর বানানো ঘুড়িটা ফাহিম রেখে গিয়েছে। আসলে আবার দিতে হবে। সন্ধ্যার পূজা সেরে ঘুড়িটা নিয়ে শিপ্রা বাড়ি চলে যায়। অপেক্ষা নতুন সাতদিনের!
৪
- পনেরো দিন পর তোমার আসার সময় হল? পনেরো দিন কত সময় জানো? দাঁড়াও হিসাব করে নেই। উম...তিনশ ষাট ঘন্টা
- সরি শিপু। থাইল্যান্ডে গিয়েছিলাম। অফিসের ট্যুর
- তো আমার জন্য কি এনেছ?
- এই বালা দুটা
- বাহ! খুব সুন্দর তো। আমাকে মানাবে তো?
- অবশ্যই। তোমাকে না মানালে কাওকে মানাবে না
- জানো? তোমাকে যত দেখি তত তোমাকে নিয়ে গর্ব হয়। তুমি নিজের চেষ্টায় কত কিছু করে ফেলেছ। কত সাকসেসফুল তুমি এখন। অযথাই টেনশন করতা
- সবই তোমার প্রার্থনার ফল। তুমি অযথাই এত ভয় পেয়েছিলা
- নাহ ফাহিম। অযথা না। আমি যেভাবে পরিস্থিতি গুলা বুঝেছিলাম, তুমি হয়ত সেভাবে বুঝনি। আমি জানতাম দেবীমা আমার প্রার্থনা শুনবে না এইভাবে। কিন্তু তুমি তো জান আমি হার মেনে ফেলার মত না। দেখ সব ঠিক করেই ফেললাম।
- আসলেই তাই?!
- ফাহিম বাদ দাও না। আগে বল আমাদের দেড় তলা বাড়ির খবর কি?
- একটা জায়গা দেখেছি। ভাল লেগেছে। অল্প জায়গা। অবশ্য আমাদের দুইজনের জন্যই তো। অফিসে লোনের জন্য এপ্লিকেশন দিব। পেয়ে গেলেই কাজে হাত দিব
- উফ! আমি যে কি খুশি। ফাইনালি তোমার ইচ্ছা গুলা পূরন হবে
- আর তোমার?
- আমারো! আগেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে, সবসময় হবে।
কাঁধে কারো হাত পড়তেই শিপ্রা ফাহিমের চোখের আড়ালে চলে যায়। পিছে তাকিয়ে দেখে সেই বড় মন্দিরের পুরোহিত। জুতা খুলে মন্দিরের ভেতর যাওয়ার অনুরোধ করেন। ফাহিম একটু অবাক হলেও উনার পেছন পেছন যান।
- আপনি ফাহিম না? খন্দকার সাহেবের ছেলে?
- জ্বী!
- আপনার একটা আমানত আমার কাছে ছিল। ভেবেছিলাম আপনাকে দিব না। আপনি সেটার যোগ্য না। কিন্তু আপনাকে প্রতিদিন দেখি মন্দিরের পিছে শিপ্রা মা’র সাথে কথা বলতে। শিপ্রা মা ঠিকই বলেছিল, আপনাদের কেও আলাদা করতে পারবে না। যখন যমদূতই পারেনি। আপনি আপনাদের দূরে রাখার কে? তাই আজ প্রায় আট মাস পরে শিপ্রা মা’র রেখে যাওয়া আমানত আপনাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
- কিসের আমানত?
- একটু অপেক্ষা করেন।
পুরোহিত লোকটি ভেতর থেকে শিপ্রার বানানো একটা ঘুড়ি দিয়ে আশীর্বাদ দিয়ে চলে যান উনার কাজে। এটা সেই ঘুড়িটা যেটা ফাহিম সেইদিন ফেলে গিয়েছিল। ঘুড়িতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, “অসীম ভালবাসা আর একরাশ বিষণ্ণতার যেই গল্পটি, শেষ হয়েছে নীরবে শুরু হওয়ার ক্ষণিকটা আগেই...তবুও এবার ইচ্ছেগুলো পূরণ হোক তোমার! কারণ, ভালবাসি, অনেক বেশিই”
ফাহিম ঘুড়িটা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। ফাহিম জানত শিপ্রার আত্মহত্যার কারণ। তার দিদির কাছ থেকে সব শুনেছিল। তবুও নিজেকে কিছুতেই আর ধরে রাখতে পারেনি আজ। ঠিক কতক্ষণ এভাবে কেঁদেছে সে নিজেও জানে না। যারা মন্দিরে আসছিল সবাই ওকে দেখে অবাক হয়ে চলে গিয়েছে। কিছু পিচ্ছি ছেলেমেয়ে ভিড় জমিয়েছিল কি হয়েছে জানতে। তারাও বিরক্ত হয়ে চলে গিয়েছে।
অনেকক্ষণ পর আশে পাশের কোন এক মসজীদের আজানের শব্দ শুনে উঠে দাঁড়ায় ফাহিম। পকেট থেকে কলম আর কাগজ বের করে কিছু একটা লিখে। চিঠিটা আর বালা জোড়া প্রতিমার সামনে রেখে চলে আসে। এতদিন ধরে শিপ্রার জন্য যা কিনেছে সব এখানেই রেখে গিয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসে সেটা আর সেখানে পায়নি। আসলে কোথায় যায় কখনো জানতে চায়নি। কিছু কথা না জানাই ভাল। অকারণেই খুশি হওয়া যায়।
সকলে সন্ধ্যের পূজায় ব্যস্ত। এই ফাঁকে নিশ্চয়ই শিপ্রা লুকিয়ে লুকিয়ে এসে ফাহিমের রেখে যাওয়া চিঠিটা পড়ে ফেলেছে, যেখানে ফাহিম কাঁপাকাঁপা হাতে খুব যত্ন নিয়ে লিখেছিল,
“শিপু, স্বর্গের দেবী এতদিনে তোমাকে সব সত্যি বলে দিয়েছে জানি। তবুও আমি আবার বলছি, তুমি আমার ইচ্ছেপূরণ করতে চেয়েছিলা। কিন্তু তুমি জানতাই না আমার ইচ্ছেগুলা সব তোমাকে ঘিরেই ছিল। আমি ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম, কিন্তু একা না। তোমাকে নিয়েই। আর আমার সেই দেড় তলা ঘরটার নাম ছিল ‘ঘুড়িঘর’। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শুধু তোমাকে নিয়ে। তুমি যাওয়ার পর হয়ত আমিও তোমার পথ ধরতাম। কিন্তু এতগুলা বছর আমার ছাদে উড়ে এসে জড়ো হওয়া ইচ্ছেঘুড়ির সুতোয় বাঁধা পড়ে গিয়েছি যে। আমাদের ঘুড়িঘর হবে, সেখানে আমবা একসাথে পুরোটা জীবন কাটাব। নীল আকাশে আমাদের রং বেরঙের ঘুড়িগুলো স্বাধীনভাবে উরে বেড়াবে। কোন সমাজ ধর্মের ভয় থাকবে না। এই জনমে না হোক, পরের জনমে...”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now