বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মীরার ফোনটা

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X মীরার ফোনটা যখন এলো আমি তখনও হাহা করে হাসছিলাম। অনেক দিন পর দুই স্কুল ফ্রেন্ডদের সাথে দেখা, উদ্দাম আড্ডা-ফাজলামি-হাসি... এর মধ্যেই ওর ফোন। আমি হাসি থামাতে থামাতে ফোন টা রিসিভ করে বললাম ''হুম বলো" . ওপাশ থেকে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেলো শুধু। . আমি একটু দূরে গেলাম। ফোনটা একটু কানে চেপে ধরে বললাম "হ্যালো, মীরা, শুনতে পাচ্ছো?" . কান্না ভেজা ভাংগা গলায় মীরা বললো "আসিফ!" . আমার মনে ভয়ানক অনেকগুলো চিন্তা খুব অল্পসময়ের মধ্যে খেলে গেলো। কি হয়েছে মেয়েটার? আমি ব্যকুলের মত জিজ্ঞেস করলাম "কি হয়েছে তোমার? কাঁদছো ক্যানো বলো আমাকে!" . মনে হলো অনেক দূর থেকে আওয়াজ ভেসে আসছে "তুমি একটু ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে আসতে পারবা?" আমার সাথে সাথে মনে হলো ভেতরে কিছু একটা ভেংগেচুড়ে গেলো। মনে ভয়ানক কুডাক দিতে লাগলো। . "আসছি আমি বাবু। এক্ষুণি আসছি" কোন রকমে বললাম। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। . . ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে মীরার বেডের পাশে আমি হতভম্ব মুখে বসে আছি। আমার সামনে যে মেয়েটা শুয়ে আছে, সেটাই মীরা হবার কথা। কিন্তু আমার ভেতর কেউ একজন চিৎকার করে বলছে- "এটা হতে পারে না, এটা হতে পারে না!!" . মীরার মুখমন্ডলের পুরোটা এবং ডান হাতের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। আসলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে পুলিশ এসে মীরার জবানবন্দি নিয়ে গেছে। মীরার বাবা, ভাই পুলিশের সাথে গেছেন। আমি আসার আগেই। এখন আমি চোখে মুখে বিভৎসতা নিয়ে আমার সামনে মীরা নামক প্রানিটার দিকে তাকিয়ে আছি। আমার মাথার ভেতর বয়ে যাচ্ছে প্রলয়ংকারী ঝড়। . মীরার সাথে আমার সম্পর্ক তিন বছরের এবং এর শুরুটা খুবই সিম্পল- হ্যা, সত্যি ব্যাপারটা হলো আমি মীরার অসম্ভব রূপেই মুগ্ধ হয়ে তার মন জয় করার কঠিন যুদ্ধে নেমেছিলাম। ক্যাম্পাসের অনেক প্রভাবশালী বড় ভাই নেতা ফেতাদের হুমকি ধামকি অগ্রাহ্য করে মীরার মন আমাকে জয় করতে হয়েছে। তিন বছর পর এসে এখন আমাদের সম্পর্ক অনেকটাই সবাই মেনে নিয়েছে, এত সুন্দরী একটা মেয়ের বয়ফ্রেন্ড হিসেবে আমিও খুবই খুশি এবং গর্বিত। . সারা মুখে রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ পরা মেয়েটার চেহারা দেখে আমার মাথায় যার কথা প্রথম এলো- আমার আম্মু। উনি নিজে খুবই সুন্দরী মহিলা, নিজের বড় ছেলের বৌ হিসেবে মীরার মত রূপবতী কাউকে চাইতেন বলেই তাকে মেনে নিয়েছেন। আমি নিজে সদ্য একটা স্টেবল চাকুরীতে জয়েন করেছি, সময় হয়েছে আমাদের ব্যাপারটা বিয়েতে নিয়ে যাবার। সব কিছু কি সুন্দর মতই চলছিলো। এটা কি হলো? আম্মু এখন কি বলবেন? . "বাবু তুমি এসেছো?" মীরার দুর্বল হাত আমাকে খুঁজে নিলো। আমি হাতটা আলতো করে ধরে রাখলাম। তিন বছরের মধ্যে প্রথম বারের মত এই প্রশ্নটা আমার মাথায় আসলো- "আমি কি এই মেয়েটাকে আসলেই ভালোবাসি? নাকি তার রূপটাকে?" . ডাক্তারের সাথে কথা বললাম। ভাগ্য নাকি ভালো যে কোন ভাইটাল অরগান হার্মড হয় নাই- চশমা থাকায় চোখ দুটো বেঁচে গেছে। আর এখন আধুনিক সার্জারি আছে, তবুও তার চেহারায় ভালো একটা ছাপই রয়ে যাবে। . . হসপিটালের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। চোখ ফেটে কান্না আসছে। লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান সুদর্শন যুবক আমি। বেশ ভালো ভার্সিটির ডিগ্রী ওয়ালা, ভালো স্যালারির জব আছে আমার। আমার প্রেমিকা হবু বউটাও আমার সাথেই মানানসই গর্জিয়াস একটা মেয়ে ছিলো, একই ভার্সিটিতে পড়ুয়া। সব কিছুই কি পারফেক্ট ছিলো। এলাকার নেতার বখে যাওয়া প্রতিশোধপরায়ন ছেলেটার ছুড়ে দেওয়া কিছু তরল আগুন সব কিছু উলট পালট করে দিলো! আমার মত একটা ছেলে এখন একটা বিকৃত চেহারার মেয়েকে বিয়ে করতে হবে? কেন? ভালোবাসা ছিলো বলে? ভালোবাসাটা আসলে কি? ও সুন্দর ছিলো বলেই আমি ওকে প্রপোজ করে ছিলাম না? আর আম কালো,বাট্টু কুতকুতে কেও হলে সে কি আমাকে একসেপ্ট করতো? আর এরকম একটা মেয়েকে এখন আমি আমার ফ্যামিলির সামনে কিভাবে নিয়ে যাবো?এসব ভালোবাসার কাহিনি তে বাহবা শুনা যায়, কিন্তু যারা জানে না আমাদের তিন বছরের প্রেমের সম্পর্ক জানে না তারা কি রিএক্ট করবে? আমার আব্বু আম্মুরও একটা সমাজ আছে। আর আমার ফ্রেন্ড সার্কেল? আমাদের ওয়েডিং প্ল্যান, কত কত আয়োজন, কল্পনা... আচ্ছা আমি তো এই মেয়ের জন্য কোথাও সাইন করি নাই, তাই না?... শিট এসব কি ভাবছি - পুরো ব্যাপারটা এখন এরকম লাগছে কেন? "ওহ গড" আমি ফুটপাথে দাঁড়িয়ে পাগলের মত মাথার চুল খামচে ধরলাম। ঠিক তখনি আমার সামনে দিয়ে একটা রিক্সা গেলো। . রিক্সাটা মোটরে চলা। তাতে দুই বুড়ো বুড়ি বসে আছে। বুড়াটার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাতে কাঠের লাঠি, গায়ে ধূসর একটা সোয়েটার। বুড়িটা সাদা শাড়ি পড়া। দুইজনই এত রিলাক্স একটা মুডে বসে আছেন, বয়েসের ভারে কুঞ্চিত মুখ ঘোলাটে চোখ কিন্তু দুইজন দুইজনের হাতে হাত ধরে বসে আছেন মুখে কি প্রশান্তির একটা হাসি! একজীবন ভালোবেসে কাটিয়ে দেবার পরই বুঝি এরকম কমফোর্ট আসে কারো পাশে বসে। . কয়েক সেকেন্ডের জন্যই আমি তাদের দেখলাম। এবং সাথে সাথে আমার মনে পরে গেলো গত তিনটা বছর মীরা আমার জন্য কি কি পাগলামি করেছে। মেয়েরা সহজে ভালোবাসে না সত্যি, কিন্তু একবার বেসে ফেললে কি করতে পারে সেটা সে দেখিয়েছে। মেয়েটা খুব ফানি, ইন্টেলেকচুয়াল ছিলো, তা না। তবুও সে আমার কথাতেই তো হাসতো। আমাকেই তো বন্ধুদের সামনে জড়িয়ে ধরে পরিচয় করিয়ে দিতো "তোদের দুলাভাই বলে"... শুধু আমাকে, হ্যা, ফর গডস সেক আই এম মোর দ্যান শিউর, শুধু আমাকেই মেয়েটা উন্মাদের মত ভালোবেসেছে। তার ফেসবুক, তার ইন্সটাগ্রাম সব কিছুতেই ছিলাম শুধু আমি, বাচ্চাদের মত আমাকে আগলে রাখতো, আমার জন্য সে সব কিছু দিতেও রাজি ছিলো এট এনি মোমেন্ট। সেই তার আমিটা তার এই দুঃসময়ে চলে যাবো? একটা মেয়ের সারা জীবন ধরে গর্বের জিনিস সুন্দর চেহারাটা নষ্ট হয়ে গেলো, তারপর সব কিছু উজার করে দেওয়া ভালোবাসার মানুষটাও চলে যাবে? কি হবে মনের অবস্থাটা তখন মেয়েটার? এটা কি বুঝাবে না আমি যাস্ট তার চেহারটাকেই ভালোবেসে গেছি এতটাদিন? আমাকে ঠিক কি পরিমাণ ঘৃণা সে করবে তখন? . আমি চোখ মুছে সামনে হাঁটা ধরলাম। হুম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি জানি আমি কি করবো। . . মীরা ঘুমিয়ে গেছে, মীরার মা মুখ ঢেকে বসে আছেন। আমাকে দেখে চমকে উঠলেন, মুখে একরাশ ঘৃণা, আতংক, হতাশা নিয়ে বললেন "তুমি এখনও কি করছো এখানে? এই কপাল পোড়া হতভাগীকে করুনা দেখাতে এসেছো?" . আমি মনে মনে হাসলাম। বাংলা সিনেমার দৃশ্য মনে হচ্ছে। কি আর করা, আমিও তাল মিলাই। আমি চোখ কপালে তুলে বললাম "করুনা? মীরাকে ভালোবেসেছি আমি, ওর চেহারাকে না! আপনি এরকম কথা কিভাবে বলতে পারলেন, আম্মু?" . আমার মুখে এই প্রথমবারের মত আন্টির বদলে আম্মু শুনে মহিলা সাথে সাথে ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন। এতক্ষণের জমে থাকা কান্না। তীব্র আনন্দ, স্বস্তির কান্না। বেচারি জানে না আমিও একটু আগেই কাঁদছিলাম, অন্য কারণে! . . . আমার আর মীরার বিয়ে হয়েছে বছর খানেক হয়েগেছে। বিয়েটা সত্যিই করার যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি যন্ত্রণা হয়েছে, বাতাসে যতই নীতিকথা ভেসে বেড়াক আমাদের রূপপূজারী এই সমাজ ভয়ানক নিষ্ঠুর। তাও আমি ব্যাপারটা ঘটিয়েছি। আর তার ফল হয়েছে চমৎকার। . আমার আর মীরার বিয়ের ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভয়ানক জনপ্রিয়তা পায়, রাতা রাতি আমরা দুইজন "সেলেব্রেটি" হয়ে গেলাম। আমাদের বিয়ের ছবি সহস্রবার শেয়ার হয়েছে, যত লাইক পড়েছে, নায়িক-ক্রিকেটারদেরটাতেও এত পড়ে না। বেশ কিছু পেপারে আমাদের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়, ফিচার ছাপে। রেডিও, টিভিতেও ডাক পাই সেলেব্রেটি কাপল হিসেবে। 9gag. টাইপের সাইটের মাধ্যমে পুরা দুনিয়াও একসময় জেনে যায়। আমরা ভালই উপভোগ করি এই জনপ্রিয়তা। মিডিয়ার এত মাতামাতিতে আমার দিকে আত্মীয় স্বজনরাও একসময় চুপচাপ হয়ে যায়। বরং অন্য লেভেলের একটা রেসপেক্টই পাই বন্ধু বান্ধব, কলিগ সার্কেলে। . আর ঘরে? মীরার মত ভালো এই দুনিয়ায় আর কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বাসে নাই। আমার জন্য সে আগেই পাগল ছিলো, এখন সেটা অবসেশন হয়ে গেছে। সে ধরেই নিয়েছিলো আমি তাকে ফেলে চলে যাবো। আমার পুরো গুষ্ঠির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তার জন্য লড়াই করাটা আমাকে তার চোখে প্রায় দেবতার কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এখনও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, প্রায় রাতেই আমাদের বিয়ের এলবাম বের করে দেখে। তারপর এসে পাগলের মত চুমু খেতে থাকে আমাকে, আদরে ভাসিয়ে দেয় আমাকে আর ফিসফিস করে বলতে থাকে "এত ভালো কেন তুমি... এত ভালো কিভাবে বাসলে..." আমি ঠোট চেপে হাসি। . মাঝরাতে জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় মীরার শান্ত পরিতৃপ্ত সুখী সুখী ঘুমন্ত ছোপ ছোপ চেহারাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেবার সময় আমি কৃতজ্ঞতা জানাই সেই কুঞ্চিত মুখের দুই অচেনা বৃদ্ধ দম্পতিকে যারা তাদের একজীবনের ভালোবাসার কিছুটা ভাগ অজান্তেই আমাদের দুজনকেও দিয়ে গেছেন সে রাতে।। লিখাঃ মোঃ আসিফ উর রহমান


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now