বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

পারাপার --হিমু সিরিজের ৪নং উপন্যাস (চ্যাপ্টার ৩) শেষ পর্ব

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X আপনার নাম কি মুনশি বদরুদ্দিন তালুকদার? জি। ভালো আছেন? মুনশি বদরুদ্দিন জবাব দিলেন না, দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হচ্ছে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়ার তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। আমার সঙ্গে কথাবার্তাও চালাতে চাচ্ছেন না। তালগাছের মতো লম্বা একজন মানুষ। রোগা। ক্লান্ত চেহারা। নামের সঙ্গে মুনশি থাকার কারণে ক্ষীণ সন্দেহ থাকে, হয়তো তাঁর দাড়ি আছে। ভদ্রলোকের দাড়ি নেই। আমি বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলতে পারি? কেন? এমনি। কিছুক্ষণ কথা বলব? কোনো কারণ নেই। জমিজমা সংক্রান্ত কোনো কাজ? না। আমি আপনাকে বেশিক্ষণ বিরক্ত করব না। কিছুক্ষণ কথা বলে চলে যাব। আপনার ঠিকানা বের করতে আমার খুব কষ্ট হয়েছে। অফিস থেকে মালিবাগের একটা ঠিকানা দিয়েছিল—দেখা গেল ভুল ঠিকানা। শুধু শুধু আমার সঙ্গে কথা বলতে চান কেন? শুনেছি আপনি ঘুস খান না। কাজেই আপনার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ বোধ করছি। ঘুস তো অনেকেই খায় না। তাও ঠিক। সবার নাম ঠিকানা জানি না। জানলে সবার সঙ্গেই দেখা করতাম। কেন? বারবার কেন কেন জিজ্ঞেস করবেন না তো ভাই—একটু বসতে দিন। আমার মেয়ে খুব অসুস্থ। আপনি আরেকদিন আসুন। তার কী অসুখ? বুকে ব্যাথা। আজই বুকে ব্যাথা করছে, না অনেকদিনের রোগ? অনেকদিনের অসুখ। আমি শারীরিক ব্যথা কমাতে পারি। মেয়েটার কাছে আমাকে নিয়ে চলুন। মুনশি বদরুদ্দিনের মুখের মাংসপেশি সামান্যতমও শিথিল হলোনা। বোঝাই যাচ্ছে এ কঠিন লোক। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে যে দাঁড়িয়েই আছে। এক মুহূর্তের জন্যেও দরজা থেকে হাত সারায় নি। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বললাম, আচ্ছা ভাই যাই। আরেকদিন আসব। সিঁড়ি দিয়ে প্রায় নেমে গেছি, তখন বদরুদ্দিন ডাকলেন, আসুন। আমি ঘরে ঢুকলাম। একজন সৎ মানুষের বসার ঘর যেমন হওয়া উচিত, ঘরটি তেমন। এক কোনায় কয়েকটা কাঠের চেয়ার, অন্য কোনায় বড় চৌকি। অসুস্থ মেয়েটি এই চৌকিতেই শুয়ে আছে। ১৪-১৫ বছর বয়স। মায়া-মায়া মুখ। হাত-পা এলিয়ে শুয়ে আছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ব্যথায় ঠোঁট নীল। এই অবস্থায়ও সে আগ্রহ নিয়ে আমাকে দেখছে। আমি হাসলাম। সেও হাসার চেষ্টা করল। আমি সহজ গলায় বললাম, মেয়েটার মা কোথায়? দেশের বাড়িতে। বেতন যা পাই তাতে ফ্যামিলি নিয়ে ঢাকায় থাকা যায় না। আমি একটা ঘর সাবলেট নিয়ে একা থাকি। এই মেয়েটি কি আপনার সঙ্গে থাকে? একে চিকিৎসার জন্যে নিয়ে এসেছিলাম। চিকিৎসা হচ্ছে? বদরুদ্দিন চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, আপনার মেয়ের নাম কী? ওর নাম কুসুম। আমি বসে আছি একটা চেয়ারে। বদরুদ্দিনের হাতে একটা গ্লাস এবং চামচ। গ্লাসে সম্ভবত শরবত জাতীয় কিছু আছে। তিনি চামচে করে মেয়ের মুখে শরবত দেয়ার চেষ্টা করছেন। মেয়েটা শরবত খেতে চাচ্ছে না। আমি বললাম, ভাই শুনন,আপনার মেয়েটার মনে হয় খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে—চলুন মেয়েটাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। না। না কেন? আমি কারো দয়া নেই না। দয়া বলছেন কেন? বলুন সাহায্য। আমি কারোর সাহায্যও নেই না। শুনন ভাই—এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে সাহায্য নিতে হয় এবং সাহায্য করতে হয়। Give and take. আমি আপনাকে চিনি না, জানি না—কেন আপনি খামাখা বিরক্ত করছেন? মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে, আপনি তার কষ্ট কমাবার চেষ্টা করবেন না? আমি আমার সাধ্যমতো করেছি। যেটা আমার সাধ্যের বাইরে সেটা আমি করব না। বদরুদ্দিন সাহেব—সততা একসময় রোগের মতো হয়ে দাঁড়ায়। সবসময় দেখা যায় সৎ মানুষরা ভয়ানক অহঙ্কারী হয়। এরা নিজেদেরকেই শুধু মানুষ মনে করে, অন্যদের করে না।আপনি নিজে যেমন কারোর সাহায্য নেন না—আমি নিশ্চিত, আপনি কাউকে সাহায্যও করেন না। করেছেন, কাউকে কেনো সাহায্য? আমি আমার নিজের মতো থাকি। নিজের মতো থাকার জন্যে তো আপনাকে পৃথিবীতে পাঠানো হয় নি। আপনি কে? আমার নাম হিমু। বাইরে ঠাণ্ডা আছে। মেয়েটাকে একটা গরম কাপড় পরান। আমারা তাকে ভালো কোনো ক্লিনিকে নিয়ে যাব। আবার যদি না বলেন—তিনতলা থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেব। অসুস্থ মেয়েটি তার বাবাকে চমকে দিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেলল। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, কুসুম, তুমি কি আমার সঙ্গে হাসপাতালে যাবে? হুঁ। তোমার ব্যথা কি এখন একটু কমেছে? হুঁ। আপনি কে? আমার নাম হিমু। ভালো নাম হিমালয়। মেয়েটি আবারো হেসে উঠল। মনে হচ্ছে সে অতি অল্পতেই হেসে ফেলে। বদরুদ্দিন গম্ভীর গলায় বললেন, হাসপাতালে কুসুমকে নিয়ে লাভ হবে না। ওর একটা অপারেশন দরকার। ডাক্তাররা বলছেন এই অপারেশন এখানে হয় না। আগে কখনো হয় নি। আগে হয় নি বলে কোনোদিন হবে তা তো না। এবার হবে। মেয়েটার গরম কাপড় নেই? বদরুদ্দিন লাল রঙের একটা সুয়েটার বের করে আনলেন। মেয়েটা আনন্দিত মুখে চুল আঁচড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে সে কোথাও বেড়াতে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁকে একটা ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিলাম। বড় ক্লিনিক বলেই বোধহয় শুধু টাকারই খেলা। ভর্তি করাবার সময়ই সাতদিনের টাকা এডভান্স দিতে হয়। এই সঙ্গে ডাক্তার এবং ওষুধের বিল বাবদ দেড় হাজার টাকা। পকেটে আছে দুটা কুড়ি টাকার নোট। একটা পাঁচ টাকার নোট। দ্রুত টাকার যোগাড় করতে হবে। জরুরি সময়ের একমাত্র ভরসা হচ্ছে রূপা। টেলিফোনে তাকে পাওয়া গেলে হয়। ক্লিনিকের রিসিপশান থেকে টেলিফোন করতে হলেও এডভান্স টাকা দিতে হয়। শহরের ভেতর প্রতি কল পাঁচ টাকা। মানুষের রোগ নিয়ে ব্যবসা কত প্রকার ও কী কী হতে পারে তা ক্লিনিকওয়ালাদের মতো ভালো কেউ জানে না। হ্যালো রূপা? হুঁ। কুকুরছানাটা যে পাঠিয়েছিলাম সে কেমন আছে? ভালো আছে। পছন্দ হয়েছে তো? হ্যাঁ,পছন্দ হয়েছে। খুব পছন্দ হয়েছে। এটা কিন্তু নেড়ি কুকুর না। বিদেশী কুকর—পুডল। শুনে আনন্দি হলাম। এখন তুমি দয়া করে একটা কাজ করো—কুকুরের দাম বাবদ চার হাজার টাকা পাঠিয়ৈ দাও। আমি লোক পাঠাচ্ছি। লোক পাঠাতে হবে না। তুমি কোথায় আছ বলো—আমি নিজেই টাকা নিয়ে আসছি। অনেকদিন তোমাকে দেখি না। রূপা টেলিফোন নামিয়ে রাখল। রূপার এখানে আসতে আসতেও আধ ঘণ্টার মতো লাগবে। এই ফাঁকে আমি সটকে পড়ব। রূপার সঙ্গে দেখা করতে চাই না। কুসুমের জায়গা হয়েছে রুম নাম্বার ৮-এ। বেশ বড় রুম। টিভি পর্যন্ত আছে। কুসুম তার শরীরের তীব্র ব্যথা অগ্রাহ্য করে তার কেবিনের সাজসজ্জা দেখছে। তার চোখে গভীর বিস্ময়। ডাক্তার সাহেব ব্যথা কমানোর ইনজেকশন দিয়েছেন। ডাক্তার সাহেবের মুখ শুকানো। মনে হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি ইনজেকশনটা দিলেন। আমি বললাম,রোগী কেমন দেখছেন ডাক্তার সাহেব তিনি রসকষহীন গলায় বললেন, বাইরে আসুন, বলছি। আমরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। ডাক্তার সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, আপনারা লষ্ট কেইস নিয়ে এসেছেন। এই মেয়ের বাঁচার কোন আশা নেই। এর হার্ট পুরোপুরি ড্যামেজড। এ যে কীভাবে বেঁচে আছে সেটাই একটা রহস্য। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, জগতটাই রহস্যময় ডাক্তার সাহেব। তবে আপনাকে একটা উপদেশ দেই। লষ্ট কেইস ধরে নিয়ে কোনো রোগীর চিকিৎসা করবেন না। চিকিৎসকরা চিকিৎসা শুরু কররেন ‘gain case ধরে, lost case’ ধরে না। ভেবেছিলাম আমার কথায় ডাক্তার রাগ করবেন। তিনি রাগ করলেন না। চিন্তিত মুখে আবার মেয়েটির কাছে ফিরে গেলেন। আমি মোটামুটি নিশ্চিত বোধ করছি। এই মেয়েটিকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। রূপা চলে আসছে। যা করার সে-ই করবে। টাকা না দিয়েই ক্লিনিক ছেড়ে চলে যাচ্ছি—এটা ক্লিনিকের লোক পছন্দ করছে না। একজন এসে টাকা দেবে—এই সত্য বিশ্বাস করতে তারা প্রস্তুত নয়। ম্যানেজার জাতীয় এক ভদ্রলোক বললেন, আপনি বসুন নারে ভাই। চা পানি খান। উনি আসলে চলে যাবেন। আমি বললাম, আমার কথার উপর ভরসা হচ্ছে না ? ছিঃ ছিঃ কী বলেন, ভরসা হবে না কেন ? জামিন হিসেবে একজন রোগী তো আছেই। টাকা-পয়সা নিয়ে আপনাদের সঙ্গে ঝামেলা হলে ইনজেকশন দিয়ে রোগী মেরে ফেলবেন। গেল ফুরিয়ে। মামলা ডিসমিস। আপনি অমানুষের মত কথা বলছেন। আপনি তো একজন ক্রিমিনাল। ঠিক বলেছেন। এখন দয়া করে অনুমতি দিন—আমাকে মুন্সিগঞ্জ যেতে হবে। মুন্সিগঞ্জের ওসি সাহেবের কাছে ধরা দিতে হবে। যেতে পারি ? কেউ জবাব দিল না। হাসপাতালের গেটের কাছে মুনশি বদরুদ্দিন দাঁড়িয়ে। তিনি আমাকে দেখলেন। কিছু বললেন না। মুখ ফিরিয়ে নিলেন। মনে হচ্ছে তিনি আমাকে পছন্দ করছেন না। মোহাম্মদ রজব খোন্দকার থানায় ছিলেন না। থানার ভেতরেই তাঁর কোয়াটার। গেলাম কোয়র্টারে। আশঙ্কা ছিল তিনি আমাকে চিনতে পারবেন না। অল্প কিছুক্ষণের পরিচয়। না পাবারই কথা। পুলিশদের স্মৃতি দুর্বল হয়। কিন্তু তিনি আমাকে চিনলেন, আনন্দিত গলায় বললেন—আরে দি গ্রেট হিমবাবু। চিনতে পেরেছেন? চিনব না মানে? মাথা কামিয়ে গর্ত বানিয়ে বসে ছিলেন। আমি ধরে নিয়ে এলাম। এরপরেও চিনব না? এখন করছেন কী ? কিছু না। হণ্টন চালিয়ে যাচ্ছেন? শহরজুড়ে হাঁটাহাঁটির বদঅভ্যাস আছে এখনো? কয়েকদিন হলো হাঁটছি না। গাড়ি করে ঘুরছি— গড়ি! গাড়ি কোথায় পেলেন? চোরাই মাল? চোরাই মাল না। অবশ্যই চোরাই মাল। ঢাকা শহরে যত গাড়ি আছে সব ব্ল্যাকমানির গাড়ি। তারপর বলুন হিমু সাহেব—আমার কাছে কী জন্যে? আপনি কেমন আছেন দেখতে এসেছি স্যার। ভালো আছি। সুখে আছি। মিরপুরে একটা জমি কিনেছি। ঘুস খাওয়া ধরেছেন? অবশ্যই ধরেছি। সকাল বিকাল সন্ধা তিন বেলা খাচ্ছি। কী ঠিক করেছি জানেন—আগামী পাঁচ বছর খাব। তারপর তওবা করব। ব্যস, আর না। বাকি জীবন আল্লাহ-খোদার নাম দিয়ে পার করে দেব। পাঁচ বছরের অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন। কারণ তিনি হচ্ছে রহমানুর রহিম। কত কঠিন অপরাধ ক্ষমা করে দেন—ঘুস তো সেই তুলনায় কিছুই না। স্যার, আপনার কাছে কলম আছে? কলম কী জন্যে? পবিত্র মানুষের একটা লিষ্ট করেছিলাম। সেখানে আপনার নাম ছিল—নামটা কেটে দেব। পবিত্র মানুষদের লিষ্ট ? হুঁ। নতুন কোনো পাগলামি ? হুঁ। গুড। ভেরি গুড। দু- একটা পাগল- ছাগল সংসারে না থাকলে ভালো লাগে না। হিমবাবু! জি স্যার ? রাতে আমার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করবেন। একজন একটা রুই মাছ দিয়ে গেছে, আট কেজি ওজন। নদীর ফ্রেশ মাছ। পোলাওয়ের চালের ভাত করতে বলেছি। পোলাওয়ের চালের ভাত, কগজি লেবু আর মাছের পেটি। দেখি মাছ কত খেতে পারেন। মাছ খেতে পারেন তো? জি স্যার, পারি। এখন সত্যি করে বলুন। আসলেই কি পবিত্র মানুষের লিষ্ট আছে? আছে। মুন্সীগঞ্জ এসেছেন আমার ব্যাপারে খোঁজখবর করবার জন্যে? জি। হিমু সাহেব, পবিত্র মানুষের ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এটা পাবেন না। আমি একজন পবিত্র মানুষকে জানতাম—আমার পিতা। অতি পবিত্র। স্কুলশিক্ষক ছিলেন—মধুর ব্যবহার। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখলে স্থির থাকতে পারতেন না। লোকে বলত থাকে দেখলে দিনটা ভালো যায়। সেই লোক কী করত জানেন ? তাঁর কাজ ছিল—কাজের মেয়েদের প্রেগনেন্ট করে ফেলা। চারটা কাজের মেয়ে আমাদের বাসায় পর পর প্রেগনেন্ট হয়েছে। আমার মা এদের টাকা-পয়সা দিয়ে গ্রামে পার করে দিতেন। আর শুধু কাঁদতেন…। বুঝলেন হিমু সাহেব, পবিত্র মানুষ না হয়ে সাধারণ মানুষ হওয়াই ভালো। রাতে ওসি সাহেবের বাসায় খেতে গেলাম। শাক, ডাল আর ডিমের তরকারি। অবাক হয়ে বললাম, রুই মাছের পেটি কোথায়? আট কেজি রুই? ওসি সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, রুই মাছের পেটি পাব কোথায়? বেতন যা পাই তা দিয়ে আট কেজি রুই একটাই কেনা যাবে। শুধু রুই মাছ কিনলে হবে? রুই মাছের কথাটা বললেন যে? একজন একটা রুই মাছ দিতে এসেছিল। হাত কচলে বলল, স্যার আট কেজি ওজন। এখন হারামজাদাকে আটবার কানে ধরে ওঠ-বোস করিয়ে বিদেয় করেছি। মিরপুরে জমি কিনেছেন? কিনেছি। মা মারা গেছেন। মার জন্যে কবরের জায়গা কিনেছি। আপনি তাহলে বদলান নি ওসি সাহেব! বদলাব কেন? আমি কি গুঁইসাপ যে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাব? আমি হলাম গিয়ে মানুষ। খেতে পারছেন হিমু? জি স্যার, পারছি খেতে, খুব ভালো হয়েছে। আপনার ভাবিকে একটু বলুন—গেস্টদের সে ভালোমন্দ খাওয়াতে পারে না, এই জন্যে তার মনটা থাকে খারাপ। কই, শুনে যাও তো… ঘোমটা দেয়া একজন মহিলা জড়োসড়ো হয়ে দরজার পাশে দাঁড়ালেন। ওসি সাহেব বললেন, ললিতা , এ হলো গিয়ে হিমু। ডেঞ্জারাস ছেলে। একে জেল-হাজতে রেখে দেয়া উচিত। একে সভ্য সমাজে চলাফেরা করতে দেয়া উচিত না। যাই হোক, এ বলছে তোমার রান্না ভালো হয়েছে। ললিতা স্বামীর কথার উত্তরে ফিসফিস করে কী যেন বললেন, ওসি সাহেব হো-হো করে হাসতে হাসতে বললেন, খবরদার এইসব কথা বলবে না। এইসব কথা শুনলে সে আবার ফট করে তোমার নাম পবিত্র মানুষদের লিস্টে তুলে ফেলবে। এ ভয়ঙ্কর ছেলে। লিস্টে নাম উঠে গেল ভয়ঙ্কর বিপদে পড়বে….হো-হো-হো-হো। হা-হা-হা। মুন্সীগঞ্জ থেকে ফেরার সময় ওসি সাহেব এক ডজন কলা কিনে দিলেন। মুন্সীগঞ্জের কলা নাকি বিখ্যাত। আমি স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। পবিত্র মানুষ র্স্পশ করলেও পুণ্য। ওসি সাহেব আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। স্ত্রীকে হাসতে হাসতে বললেন, এই পাগলাটাকে একদিন রুই মাছ খাওয়াতে হবে। বড় খালা সাধারণত দশটা বাজার আগেই ঘুমিয়ে পড়েন। এখন সাড়ে এগারটা বাজে। এত রাত পর্যন্ত তিনি কখনোই জাগেন না।আজ জেগে ছিলেন। কলিংবেল বাজতেই নিজে দরজা খুললেন। আমি বললাম, তুমি দোতলা থেকে নামলে কেন? আর লোকজন কোথায়? বড় খালা কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, তোর খালুজান সেই যে গিয়েছে আর ফেরে নি। চারদিন হয়ে গেছে। টেলিফোন করে নি, অফিসেও যায় নি। অফিসে যাবে কেন? সেখানে তো শুনেছি চাকরি নেই। চাকরি যাওয়া এত সোজা? ওকে ছাড়া অফিস চলবে? ও একা যত কাজ করে অফিসের পুরো স্টাফ তা করে না। তবু অফিসে বসে মদ্যপান। অফিসে চা খেলে দোষ হয় না, আর একটু-আধটু ইয়ে খেলে দোষ হয়ে গেল? একটু-আধটু না খালা, গ্যালন গ্যালন… চুপ কর। বড় খালার মুখ কাঁদো-কাঁদো। মনে হয় কাঁদছিলেন। তাঁর পরিবর্তন বিস্ময়কর। আমি বললাম, খালূজান ছাড়াও তো ঘরে লোকজন ছিল। তারা কোথায়? কাজের লোকজনের কথা বলছিস? দোকা আমি পাব কোথায়? রাতে ভয় লাগে না? এত বড় বাড়ি একা একা থাক… ভয় তো লাগবেই। ভয়ের জন্যেই তো জেগে ছিলাম। দুটা সিডাকসিন খেয়েছি, তারপরেও ঘুম আসছে না। আরো দুটা খাও। আজকাল সিডাকসিনেও ভেজাল। ঘুম আসার বদলে ঘুম চলে যায়। রাতদুপুরে ফাজলামি করিস না তো। ফাজলামি করছি না খালা। আমি সিরিয়াস। আমার মনে হয় না একা একা তোমার এত বড় একটা বাড়িতে থাকা উচিত। শেষে ভূত-টূত কিছু একটা দেখে বাথরুমে দাঁত কপাটি লেগে পড়ে থাকবে। খালা, তুমি বরং কোনো আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে যাও। বাড়িতে বিরাট তালা লাগিয়ে দাও। আমি অন্যের বাসায় গিয়ে উঠি, আর তোর খালু ফিরে এসে দেখুক বাড়িতে কেউ নেই, তালা ঝুলছে। আজগুবি উপদেশ দিতে তোকে কে বলছে? তাহলে বরং এইখানেই থাক,এবং একা একা থাক। একা একা থাকা অভ্যাস হবারও দরকার আছে। খালুজান তোমার দশ বছরের বড়। সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললে তিনি বিদেয় হবেন তোমার দশ বছর আগে। খুব কম করে হলেও তোমাকে দশ বছর থাকতে হবে একা একা। মেয়েরা আবার শুনেছি পুরুষদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচে। এমনিতে নাকি শারীরিকভাবে দুর্বল। বাঁচার সময় আবার বেশিদিন বাঁচছে—কোনো মানে হয়? তুই ক্রমাগহ আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছিস কেন? চলে যাব? চলে যা। আর ধর, হঠাৎ পথেঘাটে খালুজানের দেখা পেয়ে যাই তাহলে কী করব? ধরে নিয়ে আসব? আমি তো পথে পথেই ঘুরি। আমার জন্যে দেখা পাওয়াটা সহজ। কাউকে আনতে হবে না। নিজ থেকে এলে আসবে, না এলে নাই। তাহলে আমি বিদেয় হই খালা। তুমি দরজা-টরজা লাগিয়ে জেগে বসে থাক। রাতে কিছু খেয়েছিস? খেয়েছি। শুধু মুখে যাবি কেন? হালুয়া খেয়ে যা। হালুয়া আমি খাই না। ভালো হালুয়া। পেঁপের হালুয়া। পেঁপের আবার হালুয়া হয় নাকি? হয়। খেতে মোরব্বার মতো লাগে। তোর খালুজান খুব পছন্দ করে খায়। তুমি কি এখন রাত জেগে জেগে খালুজানের পছন্দের খাবার বানাও? গাধার মতো কথা বলবি না। ঘরে পেঁপে ছিল। নষ্ট হচ্ছিল, হালুয়া বানিয়ে রেখে দিয়েছি—খাবি? এনে দেই পিরিচে করে? উঁহুঁ, তুমি বরং পলিথিনের ব্যাগে করে খানিকটা দিয়ে দাও। মাঝরাতে খিদে পেলে তখন খেয়ে নে। বড় খালা আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। আমি বললাম, তোমার যদি একা থাকতে ভয় লাগে তাহলে মুখ ফুটে বলো আমি থেকে যাব। কাউকে থাকতে হবে না। আর তুই ঠিকই বলেছিস, একা একা থাকার অভ্যাস তো করতেই হবে। যাই খালা? যা। আর শোন, তুই তো পথে পথেই ঘুরিস। একটু চোখকান খোলা রাখিস। তোর খালুজানকে দেখলে…. অ্যারেস্ট করে নিয়ে আসব? নিয়ে আসতে হবে না। লুকিয়ে লুকিয়ে পেছনে পেছনে যাবি? কোথায় থাকে জেনে আসবি, তারপর আমি গিয়ে ধরব। এটা মন্দ না। খালা যাই। যা। ভালো কথা, তুই নাকি পবিত্র মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছিস? কে বলল? কে বলেছে খেয়াল নেই। তুই নাকি কী একটা লিস্ট বানিয়েছিস? হুঁ। কী করবি পবিত্র মানুষ দিয়ে? চিড়িখানায় রাখা যায় কি না সেই চেষ্টা করব। পবিত্র মানুষ বলতে গেলে রেয়ার স্পেসিস হয়ে গেছে। দুর্লভ প্রাণী, চীনের পাণ্ডার মতো… সবসময় সবার সঙ্গে রসিকতা করিস না হিমু। মা-খালাদের সঙ্গে রসিকতা করা যায় না। আর করব না। পবিত্র মানুষ পেয়েছিস খুঁজে? একটা প্রিলিমিনারি লিস্ট তৈরি করেছি। এর মধ্যে বাছাই হচ্ছে…। সেমিফাইনালে চলে এসেছি….। বড় খালা লজ্জিত গলায় বললেন, তোর খালুজানের নাম কি লিস্টেতে আছে? আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, তুমি কি চাও তার নাম লিস্টিতে থাকুক? হুঁ। একজন স্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব তার স্বামীকে পুরোপুরি জানা…আমি তাকে যতটুকু জানি তার নাম থাকা উচিত। হাসছিস কেন? বড় খালুর নাম লিস্টিতে আছে। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানো, তোমার নামও লিস্টিতে আছে। সত্যি বলছিস? কাগজটা পকেটে আছে। দেখতে চাও? না। তোর কথা বিশ্বাস করছি। এত বড় সম্মান এর আগে আমাকে কেউ দেয় নি হিমু। বড় খালা চোখ মুছতে লাগলেন। মেসে ফিরে এসেছি। আমি শুয়েছি মেঝেতে পাটি পেতে। খালুজান খাটে বসে অন্ধকারে পেঁপের হালুয়া খাচ্ছেন। আজ একটু শীত পড়েছে। পাটিতে শুয়ে শীত-শীত লাগছে। হিমালয়ের গুহায় সাধু-সন্ন্যাসীর নেংটি পরে কীভাবে থাকেন কে জানে? টেকনিকটা তাঁদের কাছে শিখে এসে আমাদের দেশের ফুটপাতের মানুষগুলোকে শিখিয়ে দিতে পারলে কাজ হতো। তারা পৌষমাসের নিদারুণ শীত হাসিমুখে পার করে দিতে পারত। খাটের উপর থেকে বড় খালু ডাকলেন, হিমু! আমি কিছু বললাম না, তবে নড়াচড়া করলাম যাতে তিনি বুঝতে পারেন আমি জেগে আছি। পেঁপের হালুয়াটা তো অসাধারণ হয়েছে—চেখে দেখবি? না। জিনিসটা পুষ্টিকর। পেটের জন্যেও ভালো। আমার পেট ভালোই আছে। আপনি খান পেট ঠিক করুন। তোর বড় খালার অবস্থা কী দেখলি? আমার জন্যে খুব ব্যস্ত? না। সে কী! কিছুই বলে নি? না। মুখে না বললেও মনে মনে খুবই ব্যস্ত। পেঁপের হালুয়া-টালুয়া বানাচ্ছে দেখছিস না? পেঁপে পচে যাচ্ছিল। হালুয়া বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। এইসব তুই বুঝবি না। বিয়ে করিস নি তো, বুঝবি কীভাবে? আমি তো বলতে গেলে একটা থার্ডক্লাস লোক। সেই আমার জন্যে তার টান… ঘুমান খালুজান। অসাধারণ একজন মহিলা। আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, অসাধারণের কী দেখলেন? তাঁর ঝগড়া করার ক্ষমতাকে যদি অসাধারণ বলেন তাহলে ভিন্ন কথা। বাসায় গিয়ে দেখি তিনি একা,কাজের সব কটা মানুষ বিদেয় করে দিয়েছেন। উপরে উপরে দেখে তুই কিছু বুঝবি না। উপরে উপরে দেখলে তাকে ঝগড়াটে মনে হবে। কিন্তু ব্যাপার ভিন্ন। শুনবি? না,ঘুম পাচ্ছে? ইয়াং ম্যান, বারটা বাজতেই ঘুমিয়ে পড়বি এটা কেমন কথা। শোন্ না—তোর বড় খালা করে কী, অবিবাহিতা যুবতী সব মেয়ে রাখে কাজের মেয়ে হিসেবে। তোর খালার যুক্তি হচ্ছে, এই জাতীয় মেয়েগুলোকে কেউ রাখতে চায় না। এরা কাজ পায় না। শেষটায় দুষ্ট লোকের হাতে পড়ে। শুনছিস আমার কথা, না ঘুমিয়ে পড়েছিস? শুনছি। তারপর তোর খালা খোঁজখবর করে এদের বিয়ে দেয়। প্রচুর খরচপাতি করে। ছেলে পায় কোথায়? যোগাড় করে। টাকা দিয়ে কিনে নেয় বলতে পারিস। কাউকে রিকশা কিনে দেয়। কাউকে পান-বিড়ির দোকন দিয়ে দেয়…কাউকে চাকরি দিয়ে দেয়। এই পর্যন্ত আটটা মেয়ে পার করেছে। এই ব্যাপারটা জানতাম না। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না রে হিমু। কিছুই বোঝা যায় না।ডাবের শক্ত খোসা দেখে কে বলবে ভেতরে টলটলে পানি? তুই এক কাজ কর রে হিমু, তো ঐ লিস্টিতে তোর খালার নামটা তুলে দে…। আচ্ছা দেব। আপনি ঘুমান। ঘুম আসছে না। বড় খালার কাছে যেতে চান? তুই কি মনে করিস যাব? তুই যা বলবি তাই করব। তাহলে ঘুমিয়ে পড়ুন। একটু আগে না বললাম, ঘুম আসছে না। তাহলে উঠে শার্ট গায়ে দিন। চলুন দিয়ে আসি। আমাকে দেখে রাতদুপুরে আবার হইচই শুরু করে কি না। আল্লাহ যা একটা মেজাজ এই মহিলাকে দিয়েছে। ভয় লাগলে থাক। দিনেরবেলায় যাওয়া যাবে। বড় খালু উঠে বাতি জ্বালালেন। শার্ট গায়ে দিলেন। আনন্দিত গলায় বললেন, রাত তেমন হয় নি, তাছাড়া চাঁদনি পসর রাত। বড় খালুকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে মনে হলো—এখন নিজের ঘরে ফিরে যাবার কোনো মানে হয় না। বরং মুনশি বদরুদ্দিনের মেয়েটাকে দেখে আসা যাক। তার ব্যবস্থা কী হয়েছে জেনে আসি। রূপার সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা হবে না। সে এতক্ষণ বসে থাকবে না। ক্লিনিকের গেটের কাছে আমার ড্রাইভার ছামছু চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করছে। তার এতক্ষণ এখানে থাকার কথা না। রাত এগারটার পর তার ছুটি হয়ে যায়। সে চলে যায় ইয়াকুব আলি সাহেবর বাড়ি। ছামছু আমাকে দেখে ছুটে এলো। মনে হচ্ছে সে হাতে চাঁদ পেয়েছে। কী ব্যাপার ছামছু? বাড়ি যাও নি? গিয়েছিলাম স্যার আপনার জন্য আসছি। বলো কী ব্যাপার? বাড়িতে গিয়ে দেখি বড় স্যারের অবস্থা খুব খারাপ। ডাক্তাররা রক্ত দিবেন কিন্তু স্যার আপনার আনা রক্ত ছাড়া অন্য রক্ত নিবেন না। আপনাকে স্যার সবাই পাগলের মতো খুঁজতেছে। তাই নাকি? জি স্যার। ম্যানেজার সাহেব আপনার মেসে বসে আছেন। স্যার দেরি করবেন না, চলেন। এক্ষণ চলেন। এত ব্যস্ত হলে তো চলবে না ছামছু। খালি হাতে উপস্থিত হলো কোনো লাভ নেই। রক্ত নিয়ে উপস্থিত হতে হবে। আমি রক্তের ব্যবস্থা করি। যা করার একটু তাড়াতাড়ি করেন স্যার। আমি ক্লিনিকে ঢুকলাম। লবিতে রূপা বসে আছে। শুধু একটি মাত্র মেয়ের কারণে পুরো লবি আলো হয়ে আছে। মানুষের শীরর হলো তার মনের আয়না। একজন পবিত্র মানুষের পবিত্রতা তার শরীরে অবশ্যই পড়বে। সে হবে আলোর মতো। আলো যেমন চারপাশকে আলোকিত করে, একজন পবিত্র মানুষও তার চারপাশের মানুষদের আলোকিত করে তুলবে। রূপা! রূপা চমকে তাকাল। আমি হালকা গলায় বললাম, তুমি এখনো ক্লিনিকে, ব্যাপার কী? রূপা বিরক্ত মুখে বলল, তুমি কী যে ঝামেলা তৈরি করো। বসে না থেকে আমি করব কী? মেয়েটার তো অবস্থা খুব খারাপ। আমি এসে দেখি এখন মার যায়, এখন মারা যায় অবস্থা। অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। এত বড় ক্লিনিক কিন্তু কোনো স্পেশালিস্ট ডাক্তার নেই—কিচ্ছু নেই… তুমি ডাক্তার যোগাড়ে লেগে গেলে? এ ছাড়া কী করব? যোগাড় হয়েছে? হয়েছে—ডাক্তররা একটা বোর্ডের মতো করেছেন। বোর্ড মিটিং বসিয়েছেন। মেয়েটাকে মনে হয় দেশের বাইরে নিতে হবে। আমি হাসলাম। রূপা রাগী গলায় বলল, হাসছ কেন? আচ্ছা যাও আর হাসব না। আজ যে পূর্ণিমা সেটা জানো? না জানি না। অমাবস্যা-পূর্ণিমার হিসাব আমি রাখি না। পূর্ণিমায় তোমার সঙ্গে জয়দেবপুরের বাড়িতে যাবার কথা ছিল ভুলে গেছ? হ্যাঁ ভুলে গেছি। তোমার কোনো কথায় আমি কোনো গুরুত্ব দেই না। রাগ করলে? না রাগ করি নি। তুমি কি সত্যি সত্যি জয়দেবপুর যেতে চাও? হুঁ। হুঁ না স্পষ্ট করে বলো। যেতে চাই। মেয়েটাকে মরণের মুখোমুখি ফেলে রেখো তোমার সঙ্গে জোছনা দেখতে যাব? হ্যাঁ। কারণ তুমি এখানে থেকে কিছু করতে পারবে না। তুমি ডাক্তার নও। তুমি যা করার করছে। তারচেয়েও বড় কথা—মেয়েটা বেঁচে যাবে। তোমার সেই বিখ্যাত ইনট্যুশন বলছে মেয়েটা বেঁচে যাবে? হু। নিজেকে কী ভাবো তুমি? মহাপুরুষ? আমি হাসলাম। রূপা ভুরু কুঁচকে বলল, তোমার বিখ্যাত ইনট্যুশন আর কী বলছে? আমার বিখ্যাত ইনট্যুশন বলছে—তুমি আমার সঙ্গে আজ জোছনা দেখতে যাবে। চল আর দেরি করা ঠিক হবে না। আমাকে বাসা হয়ে যেতে হবে। বাসায় বলতে হবে। কাপড় বদলাতে হবে। তোমার সঙ্গে যাচ্ছি সুন্দর একটা কাপড় পরব না? যা তুমি পরে আছ তারচে’ সুন্দর আর কোনো পোশাক এ পৃথিবীতে তৈরি হয় নি। তাছাড়া—পথে আমরা কিছুক্ষণের জন্যে থামব। রূপা বিস্মিত হয়ে বলল, পথে থামব মানে? পথে কোথায় থামব? মিনিট দশেকের জন্যে থামব। তুমি তাহলে সত্যি সত্যি যাচ্ছ আমার সঙ্গে? আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। রূপা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। মনে হয় সে কেঁদে ফেলেছে। ইয়াকুব সাহেবের অবস্থা শোচনীয়। তাঁর চোখ বন্ধ। হাত থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁটে ফেনা জমছে। একজন নার্স রুমাল দিয়ে ঠোঁট মুছিয়ে দিচ্ছে। নার্স মেয়েটি খুব ভয় পেয়েছে। তবে যে দুজন ডাক্তার উনার দুপাশে দাঁড়িয়ে তারা শান্ত। তাঁদের চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ নেই। মিতু বাবার হাত ধরে বসে আছে।কী শান্ত, কী পবিত্র দেখাচ্ছে মেয়েটাকে! আজ তার মাথায় ‘উইগ’ নেই। এই প্রথম দেখলাম তার মাথার চুল ছেলেদের মতো ছোট ছোট করে কাটা। ছোট চুলের জন্যে মিতুর চেহারায় কিশোর কিশোর ভাব চলে এসেছে। সে পূর্ণ দৃষ্টিতে আমাকে দেখল। কোমল গলায় বলল, বাবা, হিমু এসেছেন। তাকাও , তাকিয়ে দেখ। ইয়াকুব সাহেব অনেক কষ্টে তাকালেন। অস্পষ্ট গলায় বললেন,এনেছ? জি স্যার। তুমি নিশ্চিত যাকে এনেছ সে কোনো পাপ করে নি? জি নিশ্চিত। কোথায় সে? গাড়িতে বসে আছে। গাড়িতে কেন? নিয়ে আসো। নিয়ে আসা যাবে না। নিয়ে আসার আগে আপনার সঙ্গে টার্মস এন্ড কন্ডিশানস সেটল করতে হবে। ইয়াকুব সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কিসের কথা বলছ? আমি শান্তস্বরে বললাম, স্যার ব্যাপারটা হচ্ছে কী পবিত্র রক্ত যে পাত্রে ধারণ করবেন সেই পাত্রটাও পবিত্র হতে হবে। নয়তো এই রক্ত কাজ করবে না। আমাকে কী করতে হবে? আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বললাম, এই জীবনে আপনি যা কিছু সঞ্চয় করেছেন—বাড়ি-গাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, টাকা-পয়সা সব দান করে নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে। পৃথিবীতে আসার সময় যেমন নিঃস্ব অবস্থায় এসেছিলেন ঠিক সে রকম নিঃস্ব হবার পরই পবিত্র রক্ত আপনার শরীরে কাজ করবে। তার আগে নয়। এসব তুমি কী বলছ? যা সত্যি তাই বলছি। স্যার আপনাকে চিন্তা করার সময় দিচ্ছি। আজ সারারাত ভাবুন। যদি মনে করেন হ্যাঁ রক্ত আপনি নেবেন তাহলে উকিল ব্যারিস্টার ডেকে দলিল তৈরি করে আমাকে খবর দেবেন। আমি জয়দেবপুরে আপনার ডাকের জন্যে অপেক্ষা করব। আমি ঠিকানা দিয়ে যাচ্ছি। ইয়াকুব সাহেব স্থিরচোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি তাঁকে অভয় দেয়ার মতো করে হাসলাম। শান্তস্বরে বললাম, আপনার জন্যে কঠিন কাজটা করা হয়েছে। পবিত্র মানুষ যোগাড় হয়েছে। আমার ধারণা বাকি কাজটা খুব সহজ। ইয়াকুব সাহেব এখনো আগের ভঙ্গিতেই তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখে পলক পড়ছে না। অবিকল পলকহীন পাখিদের চোখ। স্যার,এখন আমি যাই? ইয়াকুব সাহেব কিছু বললেন না। মনে হচ্ছে তাঁর চিন্তার শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। মিতু বলল, আপনি যাবেন না। আপনি এখানে অপেক্ষা করবেন। আমি উকিল আনাচ্ছি। দলিল তৈরি হবে। ইয়াকুব সাহেব বললেন, না। দরকার নেই। মিতু বলল, তুমি চুপ করে থাক বাবা। যে খেলা তুমি শুরু করেছ, তোমাকেই তা শেষ করতে হবে। পবিত্র রক্তের ক্ষমতা আমি পরীক্ষা করব। না মিতু, না। আমি সবকিছু বিলিয়ে দেব? এটা কোনো কথা হলো? আমার জন্যে তুমি কিছু চিন্তা করবে না। এই পৃথিবীতে আমার কোনো কিছুই চাইবার নেই। ডাক্তার সাহেব, আপনারা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন না। ব্লাড ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করুন। গাড়ি ছুটে চলেছে। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। রূপা জানালা খুলে রেখেছে। হু-হু করে গাড়িতে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে। রূপা গাড়ির জানালায় মুখ রেখে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। আমার ক্ষীণ সন্দেহ হলো—সে বোধহয় কাঁদছে। আমি বললাম, রূপা তুমি কাঁদছ নাকি? রূপা বলল, হ্যাঁ। কাঁদছ কেন? রূপা ফোঁপাতে ফুঁপাতে বলল, জানি না কেন কাঁদছি। গাড়ির জানালার ফাক দিয়ে এক টুকরো জোছনা এসে পড়েছে রূপার কোলে। মনে হচ্ছে শাড়ির আঁচলে জোছনা বেঁধে যেন অনেক দূরের কোনো দেশে যাচ্ছে। এই সময় আমার মধ্যে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি হলো—আমার মনে হলো রূপা নয়, আমার পাশে মিতু বসে আছে। রূপা কাঁদছে না, কাঁদছে মিতু। জোছনার এই হলো সমস্যা—শুধু বিভ্রম তৈরি করে। কিংবা কে জানে এটা হয়তো বিভ্রম নয়। এটাই সত্যি। পৃথিবীর সব নারীই রূপা এবং সব পুরুষই হিমু। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now