বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডরথীর কথা
--------------
জ্ঞান হবার পর থেকেই নিজেকে তার ঘাড়ের উপর দেখেছি।যদিও সে আমার পিতৃসম ছিল না।তারপরও তিনি গাছে চড়ে কাঠবাদাম, জাম আর জামরুল পেড়ে দিতেন।অথচ পৃথিবী উল্টে গেলেও তাকে দিয়ে এত নীচু কাজ আর কেউ করাতে পারবে না।শহর থেকে এনে দিতেন চমৎকার সব ছবির বই চকলেট বিস্কিট খেলনা মাঝে মাঝে দামী আর বাহারী পোষাক।গরমকালে আমরা পাটি বিছিয়ে নদীর পাড়ে শুয়ে থাকতাম।তিনি গান গাইতেন।আমিই ছিলাম তার একমাত্র ক্ষুদ্র শ্রোতা।ভোররাতে তিনি ঘুমন্ত আমাকে ঘাড়ে করে বাড়ি নিয়ে আসতেন।তিনি কখনোই আমাকে ছোট ভাবতেন না।দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমার সাথে গুরু গম্ভীর আলোচনা করতেন।পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলি আমায় পড়ে শোনাতেন।আমার মতামত চাইতেন।
স্বাভাবিক ভাবেই বাড়িতে আমার মর্যাদা একটু বেশিই ছিল।কিন্ত আমার বড় বোনদের আমাকে আর তাকে জড়িযে ইংগিতপূর্ন অশালীন কথা বলতে একটুও বাধতো না।আমি তাদের সেসব কুতসিৎ কথার জবাব দিতে পারতাম না।অবশ্য তারা যা বলতো তা তারাই বিশ্বাস করতো না।তবে সাপ্তাহিক ছুটিতে তিনি যখন বাড়ি আসতেন তখন বোনদের প্রেম পিরীতির কথা তার কাছে ফাঁস করে দিতাম।প্রচুর হেনেস্তা হত তার হাতে।এবং এটাই ছিল ঐসব নোংরা কথার যথাযথ জবাব।অবশ্য বড় বোনগুলি আমায় কুটনী বলে ডাকতো।তাও আড়ালে।তাতে আমার কিছুই এসে যেত না।
আমি তাকে হ্যানরী বলে ডাকতাম।তিনি আমায় ডরথী।তিনিই আমায় শিখিয়েছিলেন ডাকতে।এই নামের মানে আমি জানতাম না।কখনো তার কাছে জানতে চাইনি।
তিনি ছিলেন সুপুরুষ। সৌখিন।মেধাবী।আমিও পড়াশোনায় ভাল ছিলাম।তিনি বিভিন্ন উপায়ে আমার পড়াশোনায় আমাকে উৎসাহ দিতেন।মা চাকরী করতেন।মায়ের চাকরীর সুবাদে আমি যেখানেই গিয়েছি, তিনিও সেখানেই গিয়েছেন আমায় দেখতে।আমরা সিনেমা হলে ছবি দেখেছি।রেস্টুরেন্টে খেয়ছি।সৌখিন জিনিষ কিনেছি। এসব কারনে আমি বড় বোনদের ঈর্ষার পাত্রীতে পরিনত হয়েছিলাম।কেউ কেউ তার সাথে প্রেম করার বাসনাও মনে মনে পোষন করতেন।তিনি তাদের এই আচরনকে স্পষ্ট ভাবে উপেক্ষা করতেন।
কিন্তু ঝড় এলো।আমার পরিবার একদিকে বাড়ির বাকী পরিবার একদিকে।ঝগড়া হল।তার পরিবারের সাথে তারও মনোমালিন্য হল।আমার পরিবার সব পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।তিনিও আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন।এই সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করার মত ছিল না।
আমরা মেনে নিলাম।আমি তার নাম আমার হৃদয়ের গোপন কুঠুরীতে চিরদিনের জন্য বন্দী করে ফেল্লাম।আমার জীবনে নতুন যারা এসেছে তাদের কাছে আমি ভুলেও সে নাম আমি উচ্চারন করিনি।সেই সম্পর্ক সেই ভালবাসা শুধু আমার স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে রইলো।কোন দিন তা মুখেও আনিনি।শুধু মাঝে মাঝে পূর্নিমার জোৎস্নায় উথাল পাথাল হওয়া গভীর রাতে স্থান কাল ভুলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আকুল কান্নায় ভেসে যেতাম।
বহু বছর জীবন থেকে চলে গেছে।জীবনের সাঁঝবেলায় আমি।জীবনে মধ্যাহ্ন পার না হতেই সন্ধ্যা নেমে এলো ঝপ করে শীতের বেলার মত।অপরাহ্ন তো দেখলামই না। অসফল একটি জীবনের বোঝা বইলাম।ঝপ করে মৃত্যুদূত এসে ঘন্টা বাজালো।বড় অসময়ে সময় হল যাবার।জীবন আমার প্রতি সুবিচার করেনি।অথবা আমি জীবনের প্রতি!
সেদিন বিকেল বেলা চাচার বাড়ি ঘুমিয়েছিলাম।একটি কন্ঠ শুনে চমকে উঠে বসলাম।কত যুগ পর এ কন্ঠ আমি শুনলাম!আবেগে আমি থর থর করে কাঁপছি।দৌড়ে বসার ঘরে গিয়ে দেখলাম, তিনি বসে আছেন।আমার হ্যানরী।আমাদের পরিবারের বড় সন্তান। বড় চাচার বড় ছেলে।আমার হিরো।আমার স্বপ্নের পুরুষ।আমার বন্ধু।আমার শ্রদ্ধা।আমার ভক্তি আমার ভালবাসা।
তিনি দাড়িয়ে দুহাত বাড়িগ ে দিলেন।হাত ধরে সোফায় বসালেন।ভাষা হারা হয়ে দুজনে বসে রইলাম।তিনি দুচোখ দিয়ে স্নেহের ফল্গুধারায় আমায় ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন।অনেক কথা হল।তিনি বল্লেন আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।
একসময়ে বিদায় নেবার সময় এলো।ঘর থেকে রাস্তায় নেমেই দাড়িয়ে পড়লাম।তিনি একটু অবাক এবং আশাহত হলেন।তিনি ভেবেছিলেন আমি তাকে রাস্তার শেষ পর্যন্ত এগিয়ে দেব।সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।আমার হৃদয় হাহাকার করে উঠলো।আমার অন্তরাত্মা বলে উঠলো এটাই আমাদের শেষ দেখা।হৃদয়ের তন্ত্রী একটি একটি করে ছিঁড়ছিলো।ব্যথা।তীব্র ব্যথায় আমি নীল হয়ে গেলাম।আমার অন্তরের সব আবেগ আর কষ্টকে একত্রিত করে তাকে ডাকলাম- হ্যানরী! আমার কন্ঠে ব্যাকুলাতা ছিল।বেদনা ছিল।আত্মার চিৎকার ছিল সে ডাক।তিনি ধীর পায়ে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন।আমি তখন চোখের জলের বন্যায় ভেসে যাচ্ছি।মসজিদে আজান দিচ্ছে।কি অদ্ভুত বেদনবিধূর সে পরিবেশ! তিনি আমার দুহাতে মুখ তুলে ধরলেন।তাঁর চোখও শুষ্ক ছিল না।বহুক্ষন পর তিনি আমার মাথায় হাত রাখলেন
ঃ আমি তোমায় অন্তর থেকে দোয়া করছি তুমি যেন তোমার বাকী জীবন সুখে কাটাও।
তিনি আবার চলে গেলেন ক্লান্ত পায়ে।আমি সেখানে বসে পড়ে ডুকরে ডুকরে কাদতে লাগলাম। আমার জীবনে এত চোখের আর কোনদিন আমি ঝরাইনি।তিনি কেন বুঝলেন না, আমি তার আশির্বাদ চাইনি।আমি শুধু তার মুখ থেকে সেই প্রিয় নামের ডাকটি শুনতে চেয়েছিলাম।
সেই নামটি ছিল --ডরথী।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now