বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"কাউন্ট ড্রাকুলা"
লেখক : ব্রাম স্টোকার
অনুবাদক : তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
---------------------------
পর্ব ৭
নির্দিষ্ট দিনে ডাঃ সিউয়ার্ড, আর্থার এবং মরিস বার্কলে হোটেলে হেলসিংয়ের সঙ্গে দেখা করলেন। সকলকে স্বাগত জানিয়ে হেলসিং ডাঃ সিউয়ার্ডকে বললেন, " জোনাথনের স্ত্রী মীনা টেলিগ্রাম করেছে। জরুরী প্রয়োজনে সে সাড়ে দশটার ট্রেনে এখানে পৌঁছবে। তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তোমার আস্তানায় নিয়ে যেও। বিশেষ কাজে আমায় এখন এখানে সেখানে ঘুরতে হবে।"
সম্মতি জানালেন ডাঃ সিউয়ার্ড। অনেকগুলি ফুলস্কেপ কাগজ ডাঃ সিউয়ার্ডের হাতে তুলে দিয়ে হেলসিং বললেন, " জোনাথনের ডায়েরির টাইপ কপি। সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে পড়বে। আমার জ্ঞান আর বিশ্বাস মতে তার ডায়েরির এক বর্ণও মিথ্যে নয়।"
প্যাডিংটন স্টেশন। ট্রেন আসতে পনেরো মিনিট দেরী, যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে টিকিট কিনছে। অনেকে অপেক্ষা করছে ট্রেনের জন্য। হেলসিং মীনার যে সংক্ষিপ্ত অথচ নিখুঁত বিবরণ দিয়েছেন, তার থেকে অনায়াসে তাকে খুঁজে বের করা যায়।
মীনা ট্রেন থেকে নেমে ডক্টর সিউয়ার্ডের কাছে প্রশ্ন করে, " ডাঃ সিউয়ার্ড, তাই না?"
অবাক হয়ে ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " কিন্তু আপনি আমায় চিনলেন কিভাবে? "
হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে মীনা বলল, " আমি ম্যাজিক জানি।"
মীনার মালপত্রে একটা টাইপরাইটার রয়েছে। ডাঃ সিউয়ার্ড আর মীনা পাতাল ট্রেনে চাপলেন। প্রচণ্ড গতিতে ট্রেন ছুটল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা ফ্রেঞ্চচার্চ স্ট্রিটে পৌঁছলেন।
ডাঃ সিউয়ার্ডের নির্দেশে তাঁর ভৃত্য মীনার জন্য আলো বাতাসে ভরা ঘরটি পরিষ্কার করে রেখেছেন। ডাঃ সিউয়ার্ড মীনাকে বললেন, " আপনি বিশ্রাম করুন। আহার প্রস্তুত। একটু পরে একসঙ্গেই খাওয়া যাবে।"
ডাঃ সিউয়ার্ড নিজের ঘরে গেলেন। নানা কাজে এ পর্যন্ত জোনাথনের ডায়েরীর একটি লাইনও পড়া হয় নি। এতক্ষণে ডাঃ সিউয়ার্ড জোনাথনের ডায়েরীর টাইপ কপি পড়ার সময় পেলেন।
মীনার ডায়েরী
২৯ শে সেপ্টেম্বর।।
নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে আমার খুব বেশী সময় লাগেনি। ডাঃ সিউয়ার্ডের ঘরে গিয়ে মনে হল, তিনি যেন কার সঙ্গে কথা বলছেন। আমার উপস্থিতি অনুভব করে তিনি বললেন, " ভেতরে আসুন। " ঘরে ঢুকে দেখি তিনি একাই বসে আছেন। তবে তিনি এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছিলেন? টেবিলের ওপর রয়েছে একটা টেপ রেকর্ডার। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, " এইভাবে আমি ডায়েরী রাখি।"
অবাক হয়ে বলি, এর আগে আর কাউকে এমন বিচিত্র উপায়ে প্রতিদিনের ঘটনা ধরে রাখতে দেখিনি। আচ্ছা, লুসির শেষ বেলাকার ঘটনাগুলোও নিশ্চয় রেকর্ড করা আছে, একটু শোনাবেন?"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " ক্ষমা করবেন। সে সব তো অনেকদিন আগের কথা আর আমার ক্যাসেটগুলোও তারিখ অনুযায়ী ঠিকমতো সাজান নেই।"
আমি বুঝলাম পাছে আমি লুসির শেষ দিনগুলির ঘটনা শুনে ভয় পাই ডাঃ সিউয়ার্ড তাই এড়িয়ে যাচ্ছেন।
বললাম, " ডাঃ সিউয়ার্ড, আমি মেয়ে! সাহসিকতার দিক থেকে কিন্তু অসাধারণ।"
ডাঃ সিউয়ার্ড হেসে বললেন, " আপনি ভয় পেতে পারেন তাই প্রথমে শোনাতে চাইনি। " অত:পর ড্রয়ার খুলে তিনি তিন চারটে ক্যাসেট বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, চলুন, টেপ রেকর্ডারটা আপনার ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি, নিশ্চিন্ত মনে শুনুন। আমি এখন জোনাথনের ডায়েরী পড়ব।"
ডাঃ সিউয়ার্ড একমনে জোনাথনের ডায়েরী পড়ছিলেন। আমার উপস্থিতিতে তিনি চমকে উঠে বললেন, " কোথা দিয়ে যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল, জানতেও পারিনি। রহস্য, ঘটনা, ভূতপ্রেত ইত্যাদি কোনওদিনই বিশ্বাস করিনি। কিন্তু এখন করি।"
একটু থেমে আবার বললেন, " ট্রানসিলভ্যানিয়ায় কাউন্টের প্রাসাদে জোনাথনের বিচিত্র আর অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতাকে এখন আমি সত্য বলে মনে করি। আমার মনে হয়, আগে যদি একটু সজাগ হতাম, তাহলে লুসিকে হয়ত বাঁচান যেত। আমার পাগলাগারদের ঠিক পাশের ঐ বাড়ির ধ্বংসস্তুপটি কাউন্ট ড্রাকুলার এক গোপন আড্ডা। কাউন্ট কখন আসে, যায়, আমার উন্মাদ আশ্রমের এক রোগী রেনফিল্ড তা বুঝতে পারে।"
ডাঃ সিউয়ার্ডের দেওয়া ক্যাসেটগুলি তারিখ অনুযায়ী পরপর সাজিয়ে আমি টাইপ করে নিয়েছি। অনুসন্ধানের ব্যাপারে এগুলো যে সহায়ক হবে, সন্দেহ নেই।
কাল সকাল ন'টায় জোনাথন আসবে। ড্রাকুলার খবর মিলবে এই আশায় জোনাথন হন্যে হয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পোর্টকমিশনার অফিসের মিস্টার বিলিংটন কাদা ভর্তি পঞ্চাশটা কাঠের বাক্স বন্দরে আসার খবরটি সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। মাল পাঠানোর তালিকায় লেখা ছিল...
' অতি সাধারণ মাটি ভর্তি পঞ্চাশটি বাক্স ব্যবহারিক পরীক্ষায় কাজে লাগবে।'
৩০ শে সেপ্টেম্বর।।
জোনাথনকে সঙ্গে নিয়ে হেলসিং কতগুলো কাজে বাইরে গেছেন। আর্থারের সঙ্গে গল্প করছিলাম। লুসির কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখ জলে ভরে ওঠে। আমারও কান্না পাচ্ছিল। আর্থার চলে গেলে দুঃখিত মনে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলাম। মরিস এল। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। তারপর একটু হাল্কা হব, এই আশায় ডাঃ সিউয়ার্ডের কাছে গিয়ে বললাম, " চলুন, আপনার রুগী রেনফিল্ডের সাথে আলাপ করে আসি।"
ডাঃ সিউয়ার্ড সম্মত হলেন এবং আমায় রেনফিল্ডের কেবিনে নিয়ে এলেন। বললেন, " এই ভদ্রমহিলা তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে চান।"
রেনফিল্ডকে দেখে অপ্রকৃতিস্থ বলে মনেই হয় না। বলল, " ভদ্রমহিলাকে স্বাগত জানাই।"
ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, "ডাঃ সিউয়ার্ডের কাছে আপনার কথা শুনেছি।"
রেনফিল্ড হঠাৎ চিৎকার করে বলে, " এ জায়গা ভাল নয়, বাড়ি ফিরে যান।"
রেনফিল্ডকে উত্তেজিত হতে দেখে ডাঃ সিউয়ার্ড শঙ্কিত হলেন এবং আমায় চলে যাবার জন্য ইঙ্গিত করলেন।
আমি বললাম, " আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি রেনফিল্ড। এখানে কয়েকদিন থাকব, পরে আবার দেখা হবে।"
রেনফিল্ড বলে, " চিরবিদায়। আজই এখান থেকে চলে যান, নইলে......."
নীচে নেমে এলাম। ডাঃ সিউয়ার্ড আমার অনুসরণ করলেন। প্রফেসর হেলসিং আর জোনাথন ডাঃ সিউয়ার্ডের ঘরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
হেলসিং আমায় দেখে আনন্দিত হয়ে বললেন, " ভাল আছ তো? পথে আসতে কোনও অসুবিধে হয় নি তো?"
আমি বললাম, " ভাল আছি। নিরাপদেই এসে পৌঁছেছি।"
হেলসিংকে বেশ চিন্তিত মনে হল। তিনি বললেন, " রহস্য অনুসন্ধানের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। ভয় হয় মীনার জন্য....আমাদের সঙ্গে সেও নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে বলে।"
বললাম, " যাই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গেই থাকব, নানাভাবে সাহায্য করব।"
ডাঃ সিউয়ার্ড তাঁর সেই বিশেষ অনুমানের কথা হেলসিংকে বললেন, " আমার নার্সিংহোমের পাশের পুরনো বাড়িটা কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়।"
হেলসিং বললেন, " তোমার অঅনুমান মিথ্যে নাও হতে পারে।"
আমি বললাম, " আমাদের রহস্যজনক শত্রুটিকে বধ করার ব্যাপারে প্রত্যেকের প্রতিদিনের ঘটনা লিখে রাখা উচিত। "
সর্বসম্মতিক্রমে আমার প্রস্তাব গৃহীত হল।
অতঃপর হেলসিং বলতে লাগলেন, " রক্তশোষক পিশাচের অস্তিত্ব বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। মৌমাছিদের মতো একবার হুল ফুটিয়ে এরা রেহাই দেয় না। কুড়িটি পুরুষের মিলিত শক্তির চেয়ে এই পিশাচের শক্তি অনেক বেশী। অসীম ক্ষমতা বলে সে দিনকে রাত করতে পারে, ইঁদুর, পেঁচা, বাদুড়, নেকড়ে শেয়ালকে ইচ্ছেমত কাজে লাগায়। এহেন ড্রাকুলাকে সহজেই মেরে ফেলা সম্ভব নয়। তোমাদের সকলেরই বয়স অল্প। নৈরাশ্যকে প্রশ্রয় দিও না, এগিয়ে চল, অবশ্যই জয়ী হবে।"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " হতে পারে সে শক্তিমান, কিন্তু বিজ্ঞানের অবদানে আমাদের শক্তিও কিছু কম নয়।"
হেলসিং বললেন, " রক্তশোষক পিশাচেরা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে কিন্তু রক্ত না হলে তাদের চলে না। জোনাথন এতদিন কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদে থেকেছিল....অথচ কাউন্টকে একদিনও টেবিল সাজিয়ে সকালে, দুপুরে বা রাতে খেতে দেখে নি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কাউন্ট আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল অথচ আয়নায় তার প্রতিবিম্ব পড়ে নি। ড্রাকুলা নিজের ইচ্ছেমত রঙ বদলায়, নানা রূপ ধরে, কুয়াশাও সৃষ্টি করতে পারে। ট্রানসিলভ্যানিয়ার প্রাসাদে ঐ তিন সুন্দরী মেয়ে কুয়াশার মাঝে মিলিয়ে গিয়েছিল....চাঁদের আলোয় জোনাথন এ দৃশ্য দেখেছে। চুলের মতো সরু ফাটলের মধ্যে দিয়ে আমরা লুসিকে কবরে ঢুকতে দেখেছি। কিন্তু একথাও মিথ্যে নয় যে মোরগের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় হারিয়ে যায় তার পরাক্রম। তাছাড়া, রসুনফুল আর ক্রুস, এই দুটি জিনিস ভ্যাম্পায়াররা একদম সহ্য করতে পারে না।"
হেলসিং যখন এইসব বলছিলেন তখন মরিস অবাক বিস্ময়ে জানলার দিকে তাকিয়েছিল। এক সময় সে ঘর ছেড়ে চলে গেল। হেলসিং পুনরায় তাঁর বক্তব্য শুরু করেন, " জোনাথনের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে যে মাটি ভর্তি পঞ্চাশটি কফিনের মতো দেখতে কাঠের বাক্স হুইটবাইতে পৌঁছেছে। আমি নিশ্চিত, ঐ বাক্সগুলো কাউন্টের প্রাসাদে, জোনাথনের দেখা সেই বাক্সগুলো, যার একটিতে জোনাথন কাউন্টকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেছিলেন। বেদের দলের সাহায্যে ঐ বাক্সগুলো মালবাহী জাহাজে তোলা হয়েছিল, ইংলন্ডে পাড়ি দেবে বলে। আমরা এ'ও জেনেছি, ক'দিন আগে হুইটবাইয়ের সমুদ্র সৈকতে একটা শূন্য জাহাজ এসে ভিড়েছিল, যাতে না ছিল কোনও খালাসী না কোনও মাল, একমাত্র ঐ বাক্সগুলো ছাড়া। ক্যাপ্টেনকেও মৃত, রক্তশূন্য অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এ থেকে পরিষ্কার, ঐ জাহাজেই কাউন্ট ড্রাকুলা আত্মগোপন করে ইংলন্ডে এসেছে, ঐ বাক্সগুলোর ভেতরে বন্দি হয়ে, যার হিংস্র দাঁতের শিকার হয়েছে ঐ নিরীহ খালাসিগুলো আর স্বয়ং জাহাজের ক্যাপ্টেন। যে করেই হোক, এখন আমাদের ঐ বাক্সগুলোর হদিশ পেতে হবে।"
হঠাৎ গুলির আওয়াজে সবাই সচকিত হয়ে উঠল। জানলার শার্সিতে গুলির আঘাতে চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল। আর্থার চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, গলা বাড়িয়ে নিচের দিকে তাকালেন। মরিসের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, " আচমকা গুলি করার জন্য দু:খিত, এক্ষুনি ওপরে আসছি।"
কয়েক মিনিট পর মরিস হাঁফাতে হাঁফাতে ওপরে এল। সকলেই অধীর আগ্রহে মরিসের মুখের পানে তাকালেন।
মরিস বলল, " হেলসিং যখন পিশাচের কথা বলছিলেন তখন বিরাট একটা বাদুড় এদিকে উড়ে আসছিল। সেটাকে গুলি করার জন্যই নীচে গিয়েছিলাম। "
হেলসিং বললেন, " বাদুড়ের গায়ে গুলি লেগেছে কি?"
" তা জানি না, মনে হয়, আমি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছি", মরিস উত্তর দেয়।
১ লা অক্টোবর।।
ভোর চারটে। টিমটিম করে জ্বলছে পথের আলো। মাঝেমাঝে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। হেলসিংয়ের নেতৃত্বে জোনাথন, ডাঃ সিউয়ার্ড, আর্থার এবং মরিস অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে বাইরে বেরোবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, এমন সময় রেনফিল্ডের পরিচালক এসে ডাঃ সিউয়ার্ডকে বলে, " এখুনি একবার রেনফিল্ডের সঙ্গে দেখা করুন। "
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " এখন সময় হবে না। পরে দেখা করব।"
ভৃত্যটি বলল, " রেনফিল্ড বড়ই অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আপনার দেখা না পেলে সে হয়ত সুইসাইড করবে।"
ডাঃ সিউয়ার্ড তাঁর রুগীকে ভালভাবেই চেনেন। একটু চিন্তা করে তিনি বললেন, " ঠিক আছে, রেনফিল্ডকে বল, এখুনি আসছি।"
রেনফিল্ডকে দেখার আগ্রহ সকলের। সকলেই ডাঃ সিউয়ার্ডকে অনুসরণ করে।
রেনফিল্ডের ঘরে ঢুকতেই সে ডাঃ সিউয়ার্ডের উদ্দেশ্যে বলে, " আমায় এই মূহুর্তে মুক্তি দিন। আমি বাড়ি যাব, বাইরের আলো বাতাস দেখব।"
একটু থেমে আবার সে বলে, " নতুন যাঁরা এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিন।"
ডাঃ সিউয়ার্ড বলেন, " ইনি জোনাথন হার্কার।"
রেনফিল্ড বলে, " বুঝেছি, মীনার স্বামী। "
" ইনি প্রফেসর ভ্যান হেলসিং।"
রেনফিল্ড বলে, " ডাঃ হেলসিংয়ের নাম কে না শুনেছে। মস্তিষ্কের বিশেষজ্ঞ হিসেবে সকলেই তাঁকে চেনেন। আপনার ছাত্রই আমায় সুস্থ করে তুলেছেন, অধ্যাপক হেলসিং। তাঁর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। ডাঃ সিউয়ার্ড সত্যিই মানুষকে ভালবাসেন। "
রেনফিল্ডের আশাতিরিক্ত সুস্থতায় ডাঃ সিউয়ার্ডের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বললেন, " তোমার আরোগ্যে তোমার চেয়ে আমি কম আনন্দিত হইনি, রেনফিল্ড। নিজের ওপর আমার আস্থা দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু এই মূহুর্তে তোমায় মুক্তি দেওয়া সম্ভব নয়।"
অসহায় রেনফিল্ড বলল, " ডাঃ সিউয়ার্ড, আমি যে নিজের জন্য মুক্তি পেতে চাইছি, তা নয়। আমি পরাধীন। সব কিছু যদি খুলে বলতে পারতাম।"
ডাঃ সিউয়ার্ডের কিন্তু মন গলে না। তিনি বলেন, " তোমার সুস্থতা যে দীর্ঘস্থায়ী তার প্রমাণ দিতে চেষ্টা কর। কয়েকদিন পর তোমায় মুক্তি দেব।"
অধ্যাপক হেলসিং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবকিছু লক্ষ্য করছিলেন। তিনি বললেন, " এই মূহুর্তে কেন তুমি এখান থেকে চলে যেতে চাও? কারণটা জানতে পারি?'
রেনফিল্ড বলে, " মাননীয় হেলসিং, আপনার প্রশ্ন যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আমি যদি স্বাধীন হতাম, তাহলে অকপটে আপনাকে সব কিছুই বলতাম।"
হেলসিং ভাবলেন, রেনফিল্ড ডাঃ সিউয়ার্ডের চিকিৎসাধীনে রয়েছে, তাই নিজেকে পরাধীন বলছে। তাই বললেন, " তুমি ডাঃ সিউয়ার্ডের চিকিৎসাধীনে রয়েছ। তোমার সুস্থতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হলে তুমি অবশ্যই ছাড়া পাবে।"
রেনফিল্ড এবার উত্তেজিত হয়ে বলে , " আমি সুস্থ, আমায় আটকে রাখার অধিকার আপনাদের নেই। আমায় ছেড়ে দিন, বাড়ি যাব।"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " এই মূহুর্তে তোমায় ছাড়তে পাচ্ছি না, দুঃখিত। আমাদের অনেক কাজ আছে, চলি।"
রেনফিল্ডের ঘর ছেড়ে সকলে চলে গেলেন। দূর থেকে রেনফিল্ডের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা যায়, " বাঁচার সুযোগ এরা আমায় দিল না প্রভু, তাই তোমার কাছেই আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কোনও পথ রইল না।"
মীনার কাছ থেকে সবাই বিদায় নিয়ে তাদের অভিযান শুরু করল।
রেনফিল্ডের ব্যাপারেও আলোচনা করছিলেন সবাই।
মরিস বলে, " ডাঃ সিউয়ার্ড, আপনার রোগীর মতো সুস্থ উন্মাদ এর আগে আর দেখিনি। আমার মনে হয় তার কোনও কুমতলব আছে, যার জন্য সে ছাড়া পেতে চায়।"
হেলসিং বললেন, " জানি না ছাড়া পেলে তোমার রোগী রেনফিল্ড কি করত? তবে আমি ডাঃ সিউয়ার্ড হলে অবশ্যই তাকে ছুটি দিতাম। বেচারা ছুটি পাবার জন্য কি করুণ আবেদনই না করছিল!"
ডাঃ সিউয়ার্ড বললেন, " আমার স্থির বিশ্বাস, সে কোনও সাধারণ পাগল নয়। কেন জানিনা আমার কিন্তু মনে হয়, কাউন্ট ড্রাকুলার আসা যাওয়া সে বুঝতে পারে। "
জোনাথনদের বিদায় জানিয়ে মীনা ঘরে এসে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, জানে না। কুকুরের করুণ আর্তনাদে ঘুম ভেঙে উঠে জানলার কাছে এগিয়ে গেল। ভোর হতে এখনও দেরী আছে।
আনমনাভাবে বাইরের প্রকৃতির ওপর চোখ বুলোচ্ছিল মীনা। আচম্বিতে এক ঝটকায় সোজা হয়ে উঠল মীনা। তার দৃষ্টি হল সচকিত। হৃদপিন্ডটা মনে হল লাফিয়ে গলার কাছে উঠে এল।
কি দেখল সে, যার জন্য তার ভেতরে এমন আকস্মিক পরিবর্তন হল?
জানলার বাইরে, অন্ধকারের মাঝে একটি ধবধবে সাদা নারীমূর্তি। একেবারে চকের মতো সাদা তার শরীর। কিন্তু ঠোঁটদুটো যাকে বলে টুকটুকে লাল। হিংস্র চাহনি মেলে তাকিয়ে আছে এদিকে।
ট্রানসিলভ্যানিয়ায় কাউন্টের দূর্গ প্রাসাদে যে তিনটি নারীমূর্তি জোনাথনের ওপর আক্রমণ করতে গিয়ে কাউন্টের আদেশে বাধ্য হয়ে পিছিয়ে এসেছিল, তাদেরই একজন এখন মীনার শোবার ঘরের জানলায় এসে আবির্ভূত হয়েছে, মীনার ওপর গায়ের ঝাল মেটাবার জন্য।
জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মীনা ঘরের মেঝেয়।
ওদিকে জোনাথনরা সদলবলে গন্তব্যস্থলে এসে গিয়েছে। গন্তব্যস্থল বলতে ডাঃ সিউয়ার্ডের পাগলা গারদের পাশের ভাঙা, পোড়ো বাড়িটা।
যে কোনও মূহুর্তে বিপদ ঘটতে পারে, তাই প্রত্যেকের গলায় ক্রুশ, আর্থারের হাতে হুইসেল, হেলসিংয়ের হাতে একটা অদ্ভুত আলো, সিউয়ার্ডের হাতে ছুরি আর মরিসের হাতে পিস্তল।
হেলসিং বললেন, " চাবিওয়ালাকে দিয়ে এ বাড়িতে ঢোকার জন্য একসেট চাবি তৈরি করিয়ে নিয়েছি, যাতে বাড়িতে ঢোকার জন্য জানলা না ভাঙতে হয়।"
ডাঃ সিউয়ার্ড পুরনো মরচে ধরা তালার ভেতর একটা চাবি ঢুকিয়ে প্যাঁচ দিতে লাগলেন। তালা খুলে গেল। ঠেলা দিয়ে দরজা খোলা হল। আগে কে ভেতরে ঢুকবে এ নিয়ে চিন্তার অবকাশটুকু পর্যন্ত না দিয়ে হেলসিং আগে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। একে একে বাকিরাও ঢুকল। প্রত্যেকেই একটা করে বাতি জ্বালাল।
মিলিত আলোয় চুন বালি খসে পড়া দেওয়ালে তাদের বিরাট ছায়া পড়েছে। মেঝেতে পুরু হয়ে ধূলো জমেছে। এখানে সেখানে অসংখ্য মাকড়সা জাল বুনেছে। তেলচিটে ভ্যাপসা গন্ধ। নাকে রুমাল চাপা দিয়ে চলতে হচ্ছে সবাইকে। একটা অদ্ভুত অনুভূতিতে থেকে থেকে শিউরে উঠতে হচ্ছে সবাইকে। তাদের সঙ্গে তাল রেখে কে যেন সামনে এগিয়ে চলেছে। গা ছমছম করছে।
হেলসিং বললেন, " জোনাথন, এ বাড়ির ম্যাপ যে তুমি সংগ্রহ করেছিলে তার সঙ্গে সবকিছু মিলে যাচ্ছে। ঐ দ্যাখ, ডানদিকে ভাঙা একটা কাঠের দরজাটা পর্যন্ত রয়েছে।"
একটু চেষ্টা করতেই দরজাটা খুলে গেল। জলাভূমিতে যেরকম আঁশটে গন্ধ বেরোয় সেইরকম একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। জোনাথনের মনে হচ্ছে, এখুনি হয়ত সে কাউন্ট ড্রাকুলার হিংস্র, বীভৎস মুখটা দেখতে পাবে। সেই শাণিত হাসি, কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জমাট রক্তের সেই ঝাঁঝাল গন্ধ! আর্থার কি সেই বাঁকা নাক, লাল চোখ রক্তমাখা ঠোঁট ড্রাকুলাকে দেখতে পেয়েছেন!
আর্থার বললেন, " আমার মনে হল, আমি যেন একটা অস্পষ্ট মুখ দেখলাম।"
জোনাথন বলল, " এখানে এমন কিছুই গলি ঘুঁজি নেই যার ভেতর ড্রাকুলা আত্মগোপন করে থাকতে পারে।"
পঞ্চাশটি বাক্সের ভেতর এ পর্যন্ত ঊনত্রিশটির হিসেব পাওয়া গেছে। অবশিষ্ট বাক্সগুলোর খোঁজ নিতে হবে। ঘরের এককোণে মরিস নিচু হয়ে কি দেখছিল, হঠাৎ সে চমকে উঠল। ভয় পেয়ে জোনাথন তার কাছে গেল। দেখে ঘরের একটা কোণে অগণিত জোনাকি কিলবিল করছে। উজ্জ্বল তারার মতো সেগুলো জ্বলছে নিভছে।
অতর্কিতে একদল ইঁদুর তাদের ঘিরে ফেলল। ইঁদুরগুলো এমন অবস্থার সৃষ্টি করল যে পা ফেলার জায়গাটুকু পর্যন্ত কেউ পেল না। আর্থার এক লাফে কোনওমতে চৌকাঠ পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে কোটের পকেট থেকে হুইসেল বের করে জ্বালিয়ে দিলেন।
বাঁশির শব্দে আর্থারের প্রিয় কুকুরগুলি সাড়া দিল। কুকুরগুলি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছে। হাজার হাজার ইঁদুর দেখে তারাও কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। আর্থার একটি কুকুরকে তুলে নিয়ে ইঁদুরদের মাঝে ছুঁড়ে দিলেন। সেটার দেখাদেখি সবগুলো কুকুর মিলিতভাবে ইঁদুরগুলিকে আক্রমণ করল। বেশ কিছু ইঁদুর নিহত হল। আহতের দল গা ঢাকা দিল। এদিকে আর একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা সবাই দেখল। যে বাক্সগুলো এতক্ষণ তারা সরিয়ে রেখেছিল, সেগুলো কে যেন আবার যথাস্থানে রেখে দিয়েছে।
হেলসিং বললেন, " অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা এখানে ভৌতিক ভেল্কিবাজি দেখতে আসিনি। আনন্দ হচ্ছে, এই যে ইঁদুরগুলো আমাদের ঘিরে ফেলেছিল, তাদের ওপর ড্রাকুলা তার সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ হয়েছে। তা না হলে কুকুরের তাড়ায় তারা এভাবে পালিয়ে যেত না।"
জোনাথন বলল, " আমার মনে হয় কাউন্ট ড্রাকুলা অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে।"
হেলসিং বললেন, " আমারও তাই মনে হয়।"
( ক্রমশ)
--------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now