বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ইচ্ছেঘুড়ি (পর্ব-৩)

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X ৩.অনির ভীষণ জল ভীতি আছে। কিন্তু অনি দেখেছে পৃথিবীর বেশির ভাগ কাজকর্ম জল ছাড়া হয় না। জল ভীতির সাথে অবশ্যম্ভাবীভাবে জড়িয়ে থাকে স্নান ভীতি। ছোটবেলা থেকে অনিকে স্নানে নিতে মাকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। বিশেষ করে শীতকালে মা আর অনির মধ্যে এই স্নান করা নিয়ে কম লুকোচুরি খেলা হয়নি। মায়ের আঁচলে সেই সব দিনের অনেক গল্প আছে। খাওয়ার টেবিলে মাঝে মাঝে মা অনির ছেলেবেলার গল্প করে আর হাসে। বাবার স্টকেও অনি-তোড়ার ছেলেবেলার অনেক গল্প আছে। মায়ের বকুনি না খাওয়া অবধি বাবার মুখে কোনো কথা আটকায় না। খাওয়ার টেবিলে মাঝে মাঝে বাবা খুব সিরিয়াস মুখে আনসেনসর্ড সেসব গল্প বলে। কখনো কখনো সেসব গল্পকথা শুনে অনির কান গরম হয়ে যায়। গতকাল রাতে খাবার সময়ও সেরকমই একটা গল্প বলেছিল বাবা যা নিয়ে তোড়াদি আজ অবধি মুখ টিপে টিপে হাসছে। মায়ের একটা প্রিয় গল্প আছে অনির স্নান করা নিয়ে। অনি নাকি স্নানের সময় হলেই মাকে বলতো, মা আমার স্নান চাপেনি। কখনো কখনো মা অনিকে খুঁজে পেতো না। সারা বাড়ি ঘুরে ঠাকুরঘরের দরজার পিছনে বা বসার ঘরের সোফার নিচে অনিকে খুঁজে পেলে অনি কান্না জুড়তো, কেন আমাকে খুঁজে পেলে! অনির এখন আর লুকোচুরি খেলার বয়স নেই। যদিও চৌদ্দ বছরের অনির জল আর স্নানভীতি ছেলেবেলার মতোই আছে। মা স্নানের জন্য গরম পানি দিয়ে ডাকছেন। অনেকক্ষণ হলো অনি স্কুল থেকে এসেছে। আলসেমি লাগছে খুব। তবু উঠতে হবে। না ওঠা পর্যন্ত মায়ের ডাকাডাকি বন্ধ হবে না। স্নানের ব্যাপারে মা একদম নাছোড়বান্দা। অনি কোনো রকমে দু’তিন মগ পানি ঢেলে স্নান সেরে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে দেখে মা দাঁড়িয়ে আছে। -আজও সাবান দিলি না? ঘাড়ে কত ময়লা জমেছে দেখেছিস? আয় আমি সাবান ঘষে দেই। -না মা শীত লাগছে। সাবান দিবো না। -আয় তো! -আমার চান শেষ মা। যাও তো তুমি! -এমন করিস কেন বাবাই! এই সেদিনও তো তোকে চান করিয়ে দিতাম। আর আজ না করছিস! নাকি আমার হাতে সাবান দিতে লজ্জা পাচ্ছিস? মা ব্যাপারটা ঠিক ধরে ফেলেছে তবু জোর করছে। অনি রাগ হতে যেয়েও পারে না। মায়ের গলার আবদারটা অবহেলা করতে ইচ্ছে হয় না। তবু অনি মাকে বাঁধা দেয়, -দুর মা, আমি বড় হয়েছি না! তোমার সাবান দিতে হবে না। কাল আমি নিজে দিবো। -হ্যাঁ, খুব তো বড় হয়েছিস। মাকে আর লাগে না। পিঠে ডানা গজিয়েছে। ইচ্ছে হলেই বাড়ি ছেড়ে যেতে পারিস। অনি এবার খেয়াল করে মায়ের গলায় কোনো অনুযোগ নেই। বরং অভিমান আর দুশ্চিন্তার ক্লান্তিতে গলার স্বর অবসন্ন। নাহ্ সেদিন খুব কষ্ট দিয়ে ফেলেছিল মাকে। মনে মনে অনেক বকেছে নিজেকে। সেদিন বাড়ি ফিরবার পর মা ওকে জড়িয়ে ধরে কত যে কেঁদেছে। বাবাও কেঁদেছে। বাবা-মাকে এত কাঁদতে কখনো দেখেনি অনি। তাই মনে মনে ও প্রতিজ্ঞা করেছে, বাড়ি ছেড়ে আর যাবে না। সেদিনের কথা মনে হতেই মায়ের জন্য মায়ায় বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে ওর। এখন ওর ইচ্ছে করছে মাকে যেয়ে এক ছুটে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু কেমন একটা বাঁধো বাঁধো ঠেকে ওর। তাই মায়ের কষ্ট কমানোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে অনি মায়ের কথার অবাধ্য হয় না। ছেলের সম্মতি পেয়ে খুশি মনে মোহনা বাথরুমে ঢোকে আর ছেলের ঘাড়ে পিঠে সাবান ঘষতে ঘষতে ঠাকুমার ঝুলি খুলে বসে, -খুব তো বড় হয়েছিল! নিজের শরীরে সাবান পর্যন্ত দিতে পারিস না। দ্যাখ দ্যাখ কেমন ছাতা বের হচ্ছে। শোন আজ থেকে সপ্তাহে একদিন নিয়ম করে আমিই তোকে সাবান দিয়ে দেবো। মাথায় লম্বা হলেই কি আর বড় হওয়া যায়! এই তো কদিন আগে অবধিও তো আমার কাছেই চান করতি। আর এখন ছেলে খুব লায়েক হয়েছে। হাইস্কুলে উঠে রাজ্যি জয় করেছে। বাথরুমের দরজার কাছে তোড়ার কাচভাঙা হাসির শব্দ শোনা যায়। কি কি বলে তোড়া অনিকে ক্ষ্যাপাবার চেষ্টা করছে। অনি তোড়াকে পাত্তা দেয় না। সাবানের গন্ধ উবে গিয়ে মায়ের শরীরের গন্ধ অনিকে আজ ছোট্টটি করে দিয়েছে। আহা কেন যে অনি বড় হচ্ছে! বড় না হলে তো রোজই মায়ের কাছে ¯œান করতে পারতো। মাকে জড়িয়ে ধরে হাসনাহেনার গন্ধ নিতো! -ওর কথায় কান দিসনে বাবাই। যা এবার শরীরে জল ঢেলে নে। আমি যাচ্ছি। -ওরে ন্যাকারে... দিদিটা না দিন দিন বেশি পাজী হচ্ছে। তবে আজ আর অনি কিছু বলবে না। আজকের শোধটা আরেক দিনের জন্য তোলা থাক। তোড়াকে পাত্তা না দিয়ে অনি বাথরুমের দরজা আটকে দেয়। স্নান সেরে অনি নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখে বাবা ওর বিছানায় শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছে। অনির মনে পড়ে আজ বাবার ছুটি। গতকাল ব্যাংকের ইয়ার ক্লোজিং ছিল। বাবাকে ঘরে পেয়ে অনির মন আনন্দে ভরে ওঠে। অনেকদিন বাবার সাথে মন খুলে কথা বলে না ও। আজ অনেকটা সময় বাবাকে ঘরে পাওয়া যাবে। অনি বাবার পাশে বসে। -বাবা একটা মজার ঘটনা বলা হয়নি তোমাকে। জানো আজ কি হয়েছে? আজ না আজমাইন মনির স্যারের কাছে রাম ধোলাই খেয়েছে। স্যার বলেছে কথায় কথায় ‘ডুড’ বলা চলবে না। আমাদের ‘ডুড’ ‘ডুড’ করতে যেয়ে আজ ও স্যারকেই বলে ফেলেছে, ম্যাথ খাতাটা ভুলে আনিনি ‘ডুড’। ছেলের কথা শুনে এতক্ষণ হু হা করে যাচ্ছিলেন শংকর। ‘ডুড’ শব্দটা কানে খুট করে বিঁধতেই তিনি বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকালেন। অনিও বাবার কৌতুহল বুঝতে পেরে গল্পটা রিপিট করতে শুরু করলো। শংকর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী প্রশ্ন করেন, -আজমাইনটা কে রে? আগে তো নাম বলিসনি। -সত্যি বাবা, আজমাইন একদম আলাদা। এই গত মাসে ভর্তি হলো আমাদের সেকশনে। ওর বাবা নাকি এডিশনাল এস পি তাই বছরের মাঝখানে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে ওর কোনো সমস্যা হয়নি। এতদিন আজমাইন ঢাকায় ছিল। খুব নাকি নামকরা স্কুলে পড়তো। বাবা ওর কথা বলার ভঙ্গিটা বেশ মজার। কথায় কথায় আমাদের ‘ডুড’ বলে। অনির মুখে হাসি। -বাবা, ডুড! এ আবার কি রে? বিদেশীদের মতো নাকি? -না বাবা, টিভি নাটকের মতো। এখন তো নাটকগুলোতেও ডুড বলে, তুমি খেয়াল করোনি? -নাহ্ তো! বাবার সাথে আড্ড জমে গেলে অনির কথা খই ভাজার মতো ফুটতে থাকে। শংকর ছেলের সাথে আড্ডাবাজি খুব গুরুত্বের সাথে নেন। মোহনা মাঝে মাঝে বলে, ছেলেটা তোমার সাথে কত সহজ! আমার সাথে কেন না? শংকর সেই প্রশ্নের উত্তর জানলেও মোহনাকে অত ব্যাখ্যা করেননি। কারণ, মোহনা অনির ব্যাপারে সামান্য ব্যাখ্যাও মানতে নারাজ। ভয় আর আশংকা মোহনার মন জুড়ে থাকায় অনির বেড়ে ওঠা মোহনা উপভোগ করতে পারছে না। তবু শংকর মাঝে মাঝে চেষ্টা করেন, মোহনার ভাবনার বৃত্ত ভেঙে ফেলতে কিন্তু ছেলে-মেয়ের ব্যাপারে কোনো ছাড় দিতে মোহনা নারাজ। মোহনার ধারণা, পুরো পৃথিবী তোড়া আর অনিকে গ্রাস করতে হা করে বসে আছে। তাই মোহনা সব কাজে ছেলে-মেয়েকে বাঁধবার চেষ্টা করে আর ওদের সামনে তুলে দেয় নিষেধাজ্ঞার দেয়াল। কিন্তু শংকর জানেন, বাঁধনই সম্পর্ক আলগা করে। অনির সময়কাল এখন অন্যরকম। এই অনির ভেতরে এখন আলো ঢুকবার সময়, অন্ধকার ঢুকবার সময়। কথার মারপ্যাচ বা কথার গতিতে ওর মনের রথ থামবার না, সেটা মোহনা বুঝতে চায় না। মোহনার উচ্চারিত একটি শব্দ ‘না’ ছেলেকে মায়ের কাছ থেকে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। নিজের মনে ভাবছিলেন শংকর। হঠাৎ খেয়াল করলেন, অনি কথা বলেই যাচ্ছে। -ওর না বাবা স্মার্ট ফোন আছে। আমার আর ধীমানের ফোন নেই দেখে সে কি হাসাহাসি ওর! বলে কি না, ডুড, তোরা মফস্বলের ক্ষ্যাত! গাঁইয়া ভূত! আজমাইনের কথা শুনে ধীমান তো গতকাল খুব রেগে গিয়েছিল, বলেছে আরেকবার উল্টোপাল্টা বললে হেড স্যারকে নালিশ করবে। -তুই ও কি নালিশ করবি? -দুর বাবা, আমি ওসব নালিশে নেই। বললে বলুক। তবে আজমাইনের মোবাইলটা কিন্তু বেশ। সিম্ফনির সেট। আমাকে দু’একবার ধরতে দিয়েছে। টাচ স্ক্রিণ। ছবি আসে খুব সুন্দর। আজমাইনতো ক্লাসের মধ্যেও সেলফি তোলে। -তুই ও তো সেলফিকুলফি সব শিখে ফেললি। তোর ও কি স্মার্ট ফোন চাই ডুড? -দুর বাবা, তোমার সবটাতেই ইয়ার্কি। আমি কি কখনো বলেছি আমাকে মোবাইল দাও? জানো বাবা আজমাইনের ফোনে ইন্টারনেটের কানেকশন থাকে সবসময়। চ্যাট করে। বাবা, এই বয়সে এসব কি ভাল বলো? -তুই তো বেশ তোর মায়ের মতো কথা বলছিস? তাহলে কোন বয়সে ভাল? অনির দৃষ্টি এবার বিষণ্ন। বয়সের সমীকরণ মিলাতে ভাল লাগে না ওর। তবু কি করে যেন মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল। -তোর বয়সেই তো সব ভাল। আমি কি আর এই বুড়ো বয়সে তোর নিত্যানন্দ কাকার পিঠ চাপড়ে বলবো, হাই ডুডু! কেমন আছিস? অনি হেসে ফেলে। শংকরও হাসেন। অনি আবার সহজ হয়ে যায়। -বাবা, আজমাইনের একটা জিনিস কিন্তু খারাপ। ও কি করে বলবো? -বল। -মাকে বলে দিবে না তো? -বললেই কি? তোর মা কি আর আজমাইনের কাজেকর্মে কষ্ট পাবে? -আরে না, মা বলবে, আজমাইনের সাথে মিশিস না! কিন্তু ওর সাথে মিশতে আমার ভালই লাগে। -আচ্ছা ডুড! বলবো না। -তপন স্যারের কোচিং এ যাচ্ছে আজমাইন এক সপ্তাহ ধরে। আমাদের ব্যাচের পড়া শেষ হলে ও কি করে জানো? -উহু। -ও ইচ্ছে করে স্যারের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম প্রথম আমি আর ধীমান বুঝিনি ব্যাপারটা। কাল টের পেলাম, আমাদের ব্যাচের পরেই তো মেয়েদের ব্যাচ শুরু। ও অযথাই দাঁড়িয়ে মেয়েদের দেখবে। শংকর ছেলের মতো গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলেন, -আমিও দেখতাম তোর বয়সে। তোর মাকে আবার বলিস না! -দুর, তুমি খুব ইয়ে বাবা, মেয়েদের ওইভাবে দ্যাখে নাকি কেউ, বখাটে বলবে না সবাই? -সেটাও অবশ্য ঠিক। তাহলে আর দাঁড়িয়ে থেকে দেখার দরকার নেই। -আমি তো দেখি না। আজমাইন খুব স্টাইল মেরে দাঁড়িয়ে মোবাইল চাপতে থাকে। আমি আজ ওকে রেখেই চলে এসেছি। পথে শম্পার সাথে দেখা। ভাগ্যিস শম্পা আমাকে ওভাবে দেখেনি। তাহলে কি ভাবতো বলো! নির্ঘাৎ এসে কাকীকে বলে দিতো। -তাইতো শম্পা কি ভাবতো বল তো! -বাবা, তুমি কিন্তু আমার সাথে আবার মজা করছো! শংকর ছেলের কথা শুনতে শুনতে আপনমনে হাসেন। ছেলেটা বড় হচ্ছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now