বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অ-কথার স্তূপ

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Sayemus Suhan (০ পয়েন্ট)

X বুকের উত্তাপে রেখে দেওয়া সুখ-দুঃখের ফর্দখানা উল্টেপাল্টে দেখে নিয়ে ওরা প্রত্যেকে এক একটা নতুন গল্প বলবে বলে ঠিক করে। তারা, মানিক, মিতু, সবুজ আর তিতির। ওদের বয়স বাইশ-তেইশ বা মাস দুয়েক কম বেশি। এই বয়সে গল্প বা কল্পগল্প বলতে কাউকে ঠেলাঠেলি করতে হয় না। বরং কথার তোড় বন্ধ করতে মিনতি করা লাগে। তবে হার্ড পয়েন্টের আজকের পরিবেশটাই অদ্ভুত। মায়াময়। ধীরে ধীরে সূর্য জলস্নানে নেমে পড়ছে। অনেক গপ্পো হবে বলে মেতে উঠতেই কে যেন এক ফুঁ’য়ে চারপাশের সব আলো নিভিয়ে দিলো। সেই সাথে নদীর মিহিন ঢেউ আর জন্মান্ধ রাত যেনো স্রষ্টার কাছে আলোর আশায় মিনতি করে উঠলো। চারপাশের নিস্তব্ধতা ওদের পাঁচজনকে আরও নিশ্চুপ করে দিলো। বর্ষা এসেছে। যমুনার ঢেউয়ে তবু আজ কোনো উন্মাদনা নেই বরং জলের গোপন ভাঁজে ভাঁজে নীরবতা আর ঢেউয়ের আশ্চর্য সংগম। নদী তীরের জলগন্ধী হাওয়া শরীর জুড়োবার আগেই কি করে যেন মন জুড়িয়ে দেয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে একটা সুখময় ক্লান্তি ভর করে শরীরমন জুড়ে। তাই হয়তো ওরা কেউ মুখ খুলছে না। মানিকের দেরি দেখে মিতু ওর গায়ে ধাক্কা দেয়, -কিরে বলছিস না যে? তুই বিষয়টা প্রস্তাব করলি, তুই শুরু কর। মানিকের গলা কণ্ঠশীলনের তৈরি। ঠিক কবিতা পড়ার মত করেই মানিক বলতে শুরু করে, -তনিমা এসেছিল আমার জীবনে। কেবল একবার মুগ্ধ চোখে ওকে দেখতেই আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন পথ খুঁজে খুঁজে হয়রান ঠিক তখনি ও এসে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল নদীর পারে। তারপর আমাকে ডুবিয়ে দিয়ে যেমন আচমকা এসেছিল তেমন আচমকা চলে গেল। সবুজ মানিকের পিঠে সজোরে থাপ্পড় মারে, -শালা ভাব দেহাও? সোজা ভাষায় ক শালা, পিরিতে মজছিলি, মাইয়াডা তোমারে ছাঁকা দিয়া গ্যাছে। এইসব ভাব মারানি গপ্পে আমি নাই। হারামজাদা! ঘটনা ক। আমি ঠিক জানতাম তোরা এমনই ল্যাদল্যাদা কাহিনী শুরু করবি। আমি শালা এই সবে নাই। আমি গেলাম। সবুজের চলে যাওয়া দেখে মানিক মুখ অন্ধকার করে বসে থাকে। তারা ছটফট করে, -তুই মন খারাপ করছিস কেন মানিক? সবুজ তো এমনই। একটু পরে দেখবি ঠিকই চলে আসবে। সিগারেট ফুঁকতে গেল বোধহয়। মানিক শান্ত গলায় বলে, -আসলে ওর কথা বলতে গেলে আমি সোজাসুজি কিছু বলতে পারি না। তবে আমার জীবনটা সাদামাটা। আর এর মধ্যে তনিমার আসা আর যাওয়াই একমাত্র বৈচিত্র্যময় ঘটনা। তিতির চুপচাপ। যদিও যমুনার গন্ধ মেশা বাতাসের শহরটা ওর চিরচেনা তবু বরাবরের মতো শহররক্ষা বাঁধের পারে এসে তিতির অবাক পথিকের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে যমুনার তীর ঘেঁষা সৌন্দর্য তিতিরকে কেমন বিষাদগ্রস্থ করে তুলেছে। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে বন্ধুরা যখন বললো, তিতিরের শহরে বেড়াতে আসবে, তিতির খুব খুশি হয়েছিল। সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের সব কয়টি দর্শনীয় জায়গা ঘোরা শেষে ওদের পছন্দের যমুনার তীরে আজ দ্বিতীয় ও শেষবারের জন্য এসেছে। কাল সকালে ঢাকা ফেরার ট্রেন। মনে পড়তেই তিতির নিজের মধ্যে ফেরে। অতিথিদের দেখাশোনার দায়িত্বটা ওর উপর বর্তায় বলেই তিতির কাতর গলায় মিনতি করে, -তোরা যাবার আগে তর্কে মাতিস না। আসলে মানিক তুই কিছু মনে করিস না, আমারো ঠিক প্রেমের গল্প শুনতে ইচ্ছে করছে না। সবুজ তো ঠিকই বলেছে। তুই একটা অন্যরকম গল্প বল। আজ আমরা সেসব গল্প বলবো, যেগুলো বুকে এসে বিঁধবে, যে গল্প আগে আমরা কাউকে বলিনি। সবুজ পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, -বোঝো এবার, এসব নেকুপুষুমুনুর গপ আর না। বাদাম ভাজা খা আর আমার গপ্পো শোন। গল্পের গন্ধ পেয়ে হার্ড পয়েন্টের পাথরের ব্লকের সারিতে পা ঝুলিয়ে ওরা পাঁচজন বসে পড়ে। সবার আগ্রহী চোখ আর হাত এখন সবুজের দিকে। সবার হাতে বাদাম দিতে দিতে সবুজ লম্বা করে শ্বাস নেয়। একসময় ওর নিঃশ্বাস কেমন ভারি হয়ে আসে। তারপর সবাইকে হতবাক করে দিয়ে প্রমিত বাংলা উচ্চারণে সবুজ বলে ওঠে, -আমার গল্পটা খুব ছোট। এক লাইনের গল্প। আমার মাকে আমি আমার চাচার সাথে এক বিছানায় দেখেছি, তখন আমার বয়স আট। সবুজের গল্প শুনে বাতাস ভারি হয়ে যাবার কথা কিন্তু ওদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাতাসে মিষ্টি কামিনীর গন্ধ ভাসে। আস্তে আস্তে জোছনা অন্ধকারকে গ্রাস করে নিচ্ছে। অপূর্ব সেই সৌন্দর্য্য! চারপাশের মায়াবী সৌন্দর্য্যে ওরা পাঁচজন আবার ঘোরে পড়ে যায়। কেউ কোনো কথা বলে না। কথা বললেই যেন সুন্দরের প্রাচীরে ধ্স নামবে। দূরে একতারার সুরের সাথে পথশিল্পীর গলা শোনা যাচ্ছে। সবুজ কি কাঁদছে? কেমন যেনো ফোঁপানির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মিতু কাঁদছে। ওরা কেউ কোনো কথা বলে না। হঠাৎ শব্দেরা যেন হারিয়ে গেছে। মিতু মিনতি করে বলে, -আর গল্প বলে কাজ নেই, চল্ বাড়ি ফিরি। তিতির কাল সকালেই তো আমাদের ট্রেন। তাছাড়া আমার জীবনে অদ্ভুত কোনো গল্প নেই। খুব সাদামাটা জীবন আমার। সবুজের ক্ষ্যাপা গলা শোনা যায়, -আমার গল্প শ্যাষ। ভাল চাস তো বাকিরা গল্প শেষ কর। তারা মিতুর হাত চেপে ধরে অদ্ভুত গলায় বলে ওঠে, -নারে, সবাইকে তো বলতেই হবে, এমনই তো কথা ছিল। আমার গল্প বলি এবার। মিতু তারার দিকে ভীতু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারার চোখের মণি একটু কটা, অন্ধকারে সেই চোখ জোড়া কেমন জ্বলজ্বল করে ওঠে। ঘাবড়ে গিয়ে মিতু তারার হাত খামচে ধরে। তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বলতে থাকে, -আমাকে যে কোনো ছেলে আকর্ষণ করে না তা আমি টের পেলাম ক্লাস নাইনে পড়বার সময়। তখন আমাদের বাড়িতে রোজ পাশের বাড়ির রেখাদি আসতো। মিতু দুই কানে দুই তর্জনী ঢুকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, -আমি কিছুতেই আর কারো গল্প শুনবো না, আমি আমার কোনো গল্পও বলবো না। চারপাশের অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সবুজ বিকট শব্দে হেসে ওঠে, -বোঝো ঠ্যালা! এতো তাড়াতাড়ি কি রণে ভঙ্গ দিলে চলবো? এখনো তো তোর আর তিতিরের গল্পই শোনা হইল না! তিতির মিতুর দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসে, -কিরে এখন তুই বলবি? না আমি বলবো? সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিতু বলে, -ঠিক আছে, এবার আমি বলবো। সবুজ আবার বাতাস কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। মিতু সেই হাসির শব্দ শুনে কেমন দাঁতে দাঁত চেপে থাকে। তারপর বিরবির করে বলে ওঠে, -ইয়ার ফাইনালের আগে মানিকের ইনটেলেক্চুয়াল প্রপার্টি এ্যাক্টের যে এ্যাসাইনমেন্টটা হারিয়েছিল সেটা আমি নিয়েছিলাম। আলো-আঁধারির মায়া বিদীর্ণ করে মানিকের গলায় অস্ফুট আওয়াজ শোনা যায়, -আহ্! তুমি! তিতির বলে, -হুম, আজকের গল্পগুলো সব ভুলে যাওয়াই ভাল। যাক, এবার তাহলে আমার পালা। চার জোড়া চোখ এখন তিতিরের দিকে ঘুরে যায়। তিতিরের মুখটা খুব রহস্যময় লাগে। তিতির সময় নিচ্ছে।এক মিনিট।দুই মিনিট।তিন মিনিট। যেন সবচেয়ে আকর্ষণীয় আর ঐশ্বরিক উন্মাদনায় ভরপুর গল্পটি বলবে বলে তিতির সময় নিচ্ছে। আচমকা রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তিতির বলতে শুরু করে, -আমার সেরকম কোনো গল্প নেই। আবার এটা গল্প ধরলে গল্প। জানিস তোরা, ভার্সিটিতে ভর্তির আগে মা আর আমি প্রতি শুক্রবারে এই হার্ড পয়েন্টে আসতাম। দুজনে দাঁড়াতাম এই বাঁধের উপরে। এখনো ছুটিতে আসলেই আমরা দুজন এখানে চলে আসি। মা-মেয়েতে চুপচাপ বসে থাকি রাতের অপেক্ষায়।আমাদের অবাক করে দিয়ে কোনো কোনোদিন আজকের মতোই অন্ধকার ছাপিয়ে আলোতে ভরে যায় চারপাশ। দেখ, দেখ, কী মিষ্টি আলো! নারে? দেখেছিস? তিতির চুপ করে যায়। তবু কেউ উত্তর দেয় না। প্রশ্নও করে না। যেনো কারো কোনো তাড়া নেই। সবাই নিশ্চুপ বসে থাকে। কারণ সবাই জানে বুকের গভীরে লুকানো গোপন বিস্ময় আজ উজার করতে বাধ্য তিতির। তিতির আবার বলতে শুরু করে, -জানিস আমার জন্মদাতা মানে আমার বাবা আমেরিকা থাকে না। আমি মিথ্যে বলেছি। আমি রোজ তোদের মিথ্যে বলি। আমার বাবা রাজাকার ছিলো। রাজাকার! কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! আমার রক্তই ঘেন্নার! মানিক কত ডাকে তবু ব্লাডফ্রেন্ডের ডাকে আমি রক্ত দিতে যাই না। রাজাকারের রক্ত যে!বুঝবি না তোরা, কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! তিতির কাঁদছে। গ্লানিময়, ক্লান্তিকর সুরে। ওরা তিতিরকে কাঁদতে দেয়। একসময় তিতির থেমে যেতেই অখন্ড নিরবতা চারপাশ ঘিরে ধরে। লোক সমাগম কমে গেছে। পথশিল্পীর সুরের জাদু স্তিমিত। সুনসান নিরবতা। ওরা পাঁচজন নিশ্চুপ বসে থাকে আর আলো-আঁধারির লুকোচুরি দেখে। ধীরে ধীরে জোছনার ঝলমলে আলোয় রাত্রির রূপ পাল্টে যায়। দেখে মনে হয় ওদের অ-কথার স্তূপ ঢাকতে আকাশের ঝুলন্ত চাঁদ তার সবটুকু আলো নদী তীরে বিছিয়ে দিয়েছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now