বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল শাহানা বেগম। নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছে। গল্প লেখে। স্মার্ট সুন্দর মেয়ে। পরবর্তীকালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক এডমিনিসট্রেশনে, নাকি কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করল। বিখ্যাত সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকীর সঙ্গে বিয়ে হলো। আমাদের খুবই প্রিয়বন্ধু।
শাহানা এখন কানাডায়। কিছুদিন আগে দেশে এসেছিল মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করতে। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি।
এই লেখা লিখতে বসে কত প্রিয়বন্ধুর কথা যে মনে পড়ছে।
সাগরকে ঘিরেই সেদিন মেয়েদের ভিড়।
লিজি নামে ছবির মতো সুন্দর এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাগর আর শাহানার মাঝখানে। একটু ডাকাবুকো টাইপের একটা মেয়ে প্রায় ভিড় ঠেলে ঢুকে গেল। কী কথায় খিলখিল করে হাসতে লাগল।
রহমান বলল, ওর নাম শুশুমণি। কাদের সিদ্দিকীর ছোটবোন।
শুনেই আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কাদের সিদ্দিকীর বোন!
কাদের সিদ্দিকী তখন আমাদের হিরো। বিশাল মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তাঁর কাদেরীয়া বাহিনী পাকিস্তান আর্মির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বহুবার তাঁর নাম এবং কৃতিত্বের কথা প্রচারিত হতো। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক কিংবদন্তির নাম কাদের সিদ্দিকী। তাঁকে প্রথম দেখেছি আমাদের জগন্নাথ কলেজে। কলেজের কোনও একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা, লম্বা ি ম একজন বাঙালি। মুখভর্তি দাড়ি। কলেজের মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলছিলেন তিনি। হাজার হাজার ছাত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি তাঁকে দেখছিলাম। সেদিনের পর, বেশ অনেক বছর পর তাঁর দুখণ্ডে লেখা বই ‘স্বাধীনতা ’৭১’ হাতে এলো। কলকাতার ‘দে’জ’ প্রকাশন সংস্থা বের করেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়লাম সেই বই। দুয়েকটি অনুষ্ঠানে এই মহান বীরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। এত সুন্দর করে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন। ভাবতে ভালো লাগে, গৌরববোধ করি। কাদের সিদ্দিকীর ছোটবোন আমার বন্ধু।
সেই বন্ধুকে প্রথম চিনিয়েছিল রহমান।
কাদের সিদ্দিকীর ছোটবোন শুনে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। সরাসরি তাকানো যাবে তো এই মেয়ের দিকে? রেগে যাবে না তো? ভাইয়ের কাছে গিয়ে বিচার দেবে না তো?
শুশুর দিকে আমি খুবই সমীহের চোখে তাকিয়েছিলাম।
চাঁদের হাটের দিনগুলোতে শুশুর সঙ্গে আমার তেমন দেখা হয়নি। দু চার বার যাও দেখা হয়েছে তেমন কথাবার্তা হয়নি। দেখেছি শুশু তুমুল আড্ডা দেয় বন্ধুদের সঙ্গে। হৈ হল্লা হাসি আনন্দে মেতে থাকা অতি প্রাণবন্ত মেয়ে। খুবই ঠাট্টাপ্রিয়, শুশুর রসবোধ তীব্র।
শুশুর সঙ্গে বহু বহু বছর পর দেখা হলো চ্যানেল আইতে, সাগরের রুমে। শুশুর চেহারা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। সাগর বলল, দেখো তো চেন কি না!
চিনতে পারিনি।
সেই কিশোর বয়সের মতো শুশু আমার বাহুর কাছে একটা ধাক্কা দিল। বড় লেখক হয়ে গেছ! বন্ধুদের চিনতে পারো না। আমি শুশু।
শুশুর এই আচরণে আমি মুহূর্তে ফিরে গেলাম তিয়াত্তর সালের সেই দিনে।
আহা রে! কত কতগুলো দিন চলে গেছে আমাদের জীবন থেকে। সেই দিনকার বন্ধুদের মুখ দেখলে দিনগুলো ফিরে পাই।
শুশুকে পেয়ে সাগর খুব উচ্ছ্বসিত। তৃতীয় মাত্রার জিল্লুরকে বলল, শুশু আর মিলনকে তৃতীয় মাত্রায় আনো। ওরা বন্ধুত্ব ইত্যাদি নিয়ে কথা বলবে, দুজনেই প্রবাসে জীবন কাটিয়েছে, প্রবাস জীবন নিয়ে কথা বলবে।
মিডিলইস্টের অনেক দেশ ঘুরে শুশু এখন কানাডায় সেটেলড। আর আমি বহু বছর আগে দুবছর জার্মানিতে ছিলাম।
আমরা দুই বন্ধু তারপর তৃতীয় মাত্রায় হাজির হলাম। শুশু কথা বলতে শুরু করল। শুশুর কথাবার্তা শুনে আমি মুগ্ধ। কী সুন্দর উচ্চারণ, কী সুন্দর বাচনভঙ্গি, কী সুন্দর যুক্তি দিয়ে কথা বলে।
আমি শুশুর কাছে ম্লান হয়ে গেলাম।
আরে শুশু এত সুন্দর করে কথা বলতে শিখল কবে? কোথাও কোনও জড়তা নেই, কোনও দ্বিধা নেই। যা বিশ্বাস করে তাই স্পষ্ট উচ্চারণে বলে!
সাগর বলল, মিডিলইস্টে থাকার সময় শুশু নিয়মিত রেডিও প্রোগ্রাম করত।
শুনে এত ভালো লাগল। তার মানে আমার বন্ধুরা যে যেখানে আছে সেটুকু জায়গা আলোকিত করেই আছে!
শুশু তিয়াত্তর সালের সেই দিনটির কথা কি তোমার মনে আছে? আমার একদম পরিষ্কার মনে আছে। ওই একটি দিনেই জীবনের অনেক বন্ধুকে আমি একত্রে পেয়েছিলাম। আমার জীবনের সবচাইতে বড় অর্জনের দিন সেটি।
‘তৃতীয় মাত্রা’ নিয়ে আর একটা মজার স্মৃতি আছে। রবীন্দ্র জন্মদিবস। সাগর প্ল্যান করল আমরা তিন বন্ধু মিলে অনুষ্ঠান করব। সাগর উপস্থাপক, আমি আর আফজাল আলোচক। যথাসময়ে সেটে হাজির আমরা। সাগর মাঝখানে আমি আর আফজাল দুইপাশে। সাগর শুরু করল মজাদার এক চমক দিয়ে। ‘আমরা তিন বন্ধু আজ একত্রিত হয়েছি আমাদের আরেকজন বন্ধু সম্পর্কে কথা বলার জন্য। প্রিয়দর্শক, আমাদের সেই বন্ধুর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।
আমি আর আফজাল চমকিত।
আবার ফিরি উনিশশ’ তিয়াত্তরের সেই দিনে।
অনুষ্ঠান শুরুর সময় ঘনিয়ে আসছে। কখন কোন ফাঁকে ভরে গেছে হল। এই ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর পোস্টার পেপার ফেলে খুবই মনোযোগ দিয়ে কী কী লিখছে এক যুবক। লম্বা টিং টিংয়ে। খয়েরি রংয়ের প্যান্টের ওপর গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা। দেখে মনে হচ্ছে একটি বাঁশের গায়ে প্যান্ট পাঞ্জাবি পরানো হয়েছে। যুবকের মাথার চুল ঘাড় ছাড়িয়ে নেমেছে। গায়ের রং মাজা মাজা। মুখের প্যাটার্ন রেডইন্ডিয়ানদের মতো। চোখ দুটো বড় বড়। চোখে এক ধরনের নিরীহ এবং কৌতূহলী দৃষ্টি।
রহমান আমাকে সেই যুবকের কাছে নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিল। আজকের বিখ্যাত আফজাল হোসেনের সঙ্গে এই আমার পরিচয়। সাতক্ষীরার ছেলে। আমার দুবছরের সিনিয়র। আর্ট কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। তখন কে জানত এই নরম নিরীহ যুবকটি শিল্পের যে শাখায় হাত দেবে সেখানেই সোনা ফলবে! তার একার আলোয় অনেকখানি আলোকিত হবে আমাদের সময়।
চাঁদের হাটের সেদিনকার সেই অনুষ্ঠানে তখনকার পাঁচজন বিখ্যাত তরুণ লেখককে দেখলাম। আলী ইমাম, সালেহ আহমেদ, সিরাজুল ইসলাম, মুনা মালতি এবং ফিউরি খোন্দকার। সালেহ আহমেদ শুধুই ছোটদের লেখা লেখেন। চাঁদের হাট, কচিকাঁচার মেলা, সাতভাই চম্পা, এসব পাতায় তো তাঁর লেখাই বেরোয়ই, এখলাসউদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘টাপুর টুপুর’ পত্রিকাতেও বেরোয়। রহমানকে দেখলাম লেখক হিসেবে খুবই সমীহ করে তাঁকে।
সালেহ আহমেদ বক্তৃতা করলেন। সাহিত্য নিয়ে ভালো ভালো কথা বললেন। তারপর বক্তৃতা দিল সিরাজুল ইসলাম। সিরাজ তখন বড়দের গল্পও লেখে। দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব সিরাজের লেখা খুবই পছন্দ করেন। সিরাজ তখন বুয়েটের ছাত্র। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। পুরনো ঢাকার বেগমগঞ্জের ছেলে। আমাদের গেণ্ডারিয়ার কাছে বেগমগঞ্জ। গেণ্ডারিয়া এবং বেগমগঞ্জের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ধোলাইখাল। সিরাজ ছোটখাটো মানুষ, রহমান আকৃতির। অতি রোগা। পরনে ঢলঢলে শার্টপ্যান্ট, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, চোখে মোটা কাচের চশমা। কথা খুবই কম বলে, হাসে বেশি। ঘন ঘন সিগ্রেট খায়।
সিরাজের সঙ্গে পরে গভীর বন্ধুত্ব হয় আমার।
জীবনের অনেকগুলো বছর প্রতিটা দিন আমার সিরাজের সঙ্গে কেটেছে। চাঁদের হাটের বাইরে আমাদের পাঁচ বন্ধুর একটা দল হয়েছিল। কাজী হাসান হাবিব, সিরাজুল ইসলাম, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার এবং আমি। কী যে উন্মাদনার দিন আমাদের তখন। প্রতিদিনই পাঁচজন একসঙ্গে হচ্ছি। তুমুল আড্ডা, হৈ চৈ। একত্রে রাত্রিযাপন। আমাদের মধ্যে তখন শুধুমাত্র হাবিবই বিবাহিত।
তেরো বছর আগে হাবিব আমাদের দলটা ভেঙে দিল।
চার বন্ধুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল হাবিব। সিরাজ আমি জুবায়ের সারোয়ার চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলাম হাবিবকে। হাবিব কোনও কিছুই তোয়াক্কা করল না, চারজনের মাঝখান থেকে উধাও হয়ে গেল। হাবিবকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল ক্যান্সার।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now