বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

আঁধার ছোঁয়া আলো

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Eva Nahar Sinthi (০ পয়েন্ট)

X আমার উত্তপ্ত মিডিয়াম সাইজ ল্যাটেতে আমি যখন গভীর মনোযোগের সাথে চকোলেট পাউডার মেশাচ্ছিলাম , সাদমান ততখনে ক্যাফের একটা উইন্ডো সীটে বসে পড়েছে । আমি কফিতে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতেই সে তার চোখ নাচিয়ে বলল, “অবনীল, সত্যিকারের ভালবাসায় তোমার বিশ্বাস আছে ?” আমি ফিক করে হেসে জানলার বাইরে তাকাই । সূর্যটা ততখনে ডুবে গেছে – আকাশে সূর্যবিদায়ের অনেক রঙ । সাদমান টেবিলে আলতো নক করতেই আমি তার চোখে চোখ রেখে বলি , “তোমরা আমেরিকায় বড় হওয়া কিডজ আবার সত্যিকারের ভালবাসার ধার ধারছো কবে থেকে ? তোমাদের তো চোখের দিকে তাকালেই প্রেম হয়ে যায় !” সে হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল , “ অবনীল , not again !” আমি মুচকি হেসে বলি , “ ঠিক আছে ! কিন্তু সাদমান , আমার যে ট্রু ফলস কোনরকম ভালবাসাতেই বিশ্বাস নেই ! যত যা ই বল - এসব ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচব না’ টাইপ ভালবাসার দিন পৃথিবীতে আর নেই ।“ -“ কখনো প্রেমে পড়নি ? সিরিয়াসলি ?” -“কে বলেছে পড়িনি ? অনেকবার পড়েছি ।“ সাদমান সব কটা দাঁত বের করে বলল , “ ওয়াও ! শুনতে চাই ম্যাম !” আমি কফিতে বিশাল একটা চুমুক দিয়ে বললাম ,” তুমি কয়টা শুনতে পারবে বলে মনে কর ?” -“ তুমি যতক্ষণ বলতে পারবে বলে মনে কর !” আমি অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললাম , “ সাদমান, টিনেইজ লাইফে আমি প্রথম যার প্রেমে পড়েছিলাম , সে আমার বাসার সামনে রোজ বিকেলে ক্রিকেট খেলত । সে খেলত আর আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিল করতাম । তার ঠিক এক সপ্তাহ পর আমি আবিষ্কার করলাম , ক্লাস এইটে পড়ুয়া সেই ইচড়েপাকা ছেলের একটা গার্লফ্রেন্ড আছে । এইসব লেইম স্টোরি শুনতে ভাল লাগছে ?” -“না লাগছে না, এসব ষ্টুপিড স্টোরি সবার লাইফেই কমন পড়ে । আমি তোমার ট্রু লাভস্টোরি শুনতে চেয়েছি !” আমি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলি, “ ট্রু ? আমি তোমাকে বলেছি সাদমান , এসব ট্রু লাভস্টোরি বলে পৃথিবীতে কিছু নেই ।” -“ ‘কিছু নেই’ কথাটির পেছনে অনেক কিছু থাকে – তাইনা ? ” আমি ঠোঁট চেপে এক মুহুর্ত চুপ করে সাদমানের দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার চাইতে ভাল আর কেউ জানেনা, এই ছেলেটি আমাকে এভারেজের থেকে একটু বেশিই পছন্দ করে । আমেরিকার এই নিঃসঙ্গ জীবনে চুপচাপ আমি যখন বন্ধুহীনতায় মোটামুটিভাবে নিজেকে একঘরে করে ফেলছিলাম , ঠিক সেই সময় সাদমানের সাথে আমার পরিচয় । ভালবাসার বিষয়ে আমার বাজে রকমের অভিজ্ঞতা না থাকলে এতদিনে আমি হয়ত তাকে পছন্দ করে ফেলতাম । কিন্তু আমার জন্য এতখানি অনুভূতি থাকবার পরেও এই ছেলেটি আমার চারপাশে তুলে রাখা দেয়ালটা কখনো ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করেনি । দেয়ালের ওপাশ থেকেই সে আমার সঙ্গে থাকে , আর অপেক্ষা করে এই ভেবে – কোনদিন হয়ত আমি নিজেই তাকে দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দেব । আমি প্রচন্ড আক্ষেপকে চেপে রাখতে রাখতে সাদমানের দিকে তাকাই । কেন আমি এই ছেলেটিকে এখনো ভালবাসতে পারিনা ? আটকে রাখা শ্বাসটাকে ছেড়ে দিয়ে আমি বলি , “ সাদমান, আমার জীবনের একমাত্র সত্য ভালবাসাটি এসেছিল ঠিক পঞ্চমবার কারো চার্মে মুগ্ধ হবার পর । আমি ছেলেটিকে প্রচন্ড ভালবাসতাম, হ্যা ! ঠিক যেমন করে সিনেমার নায়িকারা সব ভুলে গিয়ে প্রেমিকের জন্য মরে যেতে চায় , আমি তাকে ঠিক তেমন করে ভালবাসতাম । অথচ আমার জীবনের সেই সত্য ভালবাসাটি কয়দিন টিকেছিল জানো ? কেবলমাত্র সাত মাস সতেরদিন । সে চলে যাবার পর আজ অবধি কেটে গিয়েছে সাড়ে ছয় বছর – অথচ দেখ, আমি দিব্যি বেঁচে আছি । তাই প্রিয় সাদমান , এই মুহুর্তে তোমাকে সাক্ষি রেখে, আমি অবনীল, শপথ করে বলছি – এই পৃথিবীতে সত্য ভালবাসার গল্প বলে কিচ্ছু নেই !” সাদমান থমথমে চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । আর আমি হাসিমুখে দুইহাত দিয়ে কফিক্যানের উষ্ণতা নিতে থাকি । কি অবাক করা ব্যাপার - এতগুলো দিন পরেও নির্বাণের কথা ভাবলে এখনো আমার চারপাশটা কেমন যেন শীতল হয়ে আসে ! নির্বাণ কিংবা তার স্মৃতি - ধীরে ধীরে তার সব কিছুই অস্পষ্ট হয়ে এসেছে আমার মন থেকে । তার অপলকে চেয়ে থাকা চোখ , ঠোঁটের এককোণ বাকানো হাসি, হাসবার ছলে ডানপাশে তাকিয়ে ফেলা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ – আমি তার কি ভালবাসিনি ? অথচ এতটা ভালবাসবার পরেও সে আমার থাকেনি ! -“ কেন থাকেনি সে ?” -“ ক্যারিয়ার । এই ড্যাশিং স্টেটসের হাতছানি কে রুখতে পারে বল ? আমিতো কোন ফ্যাক্টরই ছিলাম না ! ক্যারিয়ারের জন্য এত দূরে চলে আসবার ডিসিশান সে যখন একাই নিয়ে ফেলেছিল , আমি তখন তার জন্যে ছিলাম শুধুই একটা দেয়াল – যাকে সে অবলীলায় ভেঙ্গে যেতে পারে , যাকে ভেঙ্গে যাবার দায়বদ্ধতায় একটা সেকেন্ডেও তার চোখের পাতা কখনো ভিজে উঠবেনা !” -“কষ্ট হয়নি ?” - “হাসবে । শুনতে পেলে হাসবে ।” সাদমান অপরাধীর মত মুখ করে বলল , “ হাসব কেন ?” আমি ওর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলি,“ আমাদের সাত মাস সতের দিনের সম্পর্ক যখন শেষের দিকে চলে এসেছিল , আমি তখন দাঁতে দাঁত চেপে রাত কাটিয়ে দিতাম । যে আমাকে কেউ কোনদিন কখনো কাঁদতে দেখেনি , সেই আমি রাতের পর রাত চোখের পানি ফেলতাম । পৃথিবী সেটা দেখেনি – তাই সবটুকু অপারগতা নিজের দিকে টেনে নিয়ে আমি চলে এসেছিলাম !” -“তারপর ?” - “নির্বাণের জন্য আমি যেদিন শেষবারের মত কেঁদেছিলাম , সেদিন আমাদের শহরের বুকে প্রচন্ড শীত নেমেছিল । বাসে জানলার পাশের একটা সিটে বসে আমি সেদিন দুই হাতে শক্ত করে আমার মোবাইলটাকে চেপে ধরেছিলাম – যে মোবাইলে আসা একটি টেক্সটে নির্বাণ আমাকে জানিয়েছিল – ভালবাসা নামক একঘেয়েমিতে তার এখন বিরক্তি চলে এসেছে – আমি যেন তাকে আর ধরে না রাখি । টেক্সট পড়া শেষ হতেই সেদিন আমার চোখ থেকে শেষ কয়েক ফোঁটা কষ্ট ঝরে গিয়েছিল । তারপর থেকে নির্বাণের জন্য আমি আর কোনদিন কাঁদিনি ! সেই শেষ কান্নার ঠিক দুদিন পর আমি নির্বাণকে ডেকে বলেছিলাম , ‘ নির্বাণ , তুমি মুক্তি চাও ? আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম ।’ সাদমান , আমার ট্রু লাভস্টোরির সেখানেই এন্ডিং হয়েছিল !” এতটুকু বলবার পর সাদমানের সামনে আমি সেদিন আর একটা কথাও বলতে পারিনি । আমার নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ব্ল্যাংক মনে হচ্ছিল । ফল সিজনের সেই হালকা শীত আমাকে প্রচন্ড রিক্ততায় মেরে ফেলতে চাচ্ছিল । কেন যেন , সাদমানও সেদিন আর কিছু জানতে চায়নি - চুপচাপ আমাকে তার জ্যাকেটে জড়িয়ে আমার ফ্ল্যাটে ড্রপ করে এসেছিল । অথচ আমার কথাগুলো আমি সেদিন শেষ করতে পারিনি । সাদমান আমার কাছে যে সত্য ভালবাসার গল্প জানতে চেয়েছিল , সেই ভালবাসার অকল্পনীয় মৃত্যুকে আগলে রেখে আমি কিভাবে বেঁচে আছি – সেই গল্প আমার ওকে বলা হয়নি । আমি হয়ত ড্রাকুলার মতই একাকী জীবন্মৃতের জীবন বেছে নিয়েছিলাম । আমাকে শুধুমাত্র আমার হাতে ছেড়ে গিয়ে নির্বাণও হয়ত ভাল কাজটাই করেছিল । এইতো - নিজেকে নিয়ে আমি এখন ভালই আছি । যেই ক্যারিয়ারের জন্য নির্বান বহুদুরে চলে গিয়েছিল - আমিও সেলফিশের মত সেই ক্যারিয়ারকে কেন্দ্র করেই বাড়ি ছেড়েছি । তবে একটা ব্যাপার কি পাঠক জানেন , নিজেকে এই পৃথিবীতে খুব অযোগ্য মনে হলে অনেক দূরের কোন দ্বীপে কাউকে নিয়ে বেঁচে থাকবার একটা স্বপ্ন থাকতে হয় । খুব অলস দুপুরে পৃথিবীতে যখন বৃষ্টি নামেনা – কল্পনার সেই দ্বীপে তখন প্রিয় মানুষটির সাথে বৃষ্টিতে ভেজা যায় । নির্বাণ চলে যাবার পর থেকে আমার সেই স্বপ্নটা আর নেই । তারপর একটা আকাশ নীল থেকে লাল হল , আর লাল থেকে আঁধার – আর আমি ভুলে গেলাম , আমারও একটা আকাশ ছিল । প্রিয় নির্বান, আমি এখন আর ভুল ভেবে ভুল করিনা । আমি এখন বুঝতে শিখে গেছি , হালকা রঙের আলতো রোদও বরফ নদীর মত শীতলতা ছড়াতে পারে । চাইলেও তুমি আমাকে আর রংধনু দেখাতে পারবেনা । আমার আকাশে এখন আর কোন বৃষ্টি নেই , আমার সব না পাওয়াগুলো এখন শুভ্র - ঠিক তুষারের মতন । আমার চারপাশের পৃথিবীটা ছোট হতে হতে আমার জানলার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, আমিও সেই জানলার পাল্লাটা নামিয়ে দিয়েছি চিরদিনের জন্য । নির্বাণ, আমিতো চিরকাল আঁধার ভালবেসেছি - আলোতে আমার কেমন করে পোষাবে ? আমার সেই আঁধারে সাদমান একটু একটু করে আলো জ্বালিয়ে আসছে অনেকদিন ধরে । আমি ওকে আগে কোনদিন বলিনি আমার একটা গল্প আছে । এখানে আসবার পর আমি যখন সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতাম , এই ছেলেটা তখন আলোর মত ঝলমল করা হাসিমুখ নিয়ে আমার পাশে বসে থাকত । প্রথমদিকে আমি বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলতাম , “সাদমান , আপনি যে আমার পাশে বসে থাকেন – একটুও মানায় না , জানেন সেটা ?” সাদমান ফাটা বেলুনের মত চুপসে গিয়ে বলত , “ তুমি এত রেসিস্ট – শুধুমাত্র গায়ের রঙ ফর্সা না বলে তুমি আমাকে বেমানান বললে ?” “ আপনি কি ইচ্ছে করেই এমন করেন ? এত হাসিখুশি একটা মানুষ হয়ে আমার মত বোরিং পাবলিকের সাথে কি করে মিশছেন ?” “ আমার ভাল লাগে – আমি কি করতে পারি ?” আমি সাদমানের এই অসম্ভব ইনোসেন্ট ডায়লগে আটকা পড়ে যাই । সেটাই তো – আমরা মানুষরা বড় অসহায় ; আমাদের ভাল লাগে – আমরা কি করতে পারি ? সাদমানকে তারপর থেকে আমি আর “না” করতে পারিনি । তার ভাল লাগে আমার সাথে থাকতে – আর এই ভাল লাগার স্বীকৃতি আমি যদি নাও দিতে পারি , তবুও সে এভাবেই থেকে যাবে । তার হয়ত এভাবে বাঁচতে পেরেও ভাল লাগবে , কে জানে ? কিন্তু সেদিনের সেই সন্ধ্যায়, আমাকে বাসায় রেখে আসবার পরপর দুই সপ্তাহ – ছেলেটা যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেল । আমার গল্পে ওর কি আঘাত লেগেছে ? আমার মন খারাপ হলে আমি আমার বাসার কাছে ছোট্ট একটা পাহাড়ে চলে যাই । উঠতে পারা যায় এরকম মোটামুটি একটা উচ্চতায় গিয়ে আমি লম্বা হয়ে শুয়ে থাকি । কখনো চিৎকার করি, আর বাকিটা সময় ছবি আঁকি । আমাকে ফলো করে করে সাদমান একদিন চলে এসেছিল এখানে । আমি বিরক্ত হয়ে ওকে চলে যেতে বলায় ও কাচুমাচু করে বলেছিল , “ মনে কর , সাদমান কোন মানুষ না – সাদমান একটা পাহাড় । কোন ফাংশান নেই । থাকি ?” আজকে কাল আকাশের নিচে শুয়ে থেকে এই কথাটা মনে হতেই ফিক করে হেসে ফেলি আমি । পাশে তাকিয়ে সাদমান নামের সেই পাহাড়টিকে দেখার খুব ইচ্ছে হল আমার । মানুষের মন – কি বিচিত্র একটি জিনিস ! কোইন্সিডেন্স কিনা জানিনা , ঠিক মিনিট পাচেক পরেই আমার মোবাইলে সাদমানের একটা কল এলো । আমি ফোন রিসিভ করতেই সে আলতো গলায় বলল , “ অবনীল , আমি তোমার কাছ থেকে একটু সময় চাইতে পারি ? তোমাকে একটা গল্প বলার ছিল ।” আমি আমার নিঃশ্বাস আটকে বললাম, “ সাদমান , আমি তোমাকে দেখতে চাই ।“ সাদমান যখন আমার পাশে এসে বসল , আমি বুঝতে পারলাম – এই সাদমানকে আমি আগে কোনদিন দেখিনি । আমি তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরেই ও একটু ইতস্তত করে বলল, “ আমি ঠিক আছি । আমি...” আমি চোখ ফিরিয়ে নিয়ে বললাম, “ গল্পটা ?“ সাদমানের দৃষ্টি হঠাত করে কোথায় যেন চলে গেল , তারপর আমার দিকে না তাকিয়েই ও বলতে শুরু করল - একজন সাদমানের গল্প , একজন অবনীল কিংবা একজন নির্বানের গল্প । “ আমি যখন আন্ডারগ্র্যাড কোর্স শেষ করলাম , তখন একটা ফ্যামিলি ট্যুরে দেশে গিয়েছিলাম দুই মাসের জন্য - আব্বুর বেস্ট ফ্রেন্ডের বাসায় ছিলাম সেই সময়টা । সপ্তাহ দুয়েক যেতেই আমি লক্ষ্য করলাম , আমার ছোটবোন সুহা কোন একটা ব্যাপারে কেমন যেন বিহেভ করছে। প্রথমটায় টিনেইজ মেন্টালিটি ভেবেই উড়িয়ে দিচ্ছিলাম , কিন্তু পরে বুঝতে পারি প্রবলেমটা আসলে অন্যকিছু । প্রথমবারের মত দেশে বেড়াতে এসে সুহা প্রেমে পড়ে গিয়েছিল বাবার বন্ধুর ছেলের উপর । আমি গোপনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ছেলেটি আসলে একটা রিলেশানে আছে । ওর নাম ছিল নির্বান । অবনীল নামের একটি মেয়ের সাথে তার রিলেশান ।“ আমি তখনো আঙ্গুল দিয়ে মাটির উপর নকশা কেটে যাচ্ছি । সাদমান যখন এইটুক বলে থেমে গেল , আমি একবারের জন্যেও বিচলিত না হয়ে বললাম , “ চুপ থেকোনা , সাদমান। আমি শুনছি ।“ “ আমি যখন সুহাকে ডেকে সত্যটা বললাম – সুহা বলল , এই অনুভূতিকে সে ধরে বসে থাকবেনা । আমি নিশ্চিন্ত হলাম আর এরই মাঝে আমাদের ফিরে যাবার সময়ও হয়ে এলো । ফিরে এসে সবাই সবার মত ব্যস্ত হয়ে গেলেও আমি লক্ষ্য করলাম, সুহা আর আগের মত নেই । সে যদিও বুঝাতে চাচ্ছে তার সব ঠিকঠাক , কিন্তু আমি জানতাম – তার আসলে কিছুই ঠিক নেই । তার পড়াশুনা , খাওয়া – সবকিছুই ব্যালেন্স হারাতে লাগল । একদিন মাঝরাতে ওর সুইসাইড এটেম্পট এ আমি ভাগ্যক্রমে উপস্থিত হয়ে যাওয়াতে ওকে বাঁচাতে পারলাম । আমার কাছে ধরা পড়ে যাওয়ায় সুহা বলতে বাধ্য হল , সে আর থাকতে পারছেনা । নির্বানের সাথে তার মেসেঞ্জারে কন্ট্যাক্ট হয় । সে নাকি ওকে তার লাভারের ছবিও দেখিয়েছে । ওর জন্য এতকিছু মেনে নেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে । আমি হতভম্ব হয়ে সুহার দিকে তাকিয়ে থাকি – ওকে এভাবে হয়ত কেউ কোনদিন কাঁদতে দেখেনি । সেদিন ওর কান্না দেখে আমি প্রচন্ড বাজে একটা ডিসিশান নিই – আমি ঠিক করি , যা কিছুই হয়ে যাক না কেন – নির্বানকে আমি সুহার কাছে নিয়ে আসব । “ “ আর তারপর নির্বানের সাথে আমার ফ্রেন্ডশিপ – ওকে দেশের বাইরে আনার ব্যাপারে যত প্ররোচনা দেয়া যায় সবটাই আমি করতে লাগলাম দিনের পর দিন । প্রথমদিকে ওর খুব একটা আগ্রহ ছিল তা নয় , কিন্তু ভার্সিটিতে ওর রেজাল্ট যখন মনমত হতে লাগল না , তখন ও আস্তে আস্তে ডিসিশান বদলাতে শুরু করল । ওর ডিসিশান যখন প্যারেন্টস পর্যায়ে চলে গেল , তখন আমাদের দুই ফ্যামিলি মিলে ওর ডিসিশানের রোডওয়ে আরেকটু ইজি করে দিল । আর সেই ইজি রোডওয়েটা ছিল – সুহার সাথে নির্বানের বিয়ে ।“ এতটুকু শুনেই চোখ বন্ধ করে ফেলি আমি । দাঁতে দাঁত চেপে বলি , “ আমার আর শুনতে ইচ্ছে করছেনা ,সাদমান ।“ সাদমান মাথা নেড়ে বলল , “ না, আমাকে বলতে হবে । অবনীল, সেই বিয়ের রাতেই আমি প্রথম বুঝতে পারি , সুহার জন্য আমি আরেকটা মেয়ের সাথে কি ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি ! আমার সেই অপরাধবোধ আমাকে প্রতিটা দিন শাস্তি দিতে থাকে । প্রায়শ্চিত্ত করব বলে আমি অবনীলকে খুঁজে বের করি । দূর থেকে তাকে যখন আসতে দেখতাম , আমার ইচ্ছে করত – আমি দুই হাত জোড় করে তার কাছে ক্ষমা চাই । কিন্তু আমি পারতাম না । শেষ পর্যন্ত মেসেঞ্জারে তার সাথে কন্ট্যাক্ট করি । অবনীল , আমি আমার পরিচয় তোমাকে দিতে পারিনি । কিন্তু তোমার কি সেই মানুষটিকে মনে আছে যার সাথে কখনো দেখা হবেনা বলে তুমি তাকে তোমার সব কথা বলেছিলে ? আমি জানিনা , তুমি ভুলে গেছ কিনা – কিন্তু ততদিনে আমি আরো একটি অন্যায় করে ফেলি । আমি বুঝতে পারি , আমার এক জীবনের ভাল লাগা আমি তোমাকে দিয়ে ফেলেছি ।“ “যখন সবকিছু তোমাকে বলতে যাব , ঠিক তখনই ভাগ্য তোমাকে নিজে থেকেই আমার দুয়ারে এনে দিল । তুমি জানালে , তুমি দেশের বাইরে আসছো আর যে জায়গায় আসার কথা বললে আমি ঠিক সেখানেই থাকি । আমার অপরাধী মন আবার চাইল , সব নতুন করে শুরু করতে । আমি মেসেঞ্জার অফ করে দিলাম – তোমাকে সরাসরি এপ্রোচ করলাম নতুন পরিচয়ে । কিন্তু দেখ , তবুও তুমি আমাকে ভালবাসতে পারলে না । তোমার অজান্তেই আমি তোমার সমস্ত দুঃখের কারন – অথচ তুমি সেটা বুঝতেও পারলে না । কিন্তু আমি আর তোমাকে ঠকাতে পারলাম না, অবনীল । এই মুহুর্তে তোমার সবচেয়ে ঘৃণার মানুষটি যদি আমি হয়ে থাকি , আমি একটুও অবাক হব না । কিন্তু যেভাবেই হোক , I should end it.. আমি জানিনা আমার অ্যাটোন্মেন্ট কি হতে পারে – দুঃখিত বলবার যোগ্যতাও আমার নেই ,অবনীল ।” অনেক্ষন চুপ থাকবার পর আমি শুধু বলেছিলাম , “ সাদমান , অনেকটুকু অনুভূতির পরেও একটা জীবনে একসাথে থাকাটা সবসময় সম্ভব হয়না । তোমার অপরাধ কতটুকু আমি জানিনা – আমি শুধু জানি , আমাকে আকড়ে রাখবার মত ভালবাসা তার কাছে ছিল না । নির্বান ওর বর্তমানের জন্য অনেক বেশি দাম দিয়েছে , আর সেই দামটা ও নিজের ইচ্ছায় দিয়েছে । ওর ইচ্ছে না থাকলে তোমার কথা ও শুনত না !” সাদমান কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল, আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেখি কোন এক অচেনা চাঁদের আলোয় ওর চোখের জল চিকচিক করছে । একটা বিশাল শ্বাস নিয়ে ও বলল , “ তুমি কখনো তোমার কল্পনায় আমাকে দেখোনি , তাইনা অবনীল ? আজকের পর থেকে ওয়ান পারসেন্ট অফ সামথিং নামক চান্সটাও আমার আর নেই , তাইনা ? আমি তোমাকে আর কোনদিন বোঝাতে পারব না , তুমি আমাকে ভালবাসতে না পারলেও আমার কোন ক্ষতি নেই । আমি শুধু তোমার পাশে থাকতে চেয়েছিলাম । যার কাছ থেকে আমি সব কেড়ে নিয়েছিলাম , তার কাছেই আমার অস্তিত্ব পড়ে থাকল । অবনীল , তুমি কি আমাকে ক্ষমা করবে ? তুমি কি আমাকে মনে রাখবে ?“ আমি ওর কথা অসমাপ্ত রেখেই চলে এসেছিলাম । ছেলেটা আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল , আর আমি ওকে অপরাধী না ভাবতে পারার অপরাধে দূরে চলে গিয়েছিলাম । অনেক দূরে । সেদিনের পর সাদমানের সাথে আমার যেদিন আবার দেখা হল – তার মাঝে কেমন করে যেন কেটে গিয়েছিল সাড়ে তিন বছর । আমরা দুজনই তখন ত্রিশের ঘরে । ছেলেমানুষি ভালবাসায় হাস্যকর শিকারে পরিনত হয়ে হাহাকার করবার বয়স আমাদের আর নেই । সেই একই পাহাড় – আগেও যেমন ছিল , এখনো তেমনই আছে । জানিনা কোন বিশ্বাসে আমি ভেবে নিয়েছিলাম , সাদমানও একই রকম থাকবে । যে সত্যিকারের ভালবাসায় আমার একটুও বিশ্বাস ছিল না , আমি ধরে নিয়েছিলাম সেই ভালবাসা নিয়ে সাদমান আমার অপেক্ষায় থাকবে । সে অপেক্ষায় ছিল । -" সাদমান, এই পাহাড়টিকে মনে রেখেছিলে ?" -" মনে রাখা ? আমারতো শুধু এই পাহাড়টাই ছিল, অবনীল। " -" আর আমি ভেবেছিলাম , ভুলে যাব । ভেবেছিলাম - একদিন যদি আমাকে ছাড়াই তোমার দিন ভাল যায় , একদিন যদি তোমাকে ছাড়াই আমার ভোরের স্বপ্নগুলো দিন হয়ে যায় - আমি এখানে আসব । তোমাকে আয়োজন করে মিস করব ।" -“ তারপর ?” -“ পারিনি । It hurts, সাদমান ! যতটা আমি নিতে পারব বলে ভাবতাম , তার চেয়ে কষ্টটা অনেক বেশি ছিল ।” -" একটা কথা জানো অবনীল ? মানুষ চাইলেই যেমন ভালবাসতে পারেনা , তেমনি চাইলেই ভুলে যেতে পারেনা । খুব বেশি হলে হয়ত অভিনয় করতে পারে ।" -“ তুমি করোনি কেন – অভিনয় ?” “ জানিনা । তোমার অপেক্ষায় থাকতে আমার ভাল লাগত – আমি কি করতে পারি ?” ভোরের প্রথম আলোয় হঠাত করে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার দুই চোখ ভেসে যাচ্ছে । সাদমান , এতগুলো দিন পরে - আমি আবার নতুন করে ভালবাসতে শিখলাম কেন, বলতে পারো ? - Eva


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now