বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
শহরে হঠাৎ এক লেখকের বই ঝড়ের মতো বিক্রি হতে লাগল। প্রথমে তিনি ভাবলেন, এ তো স্বাভাবিক, ভালো লিখেছি বলেই এমন হচ্ছে। কিন্তু ঝড় যখন ঝড়ো হাওয়ায় পরিণত হলো, তখন তিনি টের পেলেন—এটা আর শুধু লেখা নয়, এটা বই বিক্রির মহাযজ্ঞ।
তিনি দিনে একবার, রাতে একবার লিখতেন। তারপর ভেবেছিলেন, দু’হাতে লিখলে উৎপাদন দ্বিগুণ হবে। হাতে-কলমে পরীক্ষা করেও দেখলেন, হ্যাঁ—ডান হাত যখন কবিতার বই লিখছে, বাম হাত তখন উপন্যাস রচনা করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ডান হাতে প্রেমের কবিতা লিখতে গিয়ে বাম হাতে হঠাৎ গদ্যের ভেতরে লিখে ফেললেন—“তোমার চোখে বসন্তের মেঘ।” পাঠকরা পরে সেটা পড়তে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেলো—উপন্যাসের চরিত্র কি প্রেমে পড়ল, না কি লেখক নিজেই পড়লেন!
কিছুদিন পর বুঝলেন, এমন চললে চলবে না। তাই ভাড়াটে লেখক ভাড়া করলেন। কারও হাতে তুলে দিলেন উপন্যাস, কারও হাতে দিলেন ভ্রমণকাহিনি, আবার কারও হাতে কবিতার খাতা। শুধু ভূমিকাটা নিজে লিখতেন। তিনি ভাবতেন—“যত বই-ই হোক, শুরুতে আমার নামটাই থাকবে, তাহলেই পাঠকরা বিশ্বাস করবে।”
বইমেলায় তার স্টলে পাঠকের ভিড় দেখে তিনি একদিন গর্বভরে ছেলেকে বললেন—“তুমি কি আমার সর্বশেষ বইটি পড়েছো?”
ছেলে কপাল কুঁচকে হেসে উত্তর দিলো—“আপনি নিজে কি ওই বইটি পড়েছেন, বাবা?”
বাবা তখন থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলেন। যেন নিজের লেখা বই নয়, পুলিশের চার্জশিট হাতে এসেছে। তিনি তো আসলেই বইটা পড়েননি! লেখার সময়ই পাননি। আসলে তিনি লিখেছেন শুধু ভূমিকা, বাকি অংশ ভাড়াটে লেখক লিখে দিয়েছেন।
“আরে বাবা, আমি তো লিখেছি, পড়ব কেন?” তিনি জোরে বললেন, কিন্তু কণ্ঠে সেই আত্মবিশ্বাস নেই।
ছেলে মুচকি হেসে বলল—“তাহলে তো পরীক্ষা হলে উত্তরপত্র জমা দিয়েই বেরিয়ে আসা ছাত্রের মতো অবস্থা। প্রশ্ন কি ছিলো, উত্তর কি লিখেছো—তা জানাই হলো না!”
বাবা গম্ভীর মুখে বললেন—“তুই বুঝিস না। লেখকের কাজ হলো ভাবনা ছড়ানো। পাঠকের কাজ হলো পড়া। আমি লিখেছি, তারা পড়েছে। এখানে আমার পড়া বাধ্যতামূলক নয়।”
ছেলে আবার হাসলো—“তাহলে পাঠকের কাজটাও ভাগাভাগি করে দিতে পারেন না? যেমন লেখক ভাড়া করেছেন, পাঠকও ভাড়া করুন। কেউ আপনার হয়ে পড়বে।”
বাবা চুপ মেরে গেলেন। আসলেই তো, যদি ভাড়াটে পাঠক রাখা যেতো! তখন আর ছেলেকে জবাব দিতে হতো না।
পরদিন তিনি বাজারে গেলেন। একজন বইপ্রেমীকে দেখে বললেন—“ভাই, একটা কাজ করবেন? আমি বই লিখি, কিন্তু পড়ার সময় পাই না। আপনি যদি ভাড়ায় আমার বইগুলো পড়ে আমাকে রিভিউ দেন, কেমন হয়?”
লোকটা অবাক হয়ে বললো—“মানে? আপনি লেখক হয়ে নিজের বই পড়েন না?”
লেখক হেসে বললেন—“না, আমি শুধু লিখি। পড়া কাজটা আপনারা করেন। তবে আপনার পড়াটাকে আমি ভাড়া হিসেবে নেব।”
লোকটা ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিলো—“আপনার বুদ্ধি দেখছি, সেলস ট্যাক্সের মতো জটিল!”
এরপর লেখক বাড়ি ফিরে আবার ভাড়াটে লেখকদের লেখার দায়িত্ব দিলেন। এবার তিনি শুধু ভূমিকা নয়, সমাপনী অংশও নিজে লিখলেন। কারণ, ছেলে আবার জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবেন—“দেখ, আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলাম।”
কিন্তু সমস্যা হলো, মাঝের অংশ পড়েননি বলে ভূমিকায় লিখলেন—“এই বইয়ের কাহিনি শুরু হয়েছে সূর্যের উদয় দিয়ে।” সমাপ্তিতে লিখলেন—“শেষ হলো চাঁদের আলোয়।” আর মাঝখানে ভাড়াটে লেখক লিখে ফেললো—“হঠাৎ বজ্রঝড়ে সব চরিত্র উড়ে গেলো।” ফলে বই পড়ে পাঠকরা বিভ্রান্ত হলো—“এ কি, শুরুতে সূর্য, শেষে চাঁদ, আর মাঝখানে ঝড়! এ তো আবহাওয়ার রিপোর্ট।”
ছেলে আবার খোঁচা দিয়ে বললো—“বাবা, এবারও কি পড়েছেন?”
বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন—“শোন, পাঠক যদি পড়ে খুশি থাকে, তাহলে লেখক পড়লো কি পড়লো না, সেটা ইতিহাসের বিষয় নয়।”
ছেলে হেসে বললো—“তাহলে পরের বইয়ের নাম দিন—‘আমি পড়িনি, আপনি পড়ুন!’”
বাবা হঠাৎ থমকে গেলেন। নামটা খারাপ শোনাচ্ছে না!
অবশেষে তিনি বুঝলেন, দুশ্চিন্তা নয়, হাসিই হলো লেখকের আসল সম্পদ। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন—পরের বইয়ে ভূমিকায় লিখবেন—“প্রিয় পাঠক, আমি এই বইটা লিখেছি, কিন্তু পড়িনি। তাই আপনারা পড়ার সময় যদি কোনো অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পান, সেটা আমার নয়, ভাড়াটে লেখকের অবদান। তবে সব দায়ভার আমার—কারণ নামটা আমার।”
এভাবে বই, লেখক আর পাঠকের মধ্যে তৈরি হলো নতুন ধরনের রম্য চুক্তি। পাঠকের হাসিতে বিক্রি বাড়লো, ছেলের খোঁচায় লেখক সতর্ক হলো, আর ভাড়াটে লেখকরা পেলো নতুন কাজের বাজার।
শেষমেশ লেখক নিজেও একদিন চুপচাপ নিজের বই খুলে পড়লেন। পড়তে পড়তে হাসি চলে এলো—“আরে, এত মজা করে লিখেছে কে?” পরে মনে পড়লো, ভাড়াটে লেখক! তখন তিনি মনে মনে বললেন—“তবে আমি-ই ভাগ্যবান, কারণ নামটা তো আমার।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now