বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

উৎসবের ফুল ও গরিবের গণতন্ত্র

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X “উৎসবের ফুল ও গরিবের গণতন্ত্র” মোহাম্মদ শাহজামান শুভ. আমাদের গ্রামে গাঁদা ফুলের আলাদা কোনো নাগরিকত্ব নেই, তবু সে সব নাগরিকের চেয়ে বেশি উপস্থিত। সে জন্মায় উঠোনে, রাস্তার ধারে, স্কুলের বাগানে, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের পেছনের অবহেলিত জমিতেও। গোলাপের মতো তার কাঁটা নেই, অর্কিডের মতো তার অহংকার নেই, টিউলিপের মতো তার ভিসা লাগে না। সে একেবারে দেশি—মাটি, ঘাম আর রোদে বেড়ে ওঠা এক অনাড়ম্বর সৌন্দর্য। তাই কেউ তাকে বলে “গরিবের ফুল”, কেউ বলে “পূজার ফুল”, কেউ ইংরেজি উচ্চারণে একটু গলা বাঁকিয়ে বলে “মেরিগোল্ড”—যেন বিদেশি পাসপোর্ট পেলে ফুলেরও সম্মান বাড়ে। আমাদের গ্রামে নির্বাচন এলে গাঁদা ফুলের কদর বেড়ে যায়। প্রার্থীরা মালা গলায় পরে, মঞ্চে ওঠে, বক্তৃতা দেয়—“এই ফুল যেমন সবার, আমিও তেমনি সবার।” গাঁদা তখন মনে মনে হাসে। কারণ সে জানে, ভোটের পর মঞ্চের পেছনে ফেলে রাখা তার মালাগুলো শুকিয়ে যাবে; ঠিক যেমন শুকিয়ে যায় প্রতিশ্রুতির পাপড়ি। গোলাপ হলে হয়তো কাঁচের ফুলদানি পেত, কিন্তু গাঁদা তো “গরিবের ফুল”—তার স্থান মাটিতেই। আমাদের পাশের বাড়ির রহিম কাকা গাঁদা চাষ করেন। তিনি বলেন, “এই ফুলে লাভ কম, কিন্তু লোকসানও কম।” তার দর্শনও তেমন—স্বপ্ন ছোট রাখলে ভাঙার শব্দও ছোট হয়। কাকার বাগানে আফ্রিকান গাঁদা আর ফ্রেঞ্চ গাঁদা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। নাম শুনে মনে হয় তারা বিদেশি দূতাবাস থেকে এসেছে, কিন্তু বাস্তবে তারা রহিম কাকার উঠোনেই জন্ম নেয়, স্থানীয় মাটিতে শেকড় গেঁথে। আমরা তাদের নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা করি—“আফ্রিকানটা বড়, ফ্রেঞ্চটা ঝোপালো”—যেন জাতিসংঘের বৈঠক চলছে। অথচ শেষমেশ দু’জনেই একই মালায় গাঁথা পড়ে। আমাদের স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলে ছাত্ররা মঞ্চ সাজায় গাঁদা দিয়ে। প্রধান শিক্ষক বক্তৃতা দেন—“শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।” মেরুদণ্ডের ওপর তখন গাঁদার মালা। ছাত্ররা পুরস্কার পায়, হাতে গাঁদার তোড়া। দুই দিন পর সেই তোড়া ডাস্টবিনে। শিক্ষা থাকে বইয়ে, ফুল থাকে আবর্জনায়। গাঁদা কখনো অভিযোগ করে না; তার নীরবতা যেন রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার। পূজার সময় গাঁদার ব্যস্ততা তুঙ্গে। হিন্দু বাড়িতে মালা, মসজিদের সামনে মিলাদে সাজসজ্জা, বিয়েবাড়িতে গেট—সবখানে সে। সে ধর্মনিরপেক্ষ; কারো বিশ্বাসে সে বাঁধা পড়ে না। কিন্তু মানুষ তাকে ভাগ করে—“এটা পূজার ফুল”, “ওটা অনুষ্ঠানের ফুল।” গাঁদা মনে মনে ভাবে, “মানুষের ধর্ম আলাদা, আমার তো শুধু রোদ-জল লাগে।” তবু তার গায়ে লেগে থাকে উৎসবের গন্ধ, আর উৎসব শেষে থাকে ধুলো। আমাদের শহরের এক কবি আছেন, তিনি গোলাপ নিয়ে দীর্ঘ কবিতা লেখেন—“রক্তিম পাপড়ির বিপ্লব”—ইত্যাদি। গাঁদা নিয়ে তার তেমন আগ্রহ নেই। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “গাঁদা নিয়ে লিখবেন না?” তিনি বললেন, “গাঁদা খুব সাধারণ।” আমি ভাবলাম, সাধারণের ভেতরেই তো অসাধারণ লুকিয়ে থাকে। গোলাপের কাঁটা নিয়ে দার্শনিক হওয়া সহজ, কিন্তু গাঁদার সরলতা নিয়ে ভাবা কঠিন। কারণ সরলতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। গ্রামের এক প্রভাবশালী নেতা একবার ঘোষণা দিলেন—“গাঁদা হবে আমাদের দলের প্রতীক।” সবাই হাততালি দিল। পরদিন বাজারে গাঁদার দাম বেড়ে গেল। রহিম কাকা খুশি, কিন্তু তিনিও জানেন—রাজনীতির প্রেম বসন্তের মতো; মৌসুম শেষে ঝরে যায়। কয়েক মাস পর প্রতীক বদলে গেল। গাঁদা আবার আগের দামে। যেন গণতন্ত্রের বাজারে তারও দর ওঠানামা করে। শহরের এক অভিজাত বিয়েবাড়িতে একবার দেখলাম, গোলাপ, লিলি, অর্কিড—সব বিদেশি ফুলে সাজানো। গাঁদা নেই। আমি আয়োজককে জিজ্ঞেস করলাম, “গাঁদা রাখেননি কেন?” তিনি হাসলেন, “ওটা খুব কমন।” কমন মানে?—যা সবার কাছে পৌঁছায়, তাই কি কম মর্যাদার? গাঁদা হয়তো দরিদ্রের উঠোনে ফোটে, কিন্তু তার রং কি কম উজ্জ্বল? বরং সে বেশি সহনশীল—রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, তবু হাসে। একদিন রহিম কাকার বাগানে বসে ভাবছিলাম, গাঁদা যেন আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা তাকে ব্যবহার করি—মালা গাঁথি, সাজাই, ছবি তুলি—তারপর ফেলে দিই। সে প্রতিবাদ করে না, ধর্মঘট ডাকে না, টকশোতে যায় না। তার নীরবতাই তার শক্তি। হয়তো সে জানে, মানুষ তাকে যতই “গরিবের ফুল” বলুক, উৎসবের দিন তার দরকার হবেই। আমাদের এক তরুণ উদ্যোক্তা সিদ্ধান্ত নিলেন—গাঁদা দিয়ে পারফিউম বানাবেন। নাম দিলেন “উৎসব এসেন্স।” বিজ্ঞাপনে লিখলেন—“গাঁদার গন্ধে ফিরে পান শৈশব।” শহরের মানুষ কিনল, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিল। গাঁদা তখন নতুন পরিচয়ে—স্টার্টআপের নায়ক। কিন্তু রহিম কাকার বাগানের গাঁদা একই রকম; সে জানে না ব্র্যান্ডিং কী জিনিস। তার কাজ শুধু ফোটা। শেষমেশ আমি বুঝলাম, গাঁদা আসলে এক প্রকার দার্শনিক। সে আমাদের শেখায়—মর্যাদা নামের ওপর নির্ভর করে না; কাজের ওপর নির্ভর করে। আফ্রিকান হোক বা ফ্রেঞ্চ, শেষমেশ সে মাটিতেই মেশে। গোলাপকে “ফুলের রানি” বলা হয়, কিন্তু রানিরও তো রাজ্য লাগে। গাঁদার রাজ্য পুরো গ্রাম—স্কুল, মসজিদ, মন্দির, মেলা, নির্বাচন, বিয়ে, শোকসভা—সবখানে সে সমান। তাই আমি তাকে আর “গরিবের ফুল” বলি না। আমি বলি—“গণতন্ত্রের ফুল।” কারণ সে সবার, সবার জন্য, সবার হাতে। উৎসবের দিন সে মঞ্চে, আর সাধারণ দিনে মাটিতে। তার জীবনটাই এক স্যাটায়ার—আমরা যাকে ছোট বলি, তাকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি; যাকে সাধারণ বলি, তারই উপস্থিতি সবচেয়ে ব্যাপক। গাঁদা ফোটে, ঝরে, আবার ফোটে। আমাদের সমাজও তেমন—প্রতিশ্রুতি ফোটে, হতাশা ঝরে, আবার আশা জন্মায়। গাঁদা শুধু নীরবে দেখে যায়। হয়তো একদিন আমরা বুঝব, যে ফুলকে আমরা “গরিবের” বলি, সে-ই আসলে আমাদের উৎসবের আসল রঙ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ উৎসবের ফুল ও গরিবের গণতন্ত্র

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now