বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
উপলব্ধি
.
বাজার করা শেষ হলে হাটতে হাটতে মাছ বাজারে গেলাম মাছ কেনার জন্য। বাজারে গিয়ে দেখি বড় একটা পাঙাশ মাছ। জেলে কে ওজন দিতে বলায় জেলে ওজন দিয়ে বলল ২.৫ কেজি। আমি মাছের দাম জিজ্ঞাস করলাম জেলে উত্তর দিলো ৩৭৫ টাকা। বললাম একটু কমিয়ে রাখা যায় না? জেলে বলল না ভাইজান বড় মাছ তাই দাম একটু বেশী। আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম ভাল করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ব্যাগে ঢুকিয়ে দাও। জেলে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলো। মাছের দাম চুকিয়ে আবার হাটাতে হাটতে বাজার থেকে বের হয়ে আসলাম। একটা রিক্সা নিয়ে বাড়ির ঠিকানা বলে দিলাম। রিক্সায় উঠে বসার পর আবার মাছের দিকে চোখ গেল। মাছের দিকে তাকিয়ে মনটা ভরে গেলো। মেয়েটা মাছ দেখে অনেক খুশি হবে। আগে আমি পাঙাশ মাছ খেতাম না এখন খাওয়া শিখে গেছি। আমার মেয়ের সবচেয়ে পছন্দের মাছ। মাত্র তিন বছর বয়স ওর এর মধ্যেই পছন্দ অপছন্দ খুব শিখে গিয়েছে। বাজারে আসার সময় দৌড়ে এসে কোলে উঠে বলল আব্বু আব্বু আমাল জন্যু পাঙা মাম আমবা টিক আছে? আমি ওর গালে চুমু দিয়ে বলেছিলাম আচ্ছা আম্মু আমি তোমার পাঙা মাম এনে দিব। আমার কথা শুনে ও আমার মুখে একটা চুমু দিয়ে বলেছি তুমি আমাল ভাল আব্বু। কথা বলা শেষ হলেই আবার কোল থেকে নেমে ওর মায়ের কাছে চলে গিয়েছিল। আমি ওকে টাটা দিয়ে যখন গেট আটকাতে যাব তখন আবার দৌড়ে এসে বলল আব্বু আব্বু সাব্বানে দেও। আমি বুঝলাম আমাকে সাবধানে যেতে বলছে। এইটুকু মেয়ে কি এতো বোঝে? কী এতো চিন্তা সাবধানে যেতে বলে। ওর কথা শুনে আমার চোখের কোণে কিছু জল জমা হয়েছিল। আমার মায়ের কথা মনে পরে গিয়েছিল বাসায় থেকে কোথাও গেলে মা সবসময় বলতো সাবধানে যাস বাবা।আবার কলেজ থেকে ফিরতে দেরী হলে রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতো। তখন ফোনের এত কম দাম ছিল না। গুটি কয়েক মানুষ ফোন ব্যবহার করতো। আমাকে দেখার পর মায়ের মুখে হাসি ফুঁটে উঠতো। আমি মাকে বলতাম মা আমি কী এখনো ছোট আছি? আমার জন্য এতো চিন্তা করতে হবে। মা বলতো যখন ছেলে মেয়ে হবে তখন বুঝবি। আসলে মা ঠিক কথাই বলতো এখন আমি সব বুঝতে পারি মেয়ের একটু ঠাণ্ডা লাগলেই আমি চিন্তিত হয়ে পড়ি। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বাজারে এসে ছিলাম। মা যদি এতদিন বেঁচে থাকতো তাহলে মেয়ের মতই আমার জন্য মা সবসময় চিন্তিত থাকতো।
.
যেদিন বউয়ের প্রসব বেদনা উঠেছিল সেদিন খুব আগ্রহ নিয়ে ছেলে সন্তানের অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু কাকির মুখে যখন শুনেছিলাম মেয়ে হয়েছে সেদিন বউকে খুব বকে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম হতভাগী একটা ছেলে জন্ম দিতে দিতে পারিসনি? মেয়ে দিয়ে আমি কী করব? মেয়ে কী বংশেরবাতি জ্বালাবে? বউ আমার কোন কথার উত্তর দিয়েছিল না। শুধু আঁচলের কোণা দিয়ে চোখের পানি মুছেছিল। মেয়ে হওয়ার কথা শুনে আমার শ্বাশুড়ি ছুটে এসেছিল আমার বউয়ের কাছে। এদেশের নিয়ম অনুযায়ী মেয়েরদের প্রথম সন্তান হয় তার বাবার বাড়িতে। নিয়ম অনুযায়ী আমার বউ বাবার বাড়ি যেতে চেয়েছিল আমি যেতে দেইনি। বলেছিলাম আমি কী ভিক্ষা করি নাকি আমার কোন দিক কম আছে? বিয়ে দেওয়ার সময়তো সরকারী চাকুরে ছেলের সাথেই বিয়ে দিয়েছিল তো এখন বাবার বাড়ি যাবে কেন? বউ কাছুমাছু গলায় বলেছিল না মানে সবাইতো যায় তাই বলছিলাম আচ্ছা ঠিক আছে আমি যাব না। মেয়ে হওয়ায় আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম মেয়ে বউ কারোই বেশী খোঁজ খবর রাখতাম না। মেয়ের জামাকাপড় প্রয়োজনীয় জিনিশ কিছুই আমি কিনেছিলাম না। আমার শ্বশুর মশাই সব কিনে দিয়ে যেতো। আস্তে আস্তে বেড়ে উঠতে লাগলো আমার মেয়ে একবছর বয়স হলে হালকা পাতলা কথা বলতে শুরু করলো। আমাকে দেখলে আব্বো আব্বো বলে ডাক দিতো। আমি অফিস থেকে ফিরলে তাড়াহুড়ো করে হামাগুড়ি দিয়ে আমার কাছে চলে আসতো। আমি ওকে মোটেই পাত্তা দিতাম না। ওর থেকে এড়িয়ে চলতাম সবসময়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অযুহাতে আমার কোলে আসতে চাইতো আমি ওকে কখনো কোলে নিতাম না। আস্তে আস্তে ওর বসয় বাড়তে লাগলো আর আমার প্রতি ওর ভালবাসা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। আমার কাছে ওর সমাগম বেড়ে যেতে লাগলো। আমি ওকে যত এড়িয়ে চলতাম আমার মনে হতো ও আমার কাছে ততো বেশী আসার চেষ্টা করতো। আমি কখনো ওর দিকে ভালভাবে তাকিয়ে দেখতাম না। ওকে বুঝতে চাইতাম না ও কী চায় জানতে চাইতাম না। ওকে বারবার দূরে ঠেলে দিতাম তবুও আমার মেয়েকে আমি কখনো নিরাশ হতে দেখিনি। এত অবহেলা করার পরেও আমার কাছেই চলে আসতো। বাবার প্রতি প্রতিটা মেয়ের এই ভালবাসা মনে হয় সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নির্ধারণ হয়ে থাকে। না হলে প্রতিটা মেয়ে বাবাকে এতটা ভালবাসে কেন? মেয়েটার বয়স তখন দেড় বছর শুক্রবারে জুম্মার নামাজ পড়ে খাওয়া দাওয়া করে বিছানায় শুয়েছিলাম। মেয়ে আমার পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল বউ রান্নাঘরে মনে হয় কোন কাজ করছিল। হঠাৎ করেই মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে কান্না শুরু করে দিয়েছিল। আমি বিরক্তিকর ভাব নিয়ে প্রথম বারের মত ওর দিকে ভাল করে তাকিয়ে ছিলাম। ওর দিকে তাকিয়ে কিছু সময়ের জন্য আমি বোবা হয়ে গেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার মৃত মা আবার ফিরে এসেছে। আমি আচমকা মা ডেকে ওকে প্রথম বারের মতো কোলে তুলে নিয়ে ওর মুখে চুমু এঁকে দিচ্ছিলাম আর চোখের পানি ঝাড়াচ্ছিলাম। মেয়ে আমার কাণ্ড দেখে কান্না থামিয়ে আমার বুকে মুখ গুজে পরেছিল। আমাদের বাপ বেটির মিলন পর্ব শেষ করে যখন দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন দেখতে পেয়েছিলাম বউ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে আমাদের দেখছে আর চোখ চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে।
.
রিক্সা থেকে বাজার নামিয়ে গেটে টোকা মারলাম। কিছুক্ষণ পর বউ এসে গেটের দরজা খুলে দিল। দরজা খোলার পরেই মেয়ে দৌড়ে এসে আমার কোলে উঠলো। আমি একহাত দিয়ে ওকে কোলে তুলে নিলাম। মেয়ে কোলে উঠেই বলল আব্বু পাঙা মাম আনতো? আমি বললাম হ্যাঁ মা আমি তোমার পাঙা মাম এনেছি।বউয়ের কাছে বাজারের ব্যাগ দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আমি টিভির রুমে চলে গেলাম।কিছুক্ষণ টিভি দেখার পর বউ এসে বলল মাছের মাথাটা কাটতে পারছিনা একটু আসবেন? বউয়ের কথা শুনে আমি ওর দিকে গরম চোখে তাকালাম। আমার চোখ দেখে বউ ভয় পেয়ে বলল না মানে মাথাটা অনেক শক্ত কাটতে গেলে বটি সরে যাচ্ছে। এবার মেয়ে কথা বলে উঠলো বলল আব্বু তলো মাম কাতপে। মেয়েকে সাথে নিয়ে এসে মাছের মাথা কাটতে বসলাম আমিও কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। আসলে মাথায় জোড়ে চাপ দিলে বটির পিড়ি থেকে বটি খুলে যাচ্ছে। বউকে বললাম বসে বটিটা আমার দিকে চেপে ধরো। বউ বসে বটি আমার দিকে চেপে ধরল এবার আমি মাথাটা অনেক জোড়ে চাপ মারলাম মাথা কেটে দুইভাগ হয়ে গেল। কিন্তু হাতের ঝুঁক ঠেকাতে পারলাম না হাত গিয়ে লাগলো বটির সাথে ফলে ডান হাতের অনেকাংশ কেটে গেল। বউ তাড়াতাড়ি বটি খুলে আমার হাত চেপে ধরলো আমি বউকে ঝাড়ি দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললাম তোর জন্যই এতো কিছু হলো। দিন দিন খেয়ে খেয়ে ষাঁড় হচ্ছিস একটা মাছের মাথা কাটতে পারিস না? এখন আবার দয়া দেখাতে আসছিস? আরো অনেক কিছু বলে বউকে বকতে লাগলাম। বকার মঝেই দেখি মেয়ে পেষ্ট আর ওর একটা জামা নিয়ে এসে বলছে আব্বু আব্বু পেস্ত নাগিয়ে দামা দিয়ে বেদে নেও নক্ক বন্দ হবে। মেয়ের কাণ্ড দেখে আমি মেয়েকে জড়িয়ে ধরলাম। ভাবতে লাগলাম আমার প্রতি আমার মেয়ের যে ভালবাসা যে কেয়ার এরকম ভালবাসা আমার শ্বশুরের প্রতি আমার বউয়ের নিশ্চয় ছিল।আমার মেয়ে আমার কাছে যেমন রাজকন্যা এমন রাজকন্যাতো আমার বউও ছিল আমার শ্বশুরের কাছে। আমি যেমন চাইনা আমার রাজকন্যাকে কেউ কষ্ট দিক এমনতো আমার শ্বশুরও চায়। আমি যেরকম অন্যের মেয়ের সাথে দুর্ব্যবহার করছি আমার মেয়ের সাথেও কেউ দুর্ব্যবহার করতে পারে। না না এরকম হতে পারে না আমার মেয়েকে কেউ কষ্ট দিতে পারে না। মেয়ে ছেড়ে দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বউকে বললাম কাপড় দিয়ে হাতটা বেঁধে দেও। বউ কাঁপাকাঁপা হাতে আমার হাত বেঁধে দিল। বাঁধা শেষ হলে বউকে বললাম আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।
.
আমার বউ যথেষ্ট সুন্দরী সাথে প্রচণ্ড ধৈর্যশীল। কোনদিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। বিয়ের পর থেকে আমি ওকে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে এসেছি কোনদিন কিছু বলেনি কোন প্রতিবাদ করেনি।কারো কাছে কিছু বলেনি শুধু মুখ বুজে সহ্য করে গেছে। ওকে নরম পেয়ে আমিও ওর উপর উঠে বসেছি। আসলে আমি ওকে দিনে দাসী আর রাতে পতিতা হিসাবে ব্যবহার করেছি। কিন্তু আর না আজ আমার চোখ খুলেছে আমার মেয়ের ব্যবহারে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি আমি কী অন্যায় করেছি। সব বাবার মত ওর বাবা আমাকে বলেছিল বাবা আমার কলিজার টুকরাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম তুমি ওকে দেখে রেখো। সেদিন শ্বশুরের হাত ধরে কথা দিয়েছিলাম কিন্তু তার কথা রাখতে পারিনি। সারাদিন দাসীর মত কাজ করিয়েছি রাতে পতিতার মত যৌন অত্যাচার করেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে ব্যান্ডেজ করে ঔষধ নিয়ে কাপড়ের দোকানে ঢুকলাম। অনেক দেখার কালো রঙের একটা শাড়ী কিনলাম। ফরশা মানুষ কালো শাড়ীতে ভালো মানাবে। কসমিটিকের দোকানে গিয়ে একটা শ্যাম্পুর কৌটা, তেল,কাজল,সাবন আর সব শেষে এক ডজন লাল চুড়ি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। বাড়ি আসতে আসতে এশার আজান দিয়ে দিল। ঘরে ঢুকে দেখতে পেলাম মেয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি ওজু করে নামাজ পড়ে টিভিতে খবর দেখছিলাম। বউ এসে খাওয়ার জন্য দিয়ে গেলো। টেবিলে গিয়ে দেখি বউ ভাত বেড়ে বসে আছে। আমি টেবিলে বসতেই জিজ্ঞাসা করলো ভাত মেখে দিব? আমি বললাম ভাত মেখে দিলে খাবো কি দিয়ে? বউ বলল চামচ আছে। আমি বললাম চামচ দিয়ে খাবো না। আমার কথা শুনে বউ আমার দিকে তাকালো। আমি চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে ওর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে বললাম আমাকে খাইয়ে দিবে পারবে না? বউ আমার দিকে আবার তাকিয়ে থাকলো হয়তো ভাবছে আমার কীভাবে এতো পরিবর্তন হলো? ওর চুপ থাকতে দেখে আমি বললাম কী হলো পারবেনা? ও বলল হ্যাঁ পারব।ও তাড়াতাড়ি করে ভাত মেখে আমাকে খাইয়ে দিতে লাগলো। খাবার মুখে তুলে দেওয়ার সময় একবার ওর হাত কামড়ে ধরলাম ও আমার দিকে তাকালে আমিও ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ও লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিলো আমি ওর হাত ছেড়ে দিলাম। খাওয়া শেষ করে রুমে চলে আসলাম। রুমে এসে বউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। বউ রুমে ঢুকলে বললাম ড্রেসিংটেবিলের উপড়ের প্যাকেট খুলে দেখোতো কিছু পছন্দ হয় নাকি। ও প্যাকেট খুলে এক এক করে সব কিছু বের করছিল আর আমার দিকে তাকাচ্ছিল। সবকিছু দেখা শেষ হলে আবার প্যাকেটে ঢুকিয়ে চোখ বুজে প্যাকেট বুকে জড়িয়ে রাখলো।আমি বিছানা থেকে উঠে ওর কাছে গেলাম ওর থুতনি ধরে বললাম কী পছন্দ হয়েছে? ও কোন কথা না বলে মাথা নাড়লো মাথা নাড়ানোর সাথেসাথে কয়েক ফোঁটা চোখের পানি এসে আমার হাতে পড়লো। আমি বুঝলাম বউ আমার আনন্দে কাঁদছে। আসলে হঠাৎ পাওয়া ভালবাসা এমনই হয় অনুভূতি গুলো তরল করে বের করে দেয়।
.
লেখাঃ বিকৃত মনের মানুষ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now