বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্পের নাম:উপদ্রব
এক
ছেলেটা যেদিন প্রথম আমাদের বাসায় আসেন সেদিন তাকে দেখেই রিতু(আমার ছোট বোন) কেমন যেন নাক সিটকায়।নাক সিটকানোটা অবশ্য ঠিক অমূলক কিছু বলা যায় না,আমরা যেমন পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারি তার থেকে লোকটা যে যোজন যোজন দূরে।বাচ্চা মেয়ে,ভদ্রতা বিষয়টা তখনও জেঁকে ধরে নি;লোক দেখিয়ে যে ভালো সাজতে হয় সেই অভিনয়ের বয়সটাও তার হয় নি;এমন অবস্থায় কি তাকে দোষ দেয়া যায়?মুখের উপর বলে বসে, “এহ কি খ্যাত!”
বাবা ইতস্ততভাবে একবার রিতুর দিকে তাকান।আমি বজ্জাতটার মুখটা চেপে ধরি,এই যাহ কাজ তো সেরে দিল।ছেলেটা আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে একটা হাসি দিল।কি মিষ্টি!আচ্ছা গ্রামের মানুষগুলো কি সবাই এমন সহজ সরল হয়?তেল দেয়া মাথায় লেপ্টে থাকা চুলগুলো আর বুড়োদের চশমার ফ্রেমের মাঝখান দিয়েও লক্ষ্য করলাম ছেলেটা দেখতে খারাপ না।বানানো ঢোলা শার্ট আর বল্টে রাখা প্যান্টটা বদলে দিলে নায়ক নায়ক চেহারা নিশ্চিত।
বাবা রিতুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে চিঠিটার দিকে চোখ ফেরান।কেউ চিঠি নিয়ে আসলে বাবা সেই চিঠি জীবনেও হাতে ধরেন না।অধিকাংশই সাহায্য চেয়ে কিংবা চাকরীর আবেদন করে।আচ্ছা গ্রামের মানুষগুলো মনেটা করে কি?শহরে কি চাকরীর ছড়াছড়ি যে লুফে নিয়ে দিয়ে দিলেই হয়?এত কিছু মাথায় রেখেও বাবা চিঠিটা গভীর মনযোগ নিয়ে পড়ছেন,কারণ চিঠিটা বাবার বাল্যকালের সবথেকে কাছের বন্ধুর লেখা,আর উপস্থিত ব্যাক্তি তার সুযোগ্য সন্তান।প্রিয় বন্ধুর আবেদন কি আর ফেলতে পারেন?
পুরো চিঠিটা পড়া শেষ করে বাবা ছেলেটার দিকে তাকায়।
“তা চাকরীর জন্যে এলে বুঝি?”
ছেলেটা ধীরে ধীরে মাথা উপর নিচ করে।
“তা থাকবে কদিন?”
“তা তো জানি না কাকু,এক বছরও হতে পারে একদিনও হতে পারে।বন্ধুর এক পরিচিত ভাই আছেন উনার সাথেই থাকব ফার্মগেটের ওদিককার এক মেসে।”
আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি,যাক বেঁচে গেলাম।
দুই
অনেকটা দিন পেরিয়ে যায়।সেই ছেলেরও আর কোন হদিশ পাই নি।উড়ে আসা ক্ষণিক সময়ের অতিথি হিসেবেই তাকে ধরে নিয়েই আবার নতুন শুরু করি।এর মাঝে এক ভয়াবহ কাহিনী করে রিতু।টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে বসে তিন সাবজেক্টে।বাবা-মায়ের মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা।স্কুল থেকে কত ঝামেলা ঝক্কি।শেষমেস বন্ড সই করে পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি দেয়া হল।বাবা রিতুর জন্যে নতুন শিক্ষক নিয়ে এলেন।আমরা ঢোক গিলি।এ তো সেই ছেলে!
তিন
ছেলেটার পোশাক আশাকে অনেকটাই শহরের হাওয়া।আগের মত তেল দেয়ার অভ্যাসটা অনেকটাই চলে গিয়েছে।তবে বাকি অভ্যাসগুলো আগের মতই রয়ে গিয়েছে।যেমন,চায়ের পিরিচে চা ঢেলে খাওয়া,চায়ে ডুবে যাওয়া বিস্কিট হাত দিয়ে টেনে বের করে আনা।প্রথম প্রথম রিতু খুব বাহানা করতো তার কাছে পড়তে না যাওয়া নিয়ে।একটা সময় মেয়েটা তার ভক্ত বনে গেলো।অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আজকাল ছেলেটা সম্পর্কে কিছু বললেই রিতু খেপে যায়।
“ভাইয়াকে নিয়ে কিছু বলবে না।”
“ওমা কেন!”আমি অবাক হই।
“বলছি তাই।”রিতু বইয়ের দিকে মনযোগ দেয়।
এসএসসিতে রিতু সব বিষয়ে এ প্লাস তুলে ফেলে।আমরা অবাক হই।যার পাশ তুলতে হাঁসফাঁস তার এহেন কান্ড।বুঝতে পারি ছেলেটার মাঝে কিছু আছে।
চার
স্বভাবতই আমার গল্পের বইয়ের ভান্ডারের দিকে কেউ নজর দিলে আমার মেজাজ গরম হয়ে যায়।তার উপর এই ছেলে না বলে বই উল্টোতে থাকা দেখে মেজাজ আকাশে চড়ে গেলো।দ্রুত পায়ে তার দিকে এগোতেই সে পিছন ফিরে তাকালো।
“আমি দুঃখিত।”
আমি থমকে দাঁড়াই।“কেন!”
“আমি বোধহয় কেউ আপনার বই ধরুক তা পছন্দ করেন না।”
“কে বলেছে আপনাকে?”
ছেলেটা মুচকি হাসে।“আমি মানুষ পড়তে পারি।”
“আমাকে পড়তে পারবেন?”
“জি।”
“তাহলে পড়ুন।”
“আপনি বড্ড গোছানো।”
“এটা যে কেউ বলতে পারে।”
“বাবার চরিত্র পেয়েছেন।ছোটবেলায় বড্ড শান্ত ছিলেন।বন্ধুমহলে খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মেয়ে।”
আমি ঘেমে উঠি।“আপনাকে কেউ একজন এগুলো বলেছে।কে?”
ছেলেটি মুচকি হেসে চলে যায়,কিছু উত্তর করে না।
রিতু আমার হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেয়।আমি ওর দিকে তাকাই।
“কে দিয়েছে?”
“ভাইয়া।”
আমি প্যাকেটটা খুলি।তাতে একটা চিঠি আর সমরেশ মজুমদারের বই।চিঠিটা খুব গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,স্পষ্ট এবং সুন্দর।
“শুভ জন্মদিন।আমি জানি আপনি সমরেশ মজুমদারের বই পড়তে খুব ভালোবাসেন।তাই এ আমার তরফ থেকে ছোট একটা উপহার।”
পাঁচ
ভার্সিটি থেকে বড়সড় সমস্যায় ফেলে দিল।একটা ছোট এসাইনমেন্টের জন্য বস্তিতে ঘোরা লাগবে।কেউ আমার সাথে নিই।এর উপর সময়ও প্রায় শেষের পথে।রিতু হামাগুড়ি দিয়ে বিছানার ও মাথা থেকে আমার পাশে আসে।
“দিদি।”
“বল।”
“ভাইয়াকে নিয়ে যেতে পারো।”
আমি ওর দিকে তাকাই।“পারবে?”
“ব্যাটা সারাদিন টই টই করে।পারবে না কেন?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি।“বলে দেখিস।”
রিতু সবকিছু ঠিকঠাক করে দেয়।আমি ছেলেটার সামনে গিয়ে বসি।
“পারবেন তো?”
একবার মাথা কাত করে সে।
ছয়
ছেলেরা যে এত লাজুক হয় জানতাম না।দুবার রিক্সায় উঠতে বলার পরও সে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।
“আরেকটা রিক্সা নেব?”
“জি না।”
“তাহলে উঠে বসুন।”
ছেলেটা ভদ্র বাচ্চার মত রিক্সায় উঠে বসে।
সময় আগায়।ছেলেটার প্রতি ধারণাও পরিবর্তন হয় আমার।বড্ড মিশুক আর ভালো ছেলে।ইট কাঠের এই কাঠিন্যে মোড়ানো শহরেও সে সৌন্দর্য খুঁজে নেয়।কখনো জীবনানন্দ কখনো বা রবীন্দ্রনাথে তার বিচরণ। কখনো হিমু হয়ে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে চলা।বস্তির বাচ্চাগুলো তাকে দেখেই সে কি হুল্লুড়।অবাক হয়ে তাকাই।
ছেলেটা মাথা চুলকোয়।“মাঝেমধ্যেই আসা হয় তো-”
“এদিকে আসা হয় কি জন্যে?”
“জীবন দেখতে।”মুচকি হেসে তার জবাব।
কোনদিন পুরোনো কোন নদীর ধারে বসে একটু জিরিয়ে নিতাম।সে দূরে কোথাও চেয়ে রইতো।কেমন যেন উদাসীনতা,স্বপ্ন আছে,বাস্তবায়নে অনীহা।
“চাকরি করবেন না?”
ছেলেটা হেসে ওঠে।“কম কি চেষ্টা করেছি?আজকাল প্রভাবক লাগে সবকিছুতে।”
“ইচ্ছেটাও লাগে।”
“পিছুটান থাকলে ইচ্ছেটাকে জোর দিতাম।বাবা-মা দিব্বি আছে।তাই হয়তো ইচ্ছেটা জাগে না।”
“যদি আমি অনুরোধ করি?”মুখ ফসকে বলে ফেলি।
ছেলেটা কিছু বলে না।একবার আমার মুখের দিকে তাকায়।
কাজ শেষ হতেই আর তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হওয়া হয় না।আমি শূন্যতায় ভুগি।ইট কাঠের মাঝে আনন্দটা খুঁজতে চেষ্টা করি।কিন্তু আমি জাদুকর নই,তাকে ছাড়া সে আনন্দ পাওয়া যাবে না।সে যেন কোথায় হারিয়ে যায়-
সাত
বাবা মা বিয়ের জন্যে জোর করতে থাকে।আমি এনিয়ে বিনিয়ে কেটে পড়ি।অপেক্ষায় থাকি সে একদিন আসবে।তাকে খোজার চেষ্টা করি,পাই না।সবখান থেকে সে কোথাও যেন হারিয়ে যায়।
ঠিক এক বছর নটা মাস পড় সে হাজির হয় আমাদের বাড়িতে।হাতে বিশাল মিষ্টির প্যাকেট।
রিতু দৌড়ে আসে।“দিদি,ভাইয়া এসেছে।”
আমি উঠে বসি।
“ভাইয়ার বিসিএস হয়ে গিয়েছে।ম্যাজিস্ট্রেট না কি যেন-”
আমি প্রায় দৌড়ে ড্রইংরুমের দিকে যাই।সেখানে স্যুট-প্যান্ট পরা একজন ভদ্রলোক।আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ান।আমি ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে যাই।
“কেমন আছেন?”তার জিজ্ঞাসা।
“আপনি কি প্রমাণ করতে চান?”আমি পাল্টা প্রশ্ন করি।
ছেলেটা আমতা আমতা করে।“আমি কেবল দায়বদ্ধতা পূরণের চেষ্টা করতে চাচ্ছিলাম।”
“তাই বলে যোগাযোগ বন্ধ করে?”
ছেলেটা কিছু বলে না।
“যদি কিছু হয়ে যেত?”
ছেলেটা টাইটা ঠিক করার চেষ্টা করে।আমি তা ধরে হ্যাচকা টান দিই।
“যদি এগুলো আর একদিনও দেখি,তাহলে জানে মেরে ফেলব।খ্যাত ছিলেন খ্যাত থাকবেন।”
“জি আচ্ছা।”ছেলেটা মুচকি হাসে।আমি তাকে জড়িয়ে ধরি।একবার ইতস্তত করে সে আমাকে কাপাকাপা হাতে ধরার চেষ্টা করে।বাবা-মা তখন বড় বড় চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।রিতুর মুখে তখন হাসি।আমার চোখে তখন আনন্দাশ্রু,একটি অযাচিত উপদ্রব,গ্রাম্য ছেলের জন্য-
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now