বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
তোমায় হৃদমাঝারে রাখিবো
-------------- সারাহ ইকবাল
- আমি আপনাকে ভালবাসি।
অনেকক্ষণ ধরে ইতস্তত করার পর অবশেষে কিভাবে জানি মুখ ফসকেই হোক কিংবা ইচ্ছাবশতই হোক বাক্যটি বলতে সমর্থ হলো অনিন্দ্য। অনুরাধা গত বিশমিনিট ধরে ওর সামনে অনর্গল চেঁচামেচি করে গেলেও মুখ দিয়ে টুঁশব্দটি বের করেনি অনিন্দ্য, সারাটিক্ষণ স্কুলের ডিটেশন পাওয়া ছাত্ররা যেমন টিচারের বেতের সামনে মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে রয় সেভাবেই ছয় ফিট লম্বা দেহটাকে টানটান করে দাঁড়িয়ে ছিলো ও। তারপর অনুরাধার কন্ঠ যখন স্কুলের রাগী মাস্টারনীদের মতন কর্কশ থেকে ক্রমান্বয়ে কচি খুকিদের মতন ভেঙে আসছিলো নিজেকে আর সামলাতে পারেনি অনিন্দ্য, ঠিক তখনই কোনরকম মিনমিনে কন্ঠে এই একটি বাক্যই মুখ দিয়ে বের করতে সক্ষম হয় ও।
অনিন্দ্যর আকস্মিক এই ভালবাসার এখতিয়ার শুনে রাধার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিলো সেই কথায় না হয় পরে আসছি।তার আগে অনিন্দ্য- রাধা জুটির আজকের এই কাহিনীতে পৌছানোর পিছনের গল্প থেকে নাহয় একটু ঘুরে আসা যাক।
অনিন্দ্য সবেমাত্র তখন নতুন চাকরী পেয়েছে। এর আগেও বেশ কয়েকটি চাকরী করে থাকলেও এটিই ছিলো প্রথমবারের মতন একদম অনিন্দ্যর নিজস্ব পছন্দসই চাকরী। তবে একটি নতুন ঝামেলাও এসে জুটেছে এই চাকরীর সাথে করে আর তা হলো নতুন শহরে একাকী জীবনযাপনের ঝামেলা। অনিন্দ্যর পৈতৃক ভিটাবাড়ি থেকে শুরু করে ওর জন্ম, বেড়ে উঠা কিংবা সকল আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বসবাস চট্টগ্রাম শহরে। এমনকি অনিন্দ্যর ভার্সিটিও চুয়েট। তাই চট্টগ্রামের বাইরে গিয়ে পরিবার ছাড়া থাকার কোন দরকার কিংবা সুযোগ কোনটাই হয়ে উঠেনি ওর। তাছাড়া অনিন্দ্য জন্মগতভাবেই কিছুটা পরিবারকেন্দ্রিক ছেলে। তাই যতবারই চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও গিয়েছে ঘুরতে সেটি ঢাকা শহর হোক কিংবা দেশের বাইরে অবশ্যই পরিবারের সাথেই গিয়েছে। কিন্তু পড়াশুনার গন্ডি পেরিয়ে যখন আয় রোজগারের ধান্ধায় পা দিয়েছে তখন সে প্রথমবারের মতন উপলব্ধি করেছে যে সারাটিজীবন সে চাইলেও আপনজনদের নিয়ে চলতে পারবে না। তাই চট্টগ্রাম শহরে নিজের পছন্দমাফিক চাকরী খুঁজতে খুঁজতে এবং কয়েকটিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হবার পর নিজের এই ছোট পরিসর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠলো সে। আর ফলস্বরূপ তার এই নতুন চাকরী, যা ঢাকার একটি নামীদামী প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে লেকচারারের পদে, যা শুধু বেশ মোটা অংকের বেতনই দিবে না বহুদিনের মনের মাঝে লালিত শিক্ষক হবার স্বপ্নকেও বাস্তবায়ন করবে।
অনিন্দ্য মানুষ হিসেবে বাস্তববাদী কিন্তু বড্ড নরম মনের অধিকারী। রাগ, হিংসা, প্রতিশোধ এই তিনটা শব্দের সাথে সে শুধুই বইয়ে কিংবা লোকমুখে শুনেই পরিচিত, কিন্তু নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কোথাও এর কোন ছিটেফোঁটাও ওর ছাব্বিশ বছরের এই জীবনে ঢুকতে দেয়নি ও। পরিবারের সবার আদরের একমাত্র ছেলে, তিনবোনের একমাত্র ছোটভাই হিসেবে যেমন উড়নচণ্ডী হবার কথা ছিলো ওর, তার তুলনায় ও বড়ই ঘরকুনো ও শান্ত। অনিন্দ্যর এই ছোট জগতে পরিবার- পরিজন, হাতেগোনা কাছের কয়েকজন বন্ধুবান্ধব ও নিজের ক্যারিয়ার এই কয়েকটি ব্যাপারই শুধু গুরুত্বপূর্ণ। বাকি সবকিছু ওর কাছে অর্থহীন ও অনাবশ্যক।
আজ অনিন্দ্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমাবে, তাই পরিবার থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধনের যারাই পেরেছে ওকে ট্রেনে তুলে দিতে স্টেশন পর্যন্ত এসেছে।অনিন্দ্যর আশেপাশে তাকাতে বড্ড লজ্জা করছে, স্টেশনের সকল মানুষই ওদের দিকে একবার করে তাকাচ্ছে তারপর মুচকি হেসে চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আসলে স্টেশনে অবস্থিত কমবেশি সবাই বুঝে ফেলেছে এতো লোকের ভীড়ের মাঝে শুধু অনিন্দ্যই ট্রেনে চড়ে যাওয়ার জন্য এসেছে, কারণ একমাত্র তার হাতেই একটি সুটকেস ধরা ও কাঁধে একটি ব্যাগ আর বাকিরা দিব্যি আরামে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্যকে এটা সেটা নিয়ে জ্ঞানমূলক বাণী শুনাতেই ব্যস্ত। অতঃপর সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ট্রেন মহাশয় আগমন ঘটালেন। সবার কাছ থেকে বিদায়পর্ব সেরে ট্রেনে চড়ে বসলো অনিন্দ্য। আজ প্রথমবারের অনিন্দ্য খেয়াল করেছে,ওর আপনজনেরা ওকে একটু বাড়াবাড়ি রকমেরই মাথায় তুলে রেখেছেন, যা কিনা আজ এতকাল পর তার ভাবনাতে এসেছে।
অনিন্দ্য এসব ভাবনার ফাঁকে ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিলো।অনিন্দ্য সিট পরেছে ঠিক জানালার পাশেরটা।" বাহ! ভালোই হলো। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গান আর একাকীত্ব। বেশ ভালোই একটা ট্রেনযাত্রা হবে দেখছি"। মনে মনে বেশ আনন্দিত হলো অনিন্দ্য। অনিন্দ্য নিজের মালপত্র জায়গা মতন রেখে সিটে শরীর এলিয়ে আরাম করে বসে পড়লো, তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে কানে হেডফোন লাগিয়ে দিব্যি আরামে নিজের প্রিয় গান শুনতে শুরু করলো।
" তাকে যত তাড়াই দূরে দূরে......
তবুও ও....সে
আসে মেঘলা চোখে ঘুরেফিরে.... "
গানের মাতাল কথাগুলোতে যখন অনিন্দ্যর চোখ প্রায় ঘুমে জড়িয়ে এসেছিলো ঠিক তখন ডানহাতের কব্জিতে কোনকিছু একটা গুঁতো এসে লাগলো। অল্প ব্যাথা পেলো সে, কিন্তু চোখ খুললো না। মশাজাতীয় কোন পোকামাকড় হবে ভেবে হাতটি চোখ বোজা অবস্থায় একটু চুলকালো ও।কিন্তু তার কয়েকসেকেন্ডের মাঝেই যখন ডান কাঁধে একজন মানুষের হাতের স্পর্শ এসে লাগলো, চমকে গিয়ে চোখজোড়া খুলে সোজা হয়ে বসলো ও। ওর পাশের সিটে বসে আছে একটি জলজ্যান্ত মেয়েমানুষ। " তারমানে একটু আগের সেই সুঁইয়ের মতন গুঁতোটা কোন পোকামাকড়ের কান্ড নয় বরং এই মানবীর কর্মকাণ্ড?" অনিন্দ্য দুইচোখ ভালোভাবে ডলতে ডলতে মেয়েটির দিকে কোনপ্রকার বাক্য বিনিময় ছাড়াই মিনিটখানেক তাকিয়ে রইলো।
- অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে ডেকেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু আপনি তো ফুল ভলিউমে গান ছেড়ে দিব্যি আরামে ঘুম দিচ্ছিলেন।তাই বাধ্য হয়ে আপনার হাতে এটা দিয়ে গুঁতো দিতে হলো, কিন্তু আজব লোক আপনি! এরপরেও যদি হুঁশ হতো। তো কি আর করার বলুন? শেষমেশ আপনার কাঁধে জোরেশোরে একটা থাবা দিতেই আপনাকে জাগাতে হলো। আজকালকার মানুষের ও যে কি হয়েছে সারাক্ষণ কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আপনি জানেন দুনিয়াতে ইদানীং কত দুর্ঘটনা ঘটছে এসব বাজে অভ্যাসের কারণে?
অনিন্দ্যর পাশে বসা মানবী একনাগাড়ে ছোট এই ভাষণ শেষ করে থামলো। মানবীর হাতে একটি পেন্সিলের মতন সরু ও লম্বা কিছু একটা। " এটা দিয়ে আমাকে গুঁতি দিয়েছিলো নাকি, বাব্বারে বাবা" অনিন্দ্য মনে মনে ভয় পেলো।
মানবী আবার মুখ খুললো,
- কি চুপ করে আছেন কেন? আমি ভূতপ্রেত নই, আমার সিটটা এখান থেকে কয়েকটা সিট পিছনে,কিন্তু একটু সমস্যার কারণে এই সিটে চলে এসেছি। বললো এই সিটটা নাকি খালি, তাই আর কি।আপনাকে ডেকে শিওর হয়ে নিতে চাচ্ছিলাম আর কি একটু, পরে যাতে আবার ঝামেলায় না পড়ি। মানবী দুইহাত নেড়ে নেড়ে চোখমুখে কেমন একটা ভঙ্গিমা এনে একটানে কথাগুলো বলে নিলো।
- জ্বী, সিটটা খালিই।আমি একা, তাই আমার একটা মাত্রই সিট। আপনি বসুন।অনিন্দ্য ভদ্রলোকের মতন বললো।
- আপনি না বললেও আমি বসবো। আমি জানি এই সিটটা ফাঁকা। মানবী নিজের হাতব্যাগ থেকে একটা চারবারের কিটকেট বের করতে করতে বললো।
- জ্বী আচ্ছা, ভালো। অনিন্দ্য মানবীর উদ্ভট আচরণে রীতিমত অবাক।
অনিন্দ্য আবার কানে হেডফোন লাগাতেই যাবে, তখন মানবী বলে উঠলো,
- আমি অনুরাধা, আপনি?
মানবীর ওর দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলো অনিন্দ্য, তারপর ভদ্রতার খাতিরে হাতটা ধরে বললো,
- আমি অনিন্দ্য সাহা। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
- ওমারে মা! এক্কেবারে পুরো নামসহ শিক্ষাগত যোগ্যতা বলে দিলেন যে! ভাগ্যিস জন্ম,ঠিকানা, ফোন নাম্বার ও দিয়ে বসেন নি। যাইহোক, আমি কিন্তু আপনার জব ইন্টার্ভিউ নিচ্ছি না, মি. অনিন্দ্য সাহা। মানবী, থুক্কু অনুরাধা হা হা করে হেসে উঠলো।
- না মানে, এতো এতো জব ইন্টার্ভিউ দিয়েছি যে বদ অভ্যাস হয়ে গেছে।দুঃখিত। অনিন্দ্য দারুণ লজ্জা পেয়েছে।
- আরে রাখুন তো, কিটকেট খাবেন? একটা বার ভাঙতে ভাঙতে অনুরাধা অনিন্দ্যকে জিজ্ঞাসা করলো।
- না, আমি চকলেট খাইনা।আপনি খান।
- আমি তো আপনি না বললেও খাবো। অনুরাধা চোখমুখে সেই অদ্ভুত ভঙ্গিমা এনে কিটকেটে মন দিলো।
অনিন্দ্য মনে মনে হাসলো। " কি সাংঘাতিক মেয়ে রে বাবা!"
অনিন্দ্য ও অনুরাধার সেই ট্রেনযাত্রার আর তেমন কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠেনি। পরের স্টেশন থেকে অনিন্দ্যর পাশের সিটে একজন যাত্রী উঠে পরাতে বাধ্য হয়ে অনুরাধা ওর সিটে ফিরে যায়। অনুরাধা যাবার আগে, " আসি, মি. অনিন্দ্য সাহা, ভালো থাকবেন" এইটুকু বলেই বিদায় নিয়েছিলো। অনিন্দ্য কিছুই মুখ দিয়ে বের করতে পারেনি, শুধু ছোট একটা হাসি দিয়েছিলো।
তারপর মাসখানেক কেটে যায়। অনিন্দ্য ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতায় এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পরে যে ট্রেনের সেই আধপাগল মানবীর কথা তার মনে আসার ফুসরতই ছিলো না। এরপর একদিন। একদিন হঠাৎ অনুরাধ আবার অনিন্দ্যর মুখোমুখি হয়।
সেইদিন কি বার ছিলো অনিন্দ্য ঠিক মনে করতে পারবে না। কিন্তু সেদিন শহরজুড়ে বড্ড বৃষ্টিপাত হচ্ছিলো, এইটুকু অনিন্দ্যর বেশ ভালোই মনে আছে।অনিন্দ্য ক্লাস শেষ করে একটা বই ইস্যু করতে লাইব্রেরীতে এসেছিলো।হঠাৎ লাইব্রেরীর কোন একটি টেবিল থেকে একটি মেয়েলী কন্ঠ শুনে কেমন জানি চেনা চেনা লাগলো তার।অনিন্দ্য আশপাশ ফিরে কন্ঠটা কোথা থেকে আসছে খোঁজার চেষ্টা করলো, তারপর তার চোখ একটি টেবিলে গিয়ে আটকে গেলো। টেবিল ঘিরে চার পাঁচজন ছেলেমেয়ে বসা,আর তাদের মাঝে যে মেয়েটি চেঁচিয়ে কথা বলছে সে আর কেউ নয় ওর সেই ট্রেনের অদ্ভুত সহযাত্রী অনুরাধা।
- অনু, কথার আওয়াজ নিচে নামা। তোর জন্য প্রতিদিন লাইব্রেরী থেকে আমাদের বের করে দেয়।
- তুই থাম প্লিজ। তো যা বলছিলাম, নতুন মুভিটাতে পৃথ্বীরাজকে যা লাগে না। ওমারে মা! পুরা অস্থির, মাথা খারাপ হয়ে যাবে মুভিটা দেখলে।আমি বাসায় গিয়ে তোদের ডাউনলোড লিংক পাঠাবো। আমাদের মেসেঞ্জারের গ্রুপটাতে, ওকে? অনুরাধা একনিশ্বাসে আশেপাশের কাউকে তোয়াক্কা না করেই জোরে জোরে বলে ফেললো।
অনিন্দ্য নিজেও জানে না, ওর কি হয়েছিলো। ও এগিয়ে গিয়ে অনুরাধার পিছনে দাঁড়ালো, তারপর ডানহাতটা ওর কাঁধে রাখলো। অনুরাধা একটুও না চমকে পিছন ফিরে তাকালো।
তারপর অনিন্দ্য মুখ খোলার আগেই নিজেই চিৎকার করে বললো,
- আরে মি. অনিন্দ্য সাহা। আপনি? আমার ভার্সিটির লাইব্রেরীতে কি করছেন? আমাকে এতদিন যাবৎ ফলো করছিলেন নাকি?
- জ্বী? অনিন্দ্য অল্প থতমত খেয়ে উঠলো। তারপর চারিদিকে তাকিয়ে যখন লাইব্রেরীতে আসা অন্যান্য মানুষের বিরক্তি ভরা চেহারা দেখলো ওর হুঁশ হলো ওরা লাইব্রেরীকে রেস্টুরেন্ট বানিয়ে ফেলেছে।
- চলুন, বাইরে গিয়ে কথা বলি। অনিন্দ্য অনুরাধাকে প্রস্তাব করলো।
- হুম চলুন।
" এই তোরা থাক, আমার জায়গাটা রাখিস।আমি দুই মিনিটের ভিতর আসছি।" বন্ধুদের বলে অনুরাধার অনিন্দ্যর সাথে বেরিয়ে এলো।
এরপর লাইব্রেরীর বাইরে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকটা সময় কথা বললো ওরা। অনিন্দ্য এই ভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ও অনুরাধা বিবিএর শেষ বর্ষের ছাত্রী। কথার মাঝাখানে অনুরাধা অনিন্দ্যকে পাশের টং দোকানের চায়ের প্রস্তাব দিলো। অনিন্দ্য মাথা নেড়ে মানা করতেই রাগে ফুলে উঠলো অনুরাধা,
- ওমা, কেন? আপনার সম্মানে বাঁধছে আমার সাথে চা খেতে? শুনুন, মি. অনিন্দ্য সাহা, আপনি এই ভার্সিটির শিক্ষক হতে পারেন কিন্তু আমার নয়।তাই এতো ভাব না নিলেও চলবে।
- আমি ভাব নিচ্ছি না। আমার চেহারাটাই জন্মগতভাবে এমন। অনিন্দ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো।
এবার অনুরাধা হেসে উঠলো।
- তাহলে চলুন চা খাওয়া যাক।
সেই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় টঙ এর দোকানের চা অনিন্দ্য-অনুরাধাকে এতোটা কাছে নিয়ে আসবে জানা ছিলো না ওদের দুজনের কারোই।ওইদিন অনুরাধাই নিজে থেকে অনিন্দ্যের ফেসবুক আইডি চেয়ে বসে, অনিন্দ্য না দিয়ে আর যাবে কোথায়।মেয়েটা পাগলী হলেও মনটা একদম পরিষ্কার তা বুঝে গিয়েছিলো অনিন্দ্য, তাই এমন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব্ করতে আপত্তি করলো না ও। আর এই ঢাকা শহরে আপন বলতে কেউ নেই, তাই দুই একজন পরিচিত মানুষ থাকা মন্দ কি? অবশ্য অনুরাধাকে বন্ধু থেকে কিছু বেশি ভাবার ইচ্ছা ছিলো নাকি তা নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করার আগেই ফেসবুকে অনুরাধার প্রোপাইল কাপল পিকচার দেখে সুযোগ আর হয়ে উঠেনি ওর। অনিন্দ্য বরাবরই একা, প্রেম ভালবাসাতে জড়ানোর ইচ্ছা কখনো তেমন জেঁকে বসেনি ওকে, তাই এই বয়সে এসে এখন বিয়েশাদির দায়িত্ব সম্পূর্ণ পরিবারের উপরই ছেড়ে দিয়েছে।যদিওবা ইচ্ছা বাইরে থেকে পিএইচডি টা শেষ করে এসেই সংসার ধর্মে মনোনিবেশ করবে।
এরপরের কয়েকমাস অনিন্দ্য ও অনুরাধার মধ্যেকার বন্ধুত্ব বেশ ভালোভাবেই চলছিলো। ভার্সিটি শেষে প্রায়ই দিন অনুরাধা অনিন্দ্যকে শহর ঘুরাতে নিয়ে যায়, রিকশাতে করে ঘুরে দুজন, বিভিন্ন জায়গায় খাওয়াদাওয়া করে, অহেতুক চিল্লাচিল্লি করে অনুরাধা আর অনিন্দ্য বাধ্য ছেলের মতন শুনে। অনুরাধার প্রেমিক দেশের বাইরে থাকায় ও অনুরাধা এতিম হওয়াতে ওর কোন পিছুটান নেই এদেশে। তাই অনিন্দ্যই হয়ে উঠেছিলো ওর সবথেকে কাছের মানুষ। অনুরাধার জন্য অনিন্দ্যর মনে প্রথমে এক ধরণের করুণা জেগে উঠেছিলো, কারণ সে নিজে এতো আদরে বেড়ে উঠেছে আর অনুরাধা কলকাতার একটি অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে।কিন্তু ধীরেধীরে এই করুণা অনিন্দ্যর নিজের জন্য হতে শুরু করলো, যে অনুরাধা মেয়েটি এত কিছুর পরেও কত প্রাণবন্ত আর সে সামান্য মনের কথা মুখে আনতে ভয় পায়।মাঝেমধ্যে তো অনুরাধা বলেই ফেলে,
- আপনি এতো ভীতু কেন, মি. অনিন্দ্য সাহা??
- কই নাতো। অনিন্দ্য অল্প হাসে।
- আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবেন? অনুরাধা অনিন্দ্যর চোখের দিকে তাকায়।
- জ্বী?? অনিন্দ্য এমন ভান করে যেন কথাটি ঠিক মতন কানে যায়নি।
- কিছু না, আসুন আপনাকে ললিপপ কিনে দেই। বাচ্চা মানুষ একটা! অনুরাধা অনিন্দ্যকে রেখে হাঁটা শুরু করে।
অনিন্দ্য পিছন পিছন যায়।" পালিয়ে যেতে পারবি তুই, অনিন্দ্য? " নিজেকে প্রশ্ন করে ও।
আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ওরা একসাথে সাতটি মাস কাটিয়ে দেয়।
তারপর সেই বিশেষ দিন আসলো। যেদিনের কথা নিয়ে গল্পের শুরু করেছিলাম।ওইদিন অনুরাধা সেই প্রবাসী প্রেমিকের সাথে ব্রেক আপ করে অনিন্দ্য সাথে দেখা করতে এসেছিলো।আর অনিন্দ্যর মুখ ফুটে বেরিয়ে আসে এতদিন গোপনে রাখা সেই বিশেষ কথাটি।
অনুরাধা কথাটি শুনার পর হঠাৎ করে থেমে যায়। তারপর অনিন্দ্যকে অবাক করে দিয়ে ওকে সজোরে একটা ধাক্কা দেয়, আর তারপর শুরু হয় কিলঘুষি। অনিন্দ্য দারুণ ভয় পেয়ে যায়, অনুরাধা কি ওকে খারাপ মানুষ ভাবছে? এভাবে মিনিট দুয়েক চলার পর অনুরাধা থামে।তারপর বলে,
- শুনুন ঢং রাখেন। আমাকে একটা ছাগলের দশ নাম্বার বাচ্চা ছ্যাঁকা দিয়েছে বলে আপনার যে দয়া দেখিয়ে আজকেই ভালবাসেন বলতে হবে এটা কোন সংবিধানে লিখা আছে শুনি?
- না মানে, আমি সিরিয়াস অনুরাধা।
- রাখুন তো, প্লিজ। চলুন, কোথাও থেকে পাস্তা খেয়ে আসি। এসব প্রেম ভালবাসা কই আর যাচ্ছে তাই না? পালাতে তো পারবেন না আমার সাথে? তাহলে আমাকে রেখেও যে পালাতে পারবেন সেটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
অনুরাধা হাসলো। তারপর অনিন্দ্যর ডানহাতটি নিজের হাতে ধরে হাঁটা শুরু করলো।
অনিন্দ্যর মাথায় তখন একটি গানই বাজছে,
"..............তোমায় হৃদমাঝারে রাখিবো ছেড়ে দিবো না............."
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now