বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
- ডেকেছিলে মায়া?
- কিছু কথা বলার ছিলো।
- সে তো নিত্যই বলো।
- আজকের কথাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
- চলো, হাঁটতে হাঁটতে শুনি তোমার কথা।
- না, আমি আজ দ্রুত বাসায় ফিরবো।
- অতীব জুরুরী কিছু?
- নিরব, তোমার মায়া এখন অন্য কারো?
- নদীর স্রোত সময়ে অসময়ে দিক বদলায়। তবে আমি জানি, তুমি নদীর সেই কালস্রোত নও।
- নিরব আমাকে ভুলে যাও তুমি।
- শিকড় ছাড়া বৃক্ষকে বাঁচতে দেখেছো মায়া?
- নিরব পাগলামি করো না।
- পাগলামিটা তোমার থেকেই শেখা মায়া।
- নিজের প্রতি খেয়াল রেখো। আর আমাকে "দুঃস্বপ্ন" ভেবে ভুলে যেও।
- তুমি দুঃস্বপ্ন হলে সেই কবেই ভুলে যেতাম।
- বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।
- তোমার মত আছে বিয়েতে?
- ছেলে বড় একটা বিজনেস করে।
- তুমি সুখি হতে পারবে মায়া, আমাকে ছেড়ে?
- বাবা এই পাত্র হাত ছাড়া করতে চান না।
- মায়া, সময় বদলালে পরিস্থিতি বদলায়।
- দেখো নিরব, আমি এতো কথা শুনতে চাই না। আমি তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারবো না ব্যাস।
- ভোমড় ছাড়া ফুল বাগানে কখনও ফুল ফুটতে দেখেছো মায়া?
- আমি তোমাকে ছাড়া সুখেই থাকবো।
- আমি যে ধ্বংস হয়ে যাবো মায়া।
- তোমার সাথে সম্পর্ক রাখলে আমিও ধ্বংস হয়ে যাবো।
- এতদিন কী তবে করুণা করেছিলে?
- তোমাকে ভালো লাগতো তাই প্রপোজ করেছিলাম।
- নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মাঝে তোমার "ভালো লাগাটা" বিলীন হয়ে গেলো মায়া?
- বাসায় ফিরতে হবে এখন।
- চলেই তো যাবে চিরদিনের জন্য, একটু বসো না মায়া। তোমাকে শেষবারের মতো দেখি একবার।
- দুইটা বছর তো মন ভরে দেখেছো।
- আর তো দেখবো না কোনোদিন।
- দেখা হয়েছে?
- মায়া আমি তোমাকে ভালোবাসি।
- নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখে কাউকে ভালোবাসতে এসো।
- সূর্যতেও কিন্তু গ্রহণ লাগে মায়া।
- আমি উঠি এখন।
- মায়া একটা অনুরোধ রাখবে?
- তাড়াতাড়ি বলো। আমার যেতে হবে।
- মূল্যবান সময়কে পেছনে ফেলে কার্যহীন সময়কে মূল্যায়ন করতে শিখে গিয়েছো। বাহ!
- কী বলবে দ্রুত বলো। আর না হলে আমি যাই।
- যদি তোমার মেয়ে হয়। তবে তার নাম রেখো "তিলোত্তমা।"
- আচ্ছা রাখবো। আর কিছু?
- না।
মায়া উঠে যাচ্ছে নিরবের পাশ থেকে। নিরব মৃদুস্বরে অনিচ্ছা স্বত্তেও মায়াকে ডাকলো। বললো,
- তোমার হাতটা একটু ধরতে দেবে?
- সময় নেই আমার।
- শুভকামনা রইলো মায়া।
মায়া আর কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেলো। ক্যাম্পাশের এই জায়গাটাতে, ঠিক এই জায়গাটাতেই মায়া নিরবকে প্রপোজ করেছিলো। নিরব সেদিন মায়াকে বলেছিলো, দেখো বোন আমি নিতান্তই নিম্নবৃত্ত পরিবারের একজন ছেলে। আর তাছাড়া আমি আর তুমি সমবয়সীও বটে। আজ বাদে কাল তোমার বিয়ে হয়ে যাবে। আর এদিকে আমার চাকরি খুঁজতে খুঁজতে জুতার তলা ক্ষয় হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং তুমি অন্য কাউকে গিয়ে "ভালোবাসি" বলো।
মায়া সেদিন নিরবের কোনো কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে জোরপূর্বক তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলো। নিরব উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত মায়ার সাথে সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়। টিউশনির টাকা থেকে প্রতিমাসে কিছু টাকা করে জমিয়ে সে মায়ার জন্য এটা সেটা কিনে তাকে উপহার দিতো।
সবকিছু ভালোই ছিলো তাদের। একদিন হঠাৎ করেই মায়া নিরবকে ফোন করে বলে, নিরব আগামীকাল ক্যাম্পাসে একটু দেখা করতে পারবে?
নিরব ছোট্ট করে "হ্যাঁ" বলে। কিন্তু কে জানতো এই দেখা করায় মায়ার সাথে নিরবের শেষ দেখা করা হবে?
.
- ভাইয়া সন্ধ্যা হয়ে এলো। আপনি এখনও এখানে বসে আছেন?
নিরব পাশে তাকিয়ে দেখে ডাইনি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির নাম "হোসনেআরা ডাইনা।" সবাই তাকে ছোট্ট করে "ডাইনি" বলে ডাকে।
- হৃদয়ে তো সন্ধ্যা সেই কখনই নেমেছে।
- মায়া কিছু বলেছে আপনাকে?
- তুমি কী করছো এখানে?
- আমাদের একটা প্রোগ্রাম ছিলো। কালকে অনুষ্ঠিত হবে প্রোগ্রামটি। তাই একটু কাজ করলাম।
- শুভকামনা।
- ভাইয়া অনুষ্ঠানে আপনার আমন্ত্রণ রইলো।
- চেষ্টা করবো।
- আসি ভাইয়া, সন্ধ্যা হয়ে এলো। আর আপনিও বাসায় যান।
ডাইনি চলে গেলো। নিরব আনমনেই তার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। স্বল্প তম সন্ধ্যারাতে মেয়েটির চলার ভঙ্গিমাটা একদমই মায়ার মতো।
.
- কিরে নিরব? কী হয়েছে ভাই তোর?
- আমাকে বড় হতে হবে ভাই।
- হ্যাঁ হবি তো, তবে পড়ালেখা করতে হবে তোকে।
- পড়ালেখা ছাড়া অতি দ্রুত বড়লোক হওয়া যায় না ভাই?
- কী হয়েছে তোর? হঠাৎ এমন প্রশ্ন করছিস? মায়া কী কিছু বলেছে তোকে?
- ভাই তুমিও কী আমাকে করুণা করো?
- কী বলছিস এসব?
- তোমার টাকায় থাকি, তোমার টাকায় পড়ি। আমার অলক্ষ্যে আমাকে নিয়ে তোমার নেতিবাচক মনোভাব থাকতেই পারে।
- আমি তোর ভাই না? আমাকে আপন ভাবিস না তুই?
- তাকেও তো আপন ভাবতাম ভাই।
- কী বলেছে মায়া তোকে?
- আচ্ছা ভাই টাকা পয়সায় কী সব?
- হ্যাঁ, তবে সব ক্ষেত্রেই না।
- ঘুমের ঔষুধ আছে ভাই?
- আছে, তবে দিতে পারবো না।
.
কিছুদিন পর নিরবের কাছে খবর এলো, মায়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছে ঐ বিজনেস ম্যান ছেলেটির সাথে। নিরব একটুও দুঃখ পায়নি। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিয়েছিলো তার। মায়া সুখে থাকুক, এটাই তো তার জন্য অনেক বড় পাওয়া। মায়া ঠিকই বলেছিলো, সে হয়তো তার দায়িত্বটা নিতে পারবে না।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে নিরব ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে জয়নাল চাচার চায়ের দোকানের দিকে রওনা দেয়। এক কিলো হেঁটে এক কাপ চা আর সিগারেট খাওয়ার জন্য সে প্রতিদিন চাচার চায়ের দোকানে গিয়ে হাজির হয়। জয়নাল চাচার হাতে যেন জাদু আছে। তার হাতের চা মানে দূর্লভ অমৃত। যে একবার খাবে, সে নির্ঘাত মারা পড়বে চাচার চায়ের প্রেমে।
- চাচা এক কাপ চা আর একটা বেনসন দিয়েন।
- নিরব বাবা একখান কথা কই?
- একটা কেন চাচা? পাঁচটা বলুন না!
- তুমি আমারে চাচা ডাহো ক্যান? সবাই তো মামা ডাহে।
নিরব কিঞ্চিৎ হেসে বললো,
- সবাইকে আপন ভাবতে নেই চাচা। আপনি কাউকে আপন ভাববেন তো কষ্ট পাবেন।
- মানে ঠিক বুঝবার পারলেম না বাবা!
- চাচা আজকে আর বসবো না। আপনি আমাকে সিগারেটটা দেন শুধু।
- এই নেও বাবা।
.
- কিরে নিরব? এতো রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলি?
- আমি যেখানেই থাকি না কেন? তাতে তোমার কী?
- তুই ড্রিংকস করেছিস?
- সরো সামনে থেকে।
নিরব স্বাধীন ভাইকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। যেদিন মায়া তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। ঠিক সেদিন থেকে নিরবকে কখনও স্বাভাবিক হতে দেখেনি স্বাধীন ভাই।তিনি তাকে অনেক বুঝিয়েছেন, তবুও কোনো কাজের কাজ হয়নি। কিন্তু আজ নিরবের এমন অবস্থা দেখে তিনি কিছুটা অবাক হন। যেই ছেলেটা একসময় ড্রিংকস দেখলে বমি করে দিতো। সেই ছেলে আজ বারে গিয়ে মাতাল হয়ে বাসায় ফিরছে।
.
ভোরবেলা নিরবের ফোনটা বেজে উঠলো। নিরব এদিকে গভীর ঘুমে মগ্ন। স্বাধীন ভাই তাকে অনেকবার ডাকলো, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ না দেখে ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি মেয়েলি কণ্ঠ শুনতে পেলেন তিনি।
- কে বলছিলেন?
- নিরব, আমি ডাইনা।
- কোন ডাইনা? আর আমি নিরবের বড় ভাই।
- ও সরি ভাইয়া। একটু নিরবকে ফোনটা দেওয়া যাবে?
- ও ঘুমাচ্ছে, পরে ফোন দিও।
- আচ্ছা ভাইয়া।
.
নিরবের ঘুম ভাঙলো দুপুর দুইটার সময়। এর মধ্যে ডাইনা অনেকবার তাকে ফোন দিয়েছে। কিন্তু একবারও লাইনে পায়নি।
বিকেলে নিরব ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো ডাইনির অনেকগুলো মিসড কল। মেয়েটা সচরাচর তাকে কল করে না। নিশ্চয়ই কোনো জুরুরী দরকারে তাকে সে স্মরণ করেছে। নিরব ডাইনিকে কল ব্যাক করলো।
- কল করেছিলে?
- হ্যাঁ ভাইয়া। কিছু কথা ছিলো।
- বলো।
- মায়া আপনার সাথে দেখা করতে চায়।
- গগনচুম্বীরা কখনও নিম্নগামী হয় না ডাইনা।
- মায়া আমাকে অনেক রিকুয়েস্ট করেছিলো, যাতে আমি তার সাথে আপনাকে কথা বলিয়ে দেই।
- শুকনো পাতা কখনও পূর্বরূপে প্রতীয়মান হয় না।
- কী একটা যেন জুরুরী কথা ছিলো।
- তাকে বলবে, নষ্ট হয়ে যাওয়া বস্তু কারো উপকারে আসে না।
- ভাইয়া প্লিজ, আমার অনুরোধটা রাখবেন।
- অনুরোধ রাখলে আমার লাভ কী বোন?
- লাভ ক্ষতির কথা বলছেন কেন?
- যে ঝিনুকে মুক্তা থাকে না। সে ঝিনুকের কী মূল্য আছে?
- ভাইয়া আমি বুঝতে পারছি আপনার ব্যাপারটা।
- তবে অন্যের হয়ে কল করেছো কেন?
- মায়া আপু শেষ বারের মতো আপনার সাথে আরেকবার দেখা করতে চায়।
- ইচ্ছে নেই।
নিরব কল কেটে দিলো। পুরোনো ক্ষতে আঘাত করলে ক্ষতটা আবার মুখ বের করে সম্মুখে ভেসে ওঠে। নিরব সেই আঘাতটা আর পেতে চায় না।
.
- চাচা একটা চা দিয়েন।
- নিরব বাবা, তুমি এতদিন পর হঠাৎ? কই ছিলা বাবা?
- কাজের চাপ ছিলো চাচা।
- চাকরি বাকরি পাইছো নাকি?
- চাকরি করে বড়লোক হওয়া যায় না চাচা।
- এই নেও তুমার চা। তা কী করছো এহন?
- সময় হলে বলবো। একটা বেনসন দিয়েন।
পুরো বিকেলটা জয়নাল চাচার চায়ের দোকানে কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলো নিরব। স্বাধীন ভাই তখন বাইরে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলেন।
- কোথাও যাচ্ছো ভাই?
- এক বন্ধুর জন্মদিন ছিলো। চাইলে তুই যেতে পারিস আমার সাথে।
- বিনা দাওয়াতে কুকুরও খায় না।
- বড় হয়েছিস বটে, কিন্তু কথা বলার ধরণটা পরিবর্তন হয়নি তোর।
- হবে বলেও মনে হয় না।
- কেন? আজ বাদে কাল তোর বিয়ে করতে হবে। একটা পরিবার সামলাতে হবে।
- যার আমাকে প্রয়োজন, সে এই কথাতেই থাকবে।
- থাক, এখন যাই। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।
.
নিরব তার লক্ষ্য পূরণে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। আজ আর সে তার ভাইয়ের টাকায় খায় না, পড়ে না। বরং তার ভাইয়ের যখন টাকার প্রয়োজন হয়। তখন সে নিজেই তার ভাইকে টাকা দেয়। মায়া যে বিজনেস ম্যানের কথা তাকে বলেছিলো। ওসব বিজনেস ম্যান এখন তার হাতে নড়াচড়া করে।
পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে। নিরব এখন অনেক বড় একজন সফল বিজনেস ম্যান। গ্রাম থেকে সে তার বাবা মাকে ঢাকাতে নিয়ে এসেছে। খু্ব স্বাচ্ছন্দ্যেই দিন যাচ্ছে তার। প্রতিটি রাতে সে তার ডায়েরীতে পুরোনো দিনগুলো থেকে একটু একটু করে লিখে তার সেই অতীতের স্মৃতিগুলো ধরে রাখে।
আজ সে মায়াকে নিয়ে লিখতে বসেছে। প্রথম যেদিন মায়া তাকে প্রপোজ করার জন্য এসেছিলো, সেই দিনের ঘটনাগুলো সে লিখতে লাগলো..
- এইযে মিস্টার ভং ধরেন আপনি হু?
- আমাকে বলছেন?
- ভাব তো দেখছি আকাশ সম।
- ভাব না নিলে কী আপনি আসতেন এখানে?
- বাহ, কথাও তো বলতে পারেন দেখছি!
- চুইংগাম খাবেন?
- আপনার চুইংগাম আপনি খান।
- আপনি কী ভেবেছিলেন, আমি নিজের টাকায় কেনা চুইংগাম আপনাকে দেবো?
- আচ্ছা বেয়াদব তো আপনি?
- আপনিও বা কম কিসে?
- এতো বেশি কথা বলেন কেন হু?
- ওহে খালা, যা বলতে এসেছিলেন। তা বলে দ্রুত প্রস্থান করুন।
- ঐ ঐ শালা, খালা কে হ্যাঁ? আমাকে দেখে তোর খালা মনে হয়?
- মনে তো অনেক কিছুই হয়।
- পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবো।
- নিজেই ভাঙবেন? নাকি অন্যকে দিয়ে ভাঙাবেন?
- শালা তুই ক্যাম্পাস থেকে বের হ। তোর খবর আছে।
মেয়েটা রাগে গজগজ করতে করতে চলে যাচ্ছিলো। নিরব পেছন থেকে ডেকে বললো,
- কী যেন বলতে চেয়েছিলেন, বললেন না তো?
- তোর মাথা।
এটুকু লিখতে গিয়ে নিরব আনমনেই হেসে উঠলো। সে জানতো মেয়েটা তাকে প্রপোজ করার জন্যই এসেছিলো। কিন্তু প্রপোজ তো দূরের কথা। ভালো করে বিনয়ের সুরে কথাটুকুও বলতে পারলো না।
.
একদিন দুপুর বেলা নিরব ক্যাম্পাসের বড় কড়ই গাছটার নিচে বসে ছিলো। মায়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললো, নিরব আমি তোমাকে হারাতে চাই না? আমি তোমাকে ভালোবাসি নিরব।
নিরব মায়ার কথা শুনে মোটেও অবাক হয়নি। কেননা সে জানতো মায়া তাকে পছন্দ করে, ভালোবাসে।
- দেখো মায়া এটা সম্ভব না।
- কেন সম্ভব না?
- তোমার আর আমার অবস্থান আকাশ পাতাল তফাৎ।
- ভালোবাসার মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না।
- তুমি আর আমি সমবয়সী। তোমার সাথে আমার হবে না।
- হবে, ১০০% হবে।
- দেখো বোন, আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে। তোমার সাথে আমার যায় না।
- ভালোবাসতে কী বিত্তবান হতে হয় নিরব?
- এই প্রশ্নের উত্তর বর্তমানে আমার কাছে নেই। তবে কোনো এক সময় এর উত্তরটা তুমি নিজেই তৈরি করবে এবং আমাকে বলবে।
- আমি অতো কিছু জানি না। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না নিরব।
- এই কথা সবাই বলে। পরে তারাই সবার আগে আমাকে ছেড়ে চলে যায়।
- সবাই কী এক হয় নিরব?
- না, তা হয় না। তবে হতেই বা কতক্ষণ?
নিরব সেদিন অনিচ্ছাস্বত্তেও মায়াকে ভালোবাসতে বাধ্য হয়। দেড় বছর তাদের সম্পর্কটা খুব ভালোভাবেই কেটে যায়। দেড় বছরের মাথায় গিয়ে মায়ার মধ্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ফোন কলে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। হঠাৎ কল রিসিভ হলেও কড়া গলায় কথা বলে কল কেটে দেয়। নিরব অবশ্য এ নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি।
কিন্তু যেদিন মায়া তাকে সরাসরিই বলে দিলো 'তাকে ভুলে যেতে।' সেদিন নিরব যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। এই কী সেই মায়া? যে তাকে তার সবকিছু জানার পরেও ভালোবেসেছিলো! এই কী সেই মায়া? যে একটা মুহূর্ত তাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না!
নিরব কষ্ট পায় তখন, যখন মায়া বিজনেস ম্যান ছেলের কথা বলে। গগনচুম্বী চাতক এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য যেমন তার নির্দিষ্ট স্থান ত্যাগ করে উপরে উঠে একান্তে বৃষ্টির স্বাদ নিতে চায়। মায়াও হয়তো ঠিক তেমনই চেয়েছিলো।
.
- নিরব ওঠ ওঠ, আজ না তোর প্রোগ্রাম।আছে?
- যাও তা ভাই। এখন ডেকো না। আগে ঘুম, পরে প্রোগ্রাম।
- মাকে ডাক দেবো?
- তুমি কী আমার শত্রু?
- কেন?
- এই যে বললে মাকে ডাক দেবে! মাকে ডাক দিলে কী হবে জানো তুমি?
- কী আর হবে? কান ধরে টেনে তুলবে শুধু।
- এটাকে শুধু বলছো?
- ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখ কয়টা বাজে।
সকাল দশটা বাজে নিরবের একটা প্রোগ্রাম রয়েছে। অবশ্য প্রোগ্রামটা নিজের কোম্পানির নয়। সদ্য গড়ে ওঠা একটা কোম্পানির মালিক তাকে আমন্ত্রণ করেছেন। বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে ঠিক সেসময় পরিচিত একটা কণ্ঠের ডাকে সে ফিরে তাকায়। দেখে খানিক দূরে ডাইনা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে।
- ভাইয়া আপনি কোথায় ছিলেন এতদিন?
- সে খোঁজ জেনে লাভ কী তোমার?
- আমি আপনাকে কত খুঁজেছি জানেন?
- প্রয়োজন ছাড়া কেউ কখনও আমাকে খোঁজেনি।
- মায়া.....
- ডাইনা অযথা অপ্রয়োজনীয় আলাপ করার সময় আমার নেই।
- ভাইয়া শুনেন, শুনেন প্লিজ। একটা কথা বলেই চলে যাচ্ছি।
- হুম বলো।
- মায়া আপু নেই।
- সে জানি, সে তো এখন অন্যকারো।
- না, মায়া আপু এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
কথাটা শোনা মাত্রই নিরবের পুরো শরীরদ্বয় হিম হয়ে গেলো। সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
- মজা করছো নিশ্চয়ই!
- আপনার সাথে মজা করলে বেয়াদবি করা হবে?
- তাহলে মায়া সত্যি......
- হ্যাঁ সত্যি। পাঁচ বছর আগে আপনাকে একদিন বিকেলে কল করে বলেছিলাম, আপু আপনার সাথে দেখা করতে চায়। কিন্তু আপনি দেখা করেননি। সেদিন রাতেই আপু দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে যায়।
নিরব কোনো কথা বলছে না। সে নির্বাক হয়ে গিয়েছে। ডাইনা আবার বলতে শুরু করলো,
- মায়া আপু বিয়েও করেননি। কেননা বিয়ে করার কথাটা অযুহাত ছিলো মাত্র। আপুর ব্রেন টিউমার ছিলো। ডাক্তার বলেছিলেন, বেশি জোর আর বছর খানেক বাঁচবেন তিনি। আর এই কারণেই আপু আপনার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। আপনি তাকে কল করলে সে কড়া মেজাজে কথা বলতো, প্রায় সময়ই ওয়েটিং দেখাতো।
- তুমি এসব কথা আমাকে আগে বলোনি কেন?
- আমি তো বলতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু আপনিই তো শুনতে চাননি।
- মায়ার কাছে আমি অপরাধী হয়ে গেলাম ডাইনা।
- এই নিন এই চিঠিটা পড়ুন। মায়া আপু মৃত্যুর পূর্বে চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন আপনাকে চিঠিটা দিতে এবং আমার সামনে পড়তে।
নিরবের চোখের কোণে তখন জল টলমল করছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না, তার মায়া আর এই দুনিয়াতে নেই। নিরব চিঠিটা খুলে পড়তে আরম্ভ করলো....
প্রিয় নিরু
আমি ক্ষমাপ্রার্থী তোমার কাছে। তাছাড়া আমি কী করতাম বলো? আমি চাইনি তোমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাক। তোমার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। সেখানে আমি অন্ধকার হয়ে কিভাবে যেতে পারি বলো? তোমার সাথে যেদিন আমাদের সম্পর্কটা ছিন্ন করে চলে এসেছিলাম, বিশ্বাস করো সেদিন আমার হৃদয়টা ক্ষণে ক্ষণে কেঁদেছিলো। তোমার মায়ামাখা মুখটা বারবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো। কিন্তু আমার কিছু করার ছিলো না প্রিয়। ডাক্তার যেদিন বললেন আমার ব্রেন টিউমার হয়েছে। সেদিন থেকে আমি মাথা ঢেকে তোমার সাথে দেখা করতে যেতাম। আর সেদিন থেকেই তোমার সাথে যোগাযোগটা কমিয়ে দিতে থাকলাম। তোমার সাথে কথা বলার জন্য মনটা প্রায়শই ব্যাকুল থাকতো। তবু আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতাম। নিরু বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ঠিক আগের মতোই ভালোবাসি।
আর হ্যাঁ শুনো, এইযে ডাইনা মেয়েটাকে দেখছো। আমার অনুরোধ থাকবে, তুমি তাকে বিয়ে করে নিও। মেয়েটা অনেক ভালো। সেও তোমাকে পছন্দ করতো। কিন্তু কখনও বলার সাহস পেতো না। আর হ্যাঁ, তোমাদের মেয়ে হলে তার নাম রেখো "তিলোত্তমা।"
নিরু আমার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কেন? দমটা আটকে আসছে যেন। কলমটা আর নাড়াতে পারছি না। সব শেষে এটুকু বলবো, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আর ডাইনা মেয়েটাকে বিয়ে করে নিও, শেষ অনুরোধ রইলো আমার। আর তো কখনও কোনো কিছুর জন্য আবদার করতে পারবো না। আমার এই আবদারটুকু রেখো নিরু।
চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। মাথাটা ব্যাথাচ্ছে খুব। নিরু আমি তোমাকে ভালোবাসি।
ইতি
তোমার মায়া
.
চিঠিটার শেষ দিকের লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা। নিরবের অজান্তেই তার দু'চোখ বেয়ে কখন যে অশ্রুধারা বইতে শুরু করেছে, তা সে খেয়ালই করেনি। ডাইনা মেয়েটি তখনও দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
সে কী বলে নিরবকে সান্ত্বনা দেবে নিজেই বুঝে উঠতে পারছে না। কেননা সে জানতো না যে, তার মায়া আপু চিঠিতে এমন কিছু একটা লিখে যাবে।
.
বছর তিনেক পর...
- আব্বু আব্বু তুমি কুব পঁতা।
- এমনটা কেন মনে হলো আম্মু?
- আমাল চককেট কই?
- ও, এই কারণে আমার আম্মুটা মন খারাপ করেছে?
- হু?
- বাব্বাহ! আমার তিলোত্তমা দেখি রাগও করতে পারে! ডাইনা আমার আম্মুটার জন্য কিছু চকলেট নিয়ে এসোতো।
লেখক:- অলিভার কুইন (শুভ)।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now