বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

স্ক্রিনের ওপারে নীল আকাশ

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। মোবাইল ফোনটা রাশেদের হাত থেকে কখনো নামত না। অফিসে, বাসায়, এমনকি রাতের খাবারের টেবিলেও সে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে থাকত। তার ধারণা ছিল—এই ছোট্ট যন্ত্রটাই তাকে পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স—সবখানেই তার উপস্থিতি। শত শত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, হাজারো মতামতের ভিড়। তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করছিল। মানুষ যত বাড়ছে, সম্পর্কগুলো তত পাতলা হয়ে যাচ্ছে—এই বোধটা সে প্রথম টের পায় এক বিকেলের ঘটনায়। সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে বাসে বসে সে একটি পোস্ট দেখল। রাজনৈতিক বিষয়, তীব্র ভাষা, আবেগে ভরা। পোস্টের নিচে কমেন্টে আগুন। রাশেদও না ভেবে একটা মন্তব্য লিখে ফেলল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পাল্টা আক্রমণ। অচেনা নাম, অচেনা মুখ—তবু কী তীব্র ঘৃণা! সে বিস্মিত হয়ে দেখল, নিজের মধ্যেও অকারণ রাগ জমে উঠছে। যেন অন্যের মত মানেই তার শত্রুতা। বাসার জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো নিভে যাচ্ছিল, আর তার ভেতরে আলো নয়—অস্বস্তি বাড়ছিল। রাশেদের বন্ধু তালিকায় তাকালে দেখা যাবে, প্রায় সবাই তার মতোই ভাবে। একই খবর শেয়ার করে, একই কৌতুক, একই ক্ষোভ। ভিন্ন সুরের মানুষ খুব কম। সে কখনো ভেবে দেখেনি কেন এমন হলো। অ্যালগরিদম যে তার পছন্দ বুঝে বুঝে ঠিক তেমনই কনটেন্ট দেখাচ্ছে—সে জানত, কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি। এখন টের পেল, সে যেন এক কাঁচের ঘরে বাস করছে। বাইরে অন্য জগৎ আছে, কিন্তু তার কাছে পৌঁছায় না। এই ফিল্টার বাবলের ভেতর বসেই সে ভাবছে—সবাই তার মতোই ভাবে, আর যারা ভাবে না, তারা ভুল। একদিন হঠাৎ তার কলেজবন্ধু মেহেদীর সঙ্গে দেখা হলো। বহুদিন পর। মেহেদী ছিল ভিন্ন মতের মানুষ—শান্ত, প্রশ্নপ্রবণ। চায়ের দোকানে বসে কথা শুরু হলো। রাশেদ উত্তেজিত হয়ে সাম্প্রতিক এক ইস্যুতে নিজের মত জানাল। মেহেদী ধীরে বলল, “আমি একটু অন্যভাবে দেখি।” এই কথাটুকুই রাশেদের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিল। সে কথা বাড়াল, যুক্তি নয়—আবেগে। মেহেদী চুপচাপ শুনল। শেষে বলল, “তুমি রাগ করছ কেন? আমরা তো কথা বলছি।” সেই প্রশ্নে রাশেদ থমকে গেল। সে বুঝতে পারল, অনলাইনের ঝগড়ার ভঙ্গিটাই তার আচরণে ঢুকে পড়েছে। রাশেদ খেয়াল করল, সে এখন ধৈর্য হারাচ্ছে খুব দ্রুত। স্ক্রল করতে করতে চোখের সামনে ভেসে ওঠা উত্তেজক শিরোনাম, চটকদার ভিডিও—সবই যেন তার মনকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে শেখাচ্ছে। বিশ্লেষণের সময় নেই, শোনার আগ্রহ নেই। যে কনটেন্ট তাকে রাগায়, সেটাই বেশি মনোযোগ পায়। সে বুঝতে পারল, তার মনোযোগ যেন পণ্যে পরিণত হয়েছে। রাগ, ভয়, অভিমান—এই আবেগগুলোই তাকে স্ক্রিনে আটকে রাখছে। বাসায় তার মা একদিন বললেন, “তুই আগের মতো গল্প করিস না।” কথাটা হালকা, কিন্তু গভীর। রাশেদ লক্ষ্য করল, সে পরিবারের সঙ্গে থেকেও নেই। ফোনের ভেতরের মানুষগুলো যেন বেশি বাস্তব, আর সামনের মানুষগুলো ধূসর। সে আর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। স্ক্রিনের আড়ালে বসে মন্তব্য করা সহজ, কিন্তু সামনাসামনি বসে ভিন্নমত শুনতে গেলে একটা দায়িত্ব লাগে—সহনশীলতার দায়িত্ব। এক রাতে ঘুম আসছিল না। সে ফোন হাতে নিয়ে শুয়ে পড়ল। হঠাৎ এক পোস্ট চোখে পড়ল—একজন মনোবিজ্ঞানী লিখেছেন অনলাইন আচরণ নিয়ে। লেখা পড়তে পড়তে রাশেদের নিজের জীবনটাই চোখের সামনে ভেসে উঠল। অতিরিক্ত অনলাইন সময় কীভাবে সহমর্মিতা কমিয়ে দেয়, কীভাবে ভার্চুয়াল নিরাপত্তা মানুষকে নিষ্ঠুর করে তোলে—সব যেন তার গল্প। সে ভাবল, মুখের সামনে কাউকে অপমান করা কঠিন, কিন্তু নাম-ছবি লুকিয়ে অনলাইনে সেটা কত সহজ! পরদিন অফিসে গিয়ে সে সিদ্ধান্ত নিল, অন্তত নিজের জায়গা থেকে কিছু বদলাবে। প্রথমে ছোট কাজ। সে সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকজন ভিন্নমতাবলম্বী মানুষকে ফলো করল। তাদের লেখা পড়ল—মত না মিললেও মনোযোগ দিয়ে। প্রথম দিকে অস্বস্তি হলো। মনে হলো, কেউ তার বিশ্বাসে আঘাত করছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শিখল—ভিন্নমত মানেই শত্রু নয়। এক সন্ধ্যায় সে আবার মেহেদীর সঙ্গে দেখা করল। এবার সে আগে শুনল। প্রশ্ন করল। তর্ক করল না। কথা শেষে একটা অদ্ভুত শান্তি অনুভব করল। মত বদলায়নি সব, কিন্তু মনটা নরম হয়েছে। সে বুঝল, সহনশীলতা মানে সবকিছু মেনে নেওয়া নয়—শুনতে রাজি থাকা। রাশেদ তার অনলাইন সময় কমাতে শুরু করল। রাতে ফোন দূরে রেখে ঘুমাতে গেল। ছুটির দিনে সে হাঁটতে বেরোল। রাস্তায় মানুষের মুখ দেখল, কথা বলল। বাস্তব মানুষের চোখে যে আবেগ, যে দ্বিধা—সেটা কোনো ইমোজিতে ধরা পড়ে না। সে টের পেল, সহমর্মিতা ফিরে আসছে ধীরে ধীরে। একদিন সে নিজেই একটি লেখা পোস্ট করল। উত্তেজক নয়, আক্রমণাত্মক নয়। শিরোনাম—“ভিন্নমতকে ভয় পাই কেন?” লেখায় সে নিজের ভুল, রাগ, শেখার গল্প লিখল। আশ্চর্যভাবে, সেখানে ঝগড়া কম হলো। কয়েকজন দ্বিমত করল, কিন্তু ভাষা নরম। কেউ কেউ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করল। রাশেদ বুঝল—ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিজে ভালো বা খারাপ নয়; আমরা যেমন ব্যবহার করি, তেমনই হয়ে ওঠে। সময় গড়াল। রাশেদের পৃথিবী হঠাৎ বদলে যায়নি। এখনও রাগ আসে, এখনও ভুল হয়। কিন্তু এখন সে থামে। স্ক্রিনের ওপারে মানুষ আছে—এই বোধটা তার মধ্যে গেঁথে গেছে। সে জানে, সহস্র মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা মানেই বৈচিত্র নয়; বৈচিত্র আসে শুনতে শেখা থেকে। এক বিকেলে সে ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। নীল আকাশ—স্ক্রিনের নীল আলো থেকে আলাদা। তার মনে হলো, প্রযুক্তি তার জীবন থেকে যাবে না। কিন্তু সে আর প্রযুক্তির হাতে ধরা দেবে না। সে নিজেই ঠিক করবে—কখন যুক্ত হবে, কখন বিচ্ছিন্ন হবে। সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা, সহনশীলতা—এসব কোনো অ্যাপ নয়, এগুলো চর্চা। রাশেদ হাসল। স্ক্রিনের ওপারেও নীল আকাশ আছে—যদি চোখ তুলে তাকানো যায়।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১০৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ স্ক্রিনের ওপারে নীল আকাশ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now