বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হাসানের ঈদের শপিং হয়নি তাই হাসানের মনটা আজ ভিষন খারাপ, কারন কালকেই ঈদ। বড় হয়েছে তাই আগের মত চাইলেও এখন আর জেদ করে বাসা থেকে টাকা নিতে পারে না। কারণ এখন হাসান বুঝতে শিক্ষেছে পরিবারের আয় টা কোথা থেকে আসে আর কোথায় শেষ হয়।
.
বিশেষ করে হাসানের বাবার গত বছর হঠাৎ চলে যাবার পর থেকেই বড় ছেলে হিসাবে হাসান কে অনেকটা ছাড় দিয়ে চলতে হচ্ছে। পেনসনের সামান্য কটা টাকা দিয়ে সংসার চালানই দায় হয়ে পরেছে হাসানের মায়ের কাছে। তাই হাসানকে প্রতিনিয়ত বিসর্জন দিতে হচ্ছে তার সব ইচ্ছা আর বিলাশী চাহিদা গুলোকে।
.
এবার ঈদে শপিং না করার পিছনেও এই একটা কারণেই দায়ী। বুঝ হবার পর থেকে এমন কোন ঈদ যায়নি যেই ঈদে হাসান শপিং করেনি। কিন্তু এবারের ঈদটাই হাসানের জীবনে ব্যাতিক্রম। ঈদের দিন নতুন জামা না পড়ে ঈদের মাঠে যেতে হবে এই জিনিসটা যেনো হাসান মানতেই পারছে না।
.
মন খারাপ করে স্কুল মাঠের এক কোনায় বসে আছে সে। আর আনমনে বাবার কথা ভাবছে। বাবা বেচে থাকলে হয়ত ওর আজ এমনটা হতো না। যেখান থেকেই পারুক না কেনো বাবা ওকে টাকা ম্যানেজ করেই দিতো। কিন্তু বাবা বেচে থাকতে কখনো এসব কথা মনে করেনি হাসান। এমনকি কখনো বাবাকে বলেওনী বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু আজ এসব ভাবতেই ওর দুচোখ বেয়ে নেমে আসতে শুরু করলো অশ্রুধারা।
.
.
হঠাৎ কেউ একজন পেছন থেকে হাত রাখলো হাসানের কাধে। হকচকিয়ে উঠো চোখের পানি মুছে পেছন ফিরে তাকালো হাসান। পেছনে দাড়িয়ে আছে রাজু। রাজু হাসানদের ক্লাশের সব থেকে হাসিখুশি ছাত্র। ওকে আজ প্রর্যন্ত কেউ কখনো মন খারাপ করে থাকতে দেখেনি। বরং কারো কোন সমস্যা হলে ও যেন এগিয়ে আসে আলোকবর্তিকা হয়ে।
.
.
: কিরে হাসান,,,, মন রাখাপ নাকি তোর? (রাজু)
: নারে দোস্ত। (হাসান)
: তাহলে কাদছিস যে?
: কই নাতো।
: আমি কিন্তু সব দেখেছি।
: না মানে বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। গত বছর এরকম সময় বাবা আমাদের সাথেছিলো,কিন্তু আজ নেই।
.
: পাগল,,,, মানুষ মারা যাবে এটা স্বাভাবিক তাই বলে কি তাকে মনে করে কাদতে হবে।
: নারে, বাবা বেচে থাকতে কখনো বুঝিনী বাবা জিনিসটা আসলে কি । সব সময় মনে হতো বাবার হাত থেকে দূরে কোথাও চলে গেলে বেচে যাই ,তখন কেউ আর আমায় বকবে না। কিন্তু আজ যখন বাবা আমাদের রেখেই দূরে চলে গেলো তখন বুঝতে পারছি,,,, বাবা কত বড় ছাতার মত হয়েছিলো আমাদের মাথার উপর। রোদ, বৃষ্টি,ঝড় সব তিনি যেনো একাই হজম করতো। আমাদের কখনো বুঝতেই দিতোনা বাহিরের দুনীয়াটা কত আজব।
.
: বাপুরে, তোর দেখি আজ ভদ্র ছেলের মত পিতৃভক্তি জেগে উঠেছে। অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছি।
: বুঝলাম না তোর কথাটা।
: দেখ হাসান,,,, আমরা সন্তানেরা কখন বাবা মাকে মিস করি জানিস,,,, যখন তাদের ছাড়া আমরা অচল হয়ে পরি। আমরা আজীবন তাদের কাছে নিয়েই যাই। কিন্তু কখনো তাদের সামনে সন্তুষ্টির হাসিটাও দেইনা বরং একটা পেলে আরেকটা চাই। তুইও নিশ্চই আজ তোর বাবাকে ছাড়া চলতে পারছিস না। তাই মিস করছিস।
.
: অনেকটা তেমনি।
: আমার সাথে শেয়ার করবি ব্যপারটা?
: এবারি জীবনে প্রথম ঈদের শপিং করতে পারলাম না। বাবা নেই বলে এমনটা হলো। গত বছর বাবা অসুস্থ ছিলো তারপরো আমাকে শপিং করার টাকা দিয়েছিলো।
.
: ওহহ এই ব্যপার
: সব বন্ধুরা কত কিছু কিনেছে জানিস,,, সবাই মেসেন্জারে শপিংয়ের পিক দিচ্ছে। কিন্তু আমার অবস্থাটা দেখ। নতুন জামা ছাড়া নামাজ পরতে যাবো কি করে বল। আল্লাহ কেনো আমার বাবাকেই তুলে নিলো, এত মানুষ দুনিয়ায় থাকতে আমার সাথে কেন এমনটা ঘটলা। আমার ভাগ্যটা এতখারাপ কেনো?
: হা হা হা।
: আমার কষ্টের কথা শুনে তোর হাসি পেলো রাজু।
: তো কি আর পাবে বল।
: যা তোর কিছুই পেতে হবে না। তুইতো দুনিয়ার সব থেকে সুখি মানুষ তুই আমার কষ্টটা বুঝবি না।
.
: আমি না বুঝলে তোর এই কষ্টটা দুনিয়ার আর কেউ আর বুঝবে না।
: বুঝলে এভাবে হাসতিস না।
: হাসান তুই যে বললি না আমি দুনিয়ার সব থেকে সুখী মানুষ। তোর কথাটা সত্য। আমি সব কিছুপরো এত সুখি থাকি কারণ আমি আমার থেকে কষ্টে থাকা মানুষদের সাথে আমার তুলনা করি।
: মানে?
.
: হাসান তুই বোধ হয় জানিস না আমার বাবা নেই। একদম ছোট বেলা থেকেই নেই। বুঝ হবার পর থেকে আব্বুকে আমি দেখিনী। আর আব্বুর মৃত্যুর ১ বছরের মাথায় আম্মুকে নানু জোর করে অন্যখানে বিয়ে দিয়ে দেয়। তখন থেকেই আমি নানু বাড়িতে থাকি। তোরা যেইটাকে আমার বাড়ি হিসাবে জানিস সেটা আসলে আমার বাড়ি নয়। সেটা আমার নানু বাড়ি।
.
একা চলতে শেখার সময় থেকেই আমি কখনো না পাইছি বাবার আদর , না পাইছি মায়ের ভালোবাসা।তখন এসব তেমন একটা না বুঝলেও জীবনে প্রথম বাবা-মার অভাব বোধ করতে শুরু করি যখন আমি ক্লাশ ওয়ানে পড়ি। মনে আছে তোর, আমরা মডেল স্কুলে পড়তাম। মডেল স্কুলে প্রতিদিন সবার বাবা না হলে মা এসে রেখে যেতো এবং নিয়ে যেতো। তোকেও আন্কেল গিয়ে নিয়ে আসতো।
.
প্রতিদিন ছুটির পর আমি ভাবতাম সবার আব্বু-আম্মু আসে চিপস কিনে দেয়, কোলে করে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু আমার আব্বু আম্মু কেনো আসেনা। মাঝে মাঝে ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করেই বসতাম, "মামা আমার আব্বু আম্মু কেনো আসে না। আমার কি আব্বু আম্মু নেই। সবার আছে আমার কেনো নেই। আমাকে একটা আব্বু-আম্মু কিনে দিবা। "
.
মামা শুধু আমার মুখের দিকে ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকতো। আর হয়ত ভাবতো, "কি করে তোকে বোঝাই, আব্বু-আম্মু কিনতে পাওয়া যায় না। "
.
.
তুই একবার ঈদে শপিং হয়নি জন্য মন খারাপ করে আছিস। আরে হাসান আমি শেষবার কবে ঈদে শপিং করেছিলাম মনেই পড়ে না। তোরাতো নিজের বাসায় থাকিস ইচ্ছা মত যা খুশি করিস। স্কুল আসার সময় টিফিনের টাকা নিস। বিকালে বের হলে রিক্সা ভাড়া নিস।
.
কিন্তু আমার দিকে দেখ। আমি মামাদের সংসারে থাকি। বুঝিসতো ধানখেতে ধান গাছ ব্যাতিত বাকি সব আগাছা। ঠিক তেমনি সংসারে নিজের সন্তান ছারা বাকিরা ঝামেলা। আমিও তেমন সবার মধ্যে ঝামেলা হয়েই থাকি। উঠতে বসতে মামিদের কটু কথা শুনতে হয়। যতক্ষন বাসায় থাকি, কোন না কোন কাজ করতেই হয়। বাজার করা থেকে শুরু করে দোকানে বসা, সব আমি করি। সমযের অভাবে পরীক্ষার সময়ও ঠিক মত পড়াশুনা করতে পারিনা। তাইতো পরীক্ষাতে খুব একটা ভালো করতে পারি না। কিন্তু একটা জিনিস জানিস হাসান,,,, এত কিছুর পরেও আমি সুখী,,,, এবং সব সময় হাসি খুশি থাকি। কিভাবে জানিস?
.
.
: কিভাবে? (হাসান)
: মামার হোটেলে একটা ছেলে কাজ করে নাম চুন্নু, ওকে দেখে।
: বুঝলাম না।
: চুন্নুরো আমার মত বাবা নেই। বাবা মারা যাবার পর ওর মা ওকে ওর দাদু বাড়িতে রেখে অন্য একজনের হাত ধরে চলে যায়। ওর যখন ৮ বছর বয়ষ তখন চুরীর অপবাদ দিয়ে ওর চাচী ওকে বাসা থেকে বের করে দেয়। তারপর থেকেই ও মামার হোটেলে কাজ করে। থাকার জায়গা নেই। তাই রাতে হোটেলের বেঞ্চ জোরা দিয়ে ঘুমায়। সারাদিন হোটেলে কাজ করে তিনবেলা খাবার খায়। দিনের শেষে ৫০ টাকা পায়।
.
কিন্তু আমার দিকে দেখ। আমি চুন্নুর থেকে অনেক বেটার আছি। আমার থাকার জন্য একটা রুম আছে। তিন বেলা খাচ্ছি। স্কুলে যাচ্ছি। মন চাইলে তোদের সাথে আড্ডা দিতে পারছি। এর চেয়ে বেশি আর কি দরকার বল। আল্লাহ চাইলে তো আমাকে চুন্নুর থেকেও খারাপ অবস্থায় রাখতে পারতো। কিন্তু রাখেনি তাই আমি আল্লাহর কাছে শুকরীয়া আদায় করি। আর নিজেকে পৃথীবির অনেক দূর্ভাগার থেকে ভালো ভাবি এবং সুখী অনুভব করি।
.
.
রাজুর কথা শুনেই হাসানের মনে পড়লো আরব্যরজনীর সেই বিখ্যাত উপন্যাসের কথা। ""জুতাবিহীন একটা লোক দুঃখ করতে করতে রাস্তা পার হচ্ছিলো, আর গরীব বানানোর জন্য স্রষ্টাকে দোষ দিচ্ছিলো। হঠাৎ সে দেখলো একটা লোকের পা নেই। আর ঠিক তখনী সে তার দুঃখ ভুলে গেলো। কারণ স্রষ্টা তাকে জুতা কিনার ক্ষমতা না দিলেও দুইটা পা দিয়েছিল।"
.
আর এটা ভেবেই হাসান রাজুকে জরীয়ে ধরলো আর মনে মনে বললো ধন্যবাদ দোস্ত তুই আমার চোখ খুলে দিলি।
.
.
" নিজের দুঃখে কষ্ট পেয়ে নিজের ভাগ্য কিংবা স্রষ্টাকে দোষারোপ করার আগে আমাদের উচিৎ আমাদের থেকেও যারা কষ্টে আছে তাদের কথা একবার ভাবা। তাহলেই দেখবেন আমরা সুখে আছি। মানুষ চাইলেই অর্থ উপার্জন করতে পারে, কিন্তু সুখ নয়। যেই সুখ ২০০ টাকা রোজগার করা রিক্সাওয়ালার ঘরে থাকে, তা অনেক সময় ২০০ কোটি টাকার মালিক শিল্পপতির ঘরে নাও থাকতে পারে। যেই শান্তির ঘুম ফুটপাতে হয়, সেই শান্তি লাখটাকার নরম বিছানায় ঘুমের ঔষুধ খেয়েও হয়ত হয়না। তাই নিজে সেই অবস্থায় আছেন, সেই অবস্থানের কারনে স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিন । দেখবেন আপনিই রাজুর মত শত কষ্ট উপেক্ষা করেও পৃথিবীর অন্যতম সুখী মানুষ। "
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now