বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সর্বোত্তমের সন্ধানে

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ। গ্রামের নাম শালবনপুর। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে একটি সরু কাঁচা রাস্তা, আর রাস্তার একপাশে বাঁশঝাড়ের আড়ালে ছোট্ট একটি টিনের ঘর। সেখানেই থাকত রফিক ও তার বাবা হাশেম আলী। মা মারা গেছেন বহু বছর আগে। হাশেম আলী ছিলেন পেশায় একজন মুচি। সারাদিন মানুষের ছেঁড়া জুতো সেলাই করে যা আয় হতো, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। টিনের ঘরে বৃষ্টি পড়লে টপটপ করে পানি ঝরত, শীতকালে বাতাস ঢুকত, আর গ্রীষ্মে ঘর হয়ে উঠত আগুনের মতো গরম। তবুও সেই ঘরেই ছিল তাদের হাসি, দুঃখ, স্বপ্ন আর সংগ্রাম। একদিন বিকেলে কাজ থেকে ফিরে হাশেম আলী দেখলেন, রফিক উঠোনে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে এক ধরনের হাহাকার। পাশের বাড়ির ধনী ব্যবসায়ী করিম সাহেব নতুন দোতলা বাড়ি করেছেন। রঙিন বাতি, নরম সোফা, বড় ফ্রিজ—সব দেখে রফিকের মনে এক অদৃশ্য বেদনা জন্মেছে। সে বাবাকে বলল, “বাবা, আমাদের কপালে কি কখনো ভালো ঘর জুটবে না? আমরা কি কোনোদিন ভালো খাবার খেতে পারব না?” হাশেম আলী মৃদু হাসলেন। তিনি জানতেন, ছেলের মন আজ হালকা নয়। সেদিন সন্ধ্যায় ভাতের হাঁড়ি নামিয়ে তিনি রফিককে পাশে বসালেন। কেরোসিনের বাতির আলোয় তার মুখটা যেন আরও শান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি বললেন, “শোনো রফিক, জীবনে তিনটি বিষয়ে কখনোই আপোষ করবে না—সর্বোত্তম খাবার খাবে, সর্বোত্তম বিছানায় ঘুমাবে এবং সর্বোত্তম ঘরে বসবাস করবে।” রফিক বিস্মিত চোখে তাকাল। “কিন্তু বাবা, আমরা তো গরিব! এসব তো কেবল ধনীদের পক্ষেই সম্ভব। আমি চাইলেও তো এগুলো করতে পারব না।” হাশেম আলী ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন, “সর্বোত্তম মানে সবসময় দামী নয়। সর্বোত্তম মানে সত্যিকারের, পবিত্র আর পরিশ্রমের ফল।” তারপর তিনি ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করলেন—“যদি তুমি কেবল তখনই খাও যখন সত্যিকারের ক্ষুধা লাগে, আর সেই খাবার যদি আসে সৎ উপায়ে—অন্য কাউকে ঠকিয়ে নয়, চুরি করে নয়—তাহলে যা খাবে সেটাই হবে পৃথিবীর সর্বোত্তম খাবার। যদি তুমি পরিশ্রম করো আর ক্লান্ত হয়ে ঘুমাও, তাহলে তোমার মাটির খাটও হয়ে উঠবে রাজপ্রাসাদের বিছানা। আর যদি তুমি মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তাদের কষ্টে পাশে দাঁড়াও, তাহলে তুমি তাদের হৃদয়ে বাস করবে—সেটাই হবে তোমার সর্বোত্তম ঘর।” সেদিনের কথাগুলো রফিকের মনে গেঁথে গেল। কিন্তু সে তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি বাবার কথার গভীরতা। সময়ের চাকা ঘুরতে লাগল। রফিক স্কুলে ভালো ছাত্র ছিল। কিন্তু অনেক সময় টিফিনের সময় তার কাছে টাকা থাকত না। একদিন তার সহপাঠী সোহেল লুকিয়ে দোকান থেকে বিস্কুট চুরি করে এনে তাকে দিল। রফিকের খুব ক্ষুধা লেগেছিল। কিন্তু বাবার কথা মনে পড়ে গেল—“সৎ উপায়ে আসা খাবারই সর্বোত্তম।” সে বিস্কুট নিতে অস্বীকার করল। সোহেল বলল, “এতে কি হবে? দোকানদার তো বুঝবেও না।” রফিক দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমি না খেয়ে থাকব, তবুও চুরি করা খাবার খাব না।” সেদিন সে ক্ষুধার্তই বাড়ি ফিরল। কিন্তু রাতে যখন বাবার সাথে বসে ভাত-ডাল খেল, সেই সাধারণ খাবার তার কাছে অদ্ভুত স্বাদের মনে হলো। যেন ভাতের প্রতিটি দানায় ছিল আত্মসম্মানের মিষ্টি গন্ধ। কয়েক বছর পর রফিক কলেজে উঠল। পড়াশোনার খরচ জোগাতে সে বিকেলে টিউশনি করত। দিনের শেষে শরীর ভেঙে পড়ত। এক রাতে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে মাটির খাটে শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে ঝড় হচ্ছিল, টিনের চাল কাঁপছিল, তবুও তার ঘুমে কোনো ব্যাঘাত হলো না। সকালে উঠে সে অনুভব করল—এই ঘুম যেন কোনো নরম গদির বিছানার চেয়েও আরামদায়ক ছিল। বাবার কথা আবার মনে পড়ল—“পরিশ্রমের ঘুমই সর্বোত্তম বিছানা।” কলেজ শেষে রফিক শহরে চাকরি পেল। ছোট একটি অফিসে হিসাবরক্ষকের কাজ। প্রথম মাসের বেতন হাতে পেয়ে সে আনন্দে কেঁদে ফেলল। সে চাইলে শহরে ভালো একটি বাসা নিতে পারত, দামি খাবার খেতে পারত। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত নিল—প্রথমে গ্রামের ঘরটি মেরামত করবে। সে বাবার টিনের চাল পাল্টে নতুন চাল দিল, দেয়ালে রং করল, আর একটি কাঠের দরজা লাগাল। হাশেম আলীর চোখে তখন জল। তিনি বললেন, “তুই আজ আমার ঘরকে রাজপ্রাসাদ বানিয়ে দিলি।” রফিক মৃদু হেসে বলল, “না বাবা, এই ঘর তো আগেই রাজপ্রাসাদ ছিল। কারণ এখানে সততা ছিল, ভালোবাসা ছিল।” অফিসে রফিক খুব সৎভাবে কাজ করত। একদিন তার বস তাকে বললেন, “এই ফাইলটায় কিছু হিসাব একটু ঘুরিয়ে দাও। এতে কোম্পানির লাভ হবে।” রফিক বুঝল, এটা অসৎ কাজ। সে বিনয়ের সাথে বলল, “স্যার, আমি ভুল হিসাব দেখাতে পারব না।” বস রেগে গেলেন। কিছুদিনের মধ্যেই রফিক চাকরি হারাল। সহকর্মীরা বলল, “তুই বোকা! একটু হিসাব পাল্টালেই তো কিছু হতো না।” রফিক শুধু হাসল। তার মনে পড়ল বাবার কথা—সর্বোত্তম খাবার, সর্বোত্তম বিছানা, সর্বোত্তম ঘর। চাকরি হারিয়ে সে ভেঙে পড়েনি। বরং গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিল। বেতন কম, কিন্তু সম্মান বেশি। সে ছাত্রদের শুধু পড়াশোনা শেখাত না; শেখাত সততা, পরিশ্রম আর মানবিকতা। ধীরে ধীরে সে গ্রামের সবার প্রিয় হয়ে উঠল। কেউ অসুস্থ হলে সে ছুটে যেত, কারো ছেলে পড়ায় পিছিয়ে পড়লে বিনা পয়সায় পড়াত। একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধা তাকে বললেন, “বাবা রফিক, তুই আমাদের ঘরের ছেলে। তোর জন্য দরজা সবসময় খোলা।” রফিক তখন উপলব্ধি করল—সে সত্যিই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই ভালোবাসার ঘর কোনো ইট-পাথরের ঘরের চেয়ে অনেক বড়। বছর কয়েক পর হাশেম আলী অসুস্থ হলেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি ছেলের হাত ধরে বললেন, “তুই কি আমার কথা রাখতে পেরেছিস?” রফিকের চোখ ভিজে উঠল। সে বলল, “বাবা, আমি দামী খাবার খাইনি, কিন্তু সৎ উপায়ে যা পেয়েছি তাই খেয়েছি। আমি নরম বিছানায় ঘুমাইনি, কিন্তু পরিশ্রমের ঘুমে শান্তি পেয়েছি। আর আমি মানুষের ভালোবাসায় যে ঘর পেয়েছি, তা কোনো প্রাসাদের চেয়ে কম নয়।” হাশেম আলী তৃপ্তির হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। বছর গড়িয়ে গেল। রফিক এখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার নিজেরও একটি ছোট পরিবার হয়েছে। কিন্তু সে এখনও সাধারণ জীবনযাপন করে। একদিন তার ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমরা কি কখনো বড় বাড়িতে থাকব?” রফিক মৃদু হেসে ছেলেকে কোলে তুলে বলল, “আমরা তো বড় বাড়িতেই আছি—মানুষের হৃদয়ে।” সেদিন সন্ধ্যায় স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গ্রামের মানুষ রফিককে সম্মাননা দিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে বলল, “সর্বোত্তম জিনিসের জন্য অর্থ নয়, প্রয়োজন সততা ও পরিশ্রম। ক্ষুধার পর সৎ খাবারই শ্রেষ্ঠ। ক্লান্তির পর ঘুমই শ্রেষ্ঠ বিছানা। আর মানুষের ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ ঘর।” শালবনপুর গ্রামের মানুষ তখন হাততালি দিল। কেরোসিনের বাতির আলোয় যে শিক্ষা শুরু হয়েছিল, তা আজ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। রাতের আকাশে তারা জ্বলছিল। রফিক মনে মনে বাবাকে বলল—“তুমি ঠিকই বলেছিলে, বাবা। সর্বোত্তম কখনো দামের মধ্যে নয়; তা লুকিয়ে থাকে চরিত্রের ভেতর।” আর সেই রাতেই সে উপলব্ধি করল—মানুষের জীবনে প্রকৃত সমৃদ্ধি আসে ভেতরের সততা, পরিশ্রম আর ভালোবাসা থেকে। যার কাছে এই তিনটি আছে, তার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে দামী খাবার, সবচেয়ে নরম বিছানা আর সবচেয়ে বড় ঘরও তুচ্ছ হয়ে যায়। সর্বোত্তমের সন্ধান তাই বাইরে নয়—নিজের ভেতরেই।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ১২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সর্বোত্তমের সন্ধানে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now