বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সোনার সিঁড়ির প্রজাতন্ত্র

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ আমাদের দেশের নাম ছিল না। অন্তত মানচিত্রে ছিল, কিন্তু মানুষ সেটিকে নানা নামে ডাকত। কেউ বলত “উন্নয়নপুর”, কেউ বলত “অগ্রগতিস্তান”, আবার কেউ কেউ ফিসফিস করে বলত “সিঁড়ির প্রজাতন্ত্র”। কারণ দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল সংসদ ভবন, আদালত কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; ছিল এক বিশাল সোনার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকত, মেঘ ছুঁয়ে। প্রচার করা হতো—এই সিঁড়ি বেয়ে উঠলেই দেশসেবা করা যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যারা সিঁড়ি বেয়ে উঠত, তাদের পকেট ভারী হতে থাকত আর দেশের পকেট হালকা হতে থাকত। সিঁড়িটির নিচে একটি বড় ফলক ছিল। সেখানে লেখা ছিল—“জনগণের কল্যাণে নির্মিত।” তবে কেউ খেয়াল করত না যে ফলকের নিচে ছোট অক্ষরে আরেকটি লাইন আছে—“শর্ত প্রযোজ্য।” প্রতি পাঁচ বছর পরপর দেশে “মহা আরোহন উৎসব” হতো। উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল কে কত দ্রুত সোনার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে পারে। প্রতিযোগীরা নিজেদের রাজনীতিবিদ বলত। তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করত—“আমি উঠব জনগণের জন্য”, “আমি উঠব ন্যায়বিচারের জন্য”, “আমি উঠব দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে।” জনগণ হাততালি দিত। তারপর দেখা যেত, সিঁড়ির মাঝামাঝি পৌঁছানোর পর তাদের কণ্ঠস্বর বদলে গেছে। তারা তখন বলতে শুরু করেছে—“আসলে জনগণের জন্য কাজ করতে হলে আগে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হয়।” দেশের মানুষ এই দৃশ্য বহুবার দেখেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা দেখেও দেখতে পেত না। কারণ নির্বাচনের সময় প্রত্যেক দল তাদের সমর্থকদের বিশেষ এক ধরনের চশমা উপহার দিত। কেউ লাল চশমা, কেউ সবুজ, কেউ নীল। সেই চশমা পরলে নিজের দলের নেতার মুখে দেবদূতের আভা দেখা যেত আর প্রতিপক্ষকে শয়তানের মতো লাগত। মজার বিষয় হলো, চশমা খুলে কেউ কিছু দেখতে চাইত না। কারণ সত্য দেখা কষ্টকর, পক্ষ দেখা আরামদায়ক। একদিন রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে এক বৃদ্ধ বই বিক্রেতা একটি দোকান খুললেন। দোকানের নাম দিলেন “চশমাহীন দৃষ্টি কেন্দ্র”। তিনি বিনা মূল্যে মানুষকে আয়না দেখাতেন। আয়নায় মুখ নয়, বিবেক দেখা যেত। প্রথম দিনেই কিছু মানুষ ভিড় করল। তারা আয়নায় দেখে অবাক হলো—যে নেতাকে এতদিন সাধু ভাবত, তিনি আসলে দুই হাতে জনগণের পকেট কাটছেন। যে নেতাকে দানব ভাবত, তিনি একই কাজ করছেন, শুধু অন্য হাত দিয়ে। খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আতঙ্কিত হয়ে গেল। তারা জরুরি বৈঠক ডাকল। বৈঠকে সব দলের নেতারা উপস্থিত। বাইরে তারা একে অন্যকে বিশ্বাসঘাতক বলে গালি দিত, কিন্তু ভেতরে সবাই একই টেবিলে বসে চা খেত। বৈঠকের সভাপতি বললেন, “দেশের জন্য ভয়ংকর একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।” একজন নেতা জিজ্ঞেস করলেন, “সীমান্তে যুদ্ধ?” “না।” “অর্থনৈতিক সংকট?” “না।” “তাহলে?” সভাপতি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “কিছু মানুষ সত্য দেখতে শুরু করেছে।” কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। একজন প্রবীণ নেতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এটা চলতে দেওয়া যায় না। মানুষ যদি সত্যিই দেখতে শুরু করে, তাহলে সিঁড়ির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।” সিদ্ধান্ত হলো, বৃদ্ধ বই বিক্রেতাকে “জাতীয় হতাশাবাদী” ঘোষণা করা হবে। পরদিন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলো—তিনি উন্নয়নের শত্রু, অগ্রগতির বিরোধী, এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ। জনগণের একাংশ তা বিশ্বাস করল। আরেক অংশ বিশ্বাস করল না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তর্কে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সত্য কোথায়, সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না। এদিকে সোনার সিঁড়ি আরও উঁচু হতে লাগল। প্রতি বছর তার একটি নতুন ধাপ যোগ হতো। নতুন ধাপের নাম দেওয়া হতো—“বিশেষ প্রকল্প”, “অগ্রাধিকার কর্মসূচি”, “জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ” ইত্যাদি। প্রতিটি ধাপ নির্মাণে কোটি কোটি টাকা খরচ হতো। আশ্চর্যের বিষয়, কাজ শেষ হওয়ার পরও সিঁড়ি আগের মতোই দেখাত। তবে যারা কাজের দায়িত্বে ছিল, তাদের বাড়ি-গাড়ি এবং ব্যাংক হিসাবের আকার দৃশ্যমানভাবে পরিবর্তিত হতো। দেশের এক তরুণ সাংবাদিক এই রহস্য অনুসন্ধান করতে গেলেন। তিনি দেখলেন, সিঁড়ির প্রতিটি ধাপের ভেতর ফাঁপা। সোনার প্রলেপ আছে, কিন্তু ভেতরে বালু। তিনি রিপোর্ট লিখলেন—“সোনার সিঁড়ির ভেতরে বালুর সাম্রাজ্য।” কিন্তু রিপোর্ট প্রকাশের আগেই তার সম্পাদক ফোন পেলেন। ফোনের ওপাশ থেকে বলা হলো, “জাতীয় স্বার্থে কিছু সত্য গোপন রাখা উচিত।” পরদিন পত্রিকায় রিপোর্টটি ছাপা হলো না। তার বদলে প্রকাশিত হলো একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র—“বিশ্বের সেরা সিঁড়ি নির্মাণে আমাদের সাফল্য।” এভাবে বছর কেটে গেল। একসময় দেশে এক বিশাল গণ-জাগরণ ঘটল। মানুষ রাস্তায় নামল। তারা বলল, “আর নয়। এবার আমরা হিসাব চাই।” সোনার সিঁড়ির নিচে লক্ষ লক্ষ মানুষ জড়ো হলো। রাজনীতিবিদরা ভয়ে কাঁপতে লাগল। অনেকেই ভাবল, এবার হয়তো সিঁড়ি ভেঙে ফেলা হবে। কিন্তু ঘটনা অন্য দিকে মোড় নিল। কিছুদিন পর নতুন কিছু মুখ দেখা গেল। তারা বলল, “পুরোনো আরোহীরা খারাপ ছিল। আমরা ভালো। আমাদের হাতে সিঁড়ি নিরাপদ।” জনগণ আশাবাদী হলো। নতুন আরোহীরা সিঁড়িতে উঠল। প্রথম কয়েক দিন তারা বিনয়ী ছিল। তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছবি তুলল, চায়ের দোকানে বসল, সাদামাটা পোশাক পরল। জনগণ মুগ্ধ হলো। কিন্তু সিঁড়ির একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল। যে-ই এর দশম ধাপে উঠত, তার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যেত। সে ভুলে যেত কেন উঠেছিল। পনেরোতম ধাপে পৌঁছালে সে ভুলে যেত জনগণের মুখ। আর বিশতম ধাপে পৌঁছালে সে শুধু টাকার ভাষা বুঝত। ফলে কিছুদিন পর দেখা গেল নতুন আরোহীরাও পুরোনোদের মতো আচরণ করছে। কেউ সরকারি জমি দখল করছে, কেউ আত্মীয়স্বজনকে সুযোগ দিচ্ছে, কেউ উন্নয়নের নামে উন্নয়নকে গিলে খাচ্ছে। জনগণ হতাশ হলো। একদিন শহরের এক স্কুলছাত্র তার শিক্ষককে প্রশ্ন করল, “স্যার, সিঁড়ি কি মানুষকে বদলে দেয়?” শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “না, বাবা। সিঁড়ি মানুষকে বদলায় না। সিঁড়ি শুধু মানুষ আসলে কী, তা প্রকাশ করে।” ছাত্রটি বলল, “তাহলে আমরা সিঁড়ি ভাঙি না কেন?” শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “কারণ সবাই মনে মনে একদিন সিঁড়িতে উঠতে চায়।” এই উত্তর শুনে পুরো শ্রেণিকক্ষ নীরব হয়ে গেল। ক্রমে দেশের মানুষ বুঝতে শুরু করল, সমস্যা শুধু আরোহীদের নয়; সমস্যা দর্শকদেরও। তারা নেতাকে নেতা হিসেবে নয়, দেবতা হিসেবে দেখেছে। প্রশ্নকে বিশ্বাসঘাতকতা ভেবেছে। সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করেছে। নিজেদের দল ভুল করলে চোখ বন্ধ করেছে, প্রতিপক্ষ ভুল করলে মিছিল করেছে। ফলে সোনার সিঁড়ি শুধু রাজনীতিবিদদের সৃষ্টি নয়; এটি ছিল সমষ্টিগত ভ্রমের স্মৃতিস্তম্ভ। এক বর্ষার রাতে বজ্রপাত হলো। প্রবল শব্দে সোনার সিঁড়ির একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ল। মানুষ ছুটে এলো। তারা দেখল, ভেতরে সোনা নয়, কাদা। বহু বছরের রঙ, প্রলেপ আর প্রচারণার নিচে লুকিয়ে ছিল কেবল কাদা। জনতা হতবাক। এক বৃদ্ধা বললেন, “আমরা এতদিন কাদাকে সোনা ভেবে পূজা করেছি!” এক কৃষক উত্তর দিলেন, “না মা, আমরা জানতাম এটা কাদা। শুধু স্বীকার করতে চাইনি।” পরদিন দেশের সব সংবাদপত্রে বড় শিরোনাম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে খবরটি কোথাও প্রকাশিত হলো না। তার বদলে শিরোনাম এল—“সিঁড়ির ঐতিহাসিক সাফল্যে জাতির গর্ব।” মানুষ হেসে ফেলল। অনেক দিন পর তারা প্রথমবার একসঙ্গে হাসল। সেই হাসি ছিল ব্যঙ্গের, বেদনার এবং আত্মসমালোচনার। কারণ তারা বুঝে গেছে—ক্ষমতা শুধু ডান হাত থেকে বাম হাতে গেলে পরিবর্তন হয় না। সিঁড়ির মালিক বদলালেই দেশ বদলায় না। বদলাতে হয় সিঁড়ির উদ্দেশ্য, আর তার চেয়েও বেশি বদলাতে হয় দর্শকের চোখ। তারপর থেকে দেশে একটি নতুন প্রবাদ চালু হলো— “যে নেতা সিঁড়িতে ওঠার আগে সবচেয়ে বেশি দেশপ্রেমের কথা বলে, তার পকেট আগে পরীক্ষা করো।” আরেকটি প্রবাদও জনপ্রিয় হলো— “দলের চশমা খুলে যে দেশকে দেখে, সেই-ই প্রকৃত দেশপ্রেমিক।” সোনার সিঁড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে। নতুন নতুন আরোহী আসে, নতুন নতুন স্লোগান দেয়, নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি শোনায়। কিন্তু সিঁড়ির নিচে এখন একটি ছোট ফলক ঝুলে আছে। কে লাগিয়েছে কেউ জানে না। সেখানে লেখা— “সতর্কীকরণ: এই সিঁড়িতে উঠলে চরিত্রের পরীক্ষা হবে। অনেকেই উত্তীর্ণ হওয়ার ভান করে, কিন্তু খুব কম মানুষই সত্যিই উত্তীর্ণ হয়।” আর ফলকের নিচে আরও ছোট অক্ষরে লেখা— “দয়া করে দলের চশমা খুলে পড়ুন।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সোনার সিঁড়ির প্রজাতন্ত্র

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now