বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ।
নানান রঙে ভরা শহর, মানুষে ভরা রাস্তাঘাট, আলো–আঁধারির খেলা। সেই শহরেরই এক কোণে, বন্ধুর মতো আপনজন ফরহাদের সংসার নিয়ে এখন দোটানায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। কী বলব তাকে? কোন পথে ঠেলে দেব তাকে—ভাঙনের পথে, নাকি জোড়ার পথে?
ফরহাদের বিয়ের বয়স হয়েছে এক বছর। তার বউ, শিউলি, শিক্ষিত, ভদ্র এবং সাংসারিক। প্রথম যেদিন শিউলিকে দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল, তার চোখে এক ধরনের শান্তি আছে, যেন ভরসার এক আশ্রয়। বাড়ির বড়রা বলত, শিউলি সংসারী মেয়ে। বিয়ের পরে তারা সবাই দেখেছে—সে সত্যিই কতটা স্বামীভক্ত, শাশুড়িকে মা জেনে যত্ন করে, শ্বশুরকে বাবার মতো সেবা করে। এমনকি দূরের আত্মীয়রা পর্যন্ত শিউলির ভদ্রতায় মুগ্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু মানুষের জীবন তো বাইরের রঙে একা সাজে না। ভেতরে ভেতরে থাকে অসংখ্য অদৃশ্য আঁচড়। শিউলিরও অতীতে ছিলো এক সম্পর্ক। বিয়ের আগে সে এক ছেলের প্রেমে পড়েছিলো। দুজনের সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু পরিবারের অমতের কারণে তা টেকে নি। জোর করে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিলো তাদের। তিন বছর পর সেই মেয়ে ফরহাদের জীবনে আসে বউ হয়ে। বিয়ের পর একদিন সাহস করে শিউলি স্বামীর কাছে তার অতীত খুলে বলে। কান্নার ভেতরে, পা ধরে, ক্ষমা চেয়ে। যেন স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অতীতের ছায়াকে ভাঙতে চায় সে।
কিন্তু ফরহাদ শোনেনি। শোনেনি বা শুনতে চায়নি।
তার চোখে, মেয়ে যেন এক অমোচনীয় দাগ।
ফরহাদ বলে, “আমি মেনে নিতে পারব না। তুমি যেহেতু অন্য কারো সাথে ছিলে, আমি কখনো তোমায় পূর্ণভাবে ভালোবাসতে পারব না।”
অথচ ফরহাদ নিজেও তো কিশোর বয়সে সম্পর্ক করেছে। হাত ধরা, ঘুরতে যাওয়া, একসাথে সময় কাটানো—সবই তার জীবনের অংশ ছিলো। তবে সেটাকে সে তেমন গভীর মনে করেনি। কিন্তু শিউলির ক্ষেত্রে সে যেন নিজেই তার মনের আদালতে কঠোর বিচারক।
শিউলির অপরাধ কী? সে তো বিয়ের পরে কোনো ভুল করেনি। তার চারপাশে এখন কেবল সংসার—কাজকর্ম, দায়িত্ব, শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ভক্তি আর স্বামীর প্রতি ভালোবাসা। সে বন্ধুর মতো কেউ নেই, ফুর্তির মতো কোনো দুনিয়া নেই। তার প্রতিটি দিন ঘিরে থাকে রান্নাঘরের ধোঁয়া, সংসারের খুঁটিনাটি, আর ফরহাদের প্রতি নিরন্তর যত্ন।
কিন্তু ফরহাদ তবু শিউলিকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তার হৃদয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক মেয়ের জন্য জায়গা তৈরি হয়েছে।
এই খবরটা আমাকে দিয়েছে ফরহাদের মা। তার চোখে দুশ্চিন্তার ছায়া। তিনি বলেছেন, “শিউলি মেয়ে হিসেবে খুব ভালো। আমি চাই আমার ছেলে তাকে মেনে নিক। কিন্তু ফরহাদ বলছে, সে আর সংসার করবে না। তুমি ওর বন্ধু, ওর সাথে কথা বলো।”
এক সন্ধ্যায় আমি ফরহাদকে পাশে বসালাম। শান্ত গলায় বললাম,
“বন্ধু, মানুষ নিখুঁত নয়। আমরা কেউই অতীত ছাড়া নই। তোকে যদি আজ অতীত দিয়ে বিচার করা হয়, তুই কি টিকতে পারবি? শিউলি ভুল করেনি—সে সত্যি বলেছে। আজকের দিনে সত্যি বলার সাহসী মানুষই আসল মানুষ। আর তুই আজ যেটাকে বোঝা ভাবছিস, কাল সেটাই হতে পারে তোর শক্তি। সংসার ভাঙা সহজ, কিন্তু সংসার বাঁচানোই আসল বড় কাজ।”
ফরহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জানালার বাইরে রাত নামছে, হাওয়ায় শিউলির রান্নার ঘ্রাণ ভেসে আসছে। মনে হলো, সেই ঘ্রাণে মিশে আছে সংসারের অটল টান।
কয়েকদিনের ভেতরে ফরহাদ বদলে গেলো। শিউলির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি তোকে ভুল বুঝেছি। আমি ভেবেছিলাম তুই অন্যরকম। কিন্তু আজ বুঝেছি, তুই-ই আমার সত্যিকারের আশ্রয়। তোর অতীতকে মুছে দিতে পারব না হয়তো, কিন্তু বর্তমানটা তো আমার হাতে আছে।”
শিউলির চোখ ভিজে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে সে শুধু বলল,
“আমি শুধু তোমাকেই চাই।”
তাদের মধ্যে যে দূরত্ব জমে উঠেছিল, সেটি এক ঝটকায় গলে গেলো। শাশুড়ি চোখের পানি মুছলেন, ঘর ভরে উঠল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে।
আজ ফরহাদ আর শিউলি আগের মতো নয়, আরও কাছাকাছি। তাদের সম্পর্কের ভেতরে এখন আছে বোঝাপড়া, বিশ্বাস আর ক্ষমার আলো। তারা শিখেছে—ভালোবাসা মানে শুধু রূপ নয়, মানে সহনশীলতা, মানে সত্যিকার মমতা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now