বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“সনদপুরের জ্ঞানসম্রাট ও কাগুজে পণ্ডিতদের রাজ্য”
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
দূর এক দেশে ছিল এক অদ্ভুত নগরী—নাম তার “সনদপুর”। নগরীটি বাইরের চোখে ছিল শিক্ষার আলোয় ঝলমলে। বিশাল ফটকে লেখা ছিল—
“এখানে মানুষ নয়, সনদই কথা বলে।”
প্রথমে এই বাক্যটি দেখে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হতো। তারা ভাবত, আহা! কী জ্ঞানপিপাসু এক রাজ্য! কিন্তু একটু ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যেত, এখানে সনদ কথা বলে ঠিকই, তবে মানুষকে চুপ করিয়ে।
সনদপুরের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছিল “মহাজ্ঞান বালিকা মহাবিদ্যালয়” এবং “বনছায়া আদর্শ বিদ্যাপীঠ”। দুই প্রতিষ্ঠানই এত বিখ্যাত ছিল যে দেশের নানা জায়গা থেকে লোকজন শুধু সাইনবোর্ড দেখে ছবি তুলতে আসত। কারণ সাইনবোর্ডের রঙ ছিল সোনালি, আর গেটের সামনে প্রতিদিন মাইক বাজত—
“আমরাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা!”
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেয়ে তারা অতীত মেরামতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। কারণ যে শিক্ষকরা পড়াতেন, তাদের অধিকাংশই বইয়ের চেয়ে সনদের বানান বেশি চিনতেন।
মহাজ্ঞান বালিকা মহাবিদ্যালয়ের প্রধান ছিলেন মহাপণ্ডিত সাহাবুদ্দিন কাগুজে। তাঁর বিশেষ প্রতিভা ছিল—একটি সনদকে তিনটি সনদে রূপান্তর করা। তিনি বলতেন,
“জ্ঞান ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কাগজ চিরস্থায়ী।”
তাঁর সহকারী দেলোয়ার চন্দ্র হিসাবী ছিলেন সংখ্যার জাদুকর। তিনি এমনভাবে হিসাব লিখতেন যে দশ টাকার খরচ কাগজে এক লাখ হয়ে যেত। আর যদি কেউ প্রশ্ন করত, তিনি কপাল কুঁচকে বলতেন,
“তুমি কি শিক্ষাব্যবস্থাকে অবিশ্বাস করছো?”
সনদপুরে প্রশ্ন করা ছিল ভয়ংকর অপরাধ। সেখানে প্রশ্নকারীদের “জাতির শত্রু” বলা হতো।
একদিন রাজ্যের নিরীক্ষক বাহিনী “ডিআইএ” এসে হাজির হলো। তাদের কাজ ছিল হিসাব দেখা। কিন্তু সনদপুরে হিসাব দেখা মানে ছিল জঙ্গলে গিয়ে বাঘকে নিরামিষভোজী প্রমাণ করা।
ডিআইএ বাহিনীর প্রধান সহিদুল তীক্ষ্ণদৃষ্টি নামের এক ব্যক্তি প্রথম দিনেই অবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন, শিক্ষক কক্ষে যতগুলো চেয়ার, শিক্ষকের সংখ্যা তার দ্বিগুণ। অথচ ক্লাসরুমে ছাত্রীরা বোর্ডে নিজেরাই নিজেদের পড়াচ্ছে।
তিনি এক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলেন,
“আপনি কোন বিষয়ে পড়ান?”
লোকটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
“আমি ইতিহাসের শিক্ষক।”
“ভালো। পলাশীর যুদ্ধ কবে হয়েছিল?”
লোকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
“স্যার, সেটা নির্ভর করছে কোন বোর্ডের প্রশ্নে এসেছে তার ওপর।”
আরেক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করা হলো,
“আপনি অনার্স কোথায় করেছেন?”
তিনি হাসিমুখে বললেন,
“সরাসরি করিনি স্যার। শর্টকাটে করেছি।”
ডিআইএ বাহিনী যত তদন্ত করল, তত বিস্মিত হলো। দেখা গেল, অনেক শিক্ষকই একই দিনে তিন জায়গায় পরীক্ষা দিয়েছেন, চার জায়গায় চাকরি করেছেন, আর পাঁচ জায়গা থেকে বেতন তুলেছেন। একজন তো এমন সনদ দেখালেন, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের বানানই ভুল!
কিন্তু সনদপুরে বানান নয়, সিলমোহরই ছিল আসল বিদ্যা।
মহাজ্ঞান বিদ্যালয়ের তহবিল ছিল যেন এক জাদুর হাঁড়ি। সেখানে টাকা ঢুকত নদীর মতো, আর বেরিয়ে যেত ধোঁয়ার মতো। পাঁচটি ল্যাপটপ কেনা হয়েছিল, পাওয়া গেল দুটি। বাকি তিনটির খোঁজ চাইলে অফিস সহকারী বলল,
“স্যার, ওগুলো হয়তো ডিজিটাল হয়ে গেছে।”
প্রতিষ্ঠানের জেনারেটর কেনা হয়েছিল এমন দামে, যাতে পুরো শহরে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো যেত। লিফট কেনা হয়েছিল এমনভাবে যে ভবনে লিফট নেই, কিন্তু কাগজে তিনটি লিফট চলমান।
ক্যান্টিনের হিসাব চাইলে কর্তৃপক্ষ বলল,
“চা-বিস্কুটের বিষয় এত গভীরে যাওয়া ঠিক হবে না। এতে শিক্ষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।”
সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল “উৎসব ভাতা” নিয়ে। সেখানে একেকজন শিক্ষক বছরে দুটি ঈদ নয়, কাগজে চারটি ঈদ পালন করেছেন। কারণ সনদপুরে ধর্মের চেয়ে হিসাবের কল্পনাশক্তি বড় ছিল।
অন্যদিকে বনছায়া আদর্শ বিদ্যাপীঠ ছিল আরও বিস্ময়কর। এর অধ্যক্ষ ইমদাদুল সর্বজয় ছিলেন একাই একটি পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই পারিবারিক সম্পত্তি।
তাই তিনি স্ত্রীকে অফিস সহায়ক, ছেলেকে ল্যাব সহকারী, ছেলের বউকে আরেক ল্যাব সহকারী, মেয়েকে শিক্ষক, বোনকে প্রভাষক, বোনের জামাইকে বিশেষজ্ঞ, চাচাতো ভাইকে ব্যাংকিং শিক্ষক, এমনকি নিজের গাড়িচালককেও জ্ঞানবিজ্ঞান বিভাগের গুরু বানিয়েছিলেন।
একদিন এক ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল,
“স্যার, এখানে চাকরি পেতে কী লাগে?”
এক কর্মচারী ফিসফিস করে বলেছিল,
“দুইটা জিনিস—একটা আত্মীয়তা, আরেকটা খাম।”
বনছায়া বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সাক্ষাৎকার ছিল অভিনব। সেখানে প্রশ্ন করা হতো না “আপনি কী জানেন?” বরং জিজ্ঞেস করা হতো—
“আপনি কাকে চেনেন?”
একজন প্রার্থী ভুল করে বলেছিল,
“আমি পড়াতে খুব ভালোবাসি।”
বোর্ড সঙ্গে সঙ্গে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল। কারণ এ ধরনের আবেগপ্রবণ লোক প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে।
অধ্যক্ষ ইমদাদুল সর্বজয় নিজেও ছিলেন এক বিস্ময়। তাঁর সব সনদ জাল হলেও বক্তৃতা ছিল অসাধারণ। তিনি প্রায়ই বলতেন,
“নৈতিকতা আমাদের শিক্ষার মূল ভিত্তি।”
এই কথা বলার সময় তাঁর পেছনে দাঁড়ানো অফিস সহকারী হেসে ফেলত। পরে তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে বলত,
“স্যারের মুখে নৈতিকতার কথা শুনলে আমার পেট ব্যথা করে।”
সনদপুরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—সেখানে সত্যকে কখনো সরাসরি হত্যা করা হতো না। তাকে কমিটির কাছে পাঠানো হতো। তারপর তদন্ত, উপতদন্ত, পুনর্তদন্ত করতে করতে সত্য নিজেই ক্লান্ত হয়ে মারা যেত।
একবার এক বৃদ্ধ শিক্ষক প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি সত্যিকারের পড়াশোনা করে শিক্ষক হয়েছিলেন। তাঁর কাছে আসল সনদ ছিল, আসল জ্ঞানও ছিল। কিন্তু সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ।
তিনি বলেছিলেন,
“জাল সনদ দিয়ে শিক্ষক বানালে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হবে।”
কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে তাকে “প্রতিষ্ঠানবিরোধী” ঘোষণা করল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল—তিনি অতিরিক্ত সৎ।
সনদপুরে সততা ছিল সংক্রামক রোগের মতো। সবাই দূরে দূরে থাকত।
ধীরে ধীরে পুরো নগরীর শিক্ষাব্যবস্থা এক অভিনয়ে পরিণত হলো। শিক্ষকরা বই না পড়ে সই অনুশীলন করতেন। ছাত্ররা পড়াশোনা না করে ভাবত—কীভাবে শর্টকাটে বড় হওয়া যায়।
কারণ তারা দেখেছে, এখানে জ্ঞান নয়, জালিয়াতিই সম্মানের সিঁড়ি।
একদিন শহরের এক শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, শিক্ষক কাকে বলে?”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“যে মানুষ জাতিকে মানুষ বানায়।”
শিশুটি আবার জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে আমাদের স্কুলে যারা আছে তারা কী?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“ওরা মানুষ বানানোর অভিনয় করে।”
এই কথাটা বাতাসে উড়ে পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল।
তারপর একদিন অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সনদপুরের সব দেয়ালে রাতারাতি কেউ লিখে দিল—
“জাল সনদে গড়া বিদ্যালয়ে সত্যিকারের শিক্ষা জন্মায় না।”
কর্তৃপক্ষ খুব রেগে গেল। তারা তদন্ত কমিটি গঠন করল। কিন্তু কমিটির প্রধান ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের সনদই চিনতেন না।
তিনি তিন মাস তদন্ত করে রিপোর্ট দিলেন—
“দেয়ালে লেখা বাক্যটি শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। দেয়াল দোষী।”
এরপর দেয়াল রং করা হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, রং দিয়ে লেখা ঢেকে গেলেও মানুষের মনে লেখা প্রশ্ন মুছে গেল না।
ডিআইএ বাহিনীর প্রতিবেদন রাজদরবারে পৌঁছাল। সবাই হৈচৈ করল। সভা হলো, সেমিনার হলো, গোলটেবিল হলো। বক্তারা বললেন—
“দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স!”
কিন্তু সভা শেষে তারা যে গাড়িতে উঠলেন, তার পেছনের সিটে বসে ছিল সেই সব লোক, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ।
সনদপুরের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল—এখানে দুর্নীতি কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটি এক ধরনের পাঠ্যক্রম।
এখানে শিশুরা বই খুলে যা শেখে না, বড়দের দেখে তা-ই শেখে।
তারা শেখে—
সত্যিকারের যোগ্যতা অপেক্ষা সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী।
পরিশ্রমের চেয়ে প্রতারণা দ্রুত ফল দেয়।
আর জ্ঞানের চেয়ে সিলমোহর বেশি সম্মানিত।
কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। মিথ্যা যত বড় হয়, তার পতনের শব্দও তত বড় হয়।
এক বর্ষার রাতে প্রবল ঝড়ে সনদপুরের প্রধান ফটকের সোনালি অক্ষর খুলে পড়ে গেল।
“এখানে মানুষ নয়, সনদই কথা বলে”—এই লেখার “সনদ” শব্দটি ভেঙে গিয়ে শুধু “মানুষ কথা বলে” অংশটুকু রয়ে গেল।
লোকেরা দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখল। কেউ কিছু বলল না। কিন্তু অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো তারা অনুভব করল—সম্ভবত শিক্ষার শুরু কাগজে নয়, বিবেকে।
আর সেদিন থেকেই সনদপুরের বাতাসে নতুন এক গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল—
“জ্ঞানহীন সনদ একদিন দেয়াল সাজায়, কিন্তু মানুষ গড়তে পারে না।”
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now