বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সময়ের খেলা

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X রাজু আজ খুব খুশি ... মা বলেছে , কাল বাবুদের বাড়ি নেমন্তন্ন ... বাবুর মেয়ের না কি জন্মদিন কাল ... বাড়ির সমস্ত কাজের লোকদেরই বলেছে ... সেই উপলক্ষ্যে রাজুর মা ও একটা নেমন্তন্ন পেয়েছে ... কথাটা রাতে এসে যখন রাজুকে বলল , শুনেই ও তক্তপোষ থেকে লাফিয়ে উঠলো !... কতদিন বাদে একটা নেমন্তন্ন এসেছে, তা ও অত বড়লোক বাড়িতে ! চন্দননগর এর সিংহরায় পরিবার বলে কথা !... বিশাল ব্যবসা চারিদিকে .... এই বাড়িতে নেমন্তন্ন মানেই তো কত ধরনের খাবার !... মুরগির মাংস , পাঠার মাংস , মিষ্টি , দই , পোলাও , চমচম আরো না জানি কত কি !.. এই সবের স্বাদ তো কোনো নেমন্তন্ন বাড়ি আসলেই ও পায় !... নইলে সারা বছর তো সেই ফ্যানা ভাত, কুমরো সিদ্ধ ... মা মাঝে মাঝে সয়াবিন করে, বলে মাংসের মতন খেতে !.. রাজু ও সেই ভেবেই হাসি মুখে চিবিয়ে নেয়............যাই হোক, কিন্তু কালকের দিনটা একদম আলাদা .... কাল যে শুধু ভালো ভালো জিনিস খাবে তা ই না, এই প্রথম সিংহরায় বাড়িটা কে ভেতর থেকে দেখবে ... ওই রকম বড় বাগান দিয়ে ঘেরা রাজপ্রাসাদের মতন বাড়িটা ভেতর থেকে কেমন , খুব জানতে ইচ্ছে করে রাজুর !... স্কুল থেকে ফেরার পথে রোজ পাঁচ মিনিট বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, অবাক চোখে দেখে বাড়িটার বড় বড় থাম, সামনের সাজানো বাগান, সেই বাগানে আবার দুটো ফোয়ারাও রাখা আছে !..... ওর মা ওই বাড়িতে রান্নার কাজ করে সেই সুবাদে একদিন সাহস করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও করেছিল,.. কিন্তু দারোয়ানটা বড্ড বাজে !..... ওকে রাস্তার উটকো ছেলে বলে ধাক্কা দিয়ে গেট এর বাইরে বার করে দিল.... অনেকবার বলেছিল সেদিন , যে ওর মা ভেতরেই আছে, কমলা দাস ওর মায়ের নাম, এই বাড়িতে রান্নার কাজ করে..... দারোয়ানটা তখন গলা চড়িয়ে বলেছিল, "এরপর কি এই বাড়িতে কাজের লোকের আত্মীয় স্বজন এসে ভীড় করবে না কি !... যা ভাগ এখান থেকে... ".... না , তারপর আর রাজু কথা বাড়ায়নি...... মুখ অন্ধকার করে বাড়ি ফিরেছিল সেইদিন .... কিন্তু কাল সেই বাড়িতেই ওর নেমন্তন্ন !.. ভাবা যায় .... সারাটা রাত এই সব ভেবে ভেবেই কেটে গেল ওর .. একটুও ঘুম আসেনি চোখের পাতায় .... পরের দিন ভোরের পাখিরা যখনই ডেকে উঠলো, রাজু সঙ্গে সঙ্গে খাটে উঠে বসলো ... পাশে শুয়ে থাকা ঘুমন্ত মা কে ধাক্কা দিয়ে বলল, " ও মা , ওঠো না .. আজ তো নেমন্তন্ন ! যাবে না !.."..... ওর মা বিরক্ত গলায় উত্তর দিল, " ভোর চারটে বাজে রাজু.. এখন ওই বাড়িতে কি আমি ঝাট দিতে যাব !.. দেরী আছে অনেক যেতে.. তুই ঘুমিয়ে পর, জ্বালাস না ..... ".......... কথাটা বলেই মা আবার গভীর ঘুমের দেশে চলে গেল ....... কিন্তু রাজু বসেই রইলো বিছানায় ... শুলে যদি খুব ঘুম চলে আসে , আর মা যদি ওকে না নিয়েই চলে যায় !.. তখন !... যাই হোক, আসতে ধীরে ঘড়ির কাঁটা এগোলো... মা পাশের বিশুকাকার খেলনার দোকান থেকে একটা সুন্দর পুতুল কিনে এনেছে, পঞ্চাশ টাকা দাম !.. নিশ্চয়ই ওই মেয়েটার খুব পছন্দ হবে ... রাজু আজ ওর আগের বছর পুজো তে কেনা দারুন লাল রঙের জামাটা পরেছে .... এই জামাটা মা ট্রাঙ্ক এ তুলে রাখে, শুধু কোথাও নেমন্তন্ন থাকলে, বা বড় পুজো আর্চার দিন হলেই পড়তে দেয় .... রাজুর মুখে আজ সকাল থেকেই একটা হাসি লেগে আছে ...... এই প্রথম সিংহরায় বাড়ির দরজা ওর জন্য খুলল ... মায়ের হাত ধরে অবাক চোখে রাজু তাকিয়েছিল চারিদিকে .... ওর পৃথিবীর থেকে এই পৃথিবীটা কত আলাদা !, ওর পৃথিবীতে সার দেয়া টিনের ঘর, ঘাম, বস্তির সামনে জঞ্জাল জমা একটা সরু রাস্তা...... আর এই পৃথিবীটা কত সাজানো, সুন্দর , বাগান, ফুল, ফোয়ারা, কত লোকের হাসি মুখ, কত আলো..... এই দুটো পৃথিবীর মাঝখানে যেন শুধু একটা দরজা .. আর আজ প্রথম সেই দরজাটাকে পেরোলো রাজু !..... এই বাড়িটা সত্যিই রাজপ্রাসাদ .. কত আলো দিয়ে সাজিয়েছে বাড়িটা, সঙ্গে আবার গান ও চলছে .... কত লোক, কত ভীড় ... সাদা জামা পরা লোকেরা পকোড়া, সরবত নিয়ে যাচ্ছে এদিক থেকে ওদিক.. রাজু চোখ বড় বড় করে দেখছিল চারিদিক, ভাবতেই পারছিল না যে জন্মদিনও এই ভাবে পালন করা হয় !... ওর জন্মদিনে তো ছোট থেকে দেখে এসেছে মা সকালে উঠে বস্তির পাশের দয়াময়ী কালীবাড়িতে পুজো দিয়ে আসে... তারপর ওর কপালে জবাফুল ছুঁয়ে ,একটা প্যারা সন্দেশ মুখে পুরে দেয় ... ব্যাস, জন্মদিন পালন সেখানেই শেষ ... আর এখানে এত লোক ডেকে, এত আলো জ্বালিয়ে , গান চালিয়ে জন্মদিন হয় !........... এই সবই ভাবছিল তখনি ওর মা বলে উঠলো, "চল বাবু, বাড়ির ভেতরে বসার ঘরে মনে হয় কেক কাটা হচ্ছে, পুতুল টা গিয়ে দিয়ে আসি ...."... কথাটা শুনে রাজু এক গাল হেসে সম্মতি জানালো, এই বাড়ির ভেতরটা কেমন জানার যে কৌতুহল, আজ অবশেষে তা পূর্ণ হবে ......... এই ভেবেই ভেতরে ঢুকলো.... আর পা টা ওর থমকে গেল, এত সাজানো বাড়ি !... সিনেমা তে যেমন দেখায় !.. মাথার ওপরে এত বড় একটা ঝাড়বাতি, দেয়াল এ কত সুন্দর সুন্দর ছবি টাঙানো .... চারিদিকটা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো !... আর ভেতরটা কি ঠান্ডা ঘরটার !...কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কেন , মা বলে উঠলো " এদের বাড়িতে ঘর ঠান্ডা করার মেশিন আছে .. বুঝলি... যাই হোক, তুই এখানে দাঁড়া, আমি ম্যাডাম এর হাতে পুতুল টা দিয়ে আসি.."... কথাটা বলে রাজুকে ভিড়ের একটা কোনায় দাঁড় করিয়ে ওর মা ভিড়ের ভেতরে হারিয়ে গেল... কিন্তু রাজু তো এক জায়গায় কখনই দাঁড়িয়ে থাকার মতন ছেলে না , অবাক চোখে চারিদিকটা দেখতে দেখতে এগোচ্ছিল, কালকে স্কুলে বন্ধুদের দারুন গল্প বলা যাবে... এই সময়ই হঠাত ভিড়ের মধ্যে ও আনমনে সামনে রাখা একটা বড় কাঁচের ফুলদানিকে ধাক্কা দিল ..... একটা জোরে আওয়াজ হয়ে ফুলদানিত মাটিতে পরে ভেঙ্গে গিয়ে টুকরো টুকরো.... অত লোকের ভির, আওয়াজ টা এক মুহুর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল ......... সবাই এখন ওর দিকে তাকিয়ে... রাজু এখন ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে !... এত ভিড়ের মধ্যে মা কে ও দেখতে পাচ্ছে না যে ছুটে যাবে !.... এই সময়ই একজন লাল শাড়ি পরা মহিলা ভিড়ের মধ্যে চেঁচিয়ে উঠে ওর সামনে এলো, " এই ! কে তুমি ? এখানে এই ভাবে কি করছ ?"...... রাজুর গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে... বুঝতে পারছে না কি বলবে, এই সময়ে ওর কানে সেই চেনা গলার আওয়াজটা এলো, ওর মা ভিড়ের মধ্যে থেকে হন্ত -দন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে , "ম্যাডাম ও আমার ছেলে, রাজু..."........... ম্যাডাম ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, "তোমার ছেলে !, তো এখানে কি করছে ?"...... "না ম্যাডাম , আজ তো আমাদের সব কাজের লোকদের নেমন্তন্ন ছিল, তাই আমি ভাবলাম ছেলেটাকেও নিয়ে আসি !.."...... ম্যাডাম এবার ঝাঝালো গলায় বলল, " নিয়ে এসেছ তো বুঝলাম, কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকাতে কে বলেছিল !.. যত সব আনকালচারড পিউপেল ...."........ রাজুর মার মুখটা ছোট হয়ে গেল , তা ও কিছু কথা সাজিয়ে বলল, "আসলে ম্যাডাম আজ তো ছোট ম্যাডাম এর জন্মদিন , তাই এই পুতুলটা এনেছিলাম.. এটা দিতেই ভেতরে ঢুকেছিলাম !.. " কথাটা বলে হাতের পুতুলটা রাজুর মা ম্যাডামের দিকে এগিয়ে দিল .... ম্যাডাম অবাক চোখে পুতুলটার দিকে এক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, "তুমি এই পুতুল এনেছ ! আমার মেয়ের জন্য .. সত্যি দোষটা আমারই .. বাড়ির কাজের লোকদের মনে হয় একটু বেশিই মাথায় তুলেছিলাম !.. যাই হোক, এবার তুমি তোমার ছেলে , আর এই দারুন গিফ্ট টা নিয়ে এখুনি বেরিয়ে যাও ... অলরেডি তোমার ছেলে আমাদের বেলজিয়াম গ্লাস এর ফ্লাওয়ার ভাস টা ভেঙ্গে আমাদের অনেক বড় একটা গিফ্ট দিয়েছে .... আর কাজের লোকদের খাওয়ার ব্যবস্থা বাড়ির পেছনে পুরনো গাড়ি রাখার গ্যারেজ টা তে করা হয়েছে .. ওখানে যাও..".. রাজুর মার চোখটা এখন ভিজে গেছে ... নিজের ওপরই লজ্জা লাগছে !.. সত্যি কি বোকা ... কাউকে জিজ্ঞাসা না করে ভেতরে ঢুকে গেল.. এই সব লোকেদের মাঝে ও আর ওর ছেলে তো যেন একটা ভিখারীই .. এই বাড়িতে ভালো মন্দ রান্না হয়েছে বলে খেতে এসেছে শুধু !.. কথাটা ভাবতে ভাবতেই রাজুর হাতটা ধরে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই ম্যাডাম আবার বলে উঠলো, " দাঁড়াও... আগে এই কাঁচগুলো যেটা মাটিতে পরে আছে, সেটা কে পরিস্কার কর ... তারপর খেতে যাও ...."......... রাজুর মা আবার ফিরে এলো, মাটিতে পরে থাকা টুকরো টুকরো কাঁচ গুলো কে হাত দিয়ে কুঁড়িয়ে পরিস্কার করতে... কিন্তু রাজু আর একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো না, ওর মার হাতে ও ছড়ানো কাঁচের টুকরো তুলে দিচ্ছিল, মা বলল . " তুই কাঁচে হাত দিস না বাবা, কেটে যাবে হাত .."..... রাজু আলতো হেসে বলল, "কাটুক মা, আজ আর লাগবে না ... "..... মেঝেতে ছড়ানো কাঁচ পরিস্কার করে রাজু আর রাজুর মা সিংহরায় বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো... রাজুর মা দরজার বাইরে এসে ছেলের দিকে কিছুক্ষণ নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ... হঠাৎ যেন মনে হলো ওই অত বড়লোকদের ভিরে ও আর ওর ছেলেটা কেমন যেন বেমানান ছিল ! অথচ ওদেরও তো দুটো চোখ, একটা নাক , একটা মুখ আছে... ওরাও তো মানুষ .. তাও যেন একটা না দেখা তফাৎ ! একটা না দেখা দুরত্ব !....যেটা হয়ত কখনো দূর হবে না !....তারপর ভিজে চোখে রাজুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল , "তুই তো সকাল থেকে অনেক আশা করেছিলিস , নেমন্তন্ন বাড়ি খাবি !.. "...... রাজু ওর মার দিকে স্থির ভাবে এক মুহূর্ত তাকিয়ে উত্তর দিল, " না মা, আমাদের ফ্যানা ভাত ই ভালো .. "...... ১৫ বছর কেটে গেছে ....... কলকাতার বস্তি তে থাকা সেই রাজু আজ স্বনামধন্য ক্রিকেটার রাজশ্রী সেন..... ছোটবেলায় বস্তিতে একটা ভাঙ্গা ব্যাট আর পুরনো বল নিয়ে রাজু অনেক চার ছয় মারত ..... তারপর বেনিয়াপুকুর সার্বজনীন বিদ্যালয় এর ক্রিকেট টিম এ ও নিজের একটা জায়গা জায়গা করে নিয়েছিল ক্লাস সেভেন এ ই .... সেই স্কুলের হয়ে অনেক ট্রফি এনে দিয়েছিল ও ... মার কাছে স্পোর্টসশু, হেলমেট , গ্লাবস কেনার টাকা কোনো সময়ই ছিল না... হাওয়াই চটি পরেই মাঠে দৌরত ও ... কিন্তু কখনো কোনো ক্যাচ মিস করত না ... এই ব্যাটসম্যান আর বোলার এর অদ্ভুত কম্বিনেসন হঠাত চোখে পরে যায় সাউথ কলকাতার ফেমাস কোচ ধ্রুবজ্যোতি চ্যাটার্জির ... না, কোনো টাকা চার্জ করেনি ওকে ট্রেনিং দেয়ার জন্য ... শুধু বলেছিল "ট্রেনিং এর বদলে আমার ইন্ডিয়া টিম এর জন্য একটা দারুন প্লেয়ার চাই .. দিতে পারবি তো ?"........ তারপরের জার্নিটা স্বপ্নের মতন.. আর পেছনে ফিরে কখনই তাকাতে হয়নি ওকে ... রঞ্জি ট্রফিতে পর পর তিন বছর দারুন খেলে, অবশেষে ইন্ডিয়া টাইম নিজের একটা জায়গা তৈরী করেই নিয়েছিল রাজু, মানে বর্তমানে যাকে সবাই চেনে জানে রাজশ্রী সেন হিসেবে .. রাজশ্রীর ব্যাঙ্ক এ আজ কোটি কোটি টাকা ... কলকাতায় নিজের দুটো বাংলো , এছাড়া দেশে বিদেশে নানা জায়গায় বাড়ি গাড়ি সব ই আছে !.. কিছুরই আজ আর অভাব নেই !... ভাগ্যর চাকা সত্যি খুব তারাতারি ঘুরে যায় ....... সপ্ন কখনো কখনো বাস্তব জীবনেও সত্যি হয় .!.. যদিও রাজশ্রী আজ ও ওর আগের জীবনটাকে এক মুহুর্তের জন্যও ভোলেনি .. সেই বস্তির ছোট্ট একটা টিনের ঘর , সেই ঝর জল বৃষ্টির রাতগুলো, যখন টিনের ফুট থেকে জল পরে মেঝে ভেসে যেত !, বা সেই গরমকালের সন্ধ্যেগুলো , যখন ৪২ ডিগ্রী টেম্পারেচারে মাথার ওপর টিমটিম করে একটা পুরনো ফ্যান ঘুরত !... আর ভোলেনি সেই রাত টা কে ... কি জানি কেন, সেই দশ বছর বয়সের সেই নেমন্তন্ন বাড়ির সন্ধ্যেটা তে ও আর ওর মা যেই অপমানটা পেয়েছিল, ওটা এতদিন বাদেও কিছুতেই মন থেকে মুছে যায়নি .. রয়ে গেছে ভেতরে কোথাও একটা !..... কিন্তু সেদিন হঠাত একটা ঘটনা ঘটল .. রাজশ্রীর পি.এ সকাল সকাল হাজির .. "স্যার , আজকে প্লিস ওই এডভাট্রাইসিং এজেন্সির সাথে একটা মিটিং করুন সন্ধ্যেবেলা .... আমাকে ফোন করে বার বার বলছে ওরা, কি একটা কোম্পানি ,'সিংহরায় গ্রুপস অফ ইন্ডাসট্রি নতুন দুটো হোটেল খুলেছে কলকাতায়.. আর তার উদ্বোধন আপনাকে দিয়ে করাতে চায় .. আর একটা এড শুট ও করতে চায় ওরা আপনাকে নিয়ে ....".....কথাগুলো এক নিঃশাস এ বলে গেল নুপুর ... কিন্তু রাজশ্রী চুপ..মুখটা বেশ গম্ভীর... নুপুর আবার জিগেশ করলো, "কি হলো স্যার ? চুপ কেন ?"...রাজশ্রী এবার জিগেশ করলো , "কি যেন বললে কোম্পানিটার নাম ? ".... নুপুর এক কোথায় উত্তর দিল, "সিংহরায় গ্রুপস অফ ইন্ডাসট্রি .."... রাজশ্রী গম্ভীরভাবে বলল, "বুঝলাম,আসতে বল..আমি দেখা করব.. আজ সন্ধ্যেবেলায় ..." সন্ধ্যেবেলা পার্ক হোটেলে মিটিং .. সিংহরায় গ্রুপস থেকে কোম্পানির সি.ই.ও মালবিকা সিংহরায়ই দেখা করতে এসেছে.. স্বামী মারা যাওয়ার পর উনিই সমস্ত বিজনেস দেখা শোনা করেন ......... রাজশ্রী কে দেখে তো সে আপ্লুত ... উনি না কি আজ অব্দি রাজশ্রীর একটা ক্রিকেট ম্যাচ ও মিস করেনি !.. হাজার কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও টি.ভি তে কখনো স্টেডিয়াম এ থেকে ম্যাচ দেখেছে .. আসলে রাজশ্রীর মতন এত বড় একজন ক্রিকেটার যদি হোটেল এর উদ্বোধন করে, তাহলে তো সব নিউস পেপার গুলোর পেজ থ্রি তে অনুষ্ঠানটার ছবি বেরোবে... এতে ওদের মার্কেটিং এ বিশাল এফেক্ট হবে ... আর তার বদলে রাজশ্রী যত টাকা চার্জ করে, ওরা দিতে রাজি.... মালবিকা আধ ঘন্টা ধরে এই সমস্ত কথা রাজশ্রী বুঝিয়ে গেল !... রাজশ্রিও হাসি মুখে এতক্ষণ ধরে ঘাড় নাড়ছিল.......... তারপর যখন মালবিকা সিংহরায় অবশেষে নিজের সব বক্তব্য শেষ করলো, তখন রাজশ্রী উত্তর দিল .... " আসলে ম্যাডাম , আমি আপনার হোটেল এর উদ্বোধন এ আসতে পারব না .. সরি .."....... হঠাৎ মালবিকা সেন এর ভুরুটা কুঁচকে গেল, "আপনি হঠাত আমাকে ম্যাডাম বলছেন কেন ? আর আসবেন না কেন ? এনি রিজেন ...."............. রাজশ্রী হেসে উত্তর দিল, "আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে, আমি না জিজ্ঞেস করে একবার আপনার পার্টি তে ঢুকে গিয়েছিলাম.. আপনার হয়ত মনে নেই !.. সেইদিন আপনি আমাকে আপনার গেস্ট হিসেবে একটুও পছন্দ করেননি .. স্বাভাবিক, বাড়ির কাজের লোকের ছেলে ছিলাম !..... এনিওয়ে , এত কথা আপনার শুনে দরকার নেই .. আপনার হোটেল উদ্বোধন করার মতন সময় এখন আমার হাতে নেই .. সো আই এম সরি .. এন্ড ইয়েস, নাইস টু মিট ইউ , ম্যাডাম .. "..... কথাটা বলেই রাজশ্রী উঠে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাত একটা কথা মনে হলো, পেছনে বসে থাকা মালবিকা সিংহরায় এর তখন থমথমে.... কিছুতেই মনে করতে পারছে না কোন পার্টির কথা বলল রাজশ্রী !.... তখন রাজশ্রী হেসে বলে উঠলো, "শুধু শুধু মনে করার চেষ্টা করবেন না ম্যাডাম.. ওই সব সাধারণ ঘটনা আপনার মনে রাখার কথা ও না... অপমান যারা করে তাদের মনে না রাখলেও চলে, কিন্তু অপমানিত যারা হয় , তারা কখনো ভুলতে পারে না.. আর একটা কথা, টাকা থাকলেই বড় হওয়া যায় না,. তার জন্য একটু মন থাকা দরকার.. যেটা আপনার নেই.... আসি.. এন্ড আই উইশ এই লাইফ এ আপনার মুখোমুখি যেন আর আমাকে কখনো না হতে হয় .............. "............ কথাগুলো বলেই রাজশ্রী জোরে পা চালালো... আর পেছনে ফিরে তাকালো না... সময় খুব তারাতারি বদলায়........ আজ ওর পিছনে ফিরে তাকানোর দিন শেষ ..


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৫৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সময়ের খেলা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now