বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সময় ও দর্পণ।
-মনোয়ার হোসেন
******************
(১)
আমার দুটো প্রেম ছিল।
সাব্বির একটু চমকে উঠেছিল, বলে কী মেয়ে! গত দেড় মাসে কম করে হলেও পাঁচটি মেয়ে দেখা হয়ে গেছে তার, কিন্তু এমনভাবে নিজের অতীত অবলীলায় স্বীকার করবে, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুকের যুগেও একটু বেশিই মনে হল।
তাই?
হ্যা।
তারপর?
তারপর আবার কী?
না মানে বলছিলেন ছিল, এখন নেই, তাই না!
অনেকটা তাই। আমার দিক থেকে সব শেষ।
অন্য দিক থেকে এখনো আছে বলতে চাইছেন?
হুম। শুভ এখনো আমাকে ক্রাশ ভাবে। আমি পাত্তা দেই না!
সাব্বির মফস্বলের ছেলে, প্রচুর পরিশ্রম করে নিজেকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ফরিদপুর জিলা স্কুল, ইয়াসিন কলেজ পেড়িয়ে ঢাকা ভার্সিটির আইবিএর বিবিএ এমবিএ শেষ করে বিদেশী এক কর্পোরেট হাউসে বিশাল পোস্টে চাকুরী করছে। নিকুঞ্জে একটি উনিশ শ স্কয়ার ফুটের ফ্লাটও কেনা হয়ে গেছে এরি মাঝে। ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছে নিজের টাকায়। ছোট বেলা থেকেই পড়াশুনা ছাড়া কিছু বুঝত না, আর চাকুরী জীবনে এত সব কিছু করে কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কেও জড়ানো হয়নি। ভার্সিটির ব্যাচমেটের অনেকেই প্রেম করেছে, কিন্তু ওগুলো ক্রাশ ছিল কী না, জানে না সাব্বির।
বেশ ইন্টারেস্টিং!
আর তাছাড়া ক্রাশের থেকেও বেশি কিছু হয়েছে!
উফ! বলে কী মেয়েটা! অপরিচিত এক পুরুষ, যাকে সে আগে কখনোই দেখে নি, এবং যার সাথে ওর বিয়ের কথা বার্তা হচ্ছে, তাকে কী অবলীলায় ট্যাবু গুলো বলে দিচ্ছে এই মেয়ে। সাব্বির সত্যি সত্যিই এবার একটু নড়েচড়ে বসল। একটু নার্ভাসও হয়ত দেখাচ্ছিল ওকে।
প্রথম কয়েকবার নিজের ইচ্ছেয়, কিন্তু শেষের দিকে বলা যায় আমাকে জোড় করে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আমরা কী এসব আলোচনা না করলে হয় না?
না। বিয়ের পর এইসব নিয়ে কোন কথা চলুক আমি চাই না। আমার সত্যিকারের অতীত হল এই। এই সত্যি স্বীকার করেই জীবন চলবে। মিথ্যাচার আমার পছন্দ নয়।
বুঝতে পারছি না কী ভাবে রিয়েক্ট করব, কিছু মনে করবেন না!
আপনি চাইলে আমি আরো কিছুক্ষণ বসব, আর না হলে আপনি নির্দ্বিধায় বলুন, আমি চলে যাই।
ওরা বনানীর এক ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে বসে ছিল। সাব্বিরের সাথে ওর এক বন্ধু এসেছে। ইভার সাথে এসেছে ওর মা। পাশেই নাকি ইভার বাবার গ্রুপ অফ কোম্পানীর অফিস, বন্ধুকে নিয়ে ইভার মা ওখানেই যাবে বলে গিয়েছিল। আলোচনা শেষ করে ইভাকে ওর বাবার অফিসে নামিয়ে দিয়ে বন্ধুকে নিয়ে চলে যাবার কথা ওর।
আমার মনে হয় আমি আর কিছু সময় বসতে পারি, যদি আপনার সময় থাকে আর আপত্তি না থাকে।
বলল সাব্বির। একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ও। এই মেয়ের সান্নিদ্ধ বেশ লাগছে বলতে হবে। আগে কখনোই কোন মেয়ের প্রতি এতটা দূর্নিবার টান অনুভব করেনি ও। মনে মনে ঠিক করে ফেলল এই মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে! তারপর বলল, আমার সম্মন্ধে কিছু জানতে চান না?
না। কেননা আমি সব জেনেই এসেছি এখানে। আমার বাবা আপনাদের কোম্পানির ক্লায়েন্টও বটে। আপনাকে বেশ কয়েকবার প্রেজেন্টেশনে দেখেছে। তাছাড়া খোঁজ খবরও নেয়া হয়েছে আপনাদের পরিবার, বন্ধু বান্ধব, এলাকায় আপনাদের সুনাম, স্বাধীনতা যুদ্ধে আপনার বাবার অবদান, এক কথায় সব কিছু আমি জানি।
সাব্বির মোটেই এসব আশা করেনি, বলা যায় আকাশ থেকে পড়া অবস্থা, ইংরেজীতে মোক্ষম ভাবে বলা যায় ফলিং ফ্রম আউট অফ দ্যা ব্লু! ইভাদের দেশের বাড়ী বগুড়া। তবে ভাসা ভাসা শুনেছে ফরিদপুরে ওর বাবা জুট মিল করেছে কিছুদিন আগে। এ হোসেন গ্রুপের জন্য ওর অনেকগুলো প্রেজেন্টেশন ছিল, তাও বেশ কয়েক বছর আগে। কিন্তু মনে করতে পারল না এমডি সাহেব স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন কবে।
তারপরও আপনার নিজের জানার অনেক কিছু থাকতে পারে। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলল সাব্বির।
আমার কিছু জানার নেই।
তারপরও! অনুনয় ঝরে পড়ে সাব্বিরের কন্ঠে।
আপনি কী আমার মত এমন আধুনিক মেয়েকে বিয়ে করতে প্রস্তুত?
সাব্বির আবারো চমকে উঠে! বলে, আপনার কী কোন শর্ত থাকতে পারে?
না, তবে আমার বাবা যতটুকু খোঁজ খবর নিয়েছে, মনে হয়েছে আপনি অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না!
এসবও খোঁজ নিয়ে এসেছে! সাব্বির কর্পোরেট হাউজে বেশ নাম কামিয়েছে এরি মাঝে। ওর ব্যক্তিত্ব, ওর অমায়িক স্বভাব, গ্রুপে ওর জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। জেনেরাল ম্যানেজার হয়েছে উন্নতির সিঁড়ি একেবারে রীতিমত নিখুঁত ভাবে টপকিয়ে। ওর কোন বাজে স্বভাব নেই, এমনকি চা সিগারেটও নয়। কোন মেয়ের সাথে কার্যক্ষেত্র ছাড়া তেমন জানাশোনাও নেই। ক্লাবে বা পার্টিতে তাও চাকুরীর স্বার্থে, কর্পোরেট প্রয়োজনীয়তায়।
এটা সত্যি, আমি সবাইকে স্বাধীনতা দেই বলেই আমাদের কোম্পানি প্রবৃদ্ধিতে খুব দ্রুত অন্য সব সমমানের কোম্পানিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ওরা আরো প্রায় ঘন্টা খানিক গল্প করল। ইভার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহপাঠী থেকে শুরু করে ওদের বাসার বুল ডগ স্যামে এসে সেই গল্প থামল। হোটেল থেকে বেরিয়ে সাব্বির নিজেকে ধন্যবাদ দিল শুরুতেই উঠে চলে না আসার জন্য। জীবনকে অন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার এক চমৎকার সুযোগ এসেছিল আজ।
দু পক্ষের আলাপ আলোচনায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেল তিনমাস পর। সাব্বিরের ছোট বোন কমনওয়েলথ স্কলারশিপে অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করছে। ছিল বুয়েটের টিচার, ঢাকা ভার্সিটির গণিত বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স এ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিল রেকর্ড সিজিপিএ পেয়ে। ছুটি পাবে অস্ট্রেলিয়ার সামারে, অর্থাৎ বাংলাদেশের শীতকালে। এই তিন মাস দুজনে চুটিয়ে ডেটিং করল। দু একদিন নিজের ফ্ল্যাটেও নিয়ে গিয়েছে। তবে সেটা নিতান্ত গল্পের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাব্বিরের মনের আজীবনের সংস্কার ওকে অন্য কিছু ভাবাতেই দেয় নি। ইভা নিজেদের বাসা থেকে, অথবা সাব্বিরকে নিয়ে গুলশান বনানীর বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে ঘর সাজানোর জিনিস পত্র কেনাকাটা করে ফ্ল্যাটটিকে চমৎকার সাজিয়ে ফেলল।
(২)
বিয়ের পর হানিমুনে গেল ইউরোপ ট্যুরে। সাব্বির ওর শ্বশুর বাড়ি থেকে কোন কিছুই নেয় নি, ঘর সাজানোর, সংসার শুরু করার সব কিছু সাব্বির নিজের টাকায় করেছে। তারপরও ইভার বাবার জোড়াজুড়িতে ইউরোপে বেড়ানোর আপ-ডাউন টিকেট নিতে হয়েছে। বার্সেলনা থেকে শুরু করেছে ওদের ট্যুর। স্পেন থেকে পর্তুগিজ, আবার পর্তুগিজ থেকে স্পেন হয়ে ফ্রান্স। তারপর সুইটজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, জার্মানি হয়ে শেষ দেশ ছিল সুইডেন। প্রচন্ড শীতের মধ্যে অন্য এক জগতে অন্য রকম হানিমুন হল দুজনের।
হানিমুন থেকে ফিরেই সাব্বির ওর কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর মাস তিনেক যেতেই ইভা এক সত্য আবিস্কার করল সাব্বির কে নিয়ে। সাব্বির একটি রোবট বই আর কিছু নয়। নিজের জগত ছাড়া অন্য কোন জগত নেই ওর। খুব সকালে ঘুম থেকে উঠবে, নিজে ফ্রেশ হয়ে কিচেনে যেয়ে নাস্তা বানাবে, তারপর ইভাকে ডেকে তুলবে। দুজনে মিলে একসাথে নাস্তা করার সময় নিজের কর্মক্ষেত্রের কিছু আলোচনা, কিভাবে জীবনকে আরো একটু গোছানো যায়, আর কতদূর যাওয়া যায়, এইসব। প্রথম প্রথম ইভার খুব ভাল লাগত আলোচনায় অংশ নিতে। তবে ধীরে ধীরে একদিন নিজেকে এক শ্রোতা ছাড়া আর কোথাও দেখতে পেল না। সাব্বির যেটা ভাল মনে করবে সেটাই করবে, যদিও ইভার সাথে আলোচনা করবে খোলা মন নিয়েই। ইভা দেখেছে, নিজের যুক্তিকে খুব সুন্দর ভাবে ওর মাঝে ঢুকিয়ে দিতে অসম্ভব পারঙ্গম সাব্বির।
আর সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে রাত দশটা বা এগারোটা বা কখনো কখনো মধ্য রাতের পরেও সাব্বির বাড়ি ফিরবে। তবে শুক্র শনিবারগুলোতে ক্বচিৎ কদাচিৎ পাওয়া যেত। ঢাকার চারিদিকে গজিয়ে উঠা বেশ কয়েকটি রিসোর্ট এরি মাঝে ঘোরা হয়ে গেছে। এত কিছুর পরও ইভার নিজেকে সাব্বিরের কাছে এক অনাহূত অতিথি ছাড়া কিছু মনে হয় না। পর পর কয়েকদিন বাবা-মা’র বাড়িতে যেয়ে থাকত দিনের বেলাটা, বিকেলে হয়ত কোন বন্ধু বা বান্ধবীর সাথে কিছু সময় কাটানো। কিন্তু এতেও ইভা এতটা বোরড হয়ে উঠবে কল্পনাও করতে পারে নি। কোনভাবেই নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল না, জীবনের অর্থ একদমই অবোধ্য হয়ে উঠেছে। এই দুঃসময়ে সাব্বিরই বুদ্ধি দিল। নিজে কিছু একটা শুরু করুক ইভা। সাব্বির চায় ও ব্যবসা করুক। ওর নিজের বাবা ওকে সাহায্য করতে পারে, চাইলে সাব্বির নিজেও সাহায্য করতে পারে। বিয়ের পর এই প্রথম ইভা ঠিক করল নিজে কিছু একটা শুরু করবে, তবে অবশ্যই সাব্বিরের বুদ্ধিতে ব্যবসা নয়! বনানীর এক নামী ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের বিজ্ঞপ্তি ছিল ফিন্যান্সের উপর অন্তত মাস্টার্স করা সিনিয়র টিচার লাগবে। সাহস করে এপ্লাই করে ফেলল কাউকে না জানিয়ে। বাবা মা ভাই বোন এমনকি কোন বন্ধুদেরও নয়। কয়েকদিনের মধ্যে ইন্টারভ্যু হয়ে গেল। আর ওকে অবাক করে দিয়ে চাকুরীটাও হয়ে গেল! রাতে ঘুমুনোর সময় সাব্বিরকে বলতে একটু গলা কাঁপছিল, তবুও নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলেই ফেলল ইভা। সাব্বির মনে হয় জানত এমন কিছু করবে ইভা। বেশ সাহস দিল। বুঝিয়ে বলল কর্মক্ষেত্রে বিহেভিয়র কেমন হতে হবে, ইন্টেন্সিটি, মোটিভিশন থেকে শুরু করে জানা অজানা অনেক বিষয়ই বেশ সময় নিয়ে ইভাকে বুঝিয়ে দিল সাব্বির। কিন্তু মনের ভেতর ইভা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল সাব্বির ঠিক হৃদয় দিয়ে কিছু বলছে না। তিন দিন পর নিজেকে সত্যিকারে স্বাধীন মনে হল ইভার। নিজেকে ঠিক যেভাবে দেখতে চেয়েছে, এতদিনে যেন সেটা তার নিজস্ব হয়ে ধরা দিয়েছে।
(৩)
সমস্যাটা শুরু হল প্রায় বছর খানেক পর, ইভাদের স্কুলে কানাডিয়ান এক পুরুষ টিচার যোগদান করার পর পর। কলিন্স নাম। ঠিক বোহেমিয়াম বলতে যা বোঝায় এই কলিন্স ঠিক তাই। বাবরি চুল। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গোঁফ। এক টি শার্ট আর এক জিন্সে দিনের পর দিন পার করে দিচ্ছে। বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ হঠাৎ কাউকে না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। স্কুল কর্ত্তৃপক্ষও বেশ উদার শুধু কলিন্সের ব্যাপারে। কেননা ইতিমধ্যে ছাত্র ছাত্রীদের মাঝে নিজেকে অবিচ্ছেদ্য প্রমাণ করে ফেলেছে। ইভা হঠাৎ করেই খেয়াল করল, সাধাসিধা এই ভবঘুরে কলিন্স ওর সত্ত্বাকে জড়িয়ে ফেলছে মাকড়শার জালের মতন! কলিন্সের সাথে কাটানো বিকেল বা সন্ধ্যাগুলো ইভার কাছে একেবারেই অন্যরকম মনে হল। নিজের মধ্যে আজীবন লুকানো সেই ভবঘুরেকে খুঁজে পেল সে। ওদের ইচ্ছা অনিচ্ছা, বা মতের মিল বা পছন্দ, সবকিছুই ঠিক ঠিক মিলে গেল। ইভা বুঝতে পারল ও সাব্বিরের মতন নয়, একদমই নয়! একদিন স্কুল ছুটির পর কলিন্স জিজ্ঞেস করল সামনের বৃহস্পতিবার ইভাকে নিয়ে সিলেটের হাওর আর বনে বাদারে বেড়াতে যেতে চায়, ইভা কি যেতে পারবে বা রাজী আছে কিনা। ইভা যেন এমন এক অফারের জন্য অপেক্ষা করে ছিল, সাথে সাথে বলল, ‘অবশ্যই যাব’। কলিন্স বাঙ্গালী কালচার বেশ চিনে ফেলেছে, জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার হাসব্যান্ড কেন তোমায় আমার সাথে যেতে দেবে?’ ‘যেতে দেবে, কেননা সাব্বির অন্য চার পাঁচটা বাঙ্গালী ছেলের মত নয়’, বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলল ইভা। দেখা গেল সত্যি সত্যি সাব্বির হাসি মুখেই বলল, ‘তোমার কলিগ, যেতে পার অবশ্যই। আর তাছাড়া দেখছই তো আমি তোমাকে সময়ও দিতে পারছি না’।
(৪)
ইভা আর কলিন্স সেবারই শুধু নয়, বেশ নিয়মিতই বাইরে ঘুরতে যেতে শুরু করল। সাব্বির নিজেকে বেশ প্রগতিশীল মনে করে। নিজের মধ্যে এ নিয়ে কোন ধরণের হীনমন্যতা নেই। ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামাতো না সে মোটেই। বিকেলের দিকে সে নিজের রুমেই নাস্তা সেরে নেয়, কখনোই কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত প্যান্ট্রিতে যায় না, আর আড্ডাতো ওর স্বভাবের বাইরে। সেদিন এক প্রেজেন্টেশন রেডি করে সাব্বিরের কাছে দেবার কথা ছিল আইটি বিভাগের সজীবের। মনে পড়তেই সে সজীবকে এই সময় প্যান্ট্রিতে পাওয়া যাবে ভেবে উঠে পড়ল। সেই অসময়ে ওর উঠে পরাটাই কাল হল। প্যান্ট্রির কাছাকাছি পৌছতেই ভেতরে বেশ উচ্চস্বরে হাসাহাসি শুনতে পেল। কাচের বিশাল দরোজা, ভাগ্যিস সে পর্যন্ত যেতে হয়নি। নিজের নাম শুনে থমকে দাঁড়াল, যেটাও কিনা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। কারো কান কথায় কখনোই সে থাকে নি বা উৎসাহ দেয় নি অন্যকেও। আজ থমকে যেয়ে জীবনের আরেক নোংরা দিক বেরিয়ে এল সাব্বিরের কাছে। ইভা আর কলিন্সকে জড়িয়ে নোংরা নোংরা কথা কি অবলীলায় বলে যাচ্ছে সবাই!হঠাৎ করে পরিচিত জগত একেবারেই অপরিচিত হয়ে উঠল সাব্বিরের কাছে। নিজেকে সংযত করতে পারল না। চুপি চুপি নিজের রুমে ফিরে আসল সাব্বির।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল মোটে সাড়ে তিনটা। সেক্রেটারিকে ফোনে বলে দিল একটু বেরুবে আজ।
বাসায় ফিরে দরোজাটা খোলাই পেল। ঢুকেই ড্রয়িং রুমে ব্রিফকেস পাশে রেখে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজতেই ইভার সাথে প্রথম দেখার দিনের টুকিটাকি ভেসে এল মনের জানালায়। একটু ঘুম ঘুম ভাব এসেছিল। হঠাৎ কিচেন থেকে টুং টাং শব্দে নিদ্রা ভাব চলে গেল। একটু হাসির শব্দও শোনা গেল। ইভা একা নয়। এক পুরুষ কন্ঠও শোনা গেল। নিদ্রাভাব চলে যাওয়ার পর পরই ঠিক কী করবে বুঝতে পেল না, টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াল। কিচেনের দরোজার কাছে পৌছতেই ভেতর থেকে হাসির কলস্বর শোনা গেল। কলিন্স মনে হয় কোন কিছু নিয়ে মজার কথা বলেছে, ইভা উচ্চস্বরে খিলখিল করে হেসে উঠছে থেকে থেকেই। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। হঠাৎ উত্তেজনায় চোখ মুখ রক্ত শূন্য হয়ে পড়ল। জীবনে এই প্রথম হেরে গেছে। হারার স্বাদ কতটুকু তেতো তা কখনোই জানেনি সবগুলো স্তরে ভাগ্যকে সাথে পাওয়া সাব্বির। না, এই প্রথম আর এই হবে শেষ! এক দৌড়ে ড্রয়িং রুমে ফিরে গিয়ে দেয়ালে ঝোলানো বেসবলের ব্যাটটা চোখে পড়ল। দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে, হঠাৎ নিজের ভেতরে এক দানব জেগে উঠতে দেখল। ব্যাটটা হাতে তুলে নিতেই কেমন এক অবসাদে জড়িয়ে গেল চেতনা। আশ্চর্য এক জীবন বোধের ভেতর দিয়ে নিজেকে ধীরে ধীরে লয় হতে দেখল। সময় যেন থমকে গিয়েছে। কয়েক মূহুর্ত ওর বয়স কয়েক বছর বাড়িয়ে দিয়েছে মনে হল।
রাস্তায় নেমে নিজেকে একেবারে হাল্কা লাগল সাব্বিরের। টাইয়ের নটটা ঢিলে করে দিয়ে ফুটপাতে উঠে পড়ল। কয়েকজন পঙ্গু ভিখারী ‘আমার আল্লা রসুলের নাম’ আর্তি ছড়িয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ফুটপাত দিয়ে এগিয়ে আসছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now