বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আন্টির বাসা থেকে বের হয়ে ছাতা ফুটিয়ে মাথায় দিতেই ফারিহা
দেখল – ছেলেটা ভিজছে ।
বর্ষাকাল ।
যখন তখন ঝুম বৃষ্টি নেমে যায় । গবেট-শ্রেণির লোক
দেখেও শেখে না – ঠেকেও শেখে না । ছাতা ছাড়াই বের
হয় । এবং ভেজে ।
এই ছেলেটাকে তার গবেট শ্রেণির মনে হচ্ছে না ।
রাস্তার পাশে ফারিহা একটু দাঁড়াল ।
ঢাকার রাস্তায় বৃষ্টির দিনে রিকশা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার । রিকশাওয়ালারাও
এই সুযোগে ভাড়া চারগুণের নিচে হাঁকে না ।
ফুটপাতের কিনারায় কাকভেজা ছেলেটার দিকে চোখ পড়তে
বাধ্য । পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে মনে হচ্ছে স্বচ্ছল ঘরের
সন্তান । হাতে একটি ফাইল । ইউনিভার্সিটির ছাত্র হবে হয়ত । চেহারা
আকর্ষনীয় ।
হঠাৎ বৃষ্টিতে বিভ্রান্ত মানুষগুলোর মত এ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা
করছে না ।
মূর্তির মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।
ফারিহার ইচ্ছে করল ওকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয় !
রাস্তায় একটা রিকশা নেই – আর এদিকে ন্যাকামো হচ্ছে !
এমনিতেই ওর মনটা বিক্ষিপ্ত । আন্টির সাথে দেখা করার পর
মেজাজ আরও চড়ে আছে ।
খালুর মামাতো ভাইয়ের ছেলে আমেরিকা থেকে বহুদিন পর
বাংলাদেশে ফিরে এসেছে । আপদটা এসে জুটেছে আন্টির
বাসাতেই । আর আন্টিরই যেমন কান্ডজ্ঞান – মাথায় উনার ঘটকালি
ঢুকেছে । ফারিহার গুণের সাতকাহন তিনি সেই ছেলের সামনেই
গেয়ে গেলেন । অপমানে পুরোটা সময় ফারিহার কান ঝাঁ ঝাঁ
করেছে । তার ওপর বেরিয়েই এতসব ন্যাকামি দেখে রাগে ও
দাঁতে দাঁত পিষল ।
‘আপা, কই যাবেন?’ সম্বিত ফিরে পেল ও রিকশাওয়ালার ডাকে ।
রিকশাওয়ালার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে । মেয়ে প্যাসেঞ্জার
সাধারণতঃ বৃষ্টির দিন ভাড়া নিয়ে গ্যাঞ্জাম করে না ।
আড়চোখে ফারিহা দেখতে পেল – ছেলেটা হাঁটতে শুরু
করেছে ।
রিকশাওয়ালাকে কোন জবাব না দিয়ে ফুটপাথ ধরল ও । ন্যাকাটার
রহস্য ভেদ করতে হবে ।
তবে এ সিদ্ধান্ত জটিলতা বাড়াল বই কমালো না ।
ওভারব্রীজের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে বসে থাকা বৃদ্ধা
মহিলাটির হাতে নিজের মানিব্যাগটা ধরিয়ে দেয় ছেলেটা ।
বিকারগ্রস্থের মত হেঁটে চলে সামনে ।
হাতে ধরা ফাইলটি ছুঁড়ে ফেলে দেয় রাস্তার পাশের ড্রেইনে
।
আবারও রাগে দাঁত কিড়মিড় করে ফারিহা । ঢাকার সুয়্যারেজ লাইনের
এমনিতেই যে অবস্থা !
এর মাঝে আবার ফাইল ফেলা হচ্ছে । টাকা আছে – মানিব্যাগ দান
করে দিচ্ছ বলে শহর তোমার বাবার ?
আর সহ্য হল না ওর । লম্বা লম্বা পায়ে হেঁটে ছেলেটাকে
ধরে ফেলে ফারিহা ।
‘এক্সকিউজ মি?’
অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ছেলেটা, ‘আমাকে বলছেন?’
‘না! আমি বৃষ্টিকণার সাথে কথা বলছি !’ ঝাঁঝের সাথে বলে ফারিহা,
‘ড্রেইনের মধ্যে ফাইলটি ছুঁড়ে ফেললেন – মানে ?’
ছেলেটার চোখ জ্বলে ওঠে, ‘যতদূর মনে পড়ে – আপনার
কিছু ছুঁড়ে ফেলিনি ।’
‘শহরটা আপনার বাবার সম্পত্তি? ড্রেইনে আজেবাজে জিনিস
ছুঁড়ে ফেলবেন – আবার যুক্তি দেখাচ্ছেন?’
‘আমার ইচ্ছা । তোমার ভালো না লাগলে তুমি মুড়ি খাও ।’ আবার
সামনে হাঁটে ছেলেটা ।
ফারিহা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে । এরকম ভাষায় প্রথম
সাক্ষাতেই কোন ছেলে তাকে এভাবে বলবে এ তার
কল্পনাতেও ছিল না ।
প্রায় এক মাস পরের কথা ।
লাইনে দাঁড়িয়ে ফারিহা । ফার্মগেট যেতে নিউ ভিশন ধরতে চায় ও
। পার্টটাইম জবের ব্যাপার আছে ।
লোকাল একটা ম্যাগাজিনের প্রুফ রিডিং করার কাজটা পড়ে আছে ।
ভার্সিটির সিনিয়র ভাই তূর্য চেয়েছিল কাজটা ওকে দিতে । তূর্য
ভাইয়ের সাথে দেখা করতেই যাচ্ছে এখন ।
পর পর দুটো বাস চলে যাওয়ার পর মোটামুটি লাইনের সামনে
চলে আসতে পারে ও ।
পরের বাসে উঠে প্রথম যে সীটটি ফাঁকা পায় বসে পরে ।
বাস আসাদগেট পৌঁছতেই ওর মনে হয় পাশের সারিতে বসা
ছেলেটা ওকে দেখছে ।
ফারিহার চেহারা যথেষ্ট সুন্দর – এবং সে বিষয়ে ও নিজেও
ওয়াকিবহাল, তবে না তাকিয়েও ছেলেটির দৃষ্টিতে কৌতুহল অনুভব
করে ও ।
এক ঝলক দেখেই ও চিনতে পারে – বৃষ্টিতে ভেজা রহস্যময়
ছেলেটিকে ।
হঠাৎ মেজাজ টং হয়ে যায় ওর আবারও ।
‘সেদিন বাজে কথা বলার সময় খেয়াল ছিল না ! এখন তাকাও কেন
বেয়াদব ছেলে।’ মনে মনে ভাবে ফারিহা।
দ্বিতীয় সাক্ষাতের কোন ইচ্ছেই ওর মধ্যে নেই । বাস
থেকে লাফিয়ে নেমে সামনে হাঁটে ও ।
এবং যা ভাবছিল – পেছন থেকে শুনতে পায়, ‘এক্সকিউজ মি’
ঘুরে যতটা সম্ভব সেদিনের উচ্চারণ নকল করে ফারিহা, ‘আমাকে
বলছেন?’
‘দেখুন, গতবারের ব্যাবহারের জন্য আমি খুবই লজ্জিত । বিশেষ
একটা কারণে সেদিন আমার মন এবং মেজাজ – কোনটাই
নিয়ন্ত্রণে ছিল না ।’
ছেলে লাইনে এসেছে – নিজে থেকে ক্ষমা চাইছে – তার
ওপর মায়াকাড়া একটা চেহারা – ঝগড়াঝাটির এখানেই ইস্তফা দেওয়ার
সিদ্ধান্ত নিল ফারিহা ।
‘সত্যি বলতে কি – সেদিন আমারও মন ভালো ছিল না । স্বীকার
করতেই হচ্ছে – বাড়াবাড়ি আমিও কিছুটা করে ফেলেছি ...’
‘আমি তন্ময় ।’ হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলেটা ।
‘ফারিহা ।’ হাত মেলায় ফারিহা ।
*
এক মাস কেটে গেছে আরও ।
তন্ময় আর ফারিহার নাম না জানা দশা পালটে গেছে গভীর
বন্ধুত্বে ।
ফার্মগেটেই নম্বর আদান-প্রদান করেছিল ওরা । আসলে
ফারিহারই উৎসাহ বেশি ছিল ।
তন্ময়ের সেদিনের ব্যাবহারের তাৎপর্য জানার জন্যই কি না – তা
সে নিজেও জানে না ।
ধীরে ধীরে তন্ময়কে আরও ভালো করে চেনে ফারিহা
– যে তন্ময়ের সাথে প্রথমদিনের সেই তন্ময়ের কোন
মিলই নেই ।
‘১৫ই মার্চ – আমি ভুলিনি’ মনে মনে ভাবে ফারিহা । ‘কয়দিন লুকাবা তুমি
। ঠিকই জেনে নিব, হুহ’
অবাক করা ব্যাপার হল – ওর কাছে জানতে চায় নি – এমনটা নয় । কিন্তু
প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে তন্ময় ।
এই যেমন আজ – জিয়া উদ্যানে হেঁটে বেড়াচ্ছে ওরা ।
কোন দিন কাজের অতিরিক্ত চাপ পড়লে একসাথে কোথাও
ঘুরতে বের হয় মাঝে মাঝে । ফারিহার জীবনে বন্ধুদের সংখ্যা
খুবই কম ছিল । তার মাঝেও তন্ময়ের মত খোলা মনের কেউ
নেই । তন্ময়ের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমন – ফারিহার সাথে
শেয়ার করে স্বস্তি পায় ও। দুইজনই একে অপরের মোবাইল
নম্বর সেইভ করে রেখেছে BFF [বেস্ট ফ্রেন্ডস
ফরেভার] নামে ।
হঠাৎ ফারিহাই তোলে প্রসঙ্গটা । আবারও ।
‘তুই – আজ পর্যন্ত একটাবারও আমাকে বললি না – আমাদের
প্রথম পরিচয়ের দিন তোর কি হয়েছিল । ’
‘তোকে আমি আগেও কয়েকবার বলেছি – আমাকে এ নিয়ে
প্রশ্ন করবি না । আমি উত্তর দিতে পারব না । ’
‘ওকে !’ হাসে ফারিহা, ‘লেট মি গেস – তুই ছ্যাঁকা খেয়েছিলি ।’
‘একরকম ।’ অন্যদিকে তাকায় তন্ময় ।
‘মেয়েটা নিশ্চয় অনেক বোকা । নাহলে তোর মত
ছেলেকে ছেড়ে যাবে কেন ?’
‘আমাকে খুঁচিয়ে তথ্য বের করতে চাইছিস তো ?’ চোখ
পাকালো তন্ময়, ‘ফাইজলামি বন্ধ ! চল বাসায় ব্যাক করি । আমার
ভালো লাগছে না ।’
মাঝে মাঝে ভাবে ফারিহা বোকাটার কথা । মানুষ মনে হয় আর
প্রেম করে ছ্যাঁকা খায় না ?
এত রাখাঢাকির কি আছে ?
তবে একটা কথা ঠিক । তন্ময়ের কোনকিছুতেই পরাজয় পছন্দ না
।
ছেলেটা খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে । প্রথম প্রথম কিভাবে
‘উন্মাদ’ নামক ম্যাগাজিনটি ওর কার্টুনকে রিফিউজ করে দিয়েছিল
আর তা ওর জন্য কত বড় একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছিল সেই
গল্প ফারিহার জানা ।
হয়ত এ কারণেই ওর পরাজয়ের কথা ও লুকিয়ে রাখতে চায়
নিজের কাছেই ।
ফারিহাকে বললে কি হত ? সবই বলে ওকে তন্ময় ।
‘গাধা একটা’ – ভাবে ও ।
তার ওপর একদিন তূর্য ওর কাছে জানতে চায়, ‘কিরে, তন্ময়ের
সাথে জুটলি কিভাবে?’
অবাক হয় ফারিহা, ‘আপনি ওকে চেনেন কিভাবে? লং স্টোরি ভাইয়া
।’
তূর্য অবাক হয়, ‘চিনব না ! আমার কলেজের ছাত্র ছিল । আমার
এলাকায় থাকে । আমার ক্লোজ ছোটভাই । আমাদের ম্যাগাজিনে
ও আর্ট নিয়ে মাঝে মাঝে সাহায্যও করে ।’
প্রশ্নটা করা ঠিক হবে কি হবে না – না বুঝেই করে ফেলে ও,
‘ভাইয়া ওকে কিছু একটা নিয়ে ডিস্টার্বড দেখি । ওর কি ইদানিং এর
ভেতর ব্রেক আপ হয়েছে কারো সাথে? ’
ঘরের ছাদ কাঁপিয়ে হাসে তূর্য, ‘তন্ময় করবে প্রেম ? ব্রেক
আপ তো পরের কথা । আমার জানামতে ওর কোন বান্ধবীও
ছিল না । তাই তো তোর কথা ওর মুখে শুনে অবাক হলাম । আরে
শিল্পী মানুষের মাঝে মাঝে উদাস হতে হয় । ও নিয়ে ভাবিস না ।’
লজ্জা পেয়ে সরে আসে ফারিহা । তূর্য ভাই নিশ্চয় ভেবেছে
তন্ময়ের প্রেমে ও হাবুডুবু ! আর ও-ও একটা যাচ্ছেতাই !
এভাবে কেউ জানতে চায় ? কিন্তু – নিজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়
ফারিহা । তন্ময়কে কি ও বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু করে
পেতে চায় না ?
তবে নিজেকে চোখ রাঙ্গায় ফারিহা । কেন ও এত করে
ভাববে তন্ময়ের কথা ।
ওরা শুধুই বন্ধু । এভাবে ভাবাটা অন্যায় । কিন্তু ভাবাভাবির ব্যাপারটা কি আর
ওর হাতে তখন আছে ?
পরের কয়েকটা দিন যতবার তন্ময়ের সাথে দেখা হয় ফারিহার –
প্রতিবারই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় ওর । তন্ময়টাকে ছাড়তেই
ইচ্ছে করে না । কোন কারণ ছাড়াই ওকে ফোন দিয়ে ডাক
দেয় ও, ‘হ্যালো তন্ময় – মন ভালো না । চল কোথাও ঘুরে
আসি ।’
আসলে ছাই – তন্ময়কে দেখার ছুতো । আর পাগলটাও যা – ইদানিং
সারাদিনই ছবি আঁকে । যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ ছবি নিয়েই বকবক
করে । ওর আবার ইদানিং বিশ্বকে চমকে দেওয়া একটা ছবি আঁকার
ইচ্ছে হয়েছে । ফারিহার কি আর অতসব মাথায় ঢোকে ? ও শুধু
তন্ময়কে দেখে । ছেলেটার চোখ দুইটা এত্ত পরিষ্কার –
ফারিহার ইচ্ছে করে ওখানে ডুবে মরতে । আর ও হাসলে
তো ফারিহার মাথা হ্যাং করে যায় – এত সুন্দর করে একটা মানুষ
হাসে কি করে ?
প্রায় প্রতিদিনই দেখা করলেও ফারিহার সাহস হয় না ওর অনুভূতির কথা
বলার ।
না – তন্ময় 'না' করে দেবে সেই ভয়ে যতটা – তার থেকেও
বড় ভয় তন্ময়ের প্রথম দিনের ব্যাখ্যার ।
ও যে পাগল – হয়ত সেই মেয়েকে জেতার একটা জেদ
নিয়ে বসে আছে আজও ।
মাঝখান থেকে ফ্রেন্ডশীপে একটা দূরত্ব আসবে ।
প্রতিদিন তন্ময়কে কিভাবে দেখবে ও তখন ?
আরেকটি মাস প্রায় গড়িয়ে যায় এভাবে । এর মাঝে একদিন বহুদিন
পর তন্ময়ের মুখে হাসি দেখে ফারিহা ।
‘তোকে বলেছিলাম আমার একটা – মাত্র একটা ছবি আঁকার সখ ছিল
। পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার জন্য ।’
‘তুই একটা পাগল । সব কিছুতেই তোর তাড়াহুড়ো ।’ ওকে
আলতো ঘুষি মারে ফারিহা ।
‘ছবিটার কাজ শেষ,ফারিহা । আজ আমরা সেলিব্রেট করব ।’ ঘুষি
ফেরত দেয় তন্ময় ।
‘কি খারাপ ! কি খারাপ !! আমাকে দেখাবি না ?’ অনুযোগ করে ফারিহা ।
‘অফকোর্স ! আর মাত্র কয়েকটা দিন দোস্ত ।’
কিন্তু কয়েকটা দিনের কথা বললেও আগামী এক সপ্তাহের
মধ্যে ছবিটা দেখা হল না ফারিহার ।
বলা যায় – একটা সপ্তাহ তন্ময়ের সাথে ভালোমত
যোগাযোগও হল না ফারিহার ।
মনে মনে গালি দিয়ে ওর ভূত ভাগায় ফারিহা – পাগলটার হয়ত ছবির
কাজ বাকি ছিল – এখন আমাকে দেখাতে হবে তাই ডুব মেরে
কাজ শেষ করছে – নিজেকে বোঝায় ও ।
মোবাইলের রিংটোন বাজতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ও – কিন্তু তন্ময়
না – তূর্য ভাইয়ার কল । বিরক্ত হয়েই ফোন রিসিভ করে ফারিহা ।
‘তোকে কিভাবে ব্যাপারটা বলব বুঝতে পারছি না ।’
‘ভাইয়া কি তন্ময়ের শেষ ছবিটার কথা বলছেন ? অবাক হয়েছেন
তো ? আমি জানতাম ও এবার অসাধারণ কিছু একটার জন্ম দেবে ।
আমি অবশ্য এখনও দেখি নি -’
‘তন্ময় মারা গেছে ফারিহা । গত পরশু রাতে ।’ কন্ঠ সিক্ত হয়ে
আসে তূর্যের । ‘তার আগে আমাকে মেসেজ দিয়েছিল
যেন তোকে বলি তোর মেইল চেক করতে । আমি
ভেবেছিলাম তোদের ঝগড়া – তাই । তখন যদি বুঝতাম রে ...’
আরও কি কি বলে যায় অপরাধী কন্ঠ নিয়ে তূর্য ভাই – কানে
কিচ্ছু শুনতে পায় না ফারিহা । হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যায়
আলতো করে ।
একটা যন্ত্রের মতই কম্পিউটারের সামনে বসে পড়ে ও ।
ফেসবুক এবং মোবাইল চেক করলেও ই-মেইলটা রোজ
চেক করা হয় না ।
একটি অ্যাটাচমেন্ট সহ একটী মাত্র আনরীড মেইল ।
প্রথমে ওর চোখ পড়ে ছবিটির ওপর ।
ফারিহার একটা পোট্রেট । সম্পূর্ণ ডিটেইলস তন্ময় নিজের মাথা
থেকে এঁকেছে । ফারিহার মুখে একটা অপার্থিব হাসি – যে
হাসিতে একই সাথে ভালোবাসা – কান্না – সুখ এবং দুঃখের প্রতিচ্ছবি
। একটি সাধারণ ছবি কিভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠে চোখের সামনে
তা ফারিহা বুঝতে পারল না – তখন ওর চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে
আসছে ।
মেইলটা ওপেন করল ও ঝাপসা চোখেই ।
‘ফারিহা,
তুই অনেক ভালো একটা মেয়ে । এবং অসাধারণ । পৃথিবীতে যদি
এখনও একটা নিখুঁত মেয়ে থাকে – তবে নিঃসন্দেহে সেটা তুই
।
আমি চিঠি লেখতে পারি না – লেখিনি কখনও । কিন্তু তোর কিছু কথা
জানার অধিকার আছে – যে কথাগুলো আমি সামনে দাঁড়িয়ে
তোকে কখনোই বলতে পারব না ।
তুই সবসময় বলতি আমি বোকা । তোর কথা এতটা সত্য আমি
নিজেও জানতাম না । তোর বন্ধুত্বের আড়ালে নিজেকে
অনেক সুখী মনে হত – জীবনকে অনেক শান্ত । কখন
যে বোকার মত তোর প্রেমে পড়ে গেলাম !
তুই আমাকে ভালোবাসতি সেটা আমি জানি – তুই আমাকে ফিরিয়ে
দিতি না – সেটাও আমি জানি ।
এখন হয়ত ভাবছিস – কেন তোকে বলিনি? আর কেনই বা
তোকে আমার জীবনের সবকিছু শেয়ার করেছি শুধু
আমাদের প্রথম দেখার দিনটি বাদ দিয়ে ?
তারিখটি তোর মনে আছে কি না জানি না । তবে আমার আছে ।
১৫ই মার্চ । যেদিন আমি হাতে পেলাম আমার ক্যাট স্ক্যানের
রিপোর্ট ।
মাথা আরও কয়েক মাস ধরেই হঠাৎ হঠাৎ প্রচন্ড রকম ব্যাথা করত ।
পাত্তা দেইনি । অনেক সময় নিয়ে ছবি আঁকতাম বলে ভাবতাম –
চোখের ওপর বেশি প্রেশার দেওয়ার ফল । অবশেষে
ডাক্তার দেখালাম । স্ক্যান করতে বলল আমাকে । স্ক্যান
রিপোর্ট নিয়ে কন্সাল্টেশন সেন্টার থেকে মাত্র দুঃসংবাদটা
নিয়ে বের হয়েছি – বড়জোর দুই থেকে আড়াই মাস বাঁচব আমি
- ঠিক তখনই দেখিস তুই আমাকে ।
টিউমারটা এতটাই গ্রো করেছিল আমার দশমিকের কোঠায়ও
সুযোগ ছিল না ।
আমাকে মাফ করে দিস ফারিহা । তোকে পেয়ে হারানোর
বেদনা দিতে চাইনি ।
আর – বেশি কাঁদিস না ।
কথা দিচ্ছি – এই জন্মে হতে না পারলেও ওই জন্মে ঠিকই তোর
হব ।
- ফারিহার তন্ময়’
*
ফারিহার ফোনে রেসপন্স না পেয়ে তূর্য ওর বাসার সামনে গাড়ি
থেকে নেমে দেখল –
মেয়েটা ভিজছে ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now