বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
“শুদ্ধতার আলোর বিদ্যালয়” - মোহাম্মদ শাহজামান শুভ।
জেলার প্রান্তিক এক উপজেলা—চরনগর। নদীর ভাঙন, কাদামাটির রাস্তা আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে “চরনগর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়”। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি বিদ্যালয়; টিনের ছাউনি, দোচালা অফিসকক্ষ, মাঠের এক কোণে ভাঙা গোলপোস্ট। কিন্তু ভেতরে জমে উঠেছিল অদৃশ্য এক অন্ধকার—নকল, সুপারিশ, পক্ষপাত, ফলাফল কারসাজি, এমনকি শিক্ষকদের কিছু অনৈতিক আচরণ নিয়ে গুঞ্জন। বিদ্যালয়ের সুনাম ছিল একসময়, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটি ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
এই সময়েই প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন আরিফুল ইসলাম। শহরের একটি নামী কলেজে শিক্ষকতা করতেন, কিন্তু নিজের গ্রামের বিদ্যালয়কে বদলে দেওয়ার স্বপ্নে ফিরে এসেছেন। যোগদানের দিনই তিনি শিক্ষক-কর্মচারী সবার সাথে এক সংক্ষিপ্ত সভা করলেন। তার কণ্ঠ ছিল শান্ত, কিন্তু দৃঢ়—“শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়; শিক্ষা মানে চরিত্র গঠন। আর চরিত্র গঠনের প্রথম শর্ত শুদ্ধাচার।”
শুরুতেই তিনি বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করলেন। কয়েকজন ছাত্রের সাথে আলাদা করে কথা বললেন। রুবেল নামের এক ছাত্র বলল, “স্যার, এখানে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস হয়। অনেকেই কোচিং সেন্টার থেকে প্রশ্ন পায়।” আরেকজন ছাত্রী, সুমি, লাজুক গলায় বলল, “কিছু শিক্ষক ভালো পড়ান, কিন্তু কিছুজন ক্লাসে সময় দেন না। কোচিংয়ে না গেলে ভালো নম্বর পাওয়া কঠিন।”
আরিফুল ইসলাম বুঝলেন, সমস্যা গভীর। তিনি একদিন স্টাফরুমে বসে বললেন, “আমরা যদি নিজেরাই শুদ্ধ না হই, তাহলে ছাত্রদের কীভাবে শুদ্ধতার পাঠ দেব?” কিছু শিক্ষক মুখ নিচু করে রইলেন। কেউ কেউ বিরক্ত হলেন—“স্যার নতুন এসেই বড় বড় কথা বলছেন,” ফিসফিস শোনা গেল।
কিন্তু তিনি থামলেন না। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুদ্ধাচার নির্দেশিকা তৈরি করলেন। প্রতিটি ক্লাসে গিয়ে তিনি নিজেই বললেন—সময়ানুবর্তিতা মানে শুধু ঘণ্টা বাজার আগে আসা নয়; এটি জীবনের শৃঙ্খলার শুরু। সততা মানে শুধু নকল না করা নয়; নিজের পরিশ্রমে বিশ্বাস রাখা। তিনি একটি ছোট গল্প শোনালেন—এক কৃষকের, যে অল্প জমি নিয়েও সৎ পথে ফসল ফলিয়ে সুখী ছিল। ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে শুনল।
পরীক্ষার আগে ঘোষণা দেওয়া হলো—কোনো ধরনের নকল সহ্য করা হবে না। পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো হলো, বাহিরের কোচিং সেন্টারগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হলো। প্রথম দিনেই কয়েকজন ছাত্র নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ল। অভিভাবকরা এসে অনুরোধ করলেন, “স্যার, বাচ্চারা তো ভুল করতেই পারে!” আরিফুল ইসলাম শান্তভাবে বললেন, “ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলকে প্রশ্রয় দিলে সেটাই অভ্যাস হয়।”
শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এলো। তিনি প্রত্যেকের ক্লাস রুটিন কঠোরভাবে অনুসরণ করলেন। দেরিতে এলে কারণ জানতে চাইলেন। একদিন গণিতের শিক্ষক দেরিতে এলে তিনি বললেন, “স্যার, আপনার দেরি মানে চল্লিশজন ছাত্রের সময় নষ্ট।” কথাটি কড়া ছিল, কিন্তু অপমানজনক নয়। ধীরে ধীরে শিক্ষকরা সময়মতো আসতে শুরু করলেন।
সবচেয়ে কঠিন ছিল নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা। আগে দেখা যেত, প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানরা বিশেষ সুবিধা পেত। এবার ফলাফল প্রকাশের আগে খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হলো। ফলাফল প্রকাশের দিন ছাত্ররা অবাক—প্রথম হয়েছে সেই রুবেল, যার বাবা একজন দিনমজুর। করিম চেয়ারম্যানের ছেলে দ্বিতীয়। গ্রামে ফিসফাস শুরু হলো—“মাস্টার সাহেব পক্ষপাত করেননি।”
প্রশাসনিক দিকেও স্বচ্ছতা আনা হলো। ভর্তি প্রক্রিয়া লটারির মাধ্যমে করা হলো। বৃত্তির তালিকা নোটিশ বোর্ডে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, সাথে নম্বরের বিবরণ। কেউ চাইলে খাতা দেখতে পারে—এই ব্যবস্থা চালু হলো। শুরুতে অনেকের আপত্তি ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝল—স্বচ্ছতা মানেই আস্থা।
একদিন বিদ্যালয়ে একটি অভিযোগ এলো—এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ। আগে এমন অভিযোগ ধামাচাপা পড়ত। কিন্তু এবার প্রধান শিক্ষক তদন্ত কমিটি গঠন করলেন। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলো। সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলো। গ্রামে তোলপাড়। কেউ বলল, “এতে স্কুলের বদনাম হবে।” আরিফুল ইসলাম বললেন, “অন্যায় লুকালে বদনাম বাড়ে, বিচার করলে আস্থা বাড়ে।”
এই ঘটনার পর ছাত্রীদের মাঝে এক নতুন সাহস জন্ম নিল। তারা বুঝল, তাদের সম্মান রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে। ছাত্ররাও বুঝল—শৃঙ্খলা মানে ভয় নয়; এটি নিরাপত্তা।
এক বছর পর বিদ্যালয়ের চেহারা বদলে গেল। সকাল আটটার আগেই ছাত্ররা উপস্থিত হয়। ক্লাসে মনোযোগী পরিবেশ। শিক্ষকরা পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করেন সময়মতো। পরীক্ষায় নকলের ঘটনা প্রায় শূন্য। ফলাফলও উন্নত। কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো মানসিকতায়।
রুবেল একদিন প্রধান শিক্ষককে বলল, “স্যার, আগে ভাবতাম ভালো নম্বর মানেই সাফল্য। এখন বুঝি, সৎভাবে পাওয়া নম্বরই আসল।” সুমি বলল, “আমরা এখন গর্ব করে বলতে পারি, আমাদের স্কুলে নকল হয় না।”
জেলার শিক্ষা কর্মকর্তা পরিদর্শনে এসে অবাক হলেন। তিনি বললেন, “চরনগর বিদ্যালয় এখন উদাহরণ।” কিন্তু আরিফুল ইসলাম জানতেন, এই সাফল্য একদিনে আসেনি; এটি এসেছে ধারাবাহিক শুদ্ধাচার চর্চা থেকে।
বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, “শুদ্ধাচার কোনো কাগুজে নীতিমালা নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চা। ছাত্রের সততা, শিক্ষকের আদর্শ, প্রশাসনের স্বচ্ছতা—এই তিন মিলেই একটি প্রতিষ্ঠান আলোকিত হয়।”
অনুষ্ঠানের শেষে পুরো বিদ্যালয় মোমবাতি জ্বালিয়ে দাঁড়াল। প্রতিটি মোম যেন একটি প্রতিজ্ঞা—নকল করব না, ঘুষ নেব না, পক্ষপাত করব না, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করব। সেই আলো ধীরে ধীরে অন্ধকার ভেদ করল।
কয়েক বছর পর চরনগর বিদ্যালয়ের নাম জেলা ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ল। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি পাঠিয়ে শিখতে এলো—কীভাবে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা যায়। আরিফুল ইসলাম তখন বলতেন, “আইন দিয়ে শুদ্ধাচার চাপিয়ে দেওয়া যায় না; উদাহরণ দিয়ে তা জাগিয়ে তুলতে হয়।”
গ্রামের মানুষ এখন বিদ্যালয়কে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, নৈতিকতার কেন্দ্র হিসেবে দেখে। ছাত্ররা বড় হয়ে যখন বিভিন্ন পেশায় যায়—কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ প্রশাসক—তারা সেই শুদ্ধাচারের পাঠ সঙ্গে নিয়ে যায়।
একদিন সন্ধ্যায় আরিফুল ইসলাম বিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, সূর্য ডুবে যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়ানো রুবেল, এখন নতুন শিক্ষক, বলল, “স্যার, আপনি যে আলো জ্বালিয়েছেন, তা নিভবে না।” প্রধান শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “আলো আমি জ্বালাইনি, তোমরাই জ্বালিয়েছ। আমি শুধু পথ দেখিয়েছি।”
চরনগরের সেই ছোট্ট বিদ্যালয় প্রমাণ করল—শুদ্ধাচার মানে কড়াকড়ি নয়; এটি বিশ্বাসের ভিত্তি। যখন ছাত্র সততায় দৃঢ়, শিক্ষক আদর্শে অটল, প্রশাসন স্বচ্ছতায় অবিচল—তখনই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে আলোকিত হয়।
আর সেই আলোকিত পথেই এগিয়ে চলে একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now