বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শুধু দুজনে

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X শুধু দুজনে -- তাহমিনা জাহান অনেকক্ষণ থেকেই নদী আর সাগর চুপচাপ পাশাপাশি বসে আছে । কোন কথা না বলে শুধু নিজেরদের উপস্থিতি উপভোগ করছে যেন দুজন । মনে হচ্ছে একটা টু শব্দও এই স্নিগ্ধ পরিবেশ কে মলিন করে দেবে । বেশ অনেকটা সময় পার হবার পর নদী জানতে চাইলো মৃদু স্বরে, "কেমন ছিলে এ দুটো বছর? " সাগর কিছুটা সময় চুপ থেকে বলল, "নদীর স্রোত থেমে গেলে সাগর যেমন থাকে তেমনই।" নদী বলল, "সাগরে তো হাজারো নদীর স্রোত মিলেমিশে একাকার হয়,কোন একটি নদীর স্রোত কি আর সাগর আলাদা করে চিনতে পারে? " উত্তরে সাগর বলল, "এই সাগরে যে অন্য কোন নদীর অনুপ্রবেশ নিষেধ চিরদিনের জন্য। " একথা শুনে নদী সাগরের চোখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো কিছুক্ষন তারপর আস্তে করে বললো, "তবে কেন এই দুটো বছর এত দুরে ছিলে? কেন নিজেকে আমার কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছিলে? এর নামই কি তবে ভালবাসা? " কিছুক্ষন মাথা নিচু করে রেখে সাগর বলল, "যে অপরাধ আমি তোমার কাছে করেছিলাম , তার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য যে এই দুরত্বটা দরকার ছিল নদী । আমি নিজের ভুল নিজে বুঝেই এই শাস্তি দিয়েছি নিজেকে । নইলে আমি জীবনেও তোমার চোখে চোখ রাখতে পারতাম না । " আবার বলে উঠলো সাগর, "তুমি আমাকে ক্ষমা করেছো তো ? " নদী মুচকি হেসে বলে উঠলো, "ক্ষমা আমি তোমাকে অনেক আগেই করেছি এতদিন শুধু অপেক্ষা করেছি তোমার ফিরে আসার ।" সাগর বলল, " সত্যিই নদী , ওই দিন যদি তুমি আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমার ভুল না ভাঙাতে তবে আমি কোন দিনই বুঝতে পারতাম না যে ক্ষনিকের আবেগ মানুষকে কতটা ভুল পথে চালনা করে । নিমেষেই নষ্ট করে দিতে পারে বহু কষ্টে গড়ে তোলা সম্পর্কগুলো । " নদী উত্তরে শুধু বলল , " নিজের ভুল বুঝে তা মেনে নিয়ে ভুল শুধরে নেয়াটাই যে প্রকৃত মানুষের কাজ । আর তুমি তা পেরেছো বলেই না আজ আমরা আবার এখানে একসাথে হলাম । " সাগর নদীর হাত ধরে বলে উঠলো, " আবার আমাদের একসাথে পথচলা শুরু হোক তবে ?" নদী বলল , " আমি তো দু'বছর যাবত এই দিনটির অপেক্ষাই করছি সাগর ।" একথা বলে ছলছল চোখে পরস্পরের হাত চেপে ধরে বসে বসে দুবছর আগের সেই বাজে ঘটনার কথা ভাবতে লাগলো ওরা । যার কারনে পরস্পরকে সত্যিকার অর্থে ভালবেসেও এই দুবছর আলাদা ছিল দুজন । তখন নদী অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী আর সাগর মার্কেটিং এ মাস্টার্স শেষ করে সবে একটা ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরিতে জয়েন করেছে । পারিবারিক ভাবে ওদের বিয়েটা ঠিক হয়েই আছে অপেক্ষা শুধু নদীর মাস্টার্স টা শেষ হবার । ততদিনে সাগরও নিজের পায়ের নিচে শক্ত ভিত তৈরী করে নিতে পারবে । খুব সুন্দরভাবেই দু'পরিবার ওদের ভালবাসাকে স্বীকৃতি দিতে সম্মতি দিয়েছে । প্রথমে তো ওরা খুব ভয়েই ছিল দুই পরিবার নিয়ে। ভেবেছিল বাংলা সিনেমার মা-বাবাদের মতো নাটকীয় ঘটনাবলীর আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে ওদের প্রেমও বুঝি জলাঞ্জলি যাবে । কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার সাগরের মাস্টার্স পাশের পর পর ওর মাকে নদীর কথা জানাতে গিয়ে দেখে মা আগে থেকেই সব জানে । আর উনাদের কারোরই কোন আপত্তি নেই নদীকে বা নদীর পরিবারকে আপন করে নিয়ে । তারপর আনুষ্ঠানিক ভাবেই ওদের বাগদান হয়ে যায় ফলে বুক চিতিয়ে প্রেম করতেও আর কোন বাধা থাকে না ওদের । এভাবে ভালভাবেই চলছিল ওদের দিন এমন সময় একদিন রাতের বেলা কথা বলতে বলতে ওদের মাঝে ঝগড়া শুরু হয় । সাগর রাগ করেই ফোন রেখে দেয় ফলে নদীর অনেক মন খারাপ হয় ।অনেক সাধ্য সাধনা করেও সাগরের রাগ ভাংগাতে পারে না । বার বার এক কথা বলায় সাগর রাগের চোটে মোবাইল অফ করে দেয় । এরপর সারা রাত চেষ্টা করেও আর কথা বলতে না পেরে নদী শুধু কাঁদতে থাকে । আর বার বার সাগরের মোবাইলে কল করতে থাকে কিন্তু পায় না। এরপর কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পরে নদী নিজেও বুঝতে পারে না । পরদিন ছিল কোন এক ছুটির দিন , হঠাত করে ঘুম ভেঙ্গে নদী মোবাইল হাতে নিয়ে দেখে সকাল নটা বেজে গেছে । তাড়াতাড়ি আবার সাগরের মোবাইলে কল করে দেখে রিং হচ্ছে কিন্তু সাগর কল রিসিভ করে না । আরো মন খারাপ হয় নদীর তবুও শোয়া থেকে উঠে নিজেকে ব্যাস্ত করে নেয় বিভিন্ন কাজে। ওর মন খারাপ দেখে বাসার কেউ তেমন ঘাটায় না ওকে হঠাত আবার নদীর ইচ্ছে করে সাগরকে কল করতে । রুমে এসে সাগরকে কল করতেই সাগর " হ্যালো " বলে উঠে । সাথে সাথেই নদীর মনটা খুশী হয়ে উঠে ভাবে সাগরের মেজাজ ঠিক হয়ে গেছে । নদী বলে , " শুভ সকাল "। সাগর উত্তরে ," হু "ছাড়া আর কিছুই বলে না । নদী কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে , " এখনো রাগ করে থাকবে ? আর কতো সরি বলবো ? " সাগর রাগী গলায় বলে, " সরি বলে কিছু হবে না এবার । " নদী দ্রুত বলে ," কি করতে হবে ? " সাগর বলে ,"দেখা করতে হবে আজ দুপুরেই । " একথা শুনে নদী কিছুটা দমে যায় । বলে , " তুমি তো জানোই ছুটির দিনে বাবা সবাইকে নিয়ে দুপুরে খেতে ভালবাসে , এটা প্রায় অলিখিত নিয়ম বাসার । " সাগর এবার প্রায় চিৎকার করেই বলে , " আজ যদি না আসো তবে এক সপ্তাহ আর আমাকে ফোন দিবা না । " একথা বলে ফোন রেখে দেয় সাগর । ওদিকে নদী আবারো কাঁদতে শুরু করে দেয় এমন সময় নদীর মা জাহানারা বেগম আসেন নদীর রুমে । এসে মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে উনি জানতে চান, " কি হয়েছে ? কেন কাঁদছিস এমন করে ?" উত্তরে নদী বলে , " মা সাগর আজ দুপুরে ওর সাথে বাইরে খেতে বলেছিল আমি মানা করেছি বলে ও আমার সাথে ঝগড়া করে এক সপ্তাহ কল করতে মানা করেছে । " জাহানারা বেগম বললেন , " তুই চলে যা , তোর বাবাকে আমি বুঝিয়ে বলবো । " নদী মাকে জড়িয়ে ধরে বললো ," আমার লক্ষি মা। যাই ওকে ফোন করে বলি যে আমি আসছি ।" জাহানারা বেগম , "আমি যেয়ে তোর বাবাকে বুঝিয়ে বলি ।" একথা বলে উনি উঠে রুমের বাইরে চলে গেলেন ।আর নদী সাগরকে ফোন করে বলল যে ও আজ দেখা করতে আসছে । একথা শুনে সাগর ওকে এক জায়গার নাম বলে ওখানে আসতে বলল । এতে একটু অবাক হলেও নদী কিছু না বলে রেডি হতে লাগলো । আর ভাবল হয়তো আজ সাগর ওকে নতুন কোথাও নিয়ে যাবে । ঘন্টাখানেক পর নদী সাগরের বলা জায়গায় গিয়ে দেখে সাগর আগে থেকেই ওখানে একটা বাইক নিয়ে দাড়িয়ে আছে । সাগর নদীকে দেখে চুপচাপ বাইকে উঠতে বলে বাইক চালু করে । কিছুক্ষন পর ওরা একটা এপার্টমেন্ট বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় । বাইক থেকে নেমে সাগর নদীকে নিয়ে লিফটের দিকে যেতে থাকলে নদী বার বার জানতে চায়, "এটা কার বাসা? কার বাসায় নিয়ে আসছো তুমি আমাকে? " সাগর কিছু না বলে লিফটে ৬ তলার এক ফ্ল্যাটে নদীকে নিয়ে আসে । ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালে নদী দেখে দরজার সামনে খুব সুন্দর করে ফুল দিয়ে " ওয়েলকাম "লেখা । নদী খুব অবাক হয়ে সাগরকে জিজ্ঞেস করে," কার ফ্ল্যাট এটা ?" সাগর চুপ্টি করে পকেট থেকে চাবি বের করে নদীর হাতে দিয়ে বললো , " তোমার ।" নদী হতবাক হয়ে বলল ," কিভাবে ?" সাগর ," কিভাবে তা জেনে কাজ কি? আগে তো দেখে বল কেমন হল । সব আমার মহারাণীর পছন্দ হয় কিনা তা দেখো , না হয় তো কি কি পাল্টাতে হবে বল । আমি চাই বিয়ের পর তুমি তোমার পছন্দের রাজত্বে প্রবেশ করবে ।" একথা নদীর দুচোখ ছলছল করে উঠলো আর মুক্তোর মত দু ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে নেমে এলো খুশিতে ।সাগর হালকা আদরে নদীর গাল বেয়ে পড়া অশ্রু ঠোঁট দিয়ে মুছিয়ে নিতেই নদী ঝরঝর করে কেঁদে সাগরকে জড়িয়ে ধরল । সাগরও নদীকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে ওকে স্বান্তনা দিতে লাগলো , হঠাত করেই নদী খেয়াল করলো সাগরের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ছে । নদী সাগরকে বাঁধা দিলে সাগর জোর করে নদীকে আঁকড়ে ধরে চুমু খেতে যায় । নদী দ্রুত সাগরকে দূরে ঠেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি নিজেকে ঘুছিয়ে নেয় । তারপর সাগরের কাছ থেকে দূরে গিয়ে বসে নিজেকে শান্ত করে নেয় । বেশ কিছুক্ষণ পর সাগর নদীর পায়ের কাছে বসে বার বার মাপ চাইতে লাগলো কিন্তু নদী কিছু না বলে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে সাগরের দিকে চেয়ে বলল , " আমি বাড়ি যাবো ।" একথা বলে নদী আস্তে আস্তে বাসার বাইরে চলে এলো । সাগরও কিছু না বলে মাথা নিচু করে নদীর পিছু পিছু যেতে লাগলো , কোন কথা না বলে নদীকে ওদের বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে শুধু জানতে চাইলো ," আবার কবে দেখা হবে?" নদী খুব দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো ," যে দিন নিঃসঙ্কোচে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে , সেদিন ।" ওইদিনই ছিল ওদের শেষ দেখা , এরপর দু বছর আর কোন যোগাযোগ করেনি সাগর নদীর সাথে । নদীর সাথে ঝগড়া করে সাগরের মাথা খুব গরম হয়ে পড়ে , কিভাবে ওকে ভালো ভাবে শায়েস্তা করা যায় তা নিয়ে নিজে নিজে পরিকল্পনা করতে থাকে । একবার ও ওর নিজের ভালবাসার মানুশের মান অপমান এর কথা মনে হয় না । কথায় ই তো আছে , মাথায় শয়তান ভর করলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না ।আর সে দিন তো রাগের চোটে সুধু নদী কে শায়েস্তা কিভাবে করবে তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ছিল না সাগ্রের।তাই কিভাবে ও ওই দিন এমন কিছু করতে পারলো আজো ভেবে পায় না । সেদিন নদীর সাথে ওরকম বাজে ব্যবহার করে সাগর খুবই লজ্জিত হয়ে পড়েছিল । নিজেকে বার বার ধিক্কার দিয়েও কোন স্বান্তনা পাচ্ছিল না । তাই হুট করেই সিদ্ধান্ত নেয় দেশ ছাড়ার । তারপর বাসায় কোন প্রকার বুঝিয়ে দেশের বাইরে চলে যায় চাকরি নিয়ে । গত দুই বছরে নিজেকে বার বার ধিক্কার দিয়েছে , নদীর কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণা সহ্য করেছে । পরিবারের হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে । তবুও কারো কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে পারে নি । অবশেষে দুই বছর পর ছুটিতে দেশে এসে চুপি চুপি নদীর খোজ নিয়ে জেনেছে যে আজো নদী একা । পড়াশুনো শেষ করে একটা জব এ মাত্র দু মাস হল জয়েন করেছে । এক দিন রুমে বসে আনমনে গান শুনতে শুনতে নদীর ছবি দেখার সময় সাগরের মা নদীর ছবি ওর হাতে দেখে ফেলেন । পরের দিন সকালে উনি একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করেন ওদের মাঝে কি হয়েছে ? আস্তে আস্তে সাগর নিজের অপরাধের কথা মা কে বলে । সব কথা শুনে সাগরের মা " ছিঃ " বলে চিৎকার করে উঠেন , বলেন , " তুই যে এমন কোন কাজ করতে পারিস তা আমি কল্পনাতেও ভাবতে পারি না ।" " তুই কি নদীর কাছে মাফ চেয়েছিস ?" সাগর বলে , " আমি তো লজ্জায় ওর সাথে দেখা করতে পারি নি মা ।" ওর মা বলেন , " এত টুকু বোধ তোর এখনো আছে জেনে ভালো লাগলো । তুই কালই নদীর সাথে দেখা করে ক্ষমা চেয়ে আসবি । যদি কোন শাস্তি দেয় তো মাথা পেতে নিবি । কোন মেয়ের অভিশাপ নিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না রে । " একথা বলে উনি সজল চোখে ওখান থেকে চলে যান আর সাগর কিছুটা দ্বিধা নিয়ে নদীর ফোন এ কল দিয়ে দেখা করার কথা বলে । যার যার ভাবনায় মশগুল সাগর - নদী হঠাত দুরের মসজিদে মাগরিবের আজান শুনতে পায়, তাতে ওরা বুঝতে পারে কতটা সময় অতীতের রোমন্থনে কেটে গিয়েছে । নদী মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাড়িয়ে সাগরের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে উঠে , " চলো , আমাদের ফেরার সময় হল ।"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শুধু দুজনে

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now