বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শরিয়তের নামে শেকল?

"ইসলামিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Rida.. (০ পয়েন্ট)

X কলেজ থেকে ঘরে ঢুকতেই টিভিতে চোখ গেল। সম্ভবত ওয়াসী টিভি চালু করে খেলতে চলে গিয়েছে। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারা যায় না, সারাদিন টিভির ভেতরেই ঢুকে থাকে। টিভি বন্ধ করতে যাব, এমন সময় একটা শিরোনাম সামনে আসলো— "Women banned from Higher Education in Afghanistan"। কিছু না ভেবেই ভিডিওটার ওপর ক্লিক করলাম। সেখানে বলা হয়েছে, তালেবান সরকার মেয়েদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। অথচ তারা প্রথমে বলেছিল মেয়েদের জন্য শিক্ষা অর্জনের আলাদা ব্যবস্থা করা হবে। আর আজ তারা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দিয়েছে! খবরটা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল, টিভিটা বন্ধ করে দিলাম।  একটু হতাশ হয়ে ফ্রেশ হয়ে যোহরের নামায আদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এমন সময় রুহীর কল এলো। রুহী বলল, "আজ আমাদের নামাযের পর মসজিদে মেয়েদের একটা গেট-টুগেদার বা তালিমে বসার কথা আছে। তুই একটু জলদি আয়।" আমি বললাম, "আচ্ছা।" ফোনটা রেখে নামায আদায় করে নিলাম। নামাযে আজ আল্লাহর কাছে অনেক অভিযোগ রয়েছে আমার। আজকে সব অভিযোগ বলব মহান আল্লাহর কাছে।  আচ্ছা আল্লাহ, দুনিয়াটা এমন কেন? কেন এখানে সৎ থাকলেও কষ্ট পেতে হয়? আমি কখনো পরীক্ষায় নকল করি না, তবুও কেন ম্যাম আমাকে পয়েন্ট করে বললেন যে, "এই নিকাবী মেয়েরা বেশি ডিসটার্ব করে"? অথচ আমি তো কিছুই করিনি! গত পরশুদিন পেছনের মেয়েটা তো আমার খাতা দেখে লিখছিল, যার অনেক কিছু আমি জানিই না; তবুও কেন স্যার আমার খাতাটা কেড়ে নিলেন? কেন আমার রব? কেন? আবার আফগানিস্তানে কেন মেয়েদের অন্যায়ের বিচার না করে উল্টো তার ধর্ষকের সাথেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে? কেন তাদের ইলম অর্জনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? কেন? এইসব কি অন্যায় না? মেয়েরা কি শুধুই ফিতনা? তুমি সবাইকে হেদায়াত দাও রব।  মোনাজাত শেষে রেডি হয়ে নিলাম মসজিদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সারা দিনটা কেমন জানি কাটল। মসজিদের সামনে যেতেই দেখি রুহী দাঁড়িয়ে আছে। ওকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "এত তাড়াতাড়ি এসেছিস? এখনও তো আজানের ৩০ মিনিট বাকি।" রুহী বলল, "আজকে নাকি সাবা নামে একটি নতুন মেয়ে আসবে অন্তরার সাথে।" আমি বললাম, "সে তো ভালো কথা, এখানে সমস্যা কোথায়?" রুহী বলল, "আগে সবাই আসুক, তারপর বুঝবি সমস্যা কোথায়।"  ১০ মিনিট পর অন্তরা এবং একটি অপরিচিত মেয়ে এলো, সম্ভবত সেই-ই সাবা। এসে তারা আমাদের সাথে কুশল বিনিময় করল। আমরা সাবার সাথে পরিচিত হয়ে নিলাম। কথার এক পর্যায়ে সাবা বলে উঠল, "তোমরা কি রোজ মসজিদে এসে নামায পড়ো?" আমি বললাম, "জ্বী, আমরা চেষ্টা করি। রোজ হয়তো হয়ে ওঠে না, তবে সপ্তাহে অন্তত ৩-৪ দিন যেন আমরা একত্র হয়ে সালাত আদায় করতে পারি এবং তালিম করতে পারি। অবশ্য রুহী আর আমি বলা চলে প্রতিদিনই আসি মসজিদে সালাত আদায় করতে।" সাবা অবাক হয়ে বলল, "কিন্তু তোমরা কি জানো না, মেয়েদের মসজিদে আসা নিষেধ? মাকরূহ?!"  আমি ওর প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে গেলাম এবং রুহীর দিকে তাকালাম। রুহী আমার প্রতিক্রিয়া দেখে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বলে উঠল, "হ্যাঁ সাবা, তোমার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই আজকের এই আয়োজন।" রুহী বুঝিয়ে বলল যে, সাবা অন্তরার পাশের বাসায় নতুন এসেছে। একই বয়সী হওয়ায় অন্তরার সাথে তার ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছে। আড্ডার মাঝে একবার অন্তরা মসজিদে আসার জন্য সাবাকে আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু সাবার মতে মেয়েদের জন্য মসজিদে যাওয়া এক ধরণের হারাম কাজ। এই নিয়ে অন্তরার সাথে তার তর্ক লেগে যায়। তখন অন্তরা বিষয়টি রুহীকে জানায় এবং রুহী ওকে পরামর্শ দেয় একদিন আমাদের তালিমে নিয়ে আসার জন্য। অনেক কষ্টে অন্তরা সাবাকে রাজি করিয়ে আজকে নিয়ে এসেছে।  আমি রুহীর কথা বুঝতে পেরে একটু মুচকি হেসে সাবাকে বললাম, "আচ্ছা ঠিক আছে, বুঝলাম। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে। চলো আজান দিচ্ছে, আগে নামায পড়ে নেই।" আমরা সবাই মসজিদের ভেতরে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় গেলাম।  নামায শেষে আমরা তালিমে বসলাম। আমি বললাম, "বলো সাবা, তুমি কি জানতে চাও?" সাবা: মেয়েদের জন্য মসজিদে যাওয়া তো মাকরূহ! তোমরা কি সেটা জানো না? রুহী: তোমার কাছে কি কোনো দলিল আছে যেখানে এটা বলা হয়েছে? সাবা: হ্যাঁ, অবশ্যই। মা আয়েশা (রাgj বলেন, "নারীরা (রাসূলের ওফাতের পর) নতুন যা কিছু শুরু করেছে, তা যদি রাসূলুল্লাহ (সাgj দেখে যেতেন, তবে তিনি অবশ্যই তাদের মসজিদে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিতেন— যেমন বনী ইসরাঈলের নারীদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।" (বুখারী শরীফ) রুহী: কিন্তু এখানে তো কোথাও বলা হয়নি যে, মেয়েদের মসজিদে যাওয়া মাকরূহ বা নিষিদ্ধ? সাবা: কিন্তু হানাফী মাযহাব ও ফিকাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটা নিষেধ। রুহী: এটা কি নবীজী (সাgj নিজে নিষেধ করেছেন? সাবা: না— কিন্তু তিনি নারীদের অন্দরমহলে সালাত আদায় করাকেই বেশি পছন্দ করতেন।  রুহী কিছু বলতে যাবে, তার আগে আমি তাকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলাম। নাহলে তালিম করার জায়গায় ওখানে একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। আমি বললাম, "আচ্ছা সাবা, তুমি কি মেয়েদের মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে পেছনের ইতিহাস জানো?" সাবা: কিছুটা। হযরত উমর (রাgj এর খেলাফতকালে মেয়েদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ করা হয়েছিল। আমি: কিন্তু এটা তো সঠিক তথ্য নয়। চলো আগে ইতিহাস জেনে নেই। নবীজী (সাgj এর যুগে মসজিদে নববীতে নারী ও পুরুষ উভয়েই নামায পড়তেন। তখন কোনো দেয়াল বা পর্দা ছিল না। পুরুষেরা সামনের কাতারে এবং নারীরা পেছনের কাতারে দাঁড়াতেন। রাসূল (সাgj স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, "তোমরা আল্লাহর দাসীদের (নারীদের) আল্লাহর মসজিদে আসতে বাধা দিও না।"  এরপর রাসূল (সাgj এর ওফাতের পর মদীনার সামাজিক পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। নারীদের চলাফেরা ও সাজসজ্জার পরিবর্তন দেখে হযরত উমর (রাgj ফিতনার আশঙ্কা করেছিলেন। এজন্য তিনি মেয়েদের মসজিদে যাওয়া ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন না, কিন্তু সেটিকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেননি। বরং তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন কীভাবে এই বিষয়টিকে সামলানো যায় এবং ফিতনামুক্ত করা যায়। এইজন্য তিনি মেয়েদের জন্য মসজিদে ঢোকার আলাদা প্রবেশ পথের ব্যবস্থা করেন। এটিই তো একজন আদর্শ শাসকের কর্তব্য! তিনি ফিতনার আশঙ্কা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেটির সমাধান বের করেছিলেন; এমনটা নয় যে তিনি সম্পূর্ণ ব্যান বা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি কখনোই তাঁর রাসূল (সাgj এর আদেশের বিরুদ্ধে যাননি। যদি নিষিদ্ধ করতেই হতো, তাহলে রাসূল (সাgj নিজেই সেটিকে নিষিদ্ধ ও হারাম বা মাকরূহ ঘোষণা করে যেতেন।  একবার হযরত উমরের স্ত্রী আতিকা বিনতে জায়েদ (রাgj নিয়মিত মসজিদে নববীতে ফজর ও এশার জামায়াতে নামায পড়তেন। লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করত, "আপনি কেন মসজিদে যান? আপনি তো জানেন উমর এটি পছন্দ করেন না এবং তিনি অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি?" তিনি উত্তরে বলেছিলেন, "তিনি (উমর) আমাকে সরাসরি মুখ ফুটে নিষেধ করছেন না কেন?— অর্থাৎ উমর (রাgj যদি সত্যিই আমাকে মসজিদে যেতে দিতে না চান, তবে তিনি আমাকে স্পষ্ট বারণ করছেন না কেন?" এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর রাসূল (সাgj যা নিষেধ, মাকরূহ বা হারাম করেননি, তা কখনোই আমরা নিষিদ্ধ বলে গণ্য করতে পারি না।  সাবা: কিন্তু আমাদের মাযহাব যে বলে... আমি: দেখো সাবা, কিয়ামতের দিন যদি তুমি মনে করো তোমার মাযহাবের ইমাম তোমার জন্য আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করবেন, তাহলে তুমি সেটিই মানতে পারো। কিন্তু মনে রেখো আমরা মুসলিম; আমাদের প্রধান উৎস আল-কুরআন এবং সহীহ হাদিস। আমরা এর বাইরে গিয়ে আলাদা কোনো নিয়ম বা আদেশ-নিষেধ তৈরি করতে পারব না। সাবা মাথা নিচু করে বলল, "আচ্ছা, আমি বুঝতে পেরেছি।"  আমি আবার বললাম, "জ্বী হ্যাঁ। আবার দেখো, আমাদের এই ভারত উপমহাদেশে এমন অনেক কিছু আছে, যা ইসলামের অংশ নয়, কিন্তু তাকে ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। যেমন দেখো, আল্লাহ আল-কুরআন নাযিলের প্রথম আয়াতেই বলেছেন, 'ইকরা'— অর্থাৎ 'পড়ো', জ্ঞান অর্জন করো। এখানে কি উনি বলেছেন যে শুধু ছেলেরাই পড়বে?" রুহী বলল, "না তো।" আমি বললাম, "'জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয।' (সুনান ইবনে মাজাহ)। তবুও দেখো, মেয়েদের শিক্ষা অর্জন করা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে ফিতনার আশঙ্কায়। অথচ খলিফা উমর (রাgj উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন যে, যদি কোনো ফিতনা বা সমস্যা আবির্ভূত হয়, তবে সেটির সমাধান বের করতে হবে, সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়। কিন্তু আজ আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষা অর্জন নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এটা কি ইসলাম? আর তালেবান শাসকরা যদি সত্যিই শারীয়া আইন প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে এটা কোন আইনের মাঝে পড়ে?  হযরত উমর (রাgj এর আমলে হুজাইল গোত্রের এক ব্যক্তি এক নারীর ঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য ওই নারী আক্রমণকারীর দিকে একটা পাথর ছুঁড়ে মারেন, যার আঘাতে পুরুষটি মারা যায়। বিষয়টি যখন খলিফা হযরত উমর (রাgj এর দরবারে আসে, তখন তিনি রায় দেন, 'আল্লাহর কসম! এই নিহতের জন্য কোনো রক্তপণ বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।'  ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড, কিন্তু তথাকথিত কিছু মুসলিম রাষ্ট্রে অন্যায়ের বিচার না করে মেয়েদের উল্টো তার ধর্ষকের সাথেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এইজন্য সাবা আমি তোমাকে বলব, তুমি যদি কোনো বিষয় শোনো যে এটা জায়েজ আছে কিংবা এটা জায়েজ নেই, তাহলে আগে তুমি নিজেই বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করবে। কারো কথায় অন্ধভাবে প্রভাবিত হয়ে সেটিকে মেনে নিবে না। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, 'তোমরা অনুমান ও ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ অনুমানভিত্তিক কথা সবচেয়ে বড় মিথ্যা।' আবার সহীহ মুসলিমেও বলা হয়েছে, 'কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করেই) তা-ই মানুষের কাছে বর্ণনা করে বেড়ায়।' আশা করি, তুমি আমার কথা বুঝতে পেরেছ।"  সাবা চোখ উজ্জ্বল করে বলল, "জ্বী, জাজাকাল্লাহু খাইরান।" আমি মুচকি হেসে বললাম, "তাহলে পরবর্তী তালিমে তুমি আমাদের সাথে জয়েন করছ তো?" সাবা হেসে বলল, "অবশ্যই, ইন শা আল্লাহ।" আমি, অন্তরা আর রুহী একসাথে বলে উঠলাম, "ইন শা আল্লাহ।"  এর মধ্যেই মাগরিবের আজান দিয়ে দিল। দিনগুলো আজকাল বড্ড ছোট হয়ে আসছে। আমরা সবাই উঠে পড়লাম মাগরিবের সালাত আদায়ের জন্য। মনের ভেতরের দুপুরের সেই মেঘটা যেন বিকেলের এই তালিমে এসে কেটে গেল।  ———— সমাপ্ত ———


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শরিয়তের নামে শেকল?

গল্পটির রেটিং দিনঃ-
☆ ☆ ☆ ☆ ☆

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now