বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বেশ কিছু দিন হল মার শরীরটা খুব
খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি করেছি।
হাসপাতালে মার বেডের পাশে
দাড়িয়ে মার ঘুমন্ত মুখের দিকে
তাকিয়ে আছি। মার মুখটা আর আগের
মত নেই। যে মুখে সব সময় হাসি
লেগেই থাকতো সেই মুখটা আজ
কেমন যেন মলিন হয়ে আছে। রুমে
ঢুকার কিছুক্ষন পরই মার ঘুম ভেঙ্গে
যায়। আমাকে পাশেই দাড়িয়ে
থাকতে দেখে মার তার বাম হাতটা
আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে, ফর্সা
হাতের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট সবুজ
রক্তনালী ফুটে উঠেছে। আমি মার
হাতটা ধরতেই যেন মার শরীর কেঁপে
উঠলো। আমাকে তার পাশে বসিয়ে
দিয়ে বললো-
- কখন এসেছিস বাবা। আমাকে
ডাকলি না কেন?
- এইতো একটু আগে। এখন কেমন
লাগছে মা তোমার?
- এখন ভাল লাগসে। তোর মুখটা এমন
শুকনো শুকনো লাগছে কেনো রে
বাবা। চিন্তার তো কিছু নেই, দেখ
আমি দিব্যি সুস্থ্য আছি। কয়েকটা
দিন আমি বাসায় নেই তাতেই
শরীরের এই অবস্থা। এখনতো একটু
নিজের খেয়াল রাখতে শিখো। আমার কিছু
হয়ে গেলে তো তোকেই সংসারটা
দেখতে হবে তাইনা..!
আমিঃ ................
.
(দুনিয়ার সব মা গুলো হয়তো এমনই হয়।
অসুস্থতার কারনে হাসপাতালের
বেডে শুয়ে অাছে অথচ নিজের কথা
বাদ দিয়ে সন্তানের কথা চিন্তা
করছে)
.
হঠাৎ মা আমার ডান হাতটা তার দুই
হাত দিয়ে ধরে তার গালের নিচে
দিয়ে আবার শুয়ে পড়লো।
.
অনেকটা অবাক হয়েছিলাম কারন
ছোট্ট বেলায় যখন মাঝ রাতে আমার
ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আর ঘুম আসতে
চাইতো না তখন আমি মার হাতটা
ঠিক এইভাবে গালের নিচে দিয়ে
ঘুমানোর চেষ্টা করতাম আর মা অন্য
হাত দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে
দিত। কত্তো রকমের গল্প বলতো মা।
গল্প শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে
পড়তাম টের-ই পেতাম না।
.
খুবই সুখের সংসার ছিল আমাদের।
বাবা, মা, আপু, আমি আর আমাদের
কাজের মেয়েকে নিয়ে আমাদের
ছোট্ট পরিবার। সবাই হইতো ভাবছেন
কাজের মেয়ে আবার পরিবারের
সদস্য হয় কিভাবে?
বাবা প্রায়ই বলতেন, মানুষকে সব
সময় মানুষ হিসাবেই সম্মান দিতে হয়,
তার পদবী দেখে নয়।
.
বাবা অত্যন্ত রাগী স্বভাবের মানুষ
ছিলেন। একটা কোম্পানি তে চাকুরি
করতেন। ঠিক সকাল ৮টার সময় বাসা
থেকে বের হতেন এবং রাত ৮ টার
সময় ফিরতেন। বাবাকে আমরা অনেক
ভয় পেতাম, বাবার সাথে আমরা
সবাই মেপে মেপে কথা বলতাম।
আমাদের সকল আবদারের ভান্ডার
ছিল মা। সারাদিন বাসাতে হৈ-
হুল্লর, চিল্লাচিল্লি করে মাছের
বাজার বানিয়ে রাখলেও, বাবা
বাসায় থাকলে দৃশ্যপট পুরোই উল্টা
হতো।
.
বাবা বাসায় থাকলে মা সারাক্ষণ
বাবার সাথে ছায়ার মত লেগে
থাকতো। বাবা গোসল করতে ঢুকলে
মা কাপড় নিয়ে বাথরুমের বাইরে
দাড়িয়ে থাকতো, বাবা খেতে বসলে,
মা মূর্তির মত পাশেই দাড়িয়ে
থাকতো। এমন ছিল যে, বাবা কোন
কিছু চাওয়ার আগেই মা সেইটা নিয়ে
বাবার সামনে হাজির থাকতো।
বাবা যখন ড্রয়িং রুমে বসে টিভি
দেখতো তখন আমি আর আপু চুপটি
করে নিজেদের রুমে বসে থাকতাম।
রুম থেকে বেরই হতাম না।
.
সপ্তাহের ৬টা দিন এইভাবে কাটলেও
ছুটির দিনটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কারন ঐদিনের সব রান্না বাবা
নিজের হাতে করতেন। রান্না বান্না
শেষ হওয়ার পর আমরা একসাথেই
খেতে বসতাম, এমনকি কাজের
মেয়েটিও। বাবা সবার প্লেটে
খাবার দিয়ে তারপর নিজের প্লেটে
নিতেন। মা বেড়ে দিতে চাইলেও
বাবা মাকে কোন কাজ করতে দিত
না। মা তখন লজ্জায় কাচুমচু করে বসে
থাকতেন। মার এই অবস্থা দেখে
আমরা মুখ টিপেটিপে হাসতাম।
.
একবার তো আপু মুখ ফোসকে বলেই
ফেলেছিল "বাবা আপনারা এতদিন
হল সংসার করেন, অথচ মার ভয় এখনো
কাটলো না, খুব খারাপ লাগে"।
.
বাবা আপুর দিকে তাকিয়ে ম্রান
হাসি দিয়ে বলেছিল "সবই আমার
অক্ষমতা রে মা। আমাকে মাফ করে
দিস ।"
.
বাবার এই একটা কথায় আমরা একদম
শান্ত হয়ে যেতাম। মুখের কথা
হারিয়ে ফেলেছিলাম। খুব ইচ্ছা
করতো বাবাকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু
লজ্জা আর ভয়ে পারতাম না।
বাবাকে বাইরে থেকে যতই রাগী
স্বভাবের মনে হোক না কেন ভিতরটা
ছিল অনেক নরম।
.
মার কথা আর কি বলবো। বাবা যেমন
রাগী ছিলেন মা ছিল ঠিক তার
উল্টো। মার মত শান্ত স্বভাবের কোন
মহিলা আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।
মার মুখের কোনায় সব সময় যেন হাসি
লেগেই থাকতো। আমার মা ছিল
আমার কাছে সেরা সুন্দরী। মাঝে
মাঝে মাকে জোর করেই একটু
সাজতে বলতাম। শাড়ি পড়লে মাকে
অসম্ভব সুন্দর লাগতো। ছোট বেলায়
মা যখন শাড়ি পড়তো, তখন দৌড়ে
মার কোলে উঠে দুই গালে দুইটা চুমু
দিতাম। তারপর দুই হাত দিয়ে গালটা
টিপে দিয়েই দৌড়ে ঘর থেকে
পালিয়ে যেতাম, আর মা আমাকে
ধরার জন্য পিছু পিছু ছুটে আসতো।
.
মা ভয়ংকর রকমের বৃষ্টি পছন্দ
করতো। বৃষ্টি আসলেই মা সব কাজ
বাদ দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতো। কি
রাত কি দিন, অনেকটাই বাচ্চাদের
মত পাগলামী স্বভাব ছিল মার।
.
মা রান্না ঘরে রান্না করসে, এমন
সময় বৃষ্টি শুরু হইসে, রান্না বাদ। মা
দৌড়ে আমাদের ঘরে এসে ফিসফিস
করে বলতো শুভ রথি চল বৃষ্টিতে
ভিজি। আমরাও স্বাচ্ছন্দ্য মার সাথে
যোগ দিতাম।
.
সামনে আমাদের ফাইনার পরীক্ষা
পড়তেসি বা স্কুল ড্রেস পড়ে রেডি
হইছি স্কুলে যাবো, এই সময় মা এসে
বৃষ্টিতে ভেজার কথা বললো, আমরাও
সব কিছু বাদ দিয়ে ঐ অবস্থায়ই মার
সাথে বৃষ্টিতে ভিজতাম।
.
আমরা সাধারনত বাসার সামনে
উঠানে ভিজতাম। মাঝে মাঝে মাকে
দেখতাম বাচ্চাদের মত বৃষ্টিতে
লাফালাফি করছে, মাটিতে গড়াগড়ি
করছে। হাত ছড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে
আকাশের দিকে তাকিয়ে গোল হয়ে
ঘুরতো, আমি আর আপুও মার
দেখাদেখি ঐভাবে ঘুরতাম। বৃষ্টির
পানি হাতে মধ্য জমা করে নিজের
মুখে মারতো। আকাশের দিকে মুখ
তুলে হা করে বৃষ্টির পানি খেত।
কখনো এইভাবে কাউকে বৃষ্টির পানি
খেতে দেখেছেন??
আমি আমার মাকে এমনটা করতে
দেখেছি।
.
মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে কাক ভেজা
হওয়ার জন্য সবার একসাথে জ্বর
আসতো। তখন বাবা কি বকা টাই না
দিত সবাইকে। কিন্তু চুপচাপ বকা
খেলেও পরের দিন যদি আবার বৃষ্টি
নামতো, আমরা আবার বৃষ্টিতে
ভিজতাম।
.
বৃষ্টি নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে।
একরাতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। হঠাৎ
ছাদে লাফানোর শব্দ শুনে ভয় পেয়ে
গিয়েছিলাম। তারাতারি নিজের রুম
থেকে বের হয়ে আপুর রুমে গিয়ে আপু
জড়িয়ে ধরেছিলাম। চোর টোর
আসলো নাকি ভেবে আমি আর আপু
ভয়ে ভয়ে ছাদে গিয়ে দেখি বাবা
আর মা বৃষ্টিতে ভিজছে।
অনেকটা অবাক হয়েছিলাম ঐদিন
"বাবাও এমন করতে পারে"
তখন আপু বলেছিল, সবার মনের মধ্যই
রোমান্টিকতা আছে রে ভাই। সে
তোর মনেও আছে, আমার মনেও
অাছে, এমন কি বাবার মনেও আছে।
.
বাসার সব কাজ মা নিজের হাতেই
করতেন। মাঝে মাঝে কাজ শেষ করে
মা বিকালের দিকে খেতে বসতো।
কিন্ত তখন আমি আর আপু মার পাশে
গিয়ে বসে পড়তাম। মার হাতে
মাখানো ভাত মা আর কতটুকু খেত,
আমাদের পেটেই বেশি খাওয়া যেত।
পেট ভরতো আমাদের তার তৃপ্তি পেত
মা নিজে।
.
বইয়ে পড়েছিলাম মাকড়োশা আর
অক্টোপাসেরর বাচ্চারা তাদের
মাকে ভক্ষন করেই বড় হয়। পৃথিবীতে
এমন আত্বত্যাগ আর কোন প্রাণি না
করলেও আমাদের মা গুলাও কম
কিসের..!!
.
নিজেরা না খেয়ে আমাদেরকে
খাওয়ায়। বছরের পর বছর একটা জামা
কাপড় দিয়ে পার করে দিলেও
আমাদের কিন্তু কিছু দিন পর পরই
নতুন জামা কাপড় বানিয়ে দিত।
তাদের সম্পর্কে যতই বলি না কেন,
তাদের ত্যাগের কাছে সবই তুচ্ছ মনে
হয়।
.
অনেক সুখে ছিলাম আমরা সবাই।
হঠাৎ করেই বাবা মারা যাবার পর
আমাদের সবকিছুই পাল্টে যেতে
থাকে। মাকে আমি কখনো কাদতে
দেখিনি, কিন্তু বাবা যেদিন মারা
যায় সেইদিন মাকে অঝোরে কান্না
করতে দেখেছিলাম। আমার এখনো
মনে আছে, বাবা মারা যাবার
শোকে আমি যতটা না কষ্ট
পেয়েছিলাম তার থেকে বেশি কষ্ট
পেয়েছিলাম মাকে কান্না করতে
দেখে। মনে হচ্ছিল বুকের ভিতরটা
একদম দুমরে-মুচরে যাচ্ছে।
.
বাবা মারা যাবার পর সংসারের সব
দায়িত্ব মার কাধেই পড়ে। জীবনের
দায়, দেনা পরিশোধ করতে করতে
আমাদের মা আর আগের মা নেই।
রোগাক্রান্ত জীবনের ফলে মা এখন
অনেক ছোট হয়ে গেসে, আমাদের
ছোট বেলার থেকেও ছোট। এখন আর
মা আমাদের মুখে খাবার তুলে দিতে
পারে না, আমরা মাকে তুলে
খাওয়াই। মা আর এখন আমাদের শাসন
করে না বরং আমরা মাকে শাসন
করি। কিন্তু মার সেই মমতা ভরা হাত
এখনো আগের মতই রয়ে গেসে।
.
.
মাকে আর বাসায় নিয়ে আসতে
পারিনি। হাসপাতালের বেডেই মা
আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মা
মারা যাওয়ার পর আমি একটুও
কাদিনি, খুব চিৎকার করে কাঁদতে
ইচ্ছা করসে কিন্তু আমি কাঁদতে
পারি নাই। আপু কান্না করতে করতে
বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, আমি
আপুকে একটুও শান্তনা দিতে পারছি
না। মনে হচ্ছে আমার মুখ কেউ চেপে
ধরে আছে, মুখ দিয়ে কোন কথাই বের
হচ্ছে না। ফ্যালফ্যাল করে সবার
মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
.
বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। মাকে
কাফনের কাপড় পড়িয়ে যে খাটের
উপর রাখা হয়েছে, আমি সেই খাটের
পা ধরে বসে আছি।
একবার মা হাসতে হাসতে বলেছিল
"দেখিস আমি যেইদিন মারা যাবো,
সেইদিন অনেক বৃষ্টি হবে, ঝুম বৃষ্টি"
.
কেন যেন মনে হচ্ছে মা আমাদের
ছেড়ে যায়নি, একটু পড়েই পাশের
কোন বাসা থেকে এসে বলবে, কিরে
খোকা তুই এখনো এইখানেই বসে
আসিছ। জীবনে তোর মত অলস মানুষ
আমি আর একটাও দেখি নাই।
.
.
আমি কখনো কল্পনাও করতে পারি
নাই আমাদের বাবা মাকে এতো
তারাতারি হারিয়ে ফেলবো।
আমাদের মাথার উপরে ছাদটা আর
রইলো না। এতিম হয়ে গেলাম আমরা।
এখন কে আমাকে ভাত খাইয়ে দিবে,
কে বলবে খোকা এই কাজটা করোনা,
খোকা ঐখানে যেও না। এখন কে
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে
বলবে "খোকা তোর জন্য একটা লাল
টুকটুকে বউ নিয়ে আসবো"। এখন কে
বলবে খোকা এত্তো অলস মানুষ
কিন্তু জীবনে কখনো উন্নতি করতে
পারে না। আমি এখন কার সাথে
অভিমান করবো। দিনশেষে কার
কোলে মাথা রেখে একটু শান্তিতে
ঘুমাবো।
.
মা তুমি যদি একবার ফিরে আসো,
কথা দিলাম আমি তোমার সব কথা
শুনবো, তোমার সব স্বপ্ন আমি নিজে
পূরন করবো শুধুমাত্র তুমি আমার পাশে
থেকে একটু ভরসা দিও। :'(
.
.
পাশে থাকা মানুষগুলো কথা আমরা
ভুলে যাই... তাদের উপস্থিতি
আমাদের তেমন কোন অনুভূতি যোগায়
না, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিতে
বোঝা যায় তারা কতটা জরুরী ছিলো
আমাদের জীবনে । চাইলেও যখন
তারা না ফেরার দেশে চলে যায়
তখন দীর্ঘ শ্বাসের সাথে একটা
কথায় চারপাশে ঘুরে বেড়ায়,'' আর
একটাবার ফিরে পেতাম, আর একটা
বার...'' ।
.
//কাছের মানুষ গুলো হারিয়ে গেলে
বুঝা যায় তারা কতটা কাছের ছিল।
দাঁত থাকতে যেমন আমরা দাঁতের
মর্যাদা বুঝি না ঠিক তেমনি বাবা
মা বেচে থাকা অবস্থায় তাদের
সঠিক মর্যাদা দিতে পারি না।
ভালো থাকুক সকল বাবা মা
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now