বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শ্রাবণ মেঘের দিন(৩য় ও শেষ পর্ব)

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Nowshin (০ পয়েন্ট)

X লেখাঃ-হামিদা ইমরোজ। সেঁজুতি ভেবেই নিয়েছে আর কখনো উৎপলের সামনে পড়বে না,মরে গেলেও না। তুলি কাগজটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে সেঁজুতিকে বললো, "কিরে এটা তোকে কে দিলো"? "এটা আমাকে কেউ দেইনি, এটা উৎপল তোকে দিয়েছে"। তুলি সেঁজুতির কথা শুনে আর কিছু বললো না।চিঠিটা ভাজ করে বিছানার নিচে রাখলো। একটুপরে তুলি আবার বলে উঠলো, " পরশু রাসেলের বিয়ে। আমাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করেছে।আমি কি যাবো নাকি রে!" কথাগুলো বলছিলো আর কাঁদছিলো তুলি। তুলির প্রতিত্তোরে সেঁজুতি বলেছিলো "না"।সেঁজুতি তুলিকে আরো বলেছিলো, একজনকে ভুলতে হলে তার মতো আরেকজনকে দরকার। আরেকজন তো তুই পেয়েই গেছিস।অতীত ভুলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব,তাহলেই ভালো থাকবি। আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে এলো তুলি। পথে রমিজার সাথে দেখা হয়েছিলো সেঁজুতির।রমিজা মেয়েটা আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছে। কারন জিজ্ঞেস করতেই রমিজা এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, "আমার স্বামী ঢাকাতে একটা মহিলারে বিয়া করছে।কোনো খরচাপাতি পাঠায় না গ্রামে। আচ্ছা সেঁজুতি, "একজনকে কষ্ট দিয়ে আরেকজনকে নিয়ে কি সত্যিই খুব সুখে থাকা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সেঁজুতি বাড়ি পৌঁছে গেলো। অবশেষে সেঁজুতি বুঝতে পারলো সুখ জিনিসটা একেক জনের কাছে এক এক রকম। সেদিনের পর থেকে প্রায় ১৭ দিন কেটে গেলো।তুলির সাথে আর সেঁজুতির দেখা হয়নি।সেঁজুতি কেন যেন ইচ্ছে করেই আর ওদের বাড়িতে যায়নি,তুলিও আর আসেনি। সেঁজুতি মনে মনে ভাবে ওদের দিনগুলো মনে হয় ভালোই কাটছে। আজকাল সেঁজুতি সবসময় ঘরে মধ্যে থাকে এবং মায়ের সব কাজে সাহায্য করে। ফরিদা বেগম সহ ঘরের লোকজন সবাই চমকে গেলো সেঁজুতির এই হঠাৎ পরিবর্তনের জন্য। যে মেয়ে এতদিন একদণ্ড ঘরে থাকতো না,এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতো, দুপুর হলেই নদীতে সাঁতার কাটতে যেতো, সে মেয়ের এখন একাকী জীবনের মোড়টা কারো চোখ এড়ালো না। সেঁজুতির দুলাভাই সেদিন বলে গিয়েছিলো,সবার আগে গল্প পড়তে আমাদের, নীল ক্যাফের ভালোবাসা, অ্যান্ড, নীল ক্যাফের ডায়েরী, পেজের সাথেই থাকুন,ধন্যবাদ "শুক্রবার সেঁজুতিকে দেখতে আসবে কিন্তু ছেলে পক্ষের কি যেনো কাজ ছিলো তাই তারা সেদিন আসতে পারেনি।" আজ শুক্রবার, সেঁজুতিকে আজ আবারো দেখতে আসার কথা।কিন্তু আজ ভোর থেকেই শুরু হয়েছে একটানা বৃষ্টি।মাঝে মাঝে বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সাথে বাতাস তো আছেই। বৃষ্টির পানিতে পুকুর,নদীনালা ভরে গেছে। শিউলিদের বাড়ির পাশের রাস্তায় ও পানি জমে গেছে।শিউলির কথা মনে পড়তেই সেঁজুতির মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা, শিউলি রাসেলকে নিয়ে ভালো আছে তো! সেঁজুতি ঘরের পাটাতনে বসে বৃষ্টি দেখছে আর ভাবছে, "আজ লোকগুলো কিভাবে আসবে সেঁজুতি কে দেখতে?রাস্তায় তো হাঁটুর উপরে পানি জমে গেছে। তাহলে কি বাবা তাদের আনতে নৌকা পাঠাবে"? নাহ্ সেঁজুতির এখন এগুলো ভাবতে মোটেও ভালো লাগছে না।সেঁজুতি এক দৃষ্টিতে দূরে তাকিয়ে আছে। সেদিনের পর থেকে উৎপল ও আর আসেনি সেঁজুতিদের বাড়িতে। সিরাজ'দার সাথে মাঝেমধ্যে উৎপল আড্ডা দিতে আসতো কিন্তু এখন আর আসে না।সেঁজুতির ইচ্ছে করে সিরাজ'দার কাছে থেকে উৎপলের খোঁজ খবর নিতে।কিন্তু সেঁজুতি সাহস পায়না পাছে যদি ভাই ওকে বকে দেয়। পাশের বাড়ির সুখন ভাই আর ভাবি বৃষ্টিতে ভিজছে।তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ২০ বছর কিন্তু এখনো তাদের মাঝে যে ভালবাসার বন্ধন খুঁজে পাওয়া যায় তা তাদের কিশোর বয়সের সেই দুরন্ত প্রেমকেও হার মানায়। সুখন ভাই একসময় কত কষ্ট করেছে,ঘরে বাজার পর্যন্ত করতে পারেনি কিন্তু কখনো তাদের ঘর থেকে কোনো ঝগড়ার আওয়াজ শোনা যায়নি।সেই অভাবের দিনগুলোতেও তিথি ভাবি ভাইয়ের পাশে ছিলো। তখন সবাই বলতো, শুধু শুধু কষ্ট করছো কেন?তোমার বাবার অবস্থা তো খুব ভালো।তার কাছে চলে যাও।সে নতুন করে তোমার আবার কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে দিবে। ভাবির উত্তর ছিলো, "দুঃখ কষ্টের সময় যদি প্রিয়জনের পাশে না থাকতে পারি,তার কষ্টটা যদি আমার হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি নাই করতে পারি,তাহলে আমি তাকে কেমন ভালবাসলাম ? আজ আমি যদি তাকে ছেড়ে চলে যাই তাহলে এটা আমার ভালবাসা হবে না হবে স্বার্থপরতা।আমি আমার প্রিয়জনকে ছেড়ে কোথাও যাবো না বরং আমাদের ভালবাসার কাছে সবকিছুকে হার মানিয়ে দিবো। যদিও আজ তাদের কোনো কষ্ট নেই।সংসার,সন্তান নিয়ে খুব ভালো আছে তারা। একেই বুঝি বলে সত্যিকারের ভালবাসা! সেঁজুতি ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো মনেই নেই।ঘুম থেকে উঠেই একটা কথা ভাবতেই ওর বুকটা ধক করে উঠলো। কারণ সেঁজুতি একটু আগে স্বপ্নে দেখেছিলো। উৎপল আর সেঁজুতি একসাথে হাতে হাত রেখে বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে দূরে কোথাও হেঁটে যাচ্ছে! ফরিদা বেগম মেয়েকে ডাকতে লাগলেন, "বেলা ১২ টা বেজে গেছে। এখনো কি করিস তুই?নিচে নেমে আয়,সকালের খাবারও তো এখন পর্যন্ত খাসনি"। সেঁজুতি উৎপলের কথা ভাবতে ভাবতে নিচে নেমে এলো। এখনো বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে। সেঁজুতি কাউকে কিছু না বলেই এক লাফে উঠোনে নেমে গেলো বৃষ্টিতে ভিজতে।কতদিন ধরে সেঁজুতি বৃষ্টিতে ভিজে না!পাশের ঘর থেকে দুই চাচাতো বোনকে পটিয়ে নিয়ে গেলো নদীর পাড়ে। আজ সেঁজুতি বৃষ্টিতে ভিজবে আর সাঁতার কাটার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠবে। নদীর পাড় দিয়ে পানিতে নামতেই পিছন থেকে কে যেনো বলে উঠলো, "বৃষ্টিতে ভিজলে মেয়েদের দেখতে একদম বাজে লাগে তোকে বলেছিনা আর কখনো বৃষ্টিতে ভিজবি না"? কন্ঠটা খুব পরিচিত মনে হলো সেঁজুতির। পিছনে ফিরে তাকাতেই ১৭দিন পর উৎপলের দেখা মিললো। উৎপলকে দেখে লজ্জায় আর নদী থেকে উঠতে পারেনা সেঁজুতি।কি করবে না করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা সেঁজুতি। কথা তো বলতেই পারছেনা বরং হৃদপিণ্ডের স্পন্দন বেড়ে গেলো। ওদিকে উৎপল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেঁজুতির দিকে আর ভাবছে, নিষ্পাপ মেয়েটা দেখতে সত্যিই অনেক সুন্দর। বিশেষ করে যখন ও লজ্জা পায় তখন ওকে দেখতে আরো সুন্দর লাগে।এগুলো ভাবতে ভাবতে উৎপল মুচকি হাসতে লাগলো। এরমধ্যে হঠাৎ সেঁজুতি এক লাফ দিয়ে নদী থেকে উঠেই বাড়ির দিকে দৌড় শুরু করলো।কে আর পায় ওকে।পিছন থেকে সেঁজুতির ২ চাচাতো বোন চেচামেচি করে বলতে লাগলো, আপা,তোর ওড়না নিয়ে যায়! প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে আজো সেঁজুতিকে দেখতে আসা হলো না ছেলে পক্ষের। বিকেলে আকাশটা একটু হালকা হলো।বৃষ্টি এখন নেই বললেই চলে কিন্তু বর্ষাকালের দিন কখন না কখন হুট করে বৃষ্টি চলে আসে বলা যায়না। বিকেলে সেঁজুতি বাড়ির পিছনে বিশাল বড় এক তেঁতুল গাছের নিচে বসে আছে।উৎপল একটুপরে কতগুলো টকটকে তাজা লাল গোলাপ নিয়ে হাজির হলো সেঁজুতির সামনে। সেঁজুতি মনে মনে ভাবতে লাগলো উৎপল আসলেই কোনো মানুষ নাকি জ্বীন? যদি ও মানুষ হয়ে থাকে তাহলে যখন তখন হুটহাট করে কিভাবে খুঁজে পায় আমাকে?ও জানে কিভাবে আমি কখন কোথায় থাকি? সেঁজুতি উৎপলকে দেখে উঠে দাঁড়ালো এবং ওর পিছন বরাবর খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।উৎপল সেঁজুতির এ আচরণ দেখে অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো এই তেঁতুল গাছ থেকে সেঁজুতিকে কোনো পেত্নীতে ধরে নিতো আবার! উৎপল সেঁজুতিকে প্রশ্ন করলো, " কি ব্যাপার,তুই এমন করছিস কেন? সেঁজুতি উৎপলের ছায়া দেখে নিশ্চিত হয়, নাহ্ ও অন্যকিছু না,ও আসলেই উৎপল। একটুপর হঠাৎ সেঁজুতি খেয়াল করলো উৎপলের হাতে অনেকগুলো লাল গোলাপ।এই গ্রামে তো এ ফুলগুলো খুঁজেই পাওয়া যায়না একমাত্র শহর ছাড়া।তাহলে উৎপল এই ফুলগুলো উৎপল কোথায় পেলো! দু'জনেই ৫ মিনিট নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।একটুপরে উৎপল সেঁজুতির হাতে ফুলগুলো দিয়েই বললো, "এগুলো আমার গাছের ফুল।তোর জন্য নিয়ে এসেছি"। উৎপলের কথা শুনে সেঁজুতি প্রচন্ডভাবে রেগে গেলো এবং বললো, "আপনারা পুরুষ মানুষ অনন্ত পক্ষে আপনাদের দৃষ্টি আগে ঠিক করুন।যাকে তাকে না, শুধুমাত্র একজনকে ভালবাসুন। একটাই হৃদয়। এটা একজনকেই দেয়া যায়, ১০ জনকে না।একটা হৃদয় ১০জনকে দিতে গেলেই তখন ভালবাসা নামক জিনিসটা ঠুনকো হয়ে যায়"। আর কিছু না বলেই সেঁজুতি সেখান থেকে চলে এলো। আজ উৎপলকে সবচেয়ে খারাপ মানুষ হিসেব মনে হচ্ছে সেঁজুতির।খারাপ মানুষের প্রতি কখনো ভালবাসা জাগতে পারেনা ওর মনে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা আর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত।রাতের খাবারদাবার শেষে সবাই সবার রুমে ঘুমাতে গেলো।সেঁজুতির আজ একটুও ঘুম আসছে না।বিকেলের কথাটা বারবার মনে পড়ছে। সারাদিন শেষে রাতটা খুবই কষ্টদায়ক। জীবনে ফেলে আসা অতীতের কথা মনে করিয়ে কেবল কষ্ট দেয়। একটুপরে টিনের ঘরের বাহিরে সেঁজুতি যেনো কার ফিসফিস কন্ঠে কথা বলার আওয়াজ শুনতে পেলো।কে যেনো ফিসফিস কন্ঠে ওকে ডাকছে। সেঁজুতি বুকে একরাশ সাহস সঞ্চার করে আস্তে করে জানালাটা খুলতে লাগলো আর মনে মনে ভেবে নিলো ভূত-পেত্নী অথবা চোর ডাকাত হলে ও জোরে চিৎকার করে সবাইকে ডেকেই ওখান থেকে দৌড়ে পালাবে। কিন্তু দেখা গেলো উল্টোটা। জানালার ঐপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো তুলি।এতরাতে তুলিকে এখানে দেখে চমকে গেলো ও।সেঁজুতি আরো চমকে গেলো যখন পিছনে উৎপলকে দেখতে পেলো। সেঁজুতি মনে মনে বলতে লাগলো উৎপলকে, এতরাতে নষ্টামি করতে এসেছিস তাও আবার আমাকে দেখিয়ে। দেখ আজ তোর কি অবস্থা করি। তুলিকে দাঁড়াতে বলে খাট থেকে নিচে নেমে দরজার দিকে পা বাড়ালো সেঁজুতি...... (শেষ পর্ব) #সেঁজুতি মনে মনে বলতে লাগলো উৎপলকে, "এতরাতে নষ্টামি করতে এসেছিস তাও আবার আমাকে দেখিয়ে। দেখ আজ তোর কি অবস্থা করি"। তুলিকে দাঁড়াতে বলে খাট থেকে নিচে নেমে দরজার দিকে পা বাড়ালো সেঁজুতি। চুপিচুপি দরজা খুলে বাহিরে পা রাখতেই সেঁজুতির চোখ চকচক করে উঠলো কারণ রাতের আকাশে ছিলো অজস্র জোৎস্নার ছড়াছড়ি। সেঁজুতি রুমের পিছনে গিয়ে উৎপলকে দেখে বললো, "এটাও দেখার বাকি ছিলো, তাই না? আপনার বাবা-মা তো আপনাকে নিয়ে খুব গর্ব করে এমনকি গ্রামের সবাই।এখন সবাইকে ডেকে এনে দেখাই? আপনি রাতের অন্ধকারে একটা মেয়েকে কোথায় নিয়ে এসেছেন"? সেঁজুতির কথা শুনে উৎপল "হা" করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। তুলি হঠাৎ সেঁজুতিকে বললো, "সেঁজুতি, তোর মাথা ঠিক আছে তো"? কথাটা বলতে বলতেই রাসেলের দেখা মিললো।রাসেল চুপিচুপি একটু দূর থেকে হেঁটে আসছে ওদের দিকে। সেঁজুতি রাসেলকে দেখে বললো, "এর মানে কি"? তুলি বললো, "আমরা চলে যাচ্ছি সেঁজুতি। তুই ভালো থাকিস।সেই ছোট্টবেলা থেকে আমরা একসাথে বড় হয়েছি। কত হইচই দুষ্টুমি করেছি।কষ্ট পেলে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি। কিন্তু আর থাকতে পারলাম না রে তোর সাথে। আমার বাবা-মাকে বলিস আমার কথা।তোকে খুব ভালবাসতাম বলেই তোকে না বলে যেতে পারিনি। চলে যাই রে! তোর সাথে আবার কোন একদিন দেখা হবে।তখন না হয় আমরা আবার মেতে উঠবো শৈশবের সেই খুন শুঁটিতে। একটা কথা বলে গেলাম, উৎপল তোকে অনেক ভালবাসে।যে তোকে ভালবাসবে তাকে কখনো কষ্ট দিবিনা তাহলে দেখবি কোন একদিন তুই সত্যিকারের ভালবাসার অভাব বোধ করবি। সবার ভালবাসা মন কাঁড়তে পারেনা"। এই বলে তুলি রাসেলের হাত ধরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। সেঁজুতি রাতের অন্ধকারে বেশীদূর যেতে পারেনি।তুলির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সেঁজুতি হু হু করে কেঁদে উঠলো। আজ উৎপল সেঁজুতির চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো, "আমি ১৫ দিনের জন্য ছোট মামার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তাই তোর সাথে দেখা হয়নি।আর তুই মনে মনে কি ভেবে নিয়েছিস আল্লাহ জানে। রাসেলের সাথে সেদিন শিউলির বিয়ে হয়নি।অনেক ঝড় তুফানের পর আজ ওদের মিলিয়ে দিলাম"। --শোন সেঁজুতি। --হুম,বলেন "আমি কিন্তু তোকেই ভালবাসি।কথাটা বলে উৎপল আবারো মুচকি হাসি দিলো।যে হাসির প্রেমে অনেক আগেই পড়েছে সেঁজুতি"। সেঁজুতি কিছু বললো না।আজ সেঁজুতি ও উৎপলের সাথে মুচকি হাসলো। সকাল সকাল পাশের বাড়ির মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙ্গলো সেঁজুতির। সবাই রাসেল আর তুলিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে গ্রামের আনাচে-কানাচেতে। কিন্তু তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তুলি আর রাসেলের মায়েদের কান্না দেখে সেঁজুতির চোখের কোনে ও কয়েক ফোঁটা জলের জন্ম নিয়েছিলো। সেঁজুতি মনে মনে বলতে লাগলো, "আরো আগে যদি আপনারা ব্যাপারটা মেনে নিতেন তাহলে আজ এমনটা দেখতে হতো না"। সেঁজুতির বিয়ের সেই প্রস্তাবটা ভেঙে গিয়েছিল বারবার বাঁধা আসার কারণে। গ্রাম বাংলার মানুষ বড্ড কুসংস্কার বিশ্বাসী। সেঁজুতির আজ ইচ্ছে করছে নৌকায় করে নদীতে ঘুরতে যাবার। সেঁজুতি বৈঠা নিয়ে যেই নৌকায় বসলো অমনি উৎপলকে দেখা গেলো ওদের বাড়ির সামনে। সেঁজুতিকে নৌকায় বসে থাকতে দেখে উৎপল ও দৌঁড়ে নৌকায় এসে বসলো। নৌকা যখন মাঝ নদীতে চলে গেলো তখন উৎপল বললো, "সেদিনের প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দিসনি"। উৎওলের কথা শুনে সেঁজুতি পড়ে গেলো মহাবিপদে।এখন সেঁজুতি কিভাবে বলবে সেও উৎপলকে ভালবাসে! বলার আগেই তো চোখ মেলে তাকাতে পারছেনা সেঁজুতি। একটুপরে উৎপল সেঁজুতির হাত ধরে বললো, "বল,তুই কি আমাকে ভালবাসিস" ? সেঁজুতি কেবল মাথা নাড়ে কিন্তু মুখে কিছু বলে না। উৎপল ও বুঝে নেয় সেঁজুতি ও তাকে ভালোবাসে। উৎপল সেঁজুতির হাত ধরে বলে, "কথা দে,কোনদিন আমাকে ছেড়ে যাবি না।আমি যদি কখনো নিখোঁজ ও হয়ে যাই অনেকদিনের জন্য তবুও আমায় ভুলে যাবি না।মনে রাখবি আমি যেখানেই থাকি না কেন তোকে ঠিকই মনে রাখবো।আমার কথাগুলো কি তুই রাখবি? সেঁজুতি আবারো মাথা নাড়লো। সেঁজুতি সম্মতি উপলব্ধি করে, উৎপল অনেক জোরে গান গাইতে গাইতে নৌকা বাইতে লাগলো। অতঃপর তাদের প্রেমটাও হয়ে গেলো। কত যে লুকিয়ে লুকিয়ে ওরা দেখা করেছে,কথা বলেছে তার কোনো হিসেব নেই।সেঁজুতি গুনেগুনে ১০ মুঠো কাঁচের চুড়ি জমিয়েছে যেগুলো উৎপল ওকে দিয়েছে। উৎপলের কাঁচের চুড়ি অনেক প্রিয়। এভাবে প্রায় অনেকদিন কেটে গেলো। আজ আবারো আকাশে মেঘের ছড়াছড়ি। যুথি আপা বেড়াতে এসেছে। সেই সুযোগে উৎপল ছোট তিতলীকে বলে দিয়েছে, সেঁজুতিকে যেন বলে তার সাথে দেখা করার জন্য। তিতলীর কথা শুনে সেঁজুতি দৌঁড়িয়ে উৎপলের কাছে চলে গেলো।এরমধ্যে শুরু হলো প্রচন্ড বৃষ্টি। সেদিনের সেঁজুতির স্বপ্নের মতো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হাঁটতে লাগলো ওরা। করিমদের বাড়ির পিছনের কদম গাছ থেকে উৎপল সেঁজুতিকে কদম ফুল পেড়ে দিলো। সেঁজুতি মনে মনে বলতো লাগলো, "এই বৃষ্টি যদি আর কখনো শেষ না হতো তাহলে বোধহয় ভালোই হতো।কখনো আমাদের আলাদা হতে হতো না"। সেঁজুতি হঠাৎ উৎপলকে বললো, "আপনি না আমাকে বৃষ্টিতে ভিজতে মানা করেছিলেন"? উৎপল বললো, "আমার সাথে ভিজলে সমস্যা নেই কিন্তু অন্য কারো সামনে ভিজবি না"। উৎপল আবারো বললো, শোন সেঁজুতি, আমি আজ থেকে তোকে আর তুই করে বলবো না।তুমি করে বলবো। আর আজ থেকে তুমিও আমাকে তুমি করে বলবে।মনে থাকবে? সেঁজুতি বললো, "আমি আমার বর ছাড়া আর কাউকে তুমি করে বলব না"। উৎপল সেঁজুতির কথা শুনে জোরে হেঁসে উঠলো। উৎপলের হাসি দেখে সেঁজুতি লজ্জা পেল খুব। একটুপরে উৎপল সেঁজুতিকে বললো, "আমি তো তোমাকেই বিয়ে করবো।সুতরাং আমাকে তুমি করে বললে, কিছু হবে না।কি বলবে তো? তুলি,হ্যাঁ, না কিছু বলেনি কেবল মাথা নাড়িয়েছে। ফরিদা বেগম তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, রমিজা গতকাল রাইতে গলায় দড়ি দিয়া মরছে,ওরে দেখতে যাইতাছি। রমিজার মৃত্যুর কথা শুনতেই সেঁজুতির বুকটা কেঁপে উঠলো।সেঁজুতি বিড়বিড় করে বলে উঠলো, মানুষ একটুখানি ভালবাসা পাওয়ার জন্য কতটা উতলা হয়ে উঠতে পারে তা রমিজাকে না দেখলে জানতাম না। আজ বিকেলে জোহরা চাচিদের বাড়িতে যাওয়ার সময় উৎপলের মা রেনু বেগম সেঁজুতিকে দেখে বললো, "জানিস সেঁজুতি,আমি উৎপলের জন্য মেয়ে দেখেছি"। কথাটা শুনেই সেঁজুতির বুকের ভিতর ছ্যাঁত করে উঠলো। একটুপরে আবার রেনু বেগম বললো, "মেয়েটার নাম শ্রাবণী। খুব সুন্দর মেয়ে।উৎপল ও সেদিন গিয়ে দেখে এসেছে। আমরা কয়েকদিন পরে গিয়ে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে আসবো"। সেঁজুতি কিছু না বলে পথে পা রেখেই কান্না শুরু করে দিলো।এমনকি কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গেলো।ফরিদা বেগম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে বারবার প্রশ্ন করতে লাগলো, "কি হয়েছে?কিন্তু সেঁজুতি কিছু না বলে কথা কাটিয়ে নিয়ে গেলো"। ৩দিন ধরে আবারো উৎপল নিখোঁজ হয়ে গেলো। তারপরের দিন উৎপলের দেখা মিললো।বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই উৎপল বললো, "আরে আমি তো তোমাকেই বিয়ে করবো।মাকে স্বান্তনা দেয়ার জন্য মেয়েটাকে দেখতে গিয়েছিলাম। মেয়েটাকে আমার মোটেও পছন্দ হয়নি তারচেয়ে আমার সেঁজুতিই আমার কাছে অনেক সুন্দর"। সেঁজুতি আর কিছু বলে না, লজ্জায় মুখ নিচু করে ফেলে। আজ উৎপল কয়েকদিনের জন্য শহরে যাচ্ছে। যাওয়ার আগেরদিন উৎপল বলে গিয়েছিলো এসেই বাবা-মাকে বলে সেঁজুতিকে বিয়ে করবে। উৎপল চলে গেলো। বিকেলে সেঁজুতি হাঁটতে হাঁটতে করিমদের বাড়ি গেলো। সেই বাড়ির আমেনা চাচির সাথে জ্বিন আছে। সে মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারে। আমেনা সেঁজুতিকে দেখেই বললো। "তোর খুব কাছের একজন মানুষ তোকে ছেড়ে চলে যাবে অনেকদূরে,আর কখনো তাকে খুঁজে পাবিনা"। কথাটা শোনার পর সেঁজুতির বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। আজ সারাবিকেল সেঁজুতির ভালো কাটেনি।সারারাত ঘুম ও হয়নি। সকালে মানুষের চিৎকার চেচামেচিতে ওর ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুম থেকে উঠেই শুনতে পেলো, "উৎপল যে লঞ্চে উঠেছিল সেটা নাকি ডুবে গেছে। কথাটা শুনে সেঁজুতির বুকটা ফেটে যাওয়ার অতিক্রম হলো"। সেঁজুতি দৌড়ে উৎপলদের বাড়ি চলে গেলো।সেখানে সবার কান্নার আহাজারিতে আকাশ ভারী হয়ে উঠলো। দেখতে দেখতে ১ সপ্তাহ কেটে গেলো কিন্তু উৎপল আর ফিরলো না।সেদিন অনেকের লাশ পাওয়া গেলেও উৎপলের লাশ আর পাওয়া যায়নি।হয়তো ওর লাশ ভাসতে ভাসতে পাড়ি জমিয়েছে অচিনপুরে। পুরো ব্যাপারটা ফরিদা বেগম বুঝতে পারলো।কিন্তু কি বলে মেয়েকে স্বান্তনা দিবে সে ভাষা খুঁজে পায়না। সেঁজুতির বারবার মনে হতে লাগলো, "উৎপলের কি বেশি কষ্ট হয়েছিলো পানিতে ডোবার সময়? যে মুখ দেখে সেঁজুতি একসময় একটা সুন্দর সংসার রচনার স্বপ্ন দেখেছিলো,শেষবারের মতো একবার দেখতেই পেলনা তার সেই চিরচেনা মুখটা! ইসস যদি উৎপলের লাশটাও পাওয়া যেতো তাহলেও না হয় ওর কবরটার সামনে গিয়ে মন উজাড় করে কাঁদা যেতো কিন্তু উৎপল ভালবাসার কোন শেষ চিহ্নই রেখে যায়নি"। তারপর অনেকবছর কেটে গেলো।গ্রামের বুক জুড়ে গ্রীষ্মের দাবদাহে ফসলের মাঠে ফাটল ধরলো,কত বর্ষা এলো আর গেলো।শরৎকালে কত কাশফুলই না সেই নদীর পাড়ে ফুটলো। কিন্তু আর কখনো বসন্তে লাল শিমুল ফুল কুড়ায়নি সেঁজুতি। সেঁজুতির ভাগ্যক্রমে সেই হাই স্কুলের মাস্টারের সাথেই একদিন বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।সেঁজুতির আজ বড় একটা ছেলে আছে তার নাম রেখেছে উৎপল। করিমের বউ,জোহরা,আমেনা চাচি, রেনু বেগম সবাই আজ বৃদ্ধাদের কাতারে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এরমধ্যে কত মানুষেরই না মৃত্যু হলো। তুলি আর কখনো ফিরে আসেনি এই গ্রামে। ওরা কেমন আছে,কোথায় আছে আজ বড্ড জানতে ইচ্ছে করে সেঁজুতির। সেঁজুতির সেই শ্রাবণী নামের মেয়েটার কথাও জানতে ইচ্ছে করে খুব। আজ সেঁজুতির ও মাথার কালো চুল সাদা রং ধারণ করেছে। শৈশবের সেই উচ্ছ্বল বালিকা আজ বৃদ্ধাদের কাতারে পা রেখেছে। উৎপল একদিন সেঁজুতির হাত ধরে বলেছিলো, "কথা দে,কোনদিন আমাকে ছেড়ে যাবি না।আমি যদি কখনো নিখোঁজ ও হয়ে যাই অনেকদিনের জন্য তবুও আমায় ভুলে যাবি না।মনে রাখবি আমি যেখানেই থাকি না কেন তোকে ঠিকই মনে রাখবো।আমার কথাগুলো কি তুই রাখবি? কথাগুলো কি সত্যিই রাখতে পেরেছে সেঁজুতি? একজীবনে কি আর সবকথা রাখা যায়?সেঁজুতি আর উৎপলের সেই দুরন্ত প্রেমের কথাই তো কেউ মনে রাখবে না সেঁজুতির মৃত্যুর পর।তখন কেউ জানবেই না, উৎপলের এক লজ্জাবতী ভালবাসা ছিলো আর সেঁজুতি ও একদিন এক ছেলের মুচকি হাসির প্রেমে পড়েছিলো এবং সেই প্রেমের একদিন মৃত্যু ও হয়েছিলো কোনো এক শ্রাবণ মেঘের দিনে। লেখাঃ হামিদা ইমরোজ। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৬৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ শ্রাবণ মেঘের দিন(৩য় ও শেষ পর্ব)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now