বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
চরনগর নামের গ্রামটি পদ্মার তীরে বসে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। নদীর স্রোতের মতো এখানে জীবনের স্রোতও চলে আসে, চলে যায়। বিদ্যুত এসেছে, মোবাইল ফোন এসেছে, স্কুলও তৈরি হয়েছে; কিন্তু গ্রামবাসীর কিছু বিশ্বাস আর প্রথা আজো বদলায়নি। প্রাচীন শিকলের মতোই সেগুলো আঁকড়ে ধরে আছে মানুষের মন।
এই গ্রামেরই একটি কুঁড়েঘরে থাকে শিউলি। বয়স মাত্র ষোলো। শিউলি যেন গ্রামের সকালের রোদ, কচি বাতাসে ভেসে বেড়ানো এক চঞ্চল পাখি। পড়াশোনায় খুব ভালো, তাই স্কুলের শিক্ষকরা তাকে আদর করে। ক্লাসে যখন উত্তর দেয়, সহপাঠীরা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। শিউলিরও স্বপ্ন আছে—একদিন সে শিক্ষক হবে। গ্রামের মেয়েদের পড়াশোনা শেখাবে, যেন কারো শৈশব অপূর্ণ না থেকে যায়।
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে আছে একটি দীর্ঘ পথ, যার প্রতিটি ইট বাঁধা আছে দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ আর কুসংস্কারের সিমেন্টে।
রফিক মিয়া, শিউলির বাবা, একজন দিনমজুর। প্রতিদিন মাঠে কাজ করে যা আয় হয়, তাতেই চলে সংসার। কখনো কাজ না পেলে সারাদিন অনাহারে কাটাতে হয়। শিউলির মা রোকেয়া বেগমও মাঝে মাঝে অন্যের বাড়ি কাজ করে সংসারে সাহায্য করেন। কিন্তু তবু তাদের জীবন কষ্টময়।
এক বিকেলে শিউলি খেলার ছলে মায়ের হাত থেকে ভাতের থালা নিয়ে ভাইয়ের সামনে বসিয়ে দিল। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে একটি ফিসফিস শব্দ ভেসে এলো—“রফিকের মেয়ে শিউলির বিয়ের কথা নাকি ঠিক হয়ে গেছে!” শিউলির কানে কথা গিয়েই বেজে উঠল ঘণ্টার মতো। সে ছুটে গিয়ে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করল, “মা, এটা কি সত্যি?”
রোকেয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ মেয়ে, তোকে বিয়ে দিতে হবে এখন। তোর বয়স হলো।”
শিউলির বুকটা কেঁপে উঠল। “কিন্তু মা, আমার তো বয়স মাত্র ষোলো! আমি তো এখনো স্কুলে পড়ি। আমি কি পড়াশোনা শেষ করতে পারব না?”
রোকেয়ার চোখে জল এসে গেল। তিনি ধরা গলায় বললেন, “মেয়ে, আমরা গরিব মানুষ। তোকে যত দ্রুত বিয়ে দেওয়া যায়, ততই ভালো। না হলে সমাজে কথা উঠবে। আর পাত্র নাকি ভালো, যৌতুকও লাগবে না। তোর আব্বারও আর কিছু বলার নেই।”
শিউলি স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো, তার বুকের ভেতর সব স্বপ্ন গুঁড়িয়ে পড়ছে।
কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব এসে রফিক মিয়াকে বললেন, “রফিক ভাই, মেয়ে তো বড় হয়ে গেছে। সমাজ কী বলবে? কোরআনে বিয়ে হালাল করা হয়েছে। মেয়েকে ঘরে বসিয়ে রাখলে গুনাহ হবে।” চারপাশের প্রবীণরাও চাপ দিলেন—“আইন কে দেখে? আমাদের গ্রামে প্রথাই আসল।”
রফিক মিয়া ভেতরে ভেতরে ভাঙতে লাগলেন। তার মনে হলো, তিনি যেন সমাজের কাছে বন্দি।
কিন্তু শিউলি হাল ছাড়ল না। কান্না জড়ানো গলায় বাবাকে বলল, “আব্বা, আমাকে পড়তে দাও। আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি জানি, আইন অনুযায়ী আমার বয়স হয়নি।”
রফিক মিয়ার চোখ রাঙা হয়ে উঠল। “আইন দিয়ে কি পেট ভরবে? সমাজের সামনে মুখ দেখাব কিভাবে? তোকে যত তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া যায়, তত ভালো।”
শিউলির স্বপ্ন তখন ভাঙা কাঁচের মতো পায়ের নিচে চূর্ণ হলো।
অবশেষে, পাশের গ্রামের দোকানদার রাশেদের সঙ্গে বিয়ের দিন ঠিক হলো। বয়স পঁচিশ। শিউলির বিয়েতে কোনো যৌতুক লাগল না বলে রফিক মিয়ার বুক হালকা হলো। মনে হলো, তিনি যেন বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলেন।
কিন্তু শিউলির জীবনের আকাশে নেমে এলো অন্ধকার। শ্বশুরবাড়ির অসীম কাজকর্ম, রাশেদের রুক্ষ আচরণ, আর অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে ফেলল। একসময় পড়াশোনা ছিল তার প্রাণ, এখন হাতে বই ধরার ফুরসতই নেই।
কিছুদিন পর জানা গেল, শিউলি মা হতে চলেছে। কিন্তু বয়স কম হওয়ায় ডাক্তাররা জানালেন, ঝুঁকি অনেক বেশি। শিউলির শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। ভেতরে ভেতরে আতঙ্ক গ্রাস করল তাকে।
এক রাতে একা বসে পুরোনো ডায়েরি খুলল শিউলি। সেখানে লেখা ছিল, “একদিন আমি শিক্ষক হব, গ্রামের সব মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাব।” পাতাগুলো ভিজে গেল তার অশ্রুতে। মনে হলো, স্বপ্নগুলো যেন কেবল শূন্যে ঝুলে রইল।
অন্যদিকে, পাশের স্কুলের শিক্ষক সেলিনা ম্যাডাম খবর পেলেন শিউলির বিয়ের কথা। তাঁর বুকটাও কেঁপে উঠল। তিনি বললেন, “আমাদের দেশে আইন আছে, আঠারোর আগে বিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু গ্রামে এখনো প্রথার কাছে আইন হেরে যায়।” স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে চাইলে গ্রামবাসী বাধা দিল। বলল, “এগুলো পারিবারিক বিষয়, প্রশাসন কী করবে?” সেলিনা ম্যাডাম অসহায়ের মতো নীরব হলেন।
গর্ভকাল বাড়তে থাকল, কিন্তু শিউলির শরীর ভেঙে পড়ল। একদিন হঠাৎ প্রবল যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ল সে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই জটিলতার কারণে তার গর্ভপাত হলো। বুকভাঙা কান্নায় শিউলি ভাবল, “এটা কি আমার অপরাধ? আমি তো শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। একটু পড়াশোনা করতে চেয়েছিলাম।”
কিন্তু ভাগ্য একেবারেই তাকে মাটিতে মিশিয়ে দিল না। একদিন সেলিনা ম্যাডাম এসে তার হাত ধরে বললেন, “শিউলি, জীবন এখানেই শেষ নয়। তুমি আবার পড়তে পারো। আমি তোমাকে সাহায্য করব। তোমার অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্য মেয়েদের বোঝাতে পারবে, যেন তারা তোমার মতো শিকার না হয়।”
শিউলির চোখ ভিজে উঠল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, “আমার স্বপ্ন হয়তো শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি অন্য মেয়েদের স্বপ্ন ভাঙতে দেব না।”
পদ্মার তীরে চরনগরের বাতাসে সেই প্রতিজ্ঞা ভেসে গেল। হয়তো একদিন গ্রামের প্রতিটি মেয়ে শিউলির কণ্ঠে সাহস খুঁজে পাবে। হয়তো একদিন সমাজ বুঝবে, শৈশবের জায়গা হলো খেলাঘর আর স্কুলের মাঠে, সংসারের বোঝায় নয়।
শিউলির অসমাপ্ত শৈশব তখন হাজারো কিশোরীর মুখে উচ্চারিত হবে এক সতর্কবার্তা হয়ে—বাল্যবিবাহ কেবল একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি পুরো সমাজের অভিশাপ। আর প্রতিটি শিউলি যদি একদিন নিজের কণ্ঠ খুঁজে পায়, তবে এই অভিশাপ ভাঙবেই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now